ইতিহাস

মুসলিম ইতিহাসচর্চার গোড়ার কথা | মাহমুদ সিদ্দীকি

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

১.

ইতিহাস হলো কালের দর্পণ। একথা যুগে-যুগে বিজ্ঞজনেরা বলে গেছেন। দর্পণ কিংবা আয়নায় যেমন ভেসে ওঠে মানুষের প্রতিচ্ছবি, তেমনি ইতিহাসের পাতায় ভেসে ওঠে কালের প্রতিচ্ছবি। ইতিহাস কালের দর্পণ বলেই খৃষ্টীয় একবিংশ শতাব্দীতে বসেও আমরা দেখতে পাই খৃষ্টপূর্ব একবিংশ শতাব্দীর প্রতিচ্ছবি। যে-কালের দর্পণ আছে, সে-কাল টিকে থাকবে চিরদিন। যে-কালের দর্পণ নেই, সে-কাল সময়-গহ্বরে বিলীন হয়ে যায়। এই যে পৃথিবীতে বিচরণরত এত-এত জাতি, যে-জাতির ইতিহাস সংরক্ষিত আছে, সে-জাতি ও তাদের অবদান চিরকাল মানুষ পড়বে, জানবে। যে-জাতির ইতিহাস সংরক্ষণ করা হবে না, সেই জাতি কালের বিবর্তনে বিস্মৃত হয়ে যাবে। এজন্য, ইতিহাস রচনা ও সংরক্ষণ অতি জরুরি।

ইতিহাস রচনা যেমন জরুরি, তেমনি ইতিহাসপাঠও জরুরি। ততোধিক জরুরি হলো ইতিহাসপাঠকে ব্যাপক করা এবং সমাজের হাতে এই ইতিহাস তুলে দেওয়া।

ইতিহাস বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে। ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, রাজনৈতিক ইতিহাস, সামাজিক ইতিহাস, জাতিগত ইতিহাস ও আদর্শিক ইতিহাস, ইত্যাদি। যিনি ভূতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করবেন, তার জন্য ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসপাঠ জরুরি। যিনি রাজনীতিবিদ হবেন, তার জন্য রাজনৈতিক ইতিহাস জানা জরুরি। সমাজবিজ্ঞানীর জ্ঞাতব্য হলো সামাজিক ইতিহাস। কিন্তু প্রতিটি ব্যক্তির জন্য জানা জরুরি যে-ইতিহাস, তা হলো— জাতিগত ও আদর্শিক ইতিহাস। আপনার রিজিওন ও অরিজিন কী, আদর্শ ও ইশতেহার কী, আপনার অরিজিন ও আদর্শ এই যুগে কতটা প্রাসঙ্গিক, আদর্শ আদতে কতটা বাস্তবিক আদর্শ, এই আদর্শ প্রকৃতই সঠিক পথের দিশা দেয় কি না— ইত্যাদি প্রশ্নের জবাব খুঁজে পেতে জাতিগত ও আদর্শিক ইতিহাসপাঠ সবসময়ই প্রাসঙ্গিক ও অতি জরুরি।

সুন্নাতুল্লাহি ফিল-আরদ, অর্থাৎ পৃথিবীতে আল্লাহ তাআলার রীতি হলো— প্রতিটি ঘটনা পৃথিবীতে ঘুরেফিরে আসে, বারবার ঘটে। প্রতিটি সুখ ও শোক, উত্থান ও পতন, স্ট্র্যাটেজি ও ট্র্যাজেডি— সবকিছুর পুনরাবৃত্তি ঘটে। কুরআনে বর্ণিত বিভিন্ন নবির উম্মতের বিবরণ, তাদের স্ট্র্যাটেজি ও ট্র্যাজেডি এবং ইতিহাসের গলিঘুপচি থেকে উঠে-আসা ইতিহাসগ্রন্থাদি এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। বহু নবির উম্মতের ক্ষেত্রে সুন্নাতুল্লাহ তথা আল্লাহ্‌র নীতি ও রীতি অভিন্নভাবে প্রয়োগ হয়েছে। ইতিহাসের বহু রাজা-বাদশাহর উত্থান-পতন একই আঙ্গিকে হয়েছে। এমনকি আধুনিক রাষ্ট্রের ইতিহাসেও বহু রাষ্ট্রের স্বাধীনতার ইতিহাস একটি অপরটিতে পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ইতিহাসের যিনি পাঠক এবং সচেতন পাঠক, তিনি ইতিহাসের এইসব ঘটনাবলি থেকে শিক্ষা নেন। ফলে, ইতিহাসপাঠ সবসময়ই প্রাসঙ্গিক ও জরুরি।pdf

২.

ইতিহাস বর্ণনার ধারা পৃথিবীতে বহুকাল থেকে চলমান। ইসলামপূর্ব সময়ের আলাপ বাদ দিয়ে যদি সাড়ে চৌদ্দশ’ বছর থেকে শুরু করি, তাহলে ইসলামি ইতিহাস বর্ণনার সূচনা করেছেন স্বয়ং আল্লাহ তাআলা। “এভাবে আমি আপনার কাছে বর্ণনা করি যারা গত হয়ে গেছে, তাদের ইতিহাস” (১)—এই কথা বলে সেই ঘোষণাও দিয়ে রেখেছেন। ঐতিহাসিক প্লাবন ও নুহ আলাইহিসসালামের বিবরণ বিবৃত করবার পর বলছেন—“এগুলো অদৃশ্যের সংবাদ। আমি আপনাকে তা ওহি করি। এগুলো ইতিপূর্বে না আপনি জানতেন, আর না আপনার কওম জানত”। (২)

আবু জাফর তাবারি রহ. উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা রহ.-এর একটি আসার এনেছেন। কাতাদা রহ. বলেন, উক্ত আয়াতে কুরআনের কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা যদি কুরআনে বর্ণনা না করতেন, তাহলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর কওম জানতেন না—নুহ আলাইহিসসালাম ও তাঁর কওমের সাথে কী ঘটেছিল। (৩) মোটকথা, ইসলামি ইতিহাস বর্ণনার সূচনা স্বয়ং আল্লাহ তাআলা কুরআনে করেছেন।
পবিত্র কুরআনুল কারিমে পূর্ববর্তী নবিদের উম্মত ও অবাধ্য বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ইতিহাস বিবৃত করেছেন স্পষ্টভাবে।

