সুবাস জড়ানো অলিন্দে-৪ | আহমাদ সাব্বির

সুবাস জড়ানো অলিন্দে

৩১.

একজন মানুষ, সে নিজের জন্যে ব্যয় করে, পরিবারের জন্যে ব্যয় করে আবার সে তার সম্পদ ব্যয় করে এমনও কারুর জন্যে যে নয় তার আত্মীয়৷ এই যাবতীয় ব্যয়ের সময় সেই মানুষটির উচিত আল্লাহ তা’লার সন্তুষ্টির নিয়ত করা৷ সাদাকাহ, দান, খায়রাত ইত্যকার ব্যয়ের সময় মানুষের সমুখে তো রবের সন্তোষ অর্জনের সদিচ্ছা থাকেই; উল্লিখিত সমুদয় ব্যয়ের সময়ও যদি তার সামনে রবের সন্তুষ্টি অর্জন উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তবে যা ব্যয় করছে সে নিজের জন্যে, পরিবারের জন্যে এবং নাম-গোত্র-পরিচয়হীন মানুষটির জন্যে সব কিছুর বিনিময় জমা পড়ে যাবে আল্লাহর কাছে৷ আল্লাহ তা’লা তাঁর উদ্দেশ্যে ব্যয়িত সম্পদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না৷

৩২.

পরিবারের ভরণ-পোষণ পরিবার-কর্তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব৷ সে এই আবশ্যকীয় দায়িত্ব পালনের সময় যদি একবার কল্পনা করে নেয়— (যেমন ধরুন) পরিবারের জন্যে এই গোশতটুকু কিনছি যেন আল্লাহ খুশি হন৷ তবে এই পরিবার-কর্তা তার প্রতি কাজে দ্বিগুণ সাওয়াব লাভ করবে৷ পরিবারের ভরণ-পোষণের আবশ্যকীয় দায়িত্ব সম্পন্ন করবার জন্যে এবং সেই কাজটি আল্লারই সন্তোষ লাভের আশা নিয়ে যে করেছে, সেই জন্যে৷ মনে রাখবেন— প্রতিটি কাজের বিনিময় প্রাপ্তি নির্ভর করে কর্তার ‘ইচ্ছে’র ওপর৷

৩৩.

আমার মুরশিদ আবদুল হাই- আল্লাহ তা’লা তার কবরে শীতলতা দান করুন- বলতেন— কোনো কাজ দুনিয়া কিংবা দীন হওয়া অনেকাংশেই নির্ভর করে দৃষ্টি ভঙ্গির ভিন্নতার ওপর৷ খাদ্য গ্রহণ, নিদ্রা যাওয়া, ওঠা-বসা করা— এসব নিছক দুনিয়া-সংশ্লিষ্ট কাজ৷ কিন্তু যদি দৃষ্টিভঙ্গি বদলে চিন্তা করা হয়— “তোমার শরীরের হক রয়েছে” নবিজীর বর্ণিত সেই হক আদায়ের জন্যে আমি খাদ্য গ্রহণ করি, নিদ্রা যাই; তবে, নিঃসন্দেহে আমার ঘুম, আমার আহার কিছুই নিষ্ফল নয়; এসবের বিনিময়েও রবের কাছে আমার জন্যে নির্ধারিত হবে প্রতিদান৷

৩৪.

উপহার-উপঢৌকন, হাদিয়া হতে হবে ভালোবাসা, হৃদ্যতা ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ৷ নিছক সামাজিকতা রক্ষার্থে হাদিয়া প্রদান অনুচিত এবং আল্লাহ তা’লার নিকট অপছন্দনীয়৷ অমুক অনুষ্ঠানে খালি হাতে গেলে ইজ্জত থাকবে না— এই অনুভূতি নিয়ে হাদিয়া প্রদান নিন্দনীয়৷ এমতাবস্থায় যদি হাদিয়া প্রদান থেকে নিরস্ত থাকা হয়, এবং এই নিরস্ত থাকাটা যদি হয়ে থাকে কেবল আল্লাহ তালারই সন্তোষ লাভের উদ্দেশ্যে তবে সে মহান রবের নিকট এর বিনিময়ে লাভ করবে প্রভূত কল্যাণ৷

৩৫.

