ইসলামের যুদ্ধ ইতিহাস | সাদিক ফারহান

ইসলামের যুদ্ধ ইতিহাস

কাগজের জন্ম কোন দেশে, এমন প্রশ্নের জবাবে আমরা সকলে একবাক্যে বলি—চীনে। সভ্যতার গতিপথ বদলে দেওয়া অনন্য এই আবিষ্কারের জন্য আজও বিশ্বজগত চৈনিকদের কাছে ঋণী। তবে আবিষ্কারের সাথে সাথেই কাগজের প্রযুক্তি বিশ্ববাসী জানতে পারেনি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, বহিঃবিশ্ব থেকে নিজেদের আলাদা করে রাখতে সর্বদা আগ্রহী চীনারা কাগজ তৈরির নিগূঢ় রহস্য গোপন করে রাখতে পেরেছিল প্রায় আটশ বছর! কিন্তু হঠাৎ একদিন চীনের এই টপ সিক্রেট জেনে যায় সারাবিশ্ব। অবশ্য সেটা কোনো শান্তিপূর্ণ কনফারেন্সের মাধ্যমে নয়, বরং রীতিমত এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে।

পৃথিবীর ইতিহাসে নতুন বাঁকের সূচনা করা এই যুদ্ধ ‘ব্যাটেল অফ তালাস রিভার’ বা ‘তালাস নদীর যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিত। ১৩৩ হিজরি মোতাবেক ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে বর্তমান কিরগিজিস্তানের অন্তর্গত তালাস নদীর অববাহিকায়, আরবদের সাথে চীনদের প্রথম এবং একইসাথে শেষ এ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। ফলাফলে চৈনিক বাহিনীর উপর মুসলিম সেনাদের বিজয়, মধ্য এশিয়ায় আব্বাসি খিলাফাহর শেকড় আরও শক্তিশালী করে দেয়।

পূর্বকথা

সময়টা অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝি। চীনের ট্যাং রাজবংশ (৬১৮-৯০৬ খ্রি.) তখন পূর্বদিকের একচ্ছত্র অধিপতি। একে একে মধ্য এশিয়ার তুর্কি রাজ্যগুলো চলে আসছিল তাদের করায়ত্বে। একের পর এক তারা দখল করে নিচ্ছিল বর্তমান উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান এবং কিরগিজিস্তানের মতো বড় বড় প্রাচীন রাজ্যগুলো। চীনা সরকারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে কর না দিয়ে রাষ্ট্র বাঁচানোর কোন উপায় তখন এদের সামনে খোলা নেই।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে জেগে উঠেছে ইসলামী খেলাফত। হযরত উমার ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতের সময় (৬৩৪-৬৪৪ খ্রি.) বিশাল পারস্য সাম্রাজ্য জয় করে মধ্য এশিয়ার উপকণ্ঠে পৌঁছে গিয়েছিল মুসলিম বাহিনী। তাঁর মৃত্যু পরবর্তী একশ বছর অর্থাৎ খুলাফায়ে রাশেদিন (৬৪৪-৬৬১ খ্রি.) এবং উমাইয়া আমলে (৬৬১-৭৫০ খ্রি.) সেই ধারা অব্যহত ছিল। অবশ্য এ সময়ে মুসলিম বাহিনীর বিজয়ের গতি ছিল প্রথম যুগের তুলনায় মন্থর। তবে বেশকিছু কারণে চীনারা শুরুতে মুসলিম শক্তিকে নিজেদের জন্য ততোটা আগ্রাসী বলে ভাবছিল না। যেমন: মুসলমানদের বিজয়যাত্রা তখনও চীন থেকে বহু দূরে। তদুপরি মধ্য এশিয়ায় তাদের সবচে বড় শত্রু, পারস্যের সাসানি রাজ্যের মরণ কামড় থেকে বাঁচতে মরিয়া তখন চীন। বড় কোন বিপর্যয় এড়াতে জেনেবুঝেই যেন তারা সাসানিদের মূল রসদ জোগানো পারস্য সম্রাটের কথা ভুলে থাকতে চাচ্ছিল।

তবে মুসলমানদের সাথে তাদের মূল সংঘর্ষ বাধে তখন, যখন খিলাফতের সেনারা ইরানের ক্ষমতা হাতে তুলে নেয়। নিজেদের বিজিত রাজ্যের সীমান্ত রক্ষার প্রয়োজনেই মধ্য এশিয়ার কর্তৃত্ব হাতে নেয়া তখন মুসলমানদের কর্তব্য হয়ে পড়ে। সেই দায়িত্বের বোধ থেকে তারা জয় করে নেয় বর্তমান আফগানের কাবুল, হেরাত ও গজনী। এতদাঞ্চলের বিজয়ের ইতিহাসে তৎকালিন খোরাসানের শাসকদের বীরত্বের প্রভাব ছিল প্রকট। বর্তমানে যাকে আমরা আফগানিস্তান বলে চিনি, বিধর্মীদের হাত থেকে এই ভূমি উদ্ধারের পেছনে সাহসী ভূমিকা ছিল খোরাসানের অধিপতি ইবনু আবি সুফরা রহিমাহুল্লাহর।

তাছাড়া ৮৫ হিজরি সালে (৭০৪ খ্রি.) একদা হাজ্জাজ বিন ইউসুফ তার সেনাদের জমা করে বলেন: ‘কে আছো চীনের দিকে যাত্রা করতে আগ্রহী, আমি তাকে সেখানকার শাসক বানিয়ে দেব?’। এরপর সে কুতাইবা ইবনু মুসলিম আল-বাহিলিকে এ কাজের উপযুক্ত ভেবে ৮৫ হিজরিতে খোরাসানের দায়িত্ব দিয়ে বেশকিছু বিজয়ের প্রতিজ্ঞা করে রওনা করিয়ে দেন। সাহসী এ সেনাপতির খোরাসানে আগমনের পরবর্তী দুই দশকের মধ্যে সমরখন্দ, বুখারাসহ মধ্য এশিয়া; বিশেষ করে আফগানিস্তান ও উজবেকিস্তানের বিরাট অংশ মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়। ফলে আরব ও চীন—প্রাচ্য এবং মধ্য প্রাচ্যের দুই পরাশক্তির মধ্যে মোকাবিলা তখন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

মুসলিম সেনাদল ঘাড়ে এসে নিঃশ্বাস নিলেও, মোটাদাগে চীন তখনও নিজেদের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সমস্যা ও অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে সামরিকভাবে তাদের মোকাবেলার জন্য সক্ষম ছিল না। চৈনিক সমাজের সর্বত্র কেবল মুসলমানদের বিপক্ষে সেনা অভিযানের প্রয়োজনীয়তার আলোচনা, নেতাদের একে অপরকে উৎসাহিত করার প্রবণতাই লক্ষ্য করা যাচ্ছিল; কিন্তু দরকারি কোন পদক্ষেপই তারা নিতে পারছিল না। তাছাড়া মুসলিম বাহিনীর ব্যাপারে তারা যা শুনে আসছিল দীর্ঘদিন ধরে, তা তাদেরকে ভড়কে দেবার জন্য যথেষ্ট ছিল। চীনের এই সীমান্তে এসে দাঁড়াবার আগে, তারা পারস্যের মতো বিশাল দুর্দমনীয় শক্তিকে নাস্তানাবুদ করে এসেছে। ধ্বংস করে দিয়েছে রোমানদের আধিপত্য; এমনকি ইউরোপের ফ্রান্স পর্যন্ত তাদের বিজয়বাহিনীর হাত থেকে নিস্তার পায়নি।
যুদ্ধের আগে যুদ্ধ

ট্যাং রাজবংশের সাথে উমাইয়া খিলাফতের প্রথম সংঘর্ষ বাঁধে ৭১৫ খ্রিস্টাব্দে। কারণটা ছিল ফারগানা উপতক্যায় আধিপত্য বিস্তার। সে সময় তিব্বতীয় রাজবংশ উমাইয়াদের পক্ষাবলম্বন করেছিল। প্রাথমিকভাবে উমাইয়া ও তিব্বতীয়দের মিলিত শক্তির লক্ষ্য অর্জিত হলেও, অচিরেই ট্যাং সেনাবাহিনী তাদের হৃত স্বার্থ পুনরুদ্ধার করে ফেলে। এদিকে দুই বছর পর ৭১৭ সালে উমাইয়া ও তিব্বতীয়রা মিলিতভাবে শিনজিয়াং আক্রমণ করে এবং আকসু অঞ্চলের দুটি শহর অবরোধ করে বসে। অবশ্য ট্যাং রাজবংশের অনুগত কারলুক তুর্কদের একটি বাহিনী সেই অবরোধ ভেঙে শহর দুটিকে পুনরায় ট্যাং রাজবংশের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এই কারলুকরাই পরবর্তী সময়ে তালাস নদীর যুদ্ধে জয়ে-বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

পরের তিন দশক পরিস্থিতি অনেকটা শান্ত ছিল। উমাইয়াদের সাথে তুর্কি রাজ্যগুলোর বেশ কিছু সংঘর্ষ হলেও এ সময় উমাইয়া খিলাফতের সীমানায় খুব বেশি পরিবর্তনও আসেনি। তবে এ সময়ে মধ্য এশিয়ায় ট্যাং রাজবংশের আধিপত্য ও প্রতিপত্তি যথেষ্ট বেড়েছিল। বলা হয়, ট্যাং রাজবংশ তাদের তিন শতাব্দী রাজত্বকালের ইতিহাসে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ প্রতিপত্তির একদম চূড়ায় আরোহণ করেছিল। তবে ভাগ্যের এক নির্মম পরিহাস হলো, পর্বতের চূড়ায় আরোহণ করতে দীর্ঘসময় লাগলেও পতনকাল কিন্তু খুবই সামান্য হয়ে থাকে; ট্যাং রাজবংশের ক্ষেত্রেও ঠিক, সেটাই ঘটেছিল।

উমাইয়াদের পতন ও শিয়াংশির সফল অভিযান

ক্ষমতা দখল ও রক্ষাকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহীদের ষড়যন্ত্রে উমাইয়া শাসনের অবস্থা তখন টালমাটাল। এদিকে মধ্য এশিয়ার বেশকিছু অঞ্চল মুসলিম সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হলেও, গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু ভূমি তখনও ছিল চৈনিকদের দখলে। তাই উমাইয়াদের আন্তঃবিদ্রোহের এই দুর্বলতাকে গাও প্রাধান্য বিস্তারের মোক্ষম সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে এবং এতদাঞ্চলে তাদের হস্তচ্যুত এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য সেনা অভিযান শুরু করে।

হঠাৎ মুসলিম সাম্রাজ্যের এক আচানক পরিবর্তন সব হিসাব নিকাশ পাল্টে ফেলে। উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ সফল হলো। প্রায় নব্বই বছর মুসলিম বিশ্বকে শাসন করার পর ৭৫১ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়াদের খিলাফতের অবসান ঘটে আব্বাসীয়দের হাতে। উমাইয়াদের পতন চীনাদের আরও উগ্র করে তোলে। ৭৪৭ থেকে ৭৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ট্যাং সেনাবাহিনীর কোরীয় সেনাপতি গাও শিয়ানশি তৎকালীন তিব্বত রাজ্যের অন্তর্গত গিলগিত (বর্তমানে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে) জয় করেন ও মধ্য এশিয়ার বেশ কিছু ছোট ছোট রাজ্যকে ট্যাং সাম্রাজ্যের করদ রাজ্যে পরিণত করে। এরপর সোৎসাহে ছুটে চলে এতদাঞ্চলের মুসলিম অধিকৃত জনপদগুলো চৈনিকদের করতলগত করার লালসায়। বর্তমান উজবেকিস্তানের বেশকিছু ছোট-বড় রাজ্য দখলে নিয়ে তারা তখন মধ্য এশিয়ায় মুসলমানদের কেন্দ্রীয় শহর কাবুলে হুমকি-ধমকি দিতে শুরু করে।

কিন্তু শুরুর দিকে আব্বাসীয় খিলাফতের বিজয়নেশা উমাইয়াদের চেয়েও তীক্ষ্ণ ছিল। আর এ কারণেই ক্ষমতায় বসেই আব্বাসিরা মধ্য এশিয়ার দিকে মনোনিবেশ করেন। এ অঞ্চলে মুসলিম শাসিত রাজ্যগুলোর সীমান্ত রক্ষার তাগিদে ১৩৩ হিজরি সনে খলিফা আবু জাফর মানসুর খোরাসানের শাসক আবু মুসলিম বরাবর একটি চিঠি লিখেন। বলেন, মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্তানে মুসলমানদের মর্যাদা অটুট রাখতে সেনা অভিযান পরিচালনা করা দরকার। আবু মুসলিম খলিফার নির্দেশে নিজের বাহিনী নিয়ে মারও নামক স্থানে গিয়ে অবস্থান নেন। সেখানে তাখারিস্তান (বর্তমান আফগানিস্তানের অন্তর্ভুক্ত) থেকে বড় অংকের সেনা সাহায্য আবু মুসলিমের বাহিনীতে এসে যোগ হয়। তিনি সকলকে নিয়ে এগিয়ে যান সমরকন্দের দিকে।

এবারও ফারগানা উপত্যকা ছিল আরব ও চীন, দুই পরাশক্তির দ্বন্দ্বের অন্যতম ক্ষেত্র। ছোট্ট রাজ্য ফারগানা ও তাসখেন্তের মধ্যে দ্বন্দ্বই মূলত দুই পরাশক্তিকে যুদ্ধের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। ফারগানার আমীরের আমন্ত্রণে গাও শিয়ানশির সৈন্যরা তাসখেন্ত দখল করে নিলে অনন্যোপায় তাসখেন্তের আমীর স্থানীয় আরবদের সাহায্য চান। (উল্লেখ্য উজবেকিস্তানের বর্তমান রাজধানী হল তাসখেন্ত) তাসখেন্তের আমীরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে কুফার সাবেক গভর্নর মুসলিম সেনাপতি যিয়াদ ইবনে সালিহ তাঁর সৈন্যদের নিয়ে সমরকন্দের দিকে অগ্রসর হন। সেখানে খলিফা প্রেরিত খোরাসানের আমির আবু মুসলিমের বাহিনীর সাথে তার সাক্ষাৎ হয় এবং দুজনের সেনাদল এক বাহিনীতে পরিণত হয়।

এদিকে মুসলিম বাহিনীর আগমনের খবর জেনে চীনারা সেনা জমায়েত শুরু করে। যুদ্ধে কোন পক্ষে সৈন্য সংখ্যা কত ছিল, এ নিয়ে দু’পক্ষের পরস্পর বিরোধী দাবি লক্ষ করা যায়। চীনাদের ভাষ্যমতে, আব্বাসী সেনাদল এবং তাদের মিত্রদের নিয়ে গঠিত বাহিনীর সংখ্যা ছিল দুই লক্ষাধিক। এদিকে ট্যাং ও তাদের মিত্রদের দ্বারা গঠিত গাও শিয়াংশির নেতৃত্বাধীন চৈনিক বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা সম্পর্কে আব্বাসীয়দের দাবি হলো, তারা ছিল এক লক্ষের কাছাকাছি। তবে নিরপেক্ষ বিচার বিশ্লেষণ এবং আধুনিক গবেষণা থেকে জানা যায়, উভয় পক্ষেরই সৈন্য সংখ্যা ছিল মোটামুটি ২৫-৩০ হাজারের মতো; অর্থাৎ দুই পক্ষের শক্তিমত্তা মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

যুদ্ধের কথা

অনিবার্য সংঘর্ষের আগে পূর্ব ও পশ্চিমের দুই পরাশক্তি এবং তাদের মিত্রদের নিয়ে গঠিত সেনাদল মিলিত হলো তালাস নদীর পাড়ে। তালাস নদী কিরগিজস্তান এবং কাজাখস্তানের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ‘তালাস নদীর যুদ্ধ’ যে তালাস নদীর পাড়ে বা এর আশেপাশে সংঘঠিত হয়েছিল, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই ঐতিহাসিক স্থানটি ঠিক কোথায় অবস্থিত, তা আজও চিহ্নিত করা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, খুব সম্ভবত জায়গাটি কিরগিজস্তান এবং কাজাখস্তান সীমান্তের কাছে কোথাও।

প্রথম পাঁচদিন উভয় পক্ষের লড়াই চলেছে সমানে সমানে। বলতে গেলে, ট্যাং সেনাবাহিনীই কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থায় আছে বলে বোধ হচ্ছিল। আমাদের মনে রাখতে হবে, খিলাফতের প্রাণকেন্দ্রগুলো থেকে মধ্য এশিয়ার বিশাল দূরত্ব এবং এসব অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ অনারব ও অমুসলিম হওয়ায়, আব্বাসীয় বাহিনী পশ্চিমদিকের ফ্রন্টগুলোতে যতটুকু শক্তিশালী ছিল, মধ্য এশিয়া ফ্রন্টে ততটা শক্তিশালী ভূমিকায় আত্মপ্রকাশ করতে পারে নি। এতদসত্ত্বেও কারলুক তুর্কদের এক রহস্যজনক ভূমিকায় ষষ্ঠ দিনে যুদ্ধের ফলাফল আব্বাসীয়দের পক্ষে এসে যায়। পরাজয় ঘটে ট্যাং সেনাবাহিনীর। চৈনিক সূত্রগুলোর দাবি, কারলুক তুর্করা যুদ্ধের মাঝখানে আচমকা বিশ্বাসঘাতকতা করে আব্বাসীয়দের পক্ষাবলম্বন করায় তাদের পরাজয় বরণ করতে হয়েছে। এদিকে আব্বাসীয়দের দাবি, কারলুক তুর্করা যুদ্ধের আগেই তাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ ছিল এবং তারা দূর থেকে ময়দানের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিল।

কারলুকদের দ্বন্দ্বময় ভূমিকা: ইতিহাস কী বলে?

কারলুকদের ভূমিকা নিয়ে দুই পক্ষের এমন পরস্পরবিরোধী দাবি থেকে সত্যটা নিরূপণ করা বেশ কঠিন। তবে চৈনিকদের দাবি যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে কারলুক তুর্করা তাদের সাথেই আব্বাসীয়দের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধ করছিল। হঠাৎ করে এতগুলো সৈন্যের পক্ষ পরিবর্তন করার কাহিনী শুনতে বেশ অবিশ্বাস্য লাগে। তার চেয়ে বরং দুই পক্ষের দাবি থেকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি- কারলুক তুর্করা প্রথম পাঁচদিন যুদ্ধ না করে দূরে ছাউনি ফেলে অবস্থান করছিল। পূর্বের মিত্রতা থেকে ট্যাং সেনাবাহিনী মনে করেছিল, এবারো বুঝি কারলুকদের সমর্থন পাওয়া যাবে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে কারলুক ও আব্বাসীয় বাহিনীর চুক্তি হয়ে গেছে, সেই কথা তারা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি। তাই কারলুকদের এই আচমকা আক্রমণ ট্যাংদের দৃষ্টিকোণ থেকে অনেকটাই বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। এছাড়া এই তত্ত্ব মেনে নিলে, আব্বাসীয়দের সাথে যে কারলুকরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল, সেটাও সত্য বলে প্রতীয়মান হয়।

সে যা-ই হোক, যুদ্ধের একপর্যায়ে মুসলিম বাহিনী তাদের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে চৈনিক সেনাদেরকে চারপাশ থেকে দিকে ফেলে। পূর্বেই মুসলিম সেনারা ময়দানের চারপাশে পরিখা খনন করে রেখেছিল; চৈনিক সেনারা অবরোধ থেকে পালানোর চেষ্টা করলে অনেকেই এসব পরিখায় পড়ে প্রাণ হারায়। সেনাপতি গাও শিয়াংশি পরাজয় অনুভব করতে পেরে ময়দান ছেড়ে পলায়ন করে এবং তালাস নদীর এ যুদ্ধে চীনাদের শোচনীয় পরাজয় ঘটে। মুসলিম সেনাপতি যিয়াদ ইবনু সালিহ ২০ হাজারের মতো চৈনিক সেনা বন্দি করে বাগদাদে পাঠিয়ে দেয়, সেখানে দাস-বিক্রি-বাজারে তাদেরকে গোলাম হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হয়।

তালাস নদীর এ-যুদ্ধে চৈনিকদের কেন পরাজয় হয়েছিল সেই বিশ্লেষণের চেয়ে, এই পরাজয়ের সুদূরপ্রসারী ভূমিকা কী ছিল— ঐতিহাসিকভাবে সেটাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

যুদ্ধের পর

এই যুদ্ধে আব্বাসীয়দের একতরফা বিজয় অর্জিত হলেও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করলে বলতে হয়, প্রাথমিকভাবে এই যুদ্ধ থেকে কোনো পক্ষই আসলে তেমন সুবিধা নিতে পারেনি। কারণ আব্বাসীয়রা এই বিজয়কে পুঁজি করে সামনের দিকে অর্থাৎ চীনের মূল ভূখণ্ডে অগ্রসর হতে পারতো। কিন্তু বিভিন্ন কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। সে-সব কারণের অন্যতম ছিল— দূরত্ব। এত লম্বা দূরত্বে যোগাযোগ রক্ষা করা যেকোনো সেনাবাহিনীর পক্ষে প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। এছাড়া প্রতিশোধের নেশায় মত্ত ট্যাং রাজবংশও পরবর্তীতে আব্বাসীয়দের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি।

৭৫৫ খ্রিস্টাব্দের শেষদিকে শুরু হওয়া বিদ্রোহের ভয়াবহ দাবানলে উল্টো ট্যাং সাম্রাজ্যই অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। ট্যাং রাজবংশের মসনদ কাঁপিয়ে দেওয়া এই বিদ্রোহ, ইতিহাসে লুশান বিদ্রোহ নামে পরিচিত। লুশান বিদ্রোহ স্থায়ী হয়েছিল প্রায় ৭ বছর। আব্বাসীয়রা তালাসের যুদ্ধ জয়ের পর থেকেই এতদাঞ্চলে ট্যাংদের গতিবিধি লক্ষ করছিল। বিদ্রোহে প্রায় ঢলে পড়া এই সময়ে, সুযোগ বুঝে তারা ট্যাং রাজবংশের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। মুসলমানদের এই সাহায্যে দুই পরাশক্তির বৈরিতার অবসান হয় এবং এতদাঞ্চলের পুরোটায় ধীরে ধীরে ইসলামের রঙ ছড়িয়ে পড়ে। ট্যাংরা দলে দলে মুসলিম হতে শুরু করলে, মধ্য এশিয়ায় দিকে দিকে ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রসার ঘটতে শুরু করে। পরবর্তীতে এই ভূমিতে জন্ম নেয় ইসলামের বিভিন্ন শাস্ত্রের জগদ্বিখ্যাত ইমামগন। বিশেষত হাদিস শাস্ত্রের প্রথমসারির কিতাব সহিহ বুখারি ও জামে আত-তিরমিজির সংকলক ইমাম আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনু ইসমাইল বুখারি এবং ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ আল-কুশাইরি।

যেভাবে দুনিয়া জেনে গেল কাগজের অজানা রহস্য

এদিকে তালাস নদীর যুদ্ধে বহু সংখ্যক চীনা সৈন্য যুদ্ধবন্দী ও নিহত হয়। বিশাল ট্যাং সেনাবাহিনীর সেনাপতি গাও শিয়ানশি অল্প কিছু সৈন্যসহ প্রাণ নিয়ে পালাতে সক্ষম হন। এই যুদ্ধবন্দী চীনাদের মধ্যে অনেকে ছিলেন কাগজ তৈরির দক্ষ কারিগর এবং প্রকৌশলী। তাদের মাধ্যমেই কাগজের প্রযুক্তি আরবদের হস্তগত হয়। সেই খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে সাই লুন কাগজ আবিষ্কার করার পর, দীর্ঘ আটশ বছর সেই কৌশল কেবল চীনা, কোরীয় ও জাপানীদেরই জ্ঞানায়ত্ত ছিল।

কিন্তু তালাস নদীর যুদ্ধের পর কাগজ তৈরির প্রযুক্তি প্রথমবারের মতো পূর্ব এশিয়ার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সমরকন্দে স্থাপিত হয় কাগজের কল এবং ক্রমান্বয়ে বাগদাদসহ আব্বাসীয় খিলাফতের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে এই শিল্পের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে। ইউরোপের প্রথম কাগজকল স্থাপিত হয়েছিল স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ায়, ১০৫৬ সালে। অবশ্যি সেটাও আরব বণিকদেরই প্রভাবে; কেননা সে সময়ে আইবেরীয় উপদ্বীপ অর্থাৎ স্পেন-পর্তুগালের বিশাল অংশ মুসলিম-আরবদের করতলগত ছিল।

তালাস নদীর যুদ্ধের সুদূরপ্রসারী প্রভাব

শুধু কাগজের প্রযুক্তি স্থানান্তরের কারণে নয়, তালাস নদীর যুদ্ধ বহুমাত্রিক কারণে ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। প্রথমত, মধ্য এশিয়ার পরবর্তী চার শতাব্দীর ভূ-রাজনীতি বদলে দিয়েছিল এই একটি যুদ্ধ। সাথে সাথে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব বিস্তার করেছিল ধর্ম, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে। কারণ তালাস নদীর যুদ্ধ অনেকটা অলিখিতভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছিল মধ্যে এশিয়ার কতটুকু অংশ আব্বাসীয় খেলাফত ও ট্যাং রাজবংশের মধ্যে থাকবে। অর্থাৎ সে সময়ের দুই পরাশক্তির স্থানগত সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল নদীপাড়ের এই যুদ্ধে।

তালাস নদীর যুদ্ধে বিজয়ের পর সিল্করুটের একটা বড় অংশ আব্বাসীয়দের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, যা তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত লাভজনক ছিল। এছাড়া মধ্য এশিয়ার তুর্কী গোত্রগুলো এ সময় মুসলিমদের সান্নিধ্যে আসে এবং পরবর্তী তিন শতাব্দীতে ক্রমান্বয়ে এদের অধিকাংশই ইসলাম গ্রহণ করে। এদিকে তালাস নদীর যুদ্ধের পর তিব্বত ও চীনের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ প্রায় বন্ধ হয়ে আসে। এ কারণে পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে তিব্বত এবং চীনের বৌদ্ধ ধর্ম ভিন্ন দিকে বিবর্তিত হয়েছিল, যার ফলশ্রুতিতে বৌদ্ধ ধর্মের চীনা সংস্করণ এবং তিব্বতীয় সংস্করণে মৌলিকভাবে এত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

ইতিহাসে পাতায় তালাসের যুদ্ধ

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তৎকালীন মুসলিম ঐতিহাসিকদের কলমে ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই যুদ্ধের তেমন কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। এমনকি জগৎবিখ্যাত ঐতিহাসিক এবং তাফসীরকারক ইবনু জারির তাবারী (রহি.) (৮৩৯-৯২৩) তাঁর ঐতিহাসিক গ্রন্থ তারিখে তাবারিতে তালাস নদীর এ যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেননি। তবে এই যুদ্ধের প্রায় অর্ধ সহস্রাব্দ পর ইবনে আসির (রহি.) (১১৬০-১২৩৩) এবং ইমাম যাহাবি (রহি.) (১২৭৪-১৩৪৮) এর কিতাবে এই যুদ্ধের উল্লেখ পাওয়া যায়। সে যা-ই হোক, সে-সময়ের ভূ-রাজনীতির বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায়, তালাস নদীর এ যুদ্ধ সময়ের পটবদলে অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রেখেছিল; যা কোনো অংশেই টুরসের যুদ্ধ কিংবা আইন জালুতের যুদ্ধের চেয়ে কম নয়। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, এই যুদ্ধটি সাধারণ মানুষ তো বটেই, ইতিহাসের অনেক উৎসুক পাঠকদের কাছেও বেশ অপরিচিত।

তথ্যসূত্র:

• কিরাআত ওয়া মুরাজাআতে নাকদিয়্যাহ: ফারুক ফুজি
• আল-আরব ওয়াস-সিন মুসতাকবিলুল আলাকা: আল মারকাযুল আরাবি লিল-আবহাস
• তারিখ আদ-দাওলাতুল উসমানিয়া: ইয়ালমায উযতুনা
• আল কামিল ফিত-তারিখ: ইবনুল আসির রহ.
• তারিখুল ইসলাম ওয়া ওয়াফায়াতুল মাশাহির ওয়াল আলাম: ইমাম শামসুদ্দিন যাহাবি
• জাওয়ানিবে মুদ্বিয়া ফি তারিখিল উসমানিয়্যিন: যিয়াদ আবু গুনাইমা
• তারিখুল হাদ্বারাতিস সিনিয়্যাহ (১৯৯৬)
• আস-সিন: ইআদাতু জুহুর ফি আসিয়া আল-উসতা: অধ্যায় ১৯
• “The Battle of Talas,” Barry Hoberman. Saudi Aramco World, pp. 26-31 (Sept/Oct 1982).
• “A Chinese Expedition across the Pamirs and Hindukush, A.D. 747,” Aurel Stein. The Geographic Journal, 59:2, pp. 112-131 (Feb. 1922)

Facebook Comments