তবে, কুরআনের ইতিহাস ও ঘটনা বিবৃতির পন্থা ও পদ্ধতি, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং ধরন ও রকম একটু আলাদা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য নবি-রাসুল এবং তাঁদের উম্মতের ঘটনা বিবৃত করেছেন। কিন্তু, কোনো উম্মতের ঘটনাই বিস্তারিত বর্ণনা করেননি। প্রতিটি বিবরণ উল্লেখ করেছেন প্রয়োজন অনুপাতে। কুরআন ইতিহাস বর্ণনা করেছে নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে। প্রায় প্রতিটি ঘটনা ও ইতিহাস বর্ণনার পর সমাপ্তিতে বিভিন্নভাবে একটি মৌলিক উদ্দেশ্য বিবৃত করেছে—‘নিশ্চয় তাতে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষা ও নিদর্শন’। অর্থাৎ, কুরআন প্রতিটি ঘটনার সেই অংশটুকুই কেবল বর্ণনা করেছে, যেটুকুতে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য শিক্ষা ও নিদর্শন রয়েছে।

যদ্দরুন, ইউসুফ আলাইহিসসালামের ইতিহাস এত বিস্তৃতভাবে বিবৃত করার পরও গভর্নরের স্ত্রীর সাথে পরবর্তীতে পরিণয় ঘটেছিল কি না—এ-কথা কুরআনের কোথাও কিংবা বিশুদ্ধ হাদিসে পাওয়া যায় না। কারণ, ইউসুফ আলাইহিসসালামের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার সংগ্রাম ও প্রচেষ্টায় শিক্ষার উপাদান থাকলেও পরবর্তী আখ্যানে কোনো শিক্ষার উপাদান নেই। সাধারণ ইতিহাস বর্ণনা এবং কুরআনের ইতিহাস বর্ণনার এটাই হলো প্রধান ও মৌলিক পার্থক্য।

কুরআনে এইসব ইতিহাস বর্ণনার আরেকটি সম্পূরক উদ্দেশ্যের কথা এভাবে বিবৃত হয়েছে—‘আমি আপনার কাছে পূর্ববর্তী রাসুলদের সব ঘটনা বিবৃত করি, যা দ্বারা আমি আপনার চিত্তকে সুদৃঢ় করি’। (৪) উপরোক্ত কথাগুলোকে সামনে রেখে কুরআনের ইতিহাস বর্ণনা থেকে যে-মূলনীতিটি পাওয়া যায় তা হলো—ইসলামি ইতিহাস বর্ণনা, রচনা, সংরক্ষণ, পাঠ ও চর্চার মৌলিক উদ্দেশ্য হলো ইতিহাস থেকে শিক্ষা অর্জন।

৩.

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নির্মম সত্য হলো, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। কথাটি যিনি বলেছেন, অতি সুন্দর ও বাস্তব বলেছেন। মানবসমাজের এই উদাসীনতার দরুন কুরআন একই ধাঁচের একাধিক জাতির ইতিহাস একাধিকবার বর্ণনা করেছে।
মুসলিম জাতির রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসের কথা বাদ দিলেও খোদ ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে যে-ইতিহাস তারা রচনা করেছেন, একজন সচেতন মুসলিম কিংবা জ্ঞানপিপাসু অমুসলিম—এই বিষয়ক অজ্ঞতা সকলের জন্য একপ্রকার অপরাধতুল্য।
ইতিহাস সংরক্ষণ এবং বর্ণনা স্বয়ং নববি যুগ থেকেই মুসলিমদের মাঝে ব্যাপকভাবে চর্চিত হয়ে আসছে।

নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিটি মুভমেন্ট, যুদ্ধ কিংবা শান্তিচুক্তি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা, ভূগোল ও স্থাপত্য, ইসলামের প্রধানতম প্রতিটি বিধান আরোপ, এমনকি কুরআনের প্রতিটি সুরা অবতরণের ইতিহাস সাহাবায়ে কেরাম সংরক্ষণ করেছেন সুনিপুণভাবে। দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দীতে এসে সূচনা হয় গ্রন্থরচনার। যা ব্যাপকতা লাভ করে তৃতীয় শতাব্দীতে। এর আগ পর্যন্ত নিজস্ব খাতায়-পুঁথিতে এবং মস্তিষ্কে সংরক্ষিত ছিল এইসব। হাদিস এবং ইতিহাস, হাদিসের শুদ্ধাশুদ্ধি নির্ণয়ের লক্ষ্যে হাদিসের বর্ণনাকারী ব্যক্তিদের জীবনী ইত্যাদি গ্রন্থ রচনার সূচনা মূলত দ্বিতীয় শতাব্দীতেই হয়। নববিযুগ থেকে নিয়ে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত সময়টা ছিল ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ। ধীরে-ধীরে ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য গ্রন্থের সংখ্যা সর্বদা বেড়েছে।

ইতিহাস সংরক্ষণের সূচনা নববি যুগ থেকে হলেও ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইতিহাস রচনা ও চর্চার সূচনা নববি যুগের কিছু পরে শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ইতিহাস রচনা শুরু হয়েছে দ্বিতীয় শতাব্দীতে। ইবনুন নাদিম বিভিন্ন অধ্যায়ের আলোচনা শেষে ওই বিষয়ের অভিজ্ঞ আলিমদের গ্রন্থাবলির তালিকা উল্লেখ করেছেন ধারাবাহিকভাবে। ইমাম ও ফকিহ লাইছ ইবে সা’দের পূর্বে কারও রচনাবলিতে ইতিহাসগ্রন্থ রচনার উল্লেখ পাওয়া যায় না। ইমাম লাইছ ইবনে সা’দের জীবনকাল হলো—৯৪-১৭৫ হি.। লাইছের রচনাবলির তালিকায় ইবনুন নাদিম উল্লেখ করেছেন—“তাঁর ‘কিতাবুত তারিখ’ নামে ইতিহাসগ্রন্থ আছে”। (৫) আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ.-এর রচনাবলিতে উল্লেখ করেছেন—তিনি ‘কিতাবুত তারিখ’ নামে ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেছেন। ইবনুল মুবারকের ওফাত হয় ১৮১ হিজরিতে, জিহাদ থেকে ফেরার পথে বাগদাদের নিকটবর্তী ‘হিত’ নগরে। (৬) মুহাম্মদ ইবনুল হাসান ইবনু যাবালা ‘তারিখুল মাদিনাহ’ নামে দ্বিতীয় শতাব্দীতে ইতিহাসের গ্রন্থ রচনা করেন। (৭) ইবনু যাবালার মৃত্যুর সন ইতিহাসবিদগণ নিশ্চিতভাবে না লিখতে পারলেও হাফেয ইবনে হাজার রহ. বলেছেন—“ইবনু যাবালা দুইশো হিজরির পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছেন”। (৮)

প্রথম ইতিহাগ্রন্থের রচয়িতা কে—এই বিষয়ে বিশিষ্ট মুহাক্কিক আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াহইয়া আল-মুআল্লিমির (১৩৮৬ হি.) তাহকিকটি সামনে রাখা যেতে পারে। আবুল কাসেম আস-সাহমি জুরজানির (৪২৭ হি.) ‘তারিখু জুরজান’-এর শুরুতে লেখা মুহাক্কিকের ভূমিকায় মুআল্লিমি এই বিষয়ক আলোচনায় লেখেন—“প্রথম ইতিহাসগ্রন্থ রচয়িতা হিসেবে যার নাম জানা যায় তিনি হলেন মিশরের আলিম ইমাম লাইছ ইবনে সা’দ। ইবনুন নাদিম লাইছ ইবনে সা’দের ‘কিতাবুত তারিখ’ নামে ইতিহাসগ্রন্থ রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। তারপর পাওয়া যায় খোরাসানের আলিম ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারকের নাম। তাঁর গ্রন্থের কথাও ইবনুন নাদিম উল্লেখ করেছেন। শামের আলিম ওলিদ ইবনুল মুসলিম দিমাশকির (১১৯-১৯৫ হি.) জীবনীতে তাযকিরাতুল হুফফাযে হাফেয যাহাবি লিখেছেন—ওলিদ অনেক গ্রন্থ ও ইতিহাস রচনা করেছেন। আরও উল্লেখ করেছেন—তার গ্রন্থসংখ্যা সত্তুর”। (৯)

সুতরাং যেকথাটি আমরা বলতে পারি তা হলো—১৭৫ হিজরির পূর্বেই ইমাম লাইছ ইবনে সা’দ মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেন। এরপর ১৮১ হিজরির পূর্বে আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করেন। একই সময়ে আরও কিছু ইতিহাসগ্রন্থ রচিত হয়।

এখানে একটি কথা বিশেষভাবে স্মর্তব্য এই যে—লাইছ ইবনে সা’দ এবং আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক; উভয়ের ওফাতের সন কাছাকাছি। তাই নির্দিষ্টভাবে জোর দিয়ে একথা বলা যায় না—কার রচনাকাল সর্বপ্রথম। তবে স্বাভাবিক হিসেবে লাইছ ইবনে সা’দই প্রথম রচয়িতা হিসেবে ধর্তব্য হবেন। এছাড়া কাছাকাছি সময়ে আরও কাউকে পাওয়া গেলে তাঁদের মৃত্যুসন মিলিয়ে সামঞ্জস্য বিধান করতে হবে।

৪.

গ্রন্থবদ্ধ ইতিহাস রচনা হয়েছে মৌলিকভাবে দুই আঙ্গিকে।

এক. ব্যক্তির জীবনী সংরক্ষণ।
দুই. ধারাবাহিক ইতিহাস লিপিবদ্ধকরণ।

প্রথম যুগে ইতিহাস রচনার মূল উদ্দেশ্য ছিল হাদিসের শুদ্ধাশুদ্ধি নির্ণয়ের জন্য রাবিদের জীবনী সংরক্ষণ। যদ্দরুন তৎকালীন ইতিহাসগ্রন্থগুলো প্রচলিত ইতিহাসগ্রন্থের ন্যায় ধারাবাহিক ইতিহাসসমৃদ্ধ ছিল না। বরং হাদিসের রাবিদের জীবনী আলোচনাই মূল লক্ষ্য ছিল। যার ফলে এই সংক্রান্ত গ্রন্থগুলোতে হাদিসের বর্ণনাকারী না হলে রাজনৈতিক বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গও স্থান পাননি। যেসব রাবিদের জীবনী স্থান পেয়েছে, সেগুলোতেও সাধারণ জীবনীর চেয়ে তাঁদের ইলমি সফর, উস্তাদ ও ছাত্রের তালিকা, মৃত্যুসন এবং ‘জারহ ও তা’দিল’ সংক্রান্ত আলোচনাই মূলত স্থান পেয়েছে। একারণে প্রাথমিক যুগে রচিত এসব গ্রন্থ থেকে ব্যক্তির ইলমি শান ও মান, মর্যাদা ও অবস্থান জানা গেলেও সম্পূর্ণ জীবনী বা ব্যক্তিগত তথ্যাবলি জানা যায় না। উদ্দেশ্যের বিচারে এই পদ্ধতিই ছিল সবচেয়ে জরুরি এবং প্রাসঙ্গিক।
এই সংক্রান্ত গ্রন্থগুলো আবার রচিত হয়েছে দুইভাবে। এক. বিচ্ছিন্নভাবে অক্ষরবিন্যাস অনুযায়ী জীবনী রচনা। দুই. ‘তবকা’ অনুযায়ী জীবনী রচনা।

দ্বিতীয়-তৃতীয় শতাব্দীর বিচ্ছিন্নভাবে অক্ষরবিন্যাস অনুযায়ী রচিত ইতিহাসগ্রন্থগুলোর নামকরণের ক্ষেত্রে সাধারণত মুসান্নিফগণ ‘তারিখ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। তৃতীয় শতাব্দীতে এই ধারা ব্যাপকতা লাভ করে যাদের হাত ধরে, তাদের গ্রন্থগুলো হলো—তারিখু ইয়াহইয়া ইবনে মাইন (২৩৩ হি.), আত-তারিখুল কাবির—ইমাম বুখারি (২৫৬ হি.), তারিখুল ইজলি (২৬১ হি.), তারিখু ইবনে আবি আবি খাইসামা (২৭৯ হি.), তারিখু আবি যুরআ আদ-দিমাশকি (২৮১ হি.)। আরও অনেক গ্রন্থ রচিত হলেও এগুলোকে ওই যুগের প্রসিদ্ধ গ্রন্থাবলি ধরা যেতে পারে। (১০)
তিনশো হিজরি পর্যন্ত সময়টা ছিল হাদিস সংরক্ষণ ও লিপিবদ্ধকরণের আসল যুগ। পরবর্তীতেও হাদিসের গ্রন্থ রচিত হয়েছে বটে; তবে মৌলিকভাবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দী ছিল এককভাবে হাদিস সংরক্ষণের যুগ। এইজন্য হাদিসের শুদ্ধাশুদ্ধি যাচাইয়ের জন্য রাবিদের পরিচিতিমূলক জীবনী ও ‘জারহ ও তা’দিল’-এর আলোচনা লিপিবদ্ধ করে সংরক্ষণ করাটা ছিল হাদিস যাচাইয়ের মৌলিক প্রয়োজনের অন্তর্ভুক্ত। তাই এই ধর্মী রচনা ছিল প্রয়োজনের বিচারে প্রাধান্যপ্রাপ্ত। পরবর্তীতে এই ধারার পরিবর্তন ঘটে। ‘জারহ ও তা’দিল’-এর আলোচনার পাশাপাশি বিস্তারিত জীবনীও উঠে আসে তিনশো হিজরির পরবর্তীতে রচিত জীবনীগ্রন্থগুলোর মাঝে। তবে সেই গ্রন্থগুলো রচিত হয়েছে নির্দিষ্ট শহরের বাসিন্দা এবং সেখানে আগমনকারী ব্যক্তিবর্গ নিয়ে। যেমন—তারিখে মিসর—ইবনে ইউনুস আল-মিসরি (৩৪৭ হি.), তারিখে নাইসাবুর—হাকেম নাইসাবুরি (৪০৫ হি.), তারিখে আসবাহান—আবু নুআইম আসবাহানি (৪৩০ হি.), তারিখে বাগদাদ—খতিব বাগদাদি (৪৬৩ হি.), এবং তারিখে দিমাশক—ইবনে আসাকির (৫৭১ হি.), ইত্যাদি। (১১)
এই তালিকায় বিশেষভাবে আরও যে নামটি থাকবে সেটি হলো—আন-নুজুমুয যাহিরাহ ফি মুলুকি মিসর ওয়াল কাহিরাহ—ইবনে তাগরিবারদি আল-আতাবেকি (৮৭৪ হি.)।

তবে, অঞ্চলকেন্দ্রিকতার বাইরে গিয়ে সামগ্রিকভাবে জীবনীভিত্তিক ইতিহাস রচনা করেছেন বেশ কয়েকজন। ইবনে খাল্লিকান (৬৮১ হি.) এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ওয়াফায়াতুল আ’ইয়ান ওয়া আম্বাউ আবনাইয যামান গ্রন্থে তাঁর সমকাল পর্যন্ত প্রসিদ্ধ সকল ব্যক্তির জীবনী রচনা করেছেন। তবে সাহাবা ও তাবেয়ি ও খলিফাদের সচেতনভাবে এড়িয়ে গেছেন। সেকথা বলেও দিয়েছেন ভূমিকায়। ওয়াফায়াতুল আ’ইয়ানের ‘যায়ল’ বা সম্পূরক আরেকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে শাকের আল-কুতবি (৭৬৪ হি.)—ফাওয়াতুল ওয়াফায়াত। এটিও মূল কিতাবের ধারা অনুসরণ করেই লেখা। ওয়াফায়াতুল আ’ইয়ানে যেসব জীবনী আসেনি, কিন্তু আসা জরুরি মনে হয়েছে, মুহাম্মাদ ইবনে শাকের আল-কুতবি সেসব জীবনী এখানে সংকলন করেছেন। তারই সমসাময়িক আরেকজন বিখ্যাত জীবনীকার হলেন—সালাহুদ্দিন খলিল বিন আইবেক সাফাদি (৭৬৪ হি.)। অভিন্ন ধারায় রচিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থটি হলো—আল ওয়াফি বিল ওয়াফায়াত। ফাওয়াতুল ওয়াফায়াতের মুহাক্কিকের বক্তব্য থেকে আরেকটি জরুরি তথ্য জানা যায়। সেটি হলো—মুহাম্মাদ ইবনে শাকের আল-কুতবি তাঁর গ্রন্থে বিভিন্ন জীবনীর ক্ষেত্রে সমসাময়িক সালাহুদ্দিন সাফাদির আল ওয়াফি বিল ওয়াফায়াত থেকে বেশকিছু জীবনী নিজের গ্রন্থে নিয়েছেন। এবং সেক্ষেত্রে সাফাদির হুবহু ভাষ্য ও বক্তব্য সহই নকল করে দিয়েছেন। (১২)

জীবনীগ্রন্থ রচনার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় যে-পদ্ধতিটি অনুসৃত হয়েছে—‘তবকা’ অনুযায়ী জীবনী রচনা। সোজা বাংলায় তবকা বোঝাতে বলা যেতে পারে—একটি প্রজন্ম বা একটি শ্রেণি; কিংবা নির্দিষ্ট একটি সময়কাল। তা হতে পারে দশ বছর, হতে পারে বিশ বছর, হতে পারে চল্লিশ বছরও। এটা নির্ভর করে গ্রন্থরচয়িতার ওপর। কেউ-কেউ তবকার একটি নির্দিষ্ট সময়কাল নির্ধারণ করতে চেয়েছেন। কিন্তু তবকা অনুযায়ী রচিত গ্রন্থাবলি ঘাঁটলে দেখা যায়—তবকা বোঝাতে মুসান্নিফগণ নির্দিষ্ট কোনো সময়কাল মানেননি। (১৩) তবকা অনুযায়ী জীবনীগ্রন্থ রচনার মানে দাঁড়াচ্ছে—লেখক যে বিষয়ের ব্যক্তিবর্গ বা যে সময়ের ইতিহাস লিখছেন, তার সকল ব্যক্তিবর্গ বা পুরো সময়টিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে ফেলা। ধরা যাক একজন রচয়িতা হাফেযে হাদিসদের নিয়ে জীবনী রচনা করবেন তবকা অনুসারে। প্রথমে তিনি সকল হাফেযের তালিকা করে একে ভাগ করবেন কয়েকটি ভাগে। প্রথম তবকা : ৫০ থেকে ১০০ হিজরি পর্যন্ত। দ্বিতীয় তবকা : ১০০ থেকে ১২০ হিজরি পর্যন্ত। এভাবে ভাগ করবেন। সেই ভাগ সাধারণত হতে পারে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যুসন অনুসারে, অথবা ভিন্ন কোনো নীতি অনুসরণ করে। বিশিষ্ট সদ্যপ্রয়াত মুহাক্কিক শায়খ শুয়াইব আরনাউতের উপস্থাপন করা তাহকিক অনুযায়ী এটা পূর্বেই স্পষ্ট হয়েছে যে—তবকার সময়কাল নির্ধারণের ক্ষেত্রে রচয়িতাগণ নিজস্ব স্বাধীনতা অবলম্বন করেন। তাই প্রতিটি গ্রন্থের তবকা সেই গ্রন্থের শুরুতে দেওয়া লেখকের বক্তব্য অথবা পর্যালোচনামূলক অধ্যয়নের মাধ্যমে জেনে নিতে হয়।

এই ধারার ইতিহাসগ্রন্থগুলোতে সাধারণত ব্যক্তির জীবনীর বর্ণনা একটু বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। এই পদ্ধতিতে রচিত ইতিহাসগ্রন্থগুলোর মধ্যে সর্বাগ্রে থাকবে—আত-তাবাকাতুল কুবরা—মুহাম্মদ ইবনে সা’দ (২৩৫ হি.)। ইবনে সা’দ ব্যতীত তৃতীয় শতাব্দীতে এই পদ্ধতিতে গ্রন্থ রচনায় উল্লেখযোগ্যভাবে আরও কয়েকজনের নাম পাওয়া যায়—খলিফা ইবনে খাইয়াত (২৪৪ হি.)—তাবাকাতুর রুওয়াত; আবু হাতেম রাযি (২৭৭ হি.)—তাবাকাতুত-তাবিয়িন। ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ রহ. (২৬১ হি.) এবং ইমাম আহমদ ইবনে শুয়াইব আন-নাসায়ি রহ. (৩০৩ হি.)—উভয়ের গ্রন্থের নামই ‘আত-তাবাকাত’। পরবর্তীতে তবকা অনুযায়ী রচিত বিখ্যাত গ্রন্থগুলো হলো—তাবাকাতুল মুহাদ্দিসিনা বিআসবাহান ওয়াল ওয়ারিদিনা আলাইহা—আবুশ শায়খ আল-আসবাহানি (৩৬৯ হি.), তাবাকাতুস সুফিয়্যাহ—আবু আব্দুর রহমান আস-সুলামি (৪১২ হি.), হিলইয়াতুল আউলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া—আবু নু’আইম আল-আসবাহানি (৪৩০ হি.), [এই কিতাব রচনার পর লেখকের জীবদ্দশায়ই তা চারশো দিনারে বিক্রি হয়], তাযকিরাতুল হুফফায—হাফেয যাহাবি (৭৪৮ হি.), সিয়ারু আ’লামিন নুবালা—হাফেয যাহাবি, তাবাকাতুশ শাফিইয়্যাহ আল-কুবরা—তাজুদ্দিন সুবকি (৭৭১ হি.) এবং তাবাকাতুল হুফফায—হাফেয সুয়ুতি (৯১১ হি.)। এ হলো বিখ্যাত তাবাকাত গ্রন্থগুলোর অল্প কিছু নাম।

তাবাকাতে ইবনে সা’দের পর যে-গ্রন্থটি সবচেয়ে বেশি সমাদৃত হয়েছে সেটি হলো—হাফেয যাহাবির সিয়ারু আ’লামিন নুবালা। মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের বিশিষ্ট কোনো মনীষী সম্পর্কে জানতে হলে সিয়ারের বিকল্প নেই। সিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—‘জারহ ও তা’দিল’ ও জীবনী—উভয়টি সমানতালে এগিয়েছে। যাহাবির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি প্রায়ই অল্পকথায় বিভিন্ন জীবনীর ওপর সামগ্রিক মূল্যায়ন পেশ করেন; যা একাধিক গ্রন্থ অধ্যয়ন করেও বের করে আনা মুশকিল। সিয়ারের যে-বৈশিষ্ট্যটি তাকে আলাদা করে রাখবে তা হলো—অন্য ইতিহাসবিদদের মতো যাহাবি কেবল ইতিহাস বর্ণনা করে যাননি। বরং অপ্রসিদ্ধ, বিচ্ছিন্ন ও অগ্রহণযোগ্য কোনো তথ্য বা বর্ণনা উল্লেখ করলে ‘কুলতু’ বলে এর ওপর মূল্যায়ন পেশ করেছেন; এবং সঠিক বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এর কারণও স্পষ্ট। যাহাবি ইতিহাস ও ‘জারহ ও তা’দিল’—উভয় ক্ষেত্রে সমানতালে পারদর্শী ছিলেন। যার ফলে সিয়ারে এদুয়ের সমন্বয় ঘটেছে খুব নিখুঁতভাবে।

৫.

জীবনীকেন্দ্রিক ইতিহাসের পাশাপাশি মৌলিকভাবে দ্বিতীয় যে-আঙ্গিকে ইতিহাস রচিত হয়েছে তা হলো—ধারাবাহিক ইতিহাস রচনা। ধারাবাহিক ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম রচিত গ্রন্থ কোনটি? এই তাহকিক করতে গেলে প্রাথমিকভাবে সামনে আসে তারিখে ইবনে ওয়াযিহ আব্বাসির কথা; যা তারিখে ইয়াকুবি নামে পরিচিত। আহমদ ইবনে আবি ইয়াকুব ওরফে ইয়াকুবির মৃত্যুসন সম্পর্কে বিশুদ্ধ মত হলো—২৯২ হিজরিতে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। তারিখে ইয়াকুবি নিয়ে কিছুটা বিস্তারিত আলোচনা করা যাক।

ইয়াকুবির পূর্বপর্যন্ত ইতিহাস রচনার মৌলিক ও অভিন্ন ধারাটি ছিল সনদভিত্তিক ইতিহাস বর্ণনা। এতে করে ইতিহাসের সত্যমিথ্যা যাচাইয়ের জন্য সনদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হতো। তৃতীয় শতাব্দীতে ইয়াকুবি এসে এই ধারা ভেঙে নতুন ও স্বতন্ত্র ধারা প্রণয়ন করেন। ইয়াকুবিই প্রথম সূচনা করেন সনদবিহীন ইতিহাস বর্ণনার। এতে করে সত্যমিথ্যা যাচাই বা ইতিহাসের বিশ্লেষণ হয়ে পড়ে সম্পূর্ণ ঘটনানির্ভর।

তারিখে ইয়াকুবি মূলত দুই ভাগে বিভক্ত। এক. পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে নিয়ে ইসলামপূর্ব যুগের ইতিহাস। দুই. ইসলামপরবর্তী যুগের ইতিহাস। ইয়াকুবির সময়টা আব্বাসিদের শাসনকাল। রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিক কোনো দায়িত্ব পালনের কথা জানা না গেলেও ইয়াকুবি ছিলেন আব্বাসিদের একদমই কাছের লোক। আব্বাসিদের ইতিহাস যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে কাছ থেকে দেখে লিখেছেন তিনি। যার দরুন নামই হয়ে গিয়েছিল—আল-কাতিবুল আব্বাসি বা আব্বাসিদের ইতিহাস লিপিকার।

আব্বাসিদের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে ইয়াকুবির সূত্রগুলো ছিল খুবই নিকটবর্তী; সরকারী কোনো কর্মকর্তা বা ঘটনা ও দায়িত্বের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সাথে আলাপ করে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতেন। এজন্য আব্বাসি ইতিহাসের ক্ষেত্রে তারিখে ইয়াকুবি বিশেষ গুরুত্ব রাখে। তবে, কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও আছে। নয়ত ফাঁদে পা দিয়ে খাদে পড়ার সমূহ আশঙ্কা থেকে যায়।

ইয়াকুবি মূলত ছিলেন শিয়া ধর্মাবলম্বী। ইয়াকুবি সাধারণ শিয়া ছিলেন না; বরং ইমামিয়া বা ইসনা আশারিয়া নামে শিয়াদের যে-ফিরকাটি ইসলামের গণ্ডির বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র ধর্মের রূপ ধারণ করেছে—ইয়াকুবি ছিলেন সেই ধর্মাবলম্বী। ইয়াকুবি বংশানুক্রমিকভাবেই শিয়াধর্মাবলম্বী। ইয়াকুবির যে উর্ধ্বতন পুরুষের নামের দিকে সম্পৃক্ত করে তাকে ডাকা হয় ইবনে ওয়াযিহ—সেই ওয়াযিহ জীবন উৎসর্গ করেছেন শিয়াদের স্বার্থ রক্ষার্থে। বংশানুক্রমিক শিয়া হবার কারণে ‘মুশাজারাতে সাহাবা’, আহলে বাইত ও এই সংক্রান্ত বর্ণনার ক্ষেত্রে ইয়াকুবি ব্যাপকভাবে শিয়াদের কল্পিত ও জালকৃত বিভিন্ন ঘটনা ও বর্ণনার সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। স্বয়ং আম্মাজান আয়েশা রা.কে নিয়েও এই ধরনের ধৃষ্টতামূলক বর্ণনা ও বক্তব্য এনেছেন। এজন্য এই ব্যাপারে শতভাগ সতর্কতা অতীব জরুরি।

ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনার ক্ষেত্রে যে-নামটি এর পরেই সামনে আসে তা হলো—তারিখুল উমামি ওয়াল মুলুক; যা তারিখুত তাবারি নামে সর্বাধিক পরিচিত। তারিখে তাবারির ক্ষেত্রেও ইমাম মুহাম্মদ ইবনে জারির আবু জাফর তাবারি রহ. ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনার জন্য একে দুইটি ভাগে ভাগ করেছেন। এক. হিজরতপূর্ব ইতিহাস; এই অংশে পৃথিবীর সূচনালগ্ন ও আল্লাহ্‌র অস্তিত্বের আলোচনা থেকে নিয়ে হিজরত পর্যন্ত ধারাবাহিক ইতিহাস এনেছেন। দুই. হিজরতপরবর্তী ইতিহাস; এই অংশে ৩০২ হিজরি পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে সনভিত্তিক ঘটনা ও ইতিহাস বিবৃত করেছেন।

তারিখে তাবারির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—ইয়াকুবির মতো ধারাবাহিক ইতিহাস বিবৃত করা হলেও এতে সনদকে ত্যাগ করা হয়নি। বরং প্রতিটি ইতিহাস ও প্রতিটি বর্ণনার ক্ষেত্রে শতভাগ সনদের উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন ইতিহাস ও আলোচনা পেশ করে তাবারি নিজস্ব বক্তব্য ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন এই বলে—“কালা আবু জাফর”; আবু জাফরের বক্তব্য হলো…।

এই ধারায় পরবর্তীতে আরও অনেক বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থ রচিত হয়েছে। যেমন—আল-মুন্তাযাম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল-উমাম—আবুল ফরজ ইবনুল জাওযি (৫৯৭ হি.)। পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনা করলেও সনদের পূর্ণ খেয়াল রাখা হয়েছে এই গ্রন্থে। ইবনুল জাওযি রহ.-এর এই গ্রন্থের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো—৫৭৪ হিজরি পর্যন্ত ইতিহাসের প্রতিটি অংশের রাজনৈতিক সকল দিক গুরুত্বের সাথে তুলে এনেছেন। গ্রন্থের মুহাক্কিকদ্বয় মুহাম্মাদ আব্দুল কাদির আতা ও মুস্তাফা আব্দুল কাদির আতা তাঁদের ভূমিকায় ডক্টর সাইয়িদের এই মূল্যায়নই উল্লেখ করেছেন। (১৪)

একই ধারার বিখ্যাত ও মৌলিক আরেকটি গ্রন্থ হলো—আল-কামিল ফিত-তারিখ—ইযযুদ্দিন ইবনুল আসির আল-জাযারি (৬৩০ হি.)। ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনার পাশাপাশি এখানে সনদ ছাড়া ইতিহাস উল্লেখ করা হয়েছে। আল-কামিলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ক্ষুদ্র চোখে যা ধরা পড়েছে তা হলো—এর গোছালো আলোচনা ও চমৎকার আঙ্গিকে উপস্থাপন।

একই শতাব্দীর আরেকটি গ্রন্থ হলো—সিবত ইবনুল জাওযির (৬৫৪ হি.) মিরআতুয যামান ফি তাওয়ারিখিল আ’ইয়ান। এই গ্রন্থে সনদবিহীন ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে।

অষ্টম শতাব্দীতে এই ধারার আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কিতাব রচিত হয়েছে। এর মধ্যে শীর্ষে থাকবে হাফেয যাহাবি (৭৪৮ হি.) রচিত তারিখুল ইসলাম ওয়া ওয়াফায়াতুল মাশাহিরি ওয়াল আ’লাম। সুবিশাল এই গ্রন্থটিতে ইমাম যাহাবি রহ. ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে সনদের উল্লেখ করেননি। আল্লামা ইবনে কাসিরের (৭৭৪ হি.) রচিত আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া এই শতাব্দীতে লিখিত অভিন্ন ধারার গুরুত্বপূর্ণ উৎসগ্রন্থ। আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়াতে বিস্তারিত সনদের উল্লেখ করা হয়নি বটে; তবে আল্লামা ইবনে কাসির সবগুলো ইতিহাসই নিয়েছেন মৌলিক উৎসগ্রন্থ থেকে। এবং সেই গ্রন্থকারের উল্লেখকৃত সনদসহই তিনি ইতিহাসের বিবরণ এনেছেন। উদাহরণত—ইবনে কাসির কোনো প্রয়োজনে তারিখে তাবারি থেকে ইতিহাস নিয়েছেন। সেক্ষেত্রে তিনি তাবারির সনদসহ বিস্তারিতই উল্লেখ করেছেন। তাই এই গ্রন্থের মান সনদবিহীন অন্যান্য গ্রন্থের তুলনায় কিছুটা এগিয়ে থাকবে। আর, একথা আলাদা করে বুঝিয়ে বলবার প্রয়োজন নেই—ইবনে কাসির কোন পর্যায়ের ইতিহাসবিদ।

এই বিষয়ের সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান করে নেওয়া আরেকটি গ্রন্থ হলো যাহাবির আল-ইবার ফি খাবারি মান গাবার। কিছু নতুন সংযুক্তিসহ তারিখুল ইসলামের খোলাসা বলা যেতে পারে এই গ্রন্থটিকে।