আলেম-উলামা ও আল্লাহ ওয়ালা বুজুর্গদের সাথে সম্পর্ক তৈরীর এবং তা রক্ষা করে চলবার একটিই উদ্দেশ্য হতে হবে— আল্লাহ তা’লার সন্তোষ লাভ৷

৩৬

কখনও-সখনও শয়তান আমাদের ধোঁকায় ফেলে দেয়৷ আল্লাহ ওয়ালাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক রক্ষার উদ্দেশ্য হয়ে পড়ে দুনিয়া-লাভ৷ আমাদের হৃদয়ে এই সুখানুভূতি জেগে ওঠে— আমি অমুক বুজুর্গের সাথে যদি সম্পর্ক রেখে চলি লোকে আমায় ভিন্ন দৃষ্টিতে বিবেচনা করবে৷ সবখানে আমার কদর হবে৷ সম্মানিত হয়ে উঠব আমি মানুষের চোখে৷ আর যদি তার একান্ত খাদেম হতে পারি তবে তো কথাই নেই! মূল্যবান হাদিয়া তোহফা সব আমার হাতে আসবে! কিংবা উদ্দেশ্য যদি হয়— বুজুর্গ ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমে আমি অমুক পদ বাগিয়ে নেব৷ আমার অমুক কাজটা হাসিল করে নিতে পারব তার সাথে সম্পর্কের দোহাই দিয়ে! আল্লাহ তা’লার কাছে পানাহ চাই৷ বুজুর্গ ব্যক্তির সাথে সম্পর্ক রক্ষার উদ্দেশ্য যদি এমনই হয়ে থাকে তবে নিজেকে এখনই শোধরে নেয়া উচিত৷ নতুবা এই সম্পর্ক আল্লার তা’লার নারাজি ডেকে আনবে৷

৩৭.

আমাদের মধ্যকার যাবতীয় সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত আল্লাহ তা’লার সন্তুষ্টি৷ মা-বাবার প্রতি আমার হৃদয়ে যে নিখাঁদ ভালোবাসা, স্ত্রী-সন্তানের প্রতি যে সুতীব্র প্রেম, ভাই-বোন, বন্ধু-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর জন্যে হৃদয়ের গহীনে যে টান, যে মায়া তার সব হতে হবে একমাত্র আল্লাহর জন্যে৷ আল্লাহ তা’লার সন্তুষ্টি লাভ ব্যতিত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে যদি হয়ে থাকে আমার ইশক-মুহাব্বাত-ভালোবাসা তবে মহান রবের দরবারে তার কানা কড়িও মূল্য নেই৷

৩৮.

কারুর সাথে আমার সম্পর্ক, কারুর প্রতি আমার হার্দিক আকর্ষণ কিংবা কারুর জন্য আমার ভালোবাসা একমাত্র আল্লাহ তা’লারই সন্তুষ্টির জন্যে কিনা— জানার উপায় কী? উপায় হলো— তার সাথে সম্পর্ক রক্ষা করতে গিয়ে যদি আল্লাহ তা’লার কোনো নারাজির কাজে জড়িয়ে পড়ি তবে কি তাকে আমি অবলীলায় ত্যাগ করতে পারছি? না, হৃদয়ের কোথাও বোধ করে উঠছি গভীর বেদন? এই অবলীলাক্রমে তাকে ত্যাগ করতে পারা ও হৃদয়ের গহনে কোন বিষাদ অনুভূত করে ওঠার মধ্যেই পরিমাপিত হয়ে যাবে— আমাদের মধ্যস্থিত সম্পর্ক আল্লাহ তা’লার সন্তোষ হাসিলের জন্যেই ছিল কিনা!

৩৯.

সবাইকে, সব কিছুকে কেবল আল্লাহরই জন্যে ভালোবাসা— এটা অনায়াস কাজ নয়৷ এর জন্যে প্রয়োজন সাধনা৷ দরকার অধ্যবসায়৷ অনবরত প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে এই গুণ আয়ত্ব করতে হয়৷

৪০.

কাউকে ভালোবাসার পূর্বে, সম্পর্ক স্থাপনের মূহুর্তে নিয়তকে ঝালাই করে নিন৷ নিজেকে প্রশ্ন করুন— কেন তাকে আমি ভালোবাসবো? কেন তার সাথে আমি হার্দিক সম্পর্ক গড়ে তুলবো? কোন উদ্দেশ্যে তার সাথে আমার পথচলা? আল্লাহ তা’লার সন্তুষ্টি লাভেরই জন্যে তো!— এভাবে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে কাঠ গড়ায় হাজিরের মাধ্যমে সব কিছুকে, সবাইকে কেবল আল্লাহ তা’লারই জন্যে ভালোবাসার এই মহৎ গুণ নিজেতে স্থাপিত করে নিতে হবে৷

আরও পড়ুন…

সুবাস জড়ানো অলিন্দে ১ম পর্ব

সুবাস জড়ানো অলিন্দে ২য় পর্ব

সুবাস জড়ানো অলিন্দে ৩য় পর্ব

Facebook Comments