আত্মশুদ্ধি

থানভীর পরশে- ২য় পর্ব | ইমরান রাইহান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলি থানভী (র) এর জন্ম ১৮৬৩ সালে, ভারতের উত্তর প্রদেশে। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম দিকের ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম। পড়াশোনা শেষে তিনি কানপুরের ফয়জে আম মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। সারাজীবন তিনি লেখালেখি ও বয়ানের মাধ্যমে মানুষের মাঝে দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করেছেন। একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি ছিলেন সুপরিচিত। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান। তাঁর বিভিন্ন রচনাবলী ও আলোচনা থেকে সংকলন করা কিছু কথা নিম্মে তুলে ধরা হল।  আজকে ২য় পর্ব দেওয়া হল…

১১.

কারো উপর যদি রাগ আসে তাহলে তা দূর করার সহজ উপায় হলো, তাঁর কাছে কিছু উপহার পাঠানো। চাই তা সামান্য কিছুই হোক। এই কাজ করলে ধীরে ধীরে রাগ দূর হয়ে যাবে।

–  এখানে রাগ বলতে ব্যক্তিগত হিংসা বা বিদ্বেষ থেকে উদ্বুদ্ধ রাগের কথা বলা হচ্ছে। শরয়ী কারণে যে রাগ করা হয়, তাঁর কথা নয়।

১২.

অনেক সময় নিজের গুন আর অন্যের দোষ চোখে পড়ে। এ থেকে বাঁচার জন্য নিজের বিভিন্ন দোষের কথা মনে করতে হবে। আর ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে চিন্তা করবে, হতে পারে তাঁর এমন কোনো গুন আছে যা আমার অজানা, কিন্তু সেই গুনের কারনে সে আল্লাহর কাছে আমার চেয়ে অধিক প্রিয়।

১৩.

শয়তান অনেক সময় ধোঁকা দিয়ে বলে, এই গুনাহ করে নাও। তাহলে গুনাহের আগ্রহ কমে যাবে। বাস্তবতা হলো গুনাহ করার মাধ্যমে গুনাহের আগ্রহ কমে না, বরং আরো শক্তিশালী হয়।

১৪.

অনেক সময় কারো মুখে প্রশংসা শুনে অন্তর খুশি হয়ে যায়। সেখানে অহংকার জন্ম নেয়। এ থেকে বাঁচার উপায় হলো, কেউ প্রশংসা করলে সাথে সাথে নিজের বিভিন্ন অপরাধের কথা স্মরণ করবে। মনে মনে চিন্তা করবে, আল্লাহ আমার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রেখেছেন বলেই এই ব্যক্তি আমার প্রশংসা করছে। সুতরাং এখানে আমার কোন কৃতিত্ব নেই। এটি বেশ শক্ত কাজ। কিন্তু কিছুদিন নিয়মিত চেষ্টা করলে সহজ হয়ে যাবে।

১৫.

খাবারের সময় সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম তত্ত্বকথা আলোচনা করা ঠিক নয়। এতে খাবারের স্বাদ নষ্ট হয়ে যায়। খাবারের সময় সাধারণ কথাবার্তা বলবে। আমার সামনে খাবারে বসে কেউ যদি জটিল বিষয়ে আলোচনা করে আমি সেদিকে কান দেই না।

–  প্রফেসর হামিদুর রহমান (দা.বা)র মুখে বহুবার একটা ঘটনা শুনেছি। তিনি একবার ভারত সফরে ছিলেন। হজরত থানভীর খলিফা শাহ আবরারুল হক (র) এর সাথে বসে খাবার খাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি কথায় কথায় বলে উঠলেন, পটিয়া মাদরাসার মুহতামিম হাজি ইউনুস (র) ইন্তেকাল করেছেন। একথা শুনে আবরারুল হক (র) নীরব থাকেন। পরে খাবার শেষে তিনি বলেন, খাবারের সময় এ ধরনের সংবাদ দেয়া উচিত নয়।

১৬.

এক সময় আমি ভাবতাম, আলেমরা ওয়াজে শুধু নসিহতমূলক কথা বলেন। মাসআলা মাসায়েলের উত্তর দেন না। আমি এখন থেকে ফিকহি মাসআলা বলবো। এই চিন্তা করে আমি এক ওয়াজে গেলাম। সেখানে সুদ বিষয়ে কয়েকটি মাসআলা বলে এলাম। পরে জানলাম সেখানে মানুষদের মধ্যে এ নিয়ে বিরুপ প্রতিক্রিয়া পড়েছে, নানা কথা ছড়িয়েছে। তখন আমি বুঝতে পারলাম, আলেমদের সিদ্ধান্তই ঠিক। এ ধরনের খোলা মজলিসে এভাবে মাসআলা বলা ঠিক নয়। মাসআলা বলা হয় বিশেষ কোনো প্রশ্নের জবাবে, একটি অবস্থাকে সামনে রেখে। কিন্তু পরে দেখা যায় প্রশ্ন গায়েব হয়ে যায়, শুধু উত্তরটা নিয়ে নানা সন্দেহ সংশয় ছড়িয়ে পড়ে। আর সেখানে সব মানুষের জানাশোনা ও বুঝের স্তরও এক থাকে না। ফলে সমস্যা তৈরী হয়।

১৭.

দানশীল বলা হয় তাকে, যে দানের খাত বুঝে সেখানে দান করে। যে শরিয়ত নির্দেশিত দানের খাতগুলোই জানে না, বরং নাজায়েজ খাতেও দান করে তাঁর উদাহরণ হলো ঐ ব্যক্তির মত, যে এক লক্ষ টাকা কোনো নদীতে ফেলে দিল। এমন ব্যক্তিকে দানশীল বলা যায় না।

১৮.

কোনো প্রয়োজনে নির্জনতা অবলম্বন করলে মনে মনে নিয়ত করবে, আমি জনসামগম ত্যাগ করেছি যেন লোকজন আমার অনিষ্ট থেকে রক্ষা পায়। কখনো মনে এই ভাব আনবে না যে, আমি লোকজনের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। তাদের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য আমি নির্জনতা অবলম্বন করেছি। এমন চিন্তার দ্বারা অন্য মুসলমানের প্রতি কুধারণা রাখা হয়।

১৯.

এক বিদাতি মৌলভী এসেছিল হজরত কাসিম নানুতুবীর কাছে। সে বললো আমি আপনার সাথে বাহাস করতে চাই। কাসিম নানুতুবী বললেন, বিতর্ক বা বাহাসের উদ্দেশ্য সাধারণত দুটি হয়। এক, হক স্পষ্ট হওয়ার পর তা গ্রহন করা। দুই, নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করা। হক স্পষ্ট হলে তা গ্রহন করার মানসিকতা আজকাল উঠে গেছে। বাকি রইলো শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করা। তো এটার জন্য বিতর্ক করার দরকার নাই। আমি বিতর্ক করা ছাড়াই আপনাকে শ্রেষ্ঠ মেনে নিচ্ছি। এরপর তিনি উপস্থিতদের দিকে তাকিয়ে বলেন, ভাইয়েরা এই হজরত অনেক বড় আলেম। এভাবে তিনি অযথা বিতর্ক এড়িয়ে যান।

২০.

একবার আমি ঢাকার নবাবের দাওয়াতে ঢাকা সফর করেছিলাম। তখন শাহীবাগ নামে এক এলাকায় নবাবের আত্মীয়দের সামনে কিছু কথা বলতে হয়েছিল। আমি তাদেরকে বলি, আমার কথা শুনে একদিনেই দাঁড়ি রাখা হয়তো সম্ভব হবে না আপনাদের জন্য। কিন্তু আপনারা একটা কাজ করতে পারেন। প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে নিজের ব্যাপারে চিন্তা করবেন। দাঁড়ি কাটার জন্য নিজেকে নিজেকে ধিক্কার দিবেন। এটা যে একটা খারাপ কাজ সে কথা মনে গেথে নিবেন। আশা করি এক সময় আল্লাহ দাঁড়ি রাখার তাওফিক দিবেন।

–  হজরত থানভী নবাব সলিমুল্লাহর আমন্ত্রনে ঢাকা সফর করেছিলেন। তখন শাহবাগে নবাবদের বাগানবাড়ি ছিল। মুনতাসির মামুনের তথ্যমতে, বর্তমান বাংলা একাডেমি থেকে কলাভবন, শাহবাগ, পরীবাগ, ঢাকা ক্লাব পুরো এলাকা ছিল নবাবদের সম্পত্তি। হজরত থানভী এই এলাকাকেই শাহীবাগ বলেছেন।

হজরত থানভী এই সফরের শুরুতেই শর্ত দিয়েছিলেন, তাকে কোনো প্রকার হাদিয়া দেয়া যাবে না। নবাবের একজন আত্মীয় হজরত থানভীকে নিয়ে থানাভবন থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন। কলকাতায় এসে কথায় কথায় তিনি বলে বসেন, দুনিয়ার নিয়ম এমনই। পিপাসিত ব্যক্তি কূপের কাছে যায়। এ কথা শুনে হজরত থানভী সফর বাতিল করে কলকাতা থেকেই থানাভবন চলে যান। পরে নবাব সলিমুল্লাহ নানাভাবে ক্ষমা চেয়ে আবার সফর করতে রাজি করান। হজরত থানভী ঢাকায় আসেন।

ঢাকার নবাববাড়িতে তিনি নবাব পরিবারের উদ্দেশ্যে বয়ান করেন। বয়ান শেষে নবাব তাঁর সন্তানদেরকে হজরতের সামনে এনে বলেন, আপনি এদের সবক পড়িয়ে দেন। এদের আনুষ্ঠানিক পড়াশোনা শুরু হোক। হজরত থানভী তাদের সবক দেন। এ সময় নবাব প্রচুর অর্থ হজরতের সামনে রেখে বলেন, হজরত আমাদের বংশের নিয়ম হলো, যিনি আমাদের সন্তানদের প্রথম সবক পড়ান তাকে আমরা উপহার দেই। আপনি এই উপহার গ্রহন করুন। হজরত থানভী উপহার গ্রহন করেন।

রাতে নবাবের সাথে একান্ত সাক্ষাতে তিনি নবাবকে সকল উপহার ফিরিয়ে দিয়ে বলেন, আপনি এখানকার নবাব। আমি যদি সবার সামনে আপনার উপহার প্রত্যাখ্যান করতাম তাহলে আপনার অপমান হত। তাই আমি উপহার গ্রহন করেছি। কিন্তু আগেই আমার শর্ত ছিল, আমাকে কোনো উপহার দেয়া যাবে না। সেই শর্তানুসারে আমি এসব উপহার ফেরত দিচ্ছি।

থানভীর পরশে ১ম পর্ব

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: