সংকলন
তৃতীয় পাঠ
আব্দুল্লাহ তালহা তোহফায়ে রমযান

রমযান মাস ও পবিত্র কুরআন | তৃতীয় পাঠ

কুরআন কারিম মাহে রমযানকে ভালোবাসে। রমযান মাসও কুরআনকে ভালোবাসে। এরা দু’জনে অত্যন্ত গভীর হৃদ্যিক বন্ধু। আল্লাহ তাআলা বলছেন,
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِنَ الْهُدَى وَالْفُرْقَانِ.
অর্থ : রমযান মাসÑ যে—মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা আদ্যোপান্ত হিদায়াত এবং এমন সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি সম্বলিত, যা সঠিক পথ দেখায় এবং সত্য ও মিথ্যার মধ্যে চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেয়।

পবিত্র রমযান মাসেই লওহে মাহফুয থেকে সম্পূর্ণ কুরআন একসঙ্গে দুনিয়ার আসমানে অবতীর্ণ হয়। এই মাস কুরআন অবতরণের কারণে সম্মানিত। এজন্য রাসুলে কারিম صلى الله عليه وسلم প্রতি রমযান মাসে জিব্রিল আমিন আ.—এর সাথে কুরআনের দাওর করতেন। একজন অপরজনকে শোনাতেন। তিনি এই মাসে অনেক বেশি কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তাদাব্বুর তথা চিন্তা—ফিকিরের সাথে কুরআন পাঠ করতেন। পবিত্র রমযান মাসে নবীজি কুরআনের মধ্যেই যেন বসবাস করতেন। তাঁর পবিত্র হৃদয় বিচরণ করত কুরআনের চারণভূমিতে।

free delivery
এজন্য কুরআন পড়তে—জানা ব্যক্তি রমযান মাসে সিয়াম ও কুরআনের মাঝে সুসমন্বয় করবে। সে চেষ্টা করবে এই একটি মাস কুরআনের মাঝে বাস করতে, যে কুরআন সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেন,
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ.
অর্থ : (ইহা ওই) কিতাব, যা আমি অবতীর্ণ করেছি আপনার উপর, বরকতময় রূপে। যেন তারা তার আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তা—ফিকির করতে পারে এবং বিচক্ষণরা তা থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে।

ঠিক একই বিষয় সম্বলিত আরও আয়াত উল্লেখ করা হচ্ছে
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا.
অর্থ : তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা—ফিকির করে না, না কি তাদের হৃদয় তালাবদ্ধ?
রমযানে কুরআন তিলাওয়াতের মাঝে ভিন্যরকম এক স্বাদ ও মজা অনুভূত হয়। এসময় কুরআন তিলাওয়াত করলে বিশেষ প্রত্যাদেশ ও নির্দেশনা লাভ হয়।

রমযানে কুরআন বিশেষ কিছু দান করে। বরকতের বারি বর্ষণ করে। রমযানে কুরআন নিয়ে থাকলে কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার ইতিহাস স্মরণ হয়। রাসুলে কারিম صلى الله عليه وسلم—এর হযরত জিব্রিলের সাথে দাওরের কথা স্মরণ হয়।
রাসুল صلى الله عليه وسلم বলেছেন , তোমরা কুরআন তিলাওয়াত করো। কারণ, কুরআন কেয়ামতের দিন তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশ করবে।

অপর হাদিসে রাসুল صلى الله عليه وسلم বলেন, তোমাদের মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ সেই ব্যক্তি যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়।
একটি হাদিসে রাসুল صلى الله عليه وسلم বলেন, যে ব্যক্তি কুরআন তিলাওয়াত করে আর সে তাতে দক্ষ, তার হাশর হবে মহান ফেরেশতাদের সাথে। আর যে ব্যক্তি কুরআন পাঠ করে এবং ঠেকে ঠেকে পাঠ করে, উচ্চারণ তার কাছে কঠিন মনে হয়; এমন ব্যক্তির জন্য রয়েছে দ্বিগুণ সওয়াব।

আমাদের পূর্বসূরিগণ রমযান মাস এলে কুরআনকে সর্বক্ষণের সঙ্গী বানাতেন। কুরআন খুলে বসে থাকতেন। সারাদিন কুরআন তিলাওয়াত, কুরআনের মর্ম উপলব্ধি করার মাঝেই তাদের সময় কেটে যেত। তাঁরা কুরআনের সাথে যেন ভ্রমণ করতেন। ইমাম মালেক রহ. সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি রমযান মাসে শুধু কুরআন নিয়ে পড়ে থাকতেন। সে সময় তিনি দরসপ্রদান, ফতোয়াদান ও মানুষের সাথে বসাও ছেড়ে দিতেন। ইমাম মালেক রহ. বলতেন, এটা রমযান মাস। এটা কুরআনের মাস।

