থানভীর পরশে-৫ | ইমরান রাইহান

থানভীর পরশে-৫

হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানভী (র) এর জন্ম ১৮৬৩ সালে, ভারতের উত্তর প্রদেশে। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম দিকের ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম। পড়াশোনা শেষে তিনি কানপুরের ফয়জে আম মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। সারাজীবন তিনি লেখালেখি ও বয়ানের মাধ্যমে মানুষের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করেছেন। একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি ছিলেন সুপরিচিত। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান। তাঁর বিভিন্ন রচনাবলী ও আলোচনা থেকে সংকলন করা কিছু কথা নিম্মে তুলে ধরা হল।

আজকে ৫ম পর্ব দেওয়া হল…

২১। গীবত কখনো শত্রুতার পিতা হয়, কখনো শত্রুতার পুত্র হয়। অর্থাৎ, কখনো শত্রুতার কারণে গীবত করা হয়, আবার কখনো গীবতের কারণে শত্রুতা তৈরী হয়।

২২। আলেমদের কেউ কেউ দেখা যায়, ওয়াজ করাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন। এটি অনুচিত। যে ওয়াজের মাধ্যমে মানুষের জীবনে পরিবর্তন আসে, সমাজ বদলায় সেই ওয়াজ খুবই জরুরি জিনিস। আমার কাছে টাকা-পয়সা থাকলে আমি বেতন দিয়ে একজন ওয়ায়েজ রেখে দিতাম। যেখানে দরকার তাকে পাঠাতাম ওয়াজ করতে। যোগ্য আলেমরা ওয়াজের প্রতি অনীহা করার কারণে মুসলমানদের যে ক্ষতি হয়েছে তা হলো, ওয়াজের ময়দান চলে গেছে মূর্খদের দখলে, আর প্রকৃত আলেমরা ওয়াজ করছেন না। ফলে মূর্খরা আজকাল আলেমদের সামনেও ভুলভাল বকতে দ্বিধা করছে না। আমি বলি, এর দায় তাদের যারা ওয়াজ নসিহত করাকে মূর্খদের কাজ মনে করে মূর্খদের হাতে এর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। মানুষ আজকাল মূর্খদের ফতোয়া জিজ্ঞেস করছে, আর তারা যা মুখে আসছে বলে দিচ্ছে।

– বর্তমান সময়ের ওয়াজ মাহফিলের দিকে তাকালে হজরত থানভীর এই কথা স্পষ্ট বুঝে আসে।

২৩। অল্পবয়সী বাচ্চাদের ওয়াজ-নাত-গজল ইত্যাদী চর্চায় উৎসাহ দেয়া উচিত নয়। এমন হলে তারা পড়াশোনা বাদ দিয়ে গজল গেয়ে দুহাতে অর্থ উপার্জনের পথে নেমে যাবে।

– বর্তমান সময়ে এটির ক্ষতিকর প্রভাবও আমাদের সামনে রয়েছে। অনেক মেধাবী ছাত্ররা পড়াশোনা বিমুখ হয়ে গেছে এই কারণে।

২৪। একবার জৌনপুর গেলাম ওয়াজ করতে। সেখানে আমাকে একটি চিরকুট দেয়া হল। তাতে লেখা ছিল- তুমি অজ্ঞ, তুমি তাঁতি, তুমি কাফের, ওয়াজ করতে বসলে পাগড়ি সামলে রেখো। আমি কাউকে এ ব্যাপারে কিছু বলিনি।

ওয়াজ করতে বসে বললাম, আমার কাছে একটি পত্রে এসেছে। তাতে চারটি কথা লেখা আছে। প্রথম কথাতে আমার আপত্তি নেই। আমিও নিজেকে মূর্খ মনে করি। পরেরটি সম্পর্কেও আমার কোনো মন্তব্য নেই। আমি এখানে বিয়ে করতে আসিনি যে আমার পেশা জানাতে হবে। কারও জানার ইচ্ছে হলে আমার এলাকায় গিয়ে খবর নিতে পারেন আমি তাঁতি কিনা। আমাকে কাফের বলা হয়েছে। আমার অতীত আপনারা জানেণ না। আমি এখন কালিমা পড়ে নিলাম। লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। এখন তো আমি মুসলমান। যতক্ষন আমি ঈমানবিরোধি কোনো কাজ না করছি ততক্ষন আমার কথা শুনতে আপত্তি থাকার কথা নয়। চতুর্থ বিষয়টি নিয়ে আমার পরামর্শ করতে হবে। আপনারা চাইলে আমি ওয়াজ করব, না চাইলে করব না। তখন সবাই একযোগে বলে উঠলো, আপনি ওয়াজ করুন, যতক্ষন ইচ্ছা করুন।

২৫। আমি গ্রামে ওয়াজ করলে সহজ ভাষায় সহজ শব্দে ওয়াজ করি। শহরে যেহেতু শিক্ষিত মানুষ বেশি থাকে তাই সেখানে ওয়াজ করলে মাঝেমাঝে যুক্তি প্রমান দিয়েও ওয়াজ করি, নইলে তারা মনে করবে এই কথাগুলো ভিত্তিহীন, আলেমরা শুধু শুধু আমাদেরকে এসব বলছে।

২৬। অনেকে তাকওয়া বা হালাল রিজিক সম্পর্কে আলোচনা করার সময় এমন কঠিন করে আলোচনা করে, শ্রোতারা ভাবে এটি খুব কঠিন বিষয়। কোনভাবেই এর উপর আমল করা সম্ভব নয়। একজন দেখলাম আলোচনা করছে, এক বুজুর্গ কাঁদছিলেন কারণ, তাঁর গরু অন্য ক্ষেতে চলে গিয়েছিল। তারপর পায়ে সেই ক্ষেতের মাটি নিয়ে বুজুর্গের ক্ষেতে এসেছে। এখন বুজুর্গ তাঁর ক্ষেতের ফসল শতভাগ হালাল কিনা তা নিয়ে সন্দেহ করছেন। এসব ঘটনা শুনে লোকজন খুব উহ-আহ করে। কান্নাকাটি করে। কিন্তু তাদের মাথায় বসে যায় হালাল রিজিক খুব কঠিন। তাকওয়া খুব কঠিন। এর উপর আমল করা বুজুর্গদের কাজ। সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

অথচ এসব ঘটনা যেমন শরিয়তপরিপন্থী তেমন যুক্তি বিরোধিও। গরু একটু হাটলে তো তাঁর পা থেকে মাটি ঝরেই যায়, ক্ষেতে আসে কী করে? আর যদি ধরে নেই ওই ক্ষেত থেকে মাটি এখানে এসেছে তাহলে এই ক্ষেত থেকেও তো মাটি ওখানে গিয়েছে। তাহলে তো সমান সমান হয়ে গেল। মোট কথা আলোচনায় নিজের পক্ষ থেকে এমন কিছু বলা উচিত নয়, যাতে লোকজন শরিয়তকে অনেক কঠিন কিছু ভেবে বসে। তারা হতাশ হয় কিংবা আমলের আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

২৭। আজকাল চারদিকে উপাধির ছড়াছড়ি। সবাই সবাইকে উপাধি দিচ্ছে। সামান্য একটি কিতাব পড়াতে পারবে না, তাকেও বলা হচ্ছে শামসুল উলামা (আলেমদের সূর্য)। আমি বলবো, এরা সূর্য। তবে গ্রহনলাগা সূর্য। যে সূর্যে গ্রহন লাগে সে নিজেই থাকে আধারঘেরা, সে আলো বিলাবে কী করে।

– উপাধি নিয়ে একটি মজার ঘটনা আছে । আব্বাসি শাসনামলে একজন বুয়াইহি শাসক ছিলেন আযদুদ্দৌলা। কিছুদিন পর পর তিনি খলিফাকে বলতেন তাকে কোনো উপাধি দিতে। অসহায় খলিফা বাধ্য হয়ে তাকে উপাধি দিতেন। মৃত্যুর সময় তাঁর পুরো উপাধির তালিকা ছিল, আল মালিকুস সায়্যিদ শাহানশাহ আল আজালুল মানসুর ওয়ালিয়্যুন নিয়াম তাজুল মামলাকাহ আযদুদ্দৌলা।

২৮। আজকাল দেখা যায় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কোথাও দাওয়াত দেয়া হয়েছে তারা সাথে নিজের কজন সহচর নিয়ে আসে। অথবা কোথাও বসে আলোচনা হচ্ছে। ইতিমধ্যে খাবারের সময় হলো, তিনি উপস্থিত সবাইকে খাবারে অংশগ্রহন করতে বললেন। মেজবানের অনুমতি ছাড়া এভাবে অন্যকে দাওয়াত দেয়া স্পষ্ট নাজায়েজ।

এরা আবার যুক্তি দাঁড় করায়, বলে উপস্থিতদের রেখে খেতে আমার লজ্জা লাগে। আফসোস মানুষকে লজ্জা লাগে, আল্লাহকে লজ্জা লাগে না। এত আগ্রহ হলে নিজের পকেট থেকে খরচ করে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করুক। কিন্তু যেদিন এটা করতে বলা হবে সেদিন তাদের লজ্জাও চলে যাবে। আমি কোথাও গেলে সাথে শুধু একজনকে রাখি। মেজবানকে আগেই বলে দেই, আমার সাথে শুধু একজন আসছে। পথে কেউ আমার সঙ্গী হলে বলে দেই, আপনার থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা আপনিই করবেন, আমি করতে পারবো না।

মেজবান যদি আপনাকে দাওয়াত করে তাহলে তাঁর সাথে আপনার সম্পর্ক বিবেচনা করে গ্রহন করতে পারেন নাও করতে পারেন। এটা আপনার বিবেচনা। আর যদি মেজবান বলে হজরত আপনার সাথীদের দাওয়াত করতে চাই, তাহলে আমি বলে দেই, আমার কোনো সাথী নেই। এরা আমার কাছে দেখা করতে এসেছে। এদেরকে দাওয়াত করা না করা আপনার ব্যক্তিগত বিষয়। দাওয়াত করতে হলে আপনিই করুন। আমি এই দায়িত্ব নিতে পারব না। এটি আমার সাধারণ নিয়ম। তবে যাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা খুব বেশি তাদের কথা ভিন্ন।

২৯। কাজে গাফলতি করলে মনোযোগ চলে যায়। এজন্য পরিমানে অল্প হলেও নিয়মি তকাজ করে যাওয়া উচিত।

৩০। আমার লেখার বৈশিষ্ট্য হলো আমি শুধু প্রয়োজনীয় কথাগুলো লিখে দেই। এর অতিরিক্ত করি না। যেখানে দরকার সেখানে দীর্ঘ করি, যেখানে দরকার নেই সেখানে সংক্ষেপ করি। আজকাল জীবনিগ্রন্থের নামে যা লেখা হচ্ছে তাঁর প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই। এসব বই নানা কিচ্ছাকাহিনী ও অলৌকিক ঘটনা দিয়ে ভর্তি। অথচ জীবনি লেখার উদ্দেশ্য হলো তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা নেয়া। তাঁর মত করে জীবন গড়া। যা এসব বই থেকে অর্জিত হয় না।

আগের পর্বগুলো…

Facebook Comments