নির্দিষ্ট অঞ্চলকেন্দ্রিক হলেও ধারাবাহিক ইতিহাস রচনায় আরও একটি নাম যুক্ত থাকবে—হুসনুল মুহাযারা ফি আখবারি মিসর ওয়াল কাহিরাহ—হাফেয জালালুদ্দিন সুয়ুতি (৯১১ হি.)। এখানে মিসরের ইতিহাস সনভিত্তিক ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনার ধারা অনুযায়ী রচিত গ্রন্থগুলোর স্বাভাবিক ধারা মূলত এই—প্রথমে সনভিত্তিক ইতিহাস বর্ণনা করা হবে; সেই সনে বিশ্বের অবস্থা, বিশেষ ঘটনা ইত্যাদির বিবরণ থাকবে। নির্দিষ্ট এক বছর বা গ্রন্থভেদে নির্দিষ্ট পাঁচ/দশ বছর পরপর এই সনগুলোতে ইন্তেকালকারী ব্যক্তিবর্গের সংক্ষিপ্ত জীবনী ও ইতিহাস উল্লেখ করা হয়। অনেকটা এইভাবে—“এই বছর যারা ইন্তেকাল করলেন” বা “এই দশ বছরে পরলোকগত মনীষীগণ”।

ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনার এগুলো হলো মৌলিক ও প্রসিদ্ধ উৎসগ্রন্থগুলোর সংক্ষিপ্ত আলোচনা। এখানে অষ্টম শতাব্দীতে রচিত সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারার আরেকটি ইতিহাসগ্রন্থের পরিচয় না দিয়ে পারছি না। গ্রন্থটি হলো—মাসালিকুল আবসার ফি মামালিকিল আমসার—ইবনে ফযলুল্লাহ আল-উমারি (৭৪৯ হি.)। লেখক যাহাবির সমসাময়িক। লিখেছেনও চমৎকার ও অভিনব এক গ্রন্থ। গ্রন্থটি দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে লেখক আলোচনা করেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে এবং দ্বিতীয় ভাগে আলোচনা করেছেন পৃথিবীতে বসবাসরত বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠী নিয়ে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ধারায় রচিত বলে এখান থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল ও জনগোষ্টীর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও ইতিহাস জানা যাবে।

এই সকল ইতিহাসগ্রন্থকে সামনে রেখে নির্যাস লিখেছেন এগারোশো শতাব্দীর একজন মানুষ। তুলে এনেছেন সকল ইতিহাস খুব সংক্ষেপে; কিন্তু সামগ্রিকভাবে প্রায় সব কথাই চলে এসেছে। সংক্ষেপে উঠে এসেছে বিভিন্ন সনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি। লেখক ভূমিকায় লিখেছেনও—“এই গ্রন্থ সংকলন করেছি নিজের জন্য এবং ইতিহাস বিষয়ে চিন্তাফিকির ও গবেষণা করে এমন মানুষদের জন্য ‘তাযকিরা’ হিসেবে”। বলা যেতে পারে—যেকোনো ইতিহাসকে সংক্ষেপে মনে রাখার জন্য একটি ডায়েরি হলো এই গ্রন্থটি; শাযারাতুয যাহাব ফি আখবারি মান যাহাব—আল্লামা ইবনুল ইমাদ হাম্বলি (১০৮৯ হি.)।

৬.

এখানে তৃতীয় ও সর্বশেষ যে ধারাটি নিয়ে আলোচনা করব সেটি হলো—শতাব্দী ভিত্তিক ইতিহাস রচনা। অর্থাৎ, লেখক নির্দিষ্ট একটি শতাব্দীকে সামনে নিয়ে ইতিহাস রচনা করবেন। সেই শতাব্দীর মনীষীদের জীবনী তুলে আনবেন, গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা লিপিবদ্ধ করবেন, ইত্যাদি। মূলত এটিও জীবনীকেন্দ্রিক ইতিহাস রচনারই একটি প্রকার।

শতাব্দীকেন্দ্রিক ইতিহাস রচনার সূচনা মূলত মুতাআখখিরিন আলিম ও রাজা-বাদশাহদের ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ঘটেছে। এই কারণে অষ্টম শতাব্দীর পূর্বে কোনো শতাব্দী নিয়ে গ্রন্থরচনার ইতিহাস পাওয়া যায় না। নয়ত এর পূর্ববর্তীদের ইতিহাস ধারাবাহিক ইতিহাসের গ্রন্থাদিতে অল্পবিস্তর পাওয়া যায়। সম্ভবত এই কারণে যে—সেকালে ধারাবাহিক ইতিহাসের গ্রন্থ পর্যাপ্ত হয়ে যাওয়ার ফলে পৃথিবীর সূচনাকাল থেকে ইতিহাস রচনার প্রয়োজনীয়তা পূরণ হয়ে গেছে। এখন প্রয়োজন সমকালের ইতিহাস সংরক্ষণ করা। এই লক্ষ্যে শতাব্দীভিত্তিক ইতিহাস রচনার সূচনা করেন জগদ্দল মুহাদ্দিস ও ইতিহাসবিদ আল্লামা হাফেয ইবনে হাজার আসকালানি রহ. (৮৫২ হি.)। অষ্টম শতাব্দীর মনীষীদের ইতিহাস নিয়ে লেখেন—আদ দুরারুল কামিনাহ ফি আ’ইয়ানিল মিআতিস সামিনাহ। একই সময় নিয়ে আরও একজন লিখেছেন—আল-বাদরুত তালি’ ফি মাহাসিনি মান বা’দাল কারনিস সাবি’—মুহাম্মাদ ইবনে আলি শাওকানি (১২৫০ হি.)। ভূমিকাতে স্পষ্ট করে লিখেছেন—“এটি মূলত অষ্টম শতাব্দীর আকাবির আলিমদের জীবনী”। (১৫)

নবম শতাব্দীর ব্যক্তিদের ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন ইবনে হাজার আসকালানির খাস শাগরিদ, কথায়-কথায় যিনি ‘কালা শাইখুনা’ বলে ইবনে হাজারের উদ্ধৃতি দেন—হাফেয শামসুদ্দিন সাখাবি রহ. (৯০২ হি.)। গ্রন্থের নাম—আয-যাওউল লামি’ লি আহলিল কারনিত তাসি’/আয-যাওউল লামি’ ফি আ’ইয়ানিল কারনিত তাসি’। দশম শতাব্দীর ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন—নাজমুদ্দিন আল-গাযযি (১০৬১ হি.); আল-কাওয়াকিবুস সাইরিহাহ বিমানাকিবি আ’ইয়ানিল মিআতিল আশিরাহ। একাদশ শতাব্দী নিয়ে লিখিত গ্রন্থ হলো—খুলাসাতুল আসার ফি আ’ইয়ানিল কারনিল হাদিয়া আশার—মুহাম্মাদ আমিন আল-মুহিব্বি আল-হানাফি (১১১১ হি.)। দ্বাদশ শতাব্দী নিয়ে লিখিত গ্রন্থ হলো—সিলকুদ দুরার ফি আ’ইয়ানিল কারনিস সানিয়া আশার; মুহাম্মাদ খলিল মুরাদি (১২০৬ হি.)। ত্রয়োদশ শতাব্দীর ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন শাইখ আব্দুর রাযযাক বাইতার (১৩৩৫ হি.)—হিলইয়াতুল বাশার ফি তারিখিল কারনিস সালিসা আশার। চতুর্দশ শতাব্দী নিয়ে লিখিত ইতিহাসগ্রন্থ হলো ইমতাউ উলিন নাযার বিবা’যি আ’ইয়ানিল কারনির রাবিআ আশার—মাহমুদ সাইদ মামদুহ আশ-শাফিয়ি। এবং আল-মুবতাদা ওয়াল-খাবার লিউলামা ফিল কারনির রাবিআ আশার ওয়া বা’যি তালামিযিহিম—ইবরাহিম নাছির সাইফ। ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতাব্দীকে নিয়ে সমন্বিত আরেকটি ইতিহাসগ্রন্থ আছে—ইতহাফুল মাতালি’ বিওয়াফায়াতি আ’লামিল কারনিস সালিসা আশার ওয়ার রাবি’—মুহাম্মাদ বিন আব্দুল কাদির সাওদাহ। সর্বশেষ গ্রন্থটিতে ১১৭১ হি. থেকে ১৪০০ হি. পর্যন্ত ব্যক্তিদের জীবনী উঠে এসেছে।
এই ধারার আরও প্রচুর ইতিহাসগ্রন্থ রয়েছে। খোদ ইতহাফুল মাতালি’-এর মুহাক্কিকের ভূমিকাতেই আরও বেশকিছু নামের উল্লেখ রয়েছে।

৭.

ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহ সর্বযুগেই সমানভাবে খেদমত করে গেছে। চর্চা ও রচনার উত্থান-পতন ছিল বটে; তবে কোনো যুগেই বিশেষ পিছিয়ে ছিল না। এর কারণও স্পষ্ট—আমাদের ইতিহাসচর্চা আমাদের পরিচয়কে আরও মজবুত, আরও বলিষ্ঠ করে; এবং, মুসলিমদের ইতিহাসচর্চার উদ্দেশ্য কী হবে তা আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন—‘নিশ্চয় তাতে রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য শিক্ষা ও নিদর্শন’।
উপরোক্ত আলোচনায় সকল ইতিহাসগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করা হয়নি; এবং তা উদ্দেশ্যও ছিল না। এখানে মূল দেখবার বিষয় ছিল দুইটি—এক. মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসচর্চার ধারাবাহিকতা। দুই. এবং ইতিহাসের কিতাবাদির রচনার রকমফের। এজন্য এমনসব মৌলিক ও মাসাদির—উৎসগ্রন্থগুলোর রচনার ধরন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যেগুলো মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

এজন্য প্রসিদ্ধ কিছু কিতাবের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সকল মাসাদিরের নাম তো আসেইনি, বরং অনেক প্রসিদ্ধ ইতিহাসগ্রন্থের নামও উক্ত আলোচনায় দীর্ঘায়নের আশঙ্কায় বাদ দিতে হয়েছে। এছাড়াও বিভিন্নভাবে নির্দিষ্ট বিষয় ও নির্দিষ্ট ব্যক্তি, খলিফা বা সালতানাতের ইতিহাস নিয়ে স্বতন্ত্র রচনাবলির কথা তো বাদ পড়েছেই। সুতরাং এটিকে একটি খসড়া আলোচনা হিসেবে ধরা যেতে পারে।

আমাদের গর্ব এই যে—আমাদের পরিচয় ও ইতিহাস ঋদ্ধ ও সমৃদ্ধ; কিন্তু আক্ষেপ এই যে—আমাদের বর্তমান হতাশা ও অদূরদর্শিতায় মুহ্যমান।
সূত্রসমূহ :
(১) সুরা তাহা, আয়াত—৯৯
(২) সুরা হুদ, আয়াত—৪৯
(৩) তাফসিরে তাবারি, ১৫/৩৫৬; আবু জাফর তাবারি, মুআসসাতুর রিসালাহ, ১৪২০ হিজরি
(৪) সুরা হুদ, আয়াত—১২০
(৫) আল-ফিহরিস্ত, পৃষ্ঠা-৩৩৯, ইবনুন নাদিম, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৪২২ হি.
(৬) আল-ফিহরিস্ত, পৃষ্ঠা-৩৭৮, ইবনুন নাদিম, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, দ্বিতীয় সংস্করণ ১৪২২ হি.
(৭) আর-রিসালাতুল মুস্তাতরাফাহ, পৃষ্ঠা-১৩৪, মুহাম্মদ ইবনে জাফর আল-কাত্তানি, দারুল বাশাইরিল ইসলামিয়্যাহ, সপ্তম সংস্করণ, ১৪২১ হি.
(৮) তাকরিবুত তাহযিব, পৃষ্ঠা-৪৭৪, শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামার তাহকিককৃত, প্রথম সংস্করণ, ১৪০৬ হি.
(৯) তারিখু জুরজান, মুহাক্কিকের ভূমিকা—আব্দুর রহমান ইবনে ইয়াহইয়া আল-মুআল্লিমি, মাকতাবা ইবনে তাইমিয়া, প্রথম সংস্করণ, ১৪২৮ হি.
(১০) আর-রিসালাতুল মুস্তাতরাফাহ, পৃষ্ঠা-১২৮-১৩০, মুহাম্মদ ইবনে জাফর আল-কাত্তানি, দারুল বাশাইরিল ইসলামিয়্যাহ, সপ্তম সংস্করণ, ১৪২১ হি.
(১১) আর-রিসালাতুল মুস্তাতরাফাহ, পৃষ্ঠা-১৩১-১৩৩, মুহাম্মদ ইবনে জাফর আল-কাত্তানি, দারুল বাশাইরিল ইসলামিয়্যাহ, সপ্তম সংস্করণ, ১৪২১ হি.
(১২) ফাওয়াতুল ওয়াফায়াত, মুকাদ্দিমাতুল মুহাক্কিক—আলি মুহাম্মাদ মুফাওইজ ও আদেল আহমদ আব্দুল মওজুদ, পৃষ্ঠা-৪১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, প্রথম সংস্করণ ১৪২১ হি.
(১৩) মুকাদ্দিমাতুল মুহাক্কিক, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, পৃষ্ঠা-৯৮-১০০, মুয়াসসাতুর রিসালাহ, তৃতীয় সংস্করণ, ১৪০৫ হি.
(১৪) আল-মুন্তাযাম ফি তারিখিল মুলুকি ওয়াল-উমাম, ইবনুল জাওযি, মুহাক্কিকের ভূমিকা, পৃষ্ঠা-৪০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, তৃতীয় সংস্করণ, ১৪৩৩ হি.
(১৫) আল-বাদরুত তালি’ ফি মাহাসিনি মান বা’দাল কারনিস সাবি’, ১/৭, মুহাম্মাদ ইবনে আলি শাওকানি, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, প্রথম সংস্করণ ১৪১৮ হি.

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: