সুবাস জড়ানো অলিন্দে | আহমাদ সাব্বির

সুবাস জড়ানো অলিন্দে

গতরাতে ঘুমোবার আগে আমি হারিয়ে গিয়েছিলাম ক্ষণিকের জন্য৷ কত সুন্দর করে দীনের কথা বলে চলেন তিনি৷ তার উচ্চারিত প্রতিটি হরফে যেন রজনীগন্ধার বাসনা জড়ানো৷ সে মোহময় সুবাসে তন্ময়তায় হারিয়ে গিয়েছিলাম যেন৷ চলুন, আপনাদেরও নিয়ে যাই শাইখুল ইসলাম মুফতী তাকী উসমানী হাফিজাহুল্লাহ‘র সেই সুবাস জড়ানো অলিন্দে৷

১,
ইসলামের মূল ভিত্তি স্থাপিত তাওহীদের কালিমার ওপর৷ তাওহীদের কালিমা অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ পাঠ করে আল্লাহ তালার একত্ববাদের স্বীকারোক্তি প্রদান করার মধ্য দিয়েই ইসলামে প্রবেশ করতে হয়৷ এই কালিমার বিস্ময়কর ফলাফল হলো— কালিমাটি পাঠ করা মাত্র মানুষের জীবনে এক অভাবিত পরিবর্তন ঘটে যায়: যে ছিল আল্লাহতে অবিশ্বাসী কালিমাটি পড়ে ওঠা মাত্রই সে হয়ে পড়ে বিশ্বাসীদের দলভুক্ত৷ যে ছিল আল্লাহ তালার ক্রোধের পাত্র সেই হয়ে ওঠে তাঁর একান্ত প্রিয় ভাজন৷ যার নসীবে লেখা ছিল জাহান্নাম তার জন্য ফায়সালা করা হয় চির সুখের জান্নাতের৷ আমার এই কথা কোন কাব্যিক অতিরঞ্জন নয়— মানুষকে জাহান্নামের তলানি থেকে উঠিয়ে মুহূর্তেই জান্নাতুল ফেরদাউসের উচ্চ আসনে সমাসীন করে যে কালিমা তা এই তাওহীদের কালিমা৷ আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মাদ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর শেষ রাসুল— এই মহান কালিমাতে পূর্ণরূপে সমর্পণই মানুষের মুক্তির একমাত্র উপায়৷

২,
কালিমায়ে তাওহীদ, এটি কোন মন্ত্র কিংবা জাদুবাক্য নয়৷ যা পাঠ করা মাত্রই জাদুবলে একজন ‘বোতল বন্দি মানুষ’ বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে যাবে৷ বরং একত্ববাদের কালিমা হলো রবের সাথে কৃত একটি চুক্তি; একটি অঙ্গিকার৷ তাওহীদের কালিমা মেনে নেয়ার অর্থ হলো— স্বীকারোক্তি প্রদান করা যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ‘ইলাহ’ নেই৷ ইবাদাতের উপযুক্ত সত্তা কেবল তিনিই৷ এবং সেই ইবাদতও হতে হবে তাঁর প্রেরিত রাসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালামের বর্ণিত পথ ও পদ্ধতির অনুসরণে৷ যিনি তাঁর পক্ষ থেকে প্রেরিত সর্বশেষ রাসুল৷ আর এই অঙ্গিকারের পূর্ণতা সাধনের সমান্তরালেই নির্ধারিত হবে মহান রবের কাছে আপনার প্রিয় হওয়া কিংবা না হওয়া৷

৩,
তাওহীদ দুই প্রকার৷
এক: এ’তেক্বাদী
দুই: আমালী

৪,
তাওহীদে এ’তেক্বাদী দ্বারা উদ্দেশ্য হলো— অন্তরে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল করে নেয়া যে, এই জগতের দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান তাবৎ বস্তুর স্রষ্টা মহান আল্লাহ৷ ইবাদাতের হকদার একমাত্র তিনিই৷ তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই৷ নেই তার কোন অংশীদার৷ সত্তাগত বিবেচনায় তিনি একক এবং তিনি একক গুণগত বিবেচনায়৷ তার সত্তার যেমন দ্বিতীয়টি নেই তার গুনাবলী ধারণ করে এমনটিও দ্বিতীয় কেউ নেই৷ তিনিই রিযিকদাতা৷ আর কেউ নেই যে রিযিক দেবার ক্ষমতা রাখে৷ তিনিই আরোগ্যদানকারী৷ তিনি ভিন্ন দ্বিতীয় কেউ নেই যে অসুস্থের রোগমুক্তি দান করতে পারে৷ কারও কোনো উপকার করার ক্ষমতা কেবল তাঁর৷ তিনি ছাড়া আর কারও সমর্থ নেই কারও সামান্য ক্ষতি করার৷ তিনিই বিপদ দানকারী৷ বিপদ থেকে উদ্ধারকারীও তিনি৷ রাব্বুল আলামিনের সত্তাগত ও গুণগত একত্ববাদের নামই তাওহীদে এ’তেক্বাদী৷

৫,
সুবাস জড়ানো অলিন্দেতাওহীদে আমালী বলা হয়— মা’বুদ হিসাবে তিনি এক ও অদ্বিতীয়৷ তিনি ছাড়া ইবাদাতের উপযুক্ত আর কেউ নেই এই বিশ্বাস অন্তরে ধারণ করে তাঁর হুকুম পালন করে যাওয়া৷ সর্বাবস্থায় প্রস্তুত থাকা মহান রবের ইবাদাতের জন্য৷ তাঁর আনুগত্য সর্বাগ্রে৷ তাঁর হুকুমের সামনে অন্য তাবৎ হুকুমকে তুচ্ছ জ্ঞান করা৷ রবের নির্দেশিত যে কোন হুকুম যথাযথ পালনের জন্য সর্বাবস্থায় মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকা৷

৬,
তাওহীদে আমালীর বদৌলতে একজন মানুষ তার জীবনের সকল কাজে আল্লাহর নির্দেশকে রাখে সর্বাগ্রে৷ সে সর্বদা লক্ষ্য রাখে— আমার এই পদক্ষেপে খোদা নারাজ হবেন না তো! তার মনে যদি সামান্য সন্দেহ জাগে যে, এই কাজে রব অসন্তুষ্ট হয়ে যেতে পারেন; নারাজ হতে পারেন তিনি আমার এমন পদক্ষেপে তাহলে সে তাৎক্ষণিক বিরত হয় এবং ফিরে আসে রবের সন্তুষ্টি হাসিলের পথে৷

৭,
আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান সে ডরায় না কাউকে৷ কারও দিকে প্রত্যাশাভরা দৃষ্টিতে দৃষ্টিপাত করে না৷ তার হাত প্রসারিত হয় না কোনো ‘মুখাপেক্ষি’র সমুখে়৷ কারও রক্তচক্ষু সামান্য টলাতে পারে না তাকে মহান রবের নির্দেশিত পথ থেকে৷ অযাচিত কামনার সমুদ্রে অবগাহন করার ভ্রম পেয়ে বসে না তাকে৷ সর্বাবস্থায় তার ভরসার স্থল হয়ে হৃদয়ে জ্বাজ্যল্যমান থাকে সেই নির্মুখাপেক্ষীর দুয়ার যার দুয়ার থেকে কেউ ফেরে না খালি হাতে৷

৮,
কবি শেখ সাদী বলেন— একত্ববাদে বিশ্বাসীর পায়ের কাছে দুনিয়ার সোনা-রূপা স্তুপ করে রাখো, কিংবা উত্তোলিত করে রাখো তার কাঁধের ‘পরে খোলা তলোয়ার৷ আল্লাহ ছাড়া কারও কাছে না তার প্রত্যাশা আছে, না আছে তার হৃদয়ে তিনি ছাড়া আর কারও সামান্য ‘ভয়-ডর’৷ এটাই তাওহীদ৷ এটাই এক আল্লাহতে পূর্ণ বিশ্বাস৷

৯,
হৃদয়ে তাওহীদ ও একত্ববাদ বদ্ধমূল করার একমাত্র মাধ্যম হলো— ইলম৷ কালিমায়ে তাওহীদ মেনে নেয়ার ফলে একজন মুমিনের ওপর আবশ্যকীয়তা কী— ইলম ছাড়া তা কোনোভাবেই জানা সম্ভব নয়৷ এজন্যই ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ৷ আবশ্যিক কর্তব্য৷

১০,
ঈমান গ্রহণের পর প্রতিটি মুসলমানের আবশ্যিক কর্তব্য হলো সে অনুসন্ধান করবে— কীসে মহান রবের সন্তুষ্টি আর কোন কাজে তাঁর নারাজি৷ তারপর সে সর্বাত্মক চেষ্টায় ব্রতী হবে— রবের সন্তুষ্টিমূলক কাজে প্রয়াসী হবার এবং তাঁর অপছন্দের সকল কাজ থেক বিরত থাকবার৷

চলবে…(ইনশাল্লাহ)

সুবাস জড়ানো অলিন্দে: ২য় পর্ব

Facebook Comments