সালাফে সালেহিনের ঘরবাড়ি রমযান মাসে এক বিশেষ রং ধারণ করত। মৌমাছির গুঞ্জরণের মত তাদের ঘরে কুরআন তেলোয়াতের আওয়াজ গুঞ্জরিত হত। সেসব ঘর এলাকায় নুর ছড়াত । সুখ ও সৌভাগ্যে পূর্ণ হয়ে থাকত তাঁদের গৃহগুলো। সালাফগণ অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে থাকতেন। কুরআনের বিস্ময়কর বর্ণনার সময় থেমে যেতেন। উপদেশাবলি পাঠ করার সময় কাঁদতেন। সুসংবাদ শুনে খুশিতে বিহ্বল হতেন। আদেশ—নিষেধের প্রতি অত্যন্ত মনোযোগী হয়ে কুরআন তিলাওয়াত করতেন।

হাদিসে বর্ণিত, একবার ইবনে মাসউদ রা. তিলাওয়াত করছিলেন আর রাসুলুল্লাহ صلى الله عليه وسلم সেই তিলাওয়াত শুনছিলেন। যখন তিনি এই আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন
فَكَيْفَ إِذَا جِئْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ بِشَهِيدٍ وَجِئْنَا بِكَ عَلَى هَؤُلَاءِ شَهِيدًا.
অর্থ : সেদিন কেমন অবস্থা হবে যখন আমি প্রত্যেক জাতি থেকে একজন সাক্ষ্যদানকারী আনব এবং আপনাকে এই সবার উপরে সাক্ষ্যদাতা হিসেবে উপস্থিত করব!

রাসুল صلى الله عليه وسلم বললেন, ইবনে মাসউদ, থামো! আর পড়ো না। হযরত ইবনে মাসউদ রা. বলেন, এরপর আমি হুজুরের চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখি তাঁর চোখদ্বয় থেকে অশ্রম্ন গড়িয়ে পড়ছে।

রাসুল صلى الله عليه وسلم সম্পর্কে এই হাদিসও বর্ণিত আছে যে, একবার আবু মুসা আশআরির তিলাওয়াত শুনলেন। অতঃপর আবু মুসার সাথে দেখা হলে রাসুলুল্লাহ বললেন, তুমি কি আমাকে লক্ষ্য করেছ যখন গতকাল আমি তোমার তিলাওয়াত শুনছিলাম? তোমার তিলাওয়াত শুনে মনে হচ্ছিল যেন, দাউদ আ.—এর সুরসমূহ থেকে তোমাকে দান করা হয়েছে। আবু মুসা বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমি যদি আপনাকে দেখতাম তাহলে আরও সুন্দর করে তিলাওয়াত করতাম।

হযরত উমর রা. সাহাবায়ে কেরাম রা.কে একত্রিত করে হযরত আবু মুসা রা.কে বলতেন, আবু মুসা! আমাদেরকে আমাদের রবের কথা স্মরণ করিয়ে দিন। তখন আবু মুসা রা. অত্যন্ত সুললিত কণ্ঠে কুরআন কারিমের তিলাওয়াত করে যেতেন। আর মজলিসে উপবিষ্ট সকল সাহাবি আবেগের সাথে তা শুনতে ও কাঁদতেন।

রাব্বুল আলামিনের কালাম শ্রবণের ব্যাপারে পরবতীর্তে যখন থেকে অবহেলা শুরু হয়েছে তখন থেকে তরবিয়ত ও দীক্ষা হারিয়ে গেছে। স্বভাব—চরিত্র হয়ে পড়েছে দুর্ঘন্ধময়। বুদ্ধি—বিবেচনা হয়ে পড়েছে অসুস্থ।

পবিত্র কুরআন সবচেয়ে গুরুত্বারোপ করেছে মানুষের হিদায়াতের ব্যাপারে। কুরআন কারিম নুর ও শিফা (আরোগ্যদানকারী); আত্মিক রোগের চিকিৎসা। কুরআন ঐশী জ্ঞান, সভ্যতা ও সুস্পষ্ট প্রমাণ।

কুরআন জীবন, কুরআন আত্মা; কুরআনই সকল সমস্যার সমাধান। আল্লাহর পক্ষ থেকে মহা প্রতিদান লাভের উপকরণ। কুরআনে কারিম ইলাহি শিক্ষা। সৃষ্টিকর্তার আইন। চিরন্তন দিকনির্দেশনা।

সুতরাং আমাদের কি সুযোগ হবে রমযানে ও রমযানের বাইরে কুরআনকে আপন করে নেয়ার! আমরা কি কুরআনের প্রতি যথাযথ সম্মান বুকে ধারণ করে আমাদের জীবনকে কুরআন দ্বারা সৌভাগ্যমণ্ডিত করব না! এখন নয়, তো কখন আমরা কুরআনকে জীবনের আলো হিসেবে গ্রহণ করব!

Facebook Comments

Related posts

মানসিক দুঃখ-কষ্টের কারণ ও প্রতিকার | আব্দুল্লাহ তালহা

সংকলন টিম

রোযাদারের সংগীত | চতুর্থ পাঠ

কাসিমুল উলূম ওয়াল হিকাম মাওলানা কাসেম নানুতুবি রহ. | আবদুল্লাহ তালহা

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!