ইমরান রাইহান

একান্ত আলাপে মুহতারাম মাওলানা আফসারুদ্দিন । ইমরান রাইহান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

মুহতারাম উস্তাদ মাওলানা আফসারুদ্দিন (মুহাম্মদ আফসার) হাফিজাহুল্লাহর সাথে ইতিহাস বিষয়ে কথা হচ্ছিল। সেই আলাপের চুম্বকাংশ এখানে। আশা করি অনেকে উপকৃত হবেন। আপনাদের আগ্রহ দেখলে পুরো আলোচনা প্রকাশ করা হবে ইনশাআল্লাহ।

ইমরান রাইহান: ইতিহাস জানা জরুরি কেন?

মাওলানা আফসারুদ্দিন– দুই কারণে। এক- আত্ম পরিচয়ের উদ্ভাবনের জন্য, যা নিয়ে মানুষ বেঁচে থাকে। দুই- নিজের হক্কানিয়্যাতের প্রমাণস্বরুপ। কুরআন নবী সা: এর হক্কানিয়্যাত প্রতিষ্ঠা করছে পূর্ববতী নবীদের জীবনী পেশ করে। মানুষ হক বুঝার পরেও মনের কোনাকানিতে কিছু সংশয় থেকে যায়। ইতিহাস সেটাকে রিপ্রেস করে। যুক্তি দাঁড় করায়। ইতিহাস হচ্চে বেইস। ইতিহাস হচ্ছে যে কোন মতবাদকে স্টাবলিশ করার ক্ষেত্রে কাঁচামাল। কুরআনে দেখবেন, الم تر۔ আপনি কী দেখেন নি? বলে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন আয়াত শুরু করেছেন। এটা এজন্য যে, মুমিনদের অন্তরে কখনো কখনো সংশয় আসবে যে, এ বিষয়টি কীভাবে হবে। আল্লাহ তায়ালা ইতিহাস তুলে ধরে প্রমাণ করেছেন এভাবে হবে।

ইমরান রাইহান:  ইতিহাসের উৎস কী? এসব উৎস থেকে ইতিহাস আহরণের পদ্ধতী কী?

মাওলানা আফসারুদ্দিনঃ  ইতিহাসের উৎস মোটামুটি চারটা। 1. লোককথা 2, উপন্যাস. 3 ইতিহাস শিরোনামের বই। 4. কুরআন ও হাদিস।। ইসলামের ইতিহাসের ক্ষেত্রে যদি সেটা কুরআন বা হাদীস না হয়, তবে যে ব্যক্তি , সময় ও গোত্র সম্পর্কে বলা হচ্ছে তার সম্পর্কে পূর্ব ধারণা না থাকলে প্রথম ধাপেই সব কথা আত্মস্থ করা যাবে না। দ্বিতীয়ত: যে বই থেকে পাঠ নেয়া হচ্ছে তার ব্যাপারে সমকালীন বিশ্বস্ত ঐতিহাসিক এবং অন্যান্য আলিমদের ধারণা কী সেটা বুঝা জরুরী। যে ফন (বিষয় বা শাস্ত্র) নিয়ে বইটি লিখিত হয়েছে, সে ফনের বিশেষজ্ঞগণ এই বই নিয়ে কী মত দেন বা তারা এ বইকে এই ফনের কিতাব হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে কী না, তাও জানা থাকা জরুরী। এতে করে আলোচ্য বিষয়ের মোটামুটি একটা বিশ্বস্ততা প্রতিষ্ঠা পায়।

আমরা আলোচনার পেছনে ফিরে যাই। যদি ইতিহাসের কিতাবটি এমন হয়, অর্থাৎ তা এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞদের কাছে স্বীকৃত তবে তা ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার সুযাগ আছে। আর যদি এমন না হয় তাহলে বিশেষজ্ঞরা ছাড়া সাধারন পাঠকের জন্য সেই বই পড়া উচিত হবে না। ইতিহাস পাঠের এটাই আপাতত সমাধান।

ইমরান রাইহান– আমরা দেখি ইতিহাসের ঘটনাগুলোর কয়েকধরনের পাঠ আছে। একই ঘটনা নিয়ে বিপরীতধর্মী দুটো মূল্যায়নও দেখা যায় অনেক সময়। এক্ষেত্রে করণীয় কী? বিশেষ করে মুস্তাশরেকিনরা প্রায়ই সমান্তরাল আরেকটি ব্যাখ্যা দাঁড় করান, যা কখনো কখনো বেশ যৌক্তিক কিন্তু আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে দেখা দেয়।

মাওলানা আফসারুদ্দিনঃ মাওলানা আবদুল মালেক সাহেবের নির্বাচিত প্রবন্ধ বইতে ওরিয়েন্টালিস্টদের কাজ সম্পর্কে মূল্যায়ন আছে। সেখানে একটা নির্দেশনা পাবেন। এ বিষয়ে পরে কখনো বিস্তারিত কথা হবে। আপাতত মুল কথা হচ্ছে- মুস্তাশরিকদের দাবিগুলো প্রায়ই ইতিহাস আছড়ে হাদীসের উপর চলে আসে। আপনি চাইলে সহীহ হাদিস দিয়ে সেটা ভুল প্রমাণ করে দিতে পারবেন। যেমন তাদের একটা দাবী কালিমা শাহাদাত এটা জাল বিষয়। তো এটা আপনি হাদিস দিয়ে পর্যালোচনা করতে পারবেন। কুরআন হাদীস ছাড়া বাকী ইসলামী ইতিহাস দুই ধরণের । বর্ণনামুলক অর্থাৎ যা পেয়েছেন তাই তুলে ধরেছেন। আর কিছু আছে তাসহীহ মুলক। অর্থাৎ তারা প্রচলিত ইতিহাস ও তথ্যের বিশুদ্ধতা যাচাই করেছেন। এজন্য পাঠের আগে তার পূর্বপাঠ জরুরী। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া বর্ণনামূলক। সিয়ারু আলামিন নুবালা কিন্তু অনেকটা তাসহীহ করা। যদিও সেটা রাবীদের জীবনী। আর আকাইদের বিষয়তো আছেই। অর্থাৎ, ইতিহাসকে আকাইদের নিক্তিতে মেপে আপনি অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে পারবেন।

ইমরান রাইহানঃ বর্তমানে আলিয়া মাদরাসা ও কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামের ইতিহাসের নামে যা পড়ানো হচ্ছে তা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কী?

মাওলানা আফসারুদ্দিনঃ এখানে যা পড়ানো হচ্ছে তাতে ছাত্রদের উল্টো মেজাজ তৈরী হয়। এসব বইপত্র ওরিয়েন্টালিস্টদের লেখা বা তাদের প্রভাবিত লেখকদের লেখা। ফলে দেখা যায় এখানে ইসলামের ইতিহাসের পাঠ দেয়া হচ্ছে স্যাকুলার মানদন্ডে। সহজে বলতে গেলে, বর্তমান যে স্যাকুলার মানদণ্ড এই মাপে যদি হজরত আলী রা. সঠিক হন তবে তারা তাকে মহীয়ান করে তুলবে। কিন্তু যদি ভিন্ন কোনো জায়গায় তাদের সাথে না মেলে তাহলে তারা চুপসে যাবে। ইতিহাসের ঐ অংশকে আলোচনায় আনবে না। আনলেও সমালোচনা করে ছাড়বে। ফলে এসব বই পড়ে যে ধারায় ইতিহাসের পাঠ ও অনুশীলন হচ্ছে তা উত্তরাধীকার সূত্রে পাওয়া ইসলামের ধারাবাহিক বুঝ (সালাফরা যেভাবে ইসলামকে ধারন করেছিলেন) থেকে পাঠককে সরিয়ে দেয়।

ইমরান রাইহানঃ অনেকে অভিযোগ করেন এদেশে ইতিহাস নিয়ে কাজ হয়নি। তাদের অভিযোগের বাস্তবতাও আছে। এর কারণ কী?

মাওলানা আফসারুদ্দিনঃ অল্পকথায় দরিদ্রতা ও রাজনৈতিক শোষণের কারণে জীবনের মৌলিক উপকরণ নিয়ে যেখানে জীবনের টানাপোড়েন সেখানে ইতিহাস তো বিত্তবানের চর্চা। এরপরো যারা চর্চা করেছে সেটা নির্দিষ্ট খাতে প্রবাহিত হয়েছে।

ইমরান রাইহানঃ ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণের উপায় কী?

মাওলানা আফসারুদ্দিনঃ কয়েক ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যায়। ভিন্ন ভিন্ন উপযোগি করে প্রকাশনা, ইতিহাস পাঠে উদ্বুদ্ধকরন, পাঠাগার, একাডেমি ও মাদরাসাগুলোতে এ বিষয়ের পাঠদান। মাঝে মাঝে পাঠচক্র। ইতিহাস যে ভিন্নখাতে প্রবাহিত হচ্ছে তা তুলে ধরা। ইতিহাসকে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে হবে আমাদের দাবি সহ। বিরোধীপক্ষের দাবিরও একটা সমাধান দিতে হবে এই ঝামেলায় পড়ে গেলে আপনার নিজের দাবি শক্ত হবে না। ধরেন হরিদাস পাল মুসলমান হলেন। তাঁর বাড়িতে একটা মন্দির ছিল, সেটা তিনি মসজিদ বানালেন। এখন একশো বছর পর এটাকে আপনি কী বলবেন? মন্দির মসজিদ বানানো হয়েছিল নাকি মসজিদ মন্দির ছিল।

মন্দির মসজিদ হয়েছে আপনি যদি এই দাবি মাথায় ঘোরান তাহলে আপনি নিজেই দুর্বল হয়ে যাবেন। আপনাকে বরং চিন্তা করতে হবে এটা এমন একটা খালি জায়গা, যেখানে আগে মন্দির ছিলো, সেই খালি জায়গায় এখন মসজিদ।

(অসমাপ্ত)

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: