থানভীর পরশে-৩ । মাহমুদ সিদ্দিকী

থানভীর পরশে

সময়টা শঙ্কা-দুশ্চিন্তা ও বিচলতা-বিহ্বলতার। আশা-নিরাশার দোলাচলে দুলছে সময়। কার্নিশে ঝুলে থাকা মাকড়সার জালের মতো সবকিছু অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে। জীবনচলা থমকে গেছে রব্বে জাব্বারের জালাল প্রকাশে। অসহায়-বিহ্বল আজ সকল মানব জাব্বার। তিরতির প্রবাহে থরথরে কাঁপতে থাকা সদ্য-উদ্গত কিশলয়ের মতো অসহায়ত্ব চতুর্দিকে। তাকদিরের অপ্রতিরোধ্য ঝড়ের সামনে প্রচণ্ড শীতে উড়তে-থাকা পেঁজাতুলোর মতো উড়ছে সব। অথৈ সমুদ্রে ডুবতে-ডুবতে সামান্য খড়কুটো আঁকড়ে ধরে যেন বাঁচতে চাওয়া—সামান্য সময়ের অসামান্য দুঃসহ এইসব পরিস্থিতিতে সকল দম্ভ চূর্ণ, সকল প্রতিপত্তি ব্যর্থ হয়ে গেছে। মহান জাব্বারের প্রতিপত্তির সামনে সবকিছু নস্যি প্রমাণিত হয়েছে।

এমনতর পরিস্থিতিতে আকিদার জ্ঞান থাকা খুবই জরুরি। আকিদা যদি ঠিকঠাক শেখা না হয়, তাহলে বিপদ-আপদে মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ে। দিশেহারা হয়ে অনেক সময় এমন কথাও বলে ফেলে, যাতে ইমান আছে কি নেই—এই শঙ্কা তৈরি হয়ে যায়। আকিদার জ্ঞান ছাড়া আমলের পরিপূর্ণতা সম্ভব নয়; আমলের পরিপূর্ণতার জন্যই আকিদার জ্ঞান জরুরি। আকিদা সহিহ হলে আমলও বিশুদ্ধ হবে।

হাকিমুল উম্মত থানভি রহ. বলেন—“আকিদার তা’লিম দ্বারা আমলের পরিপূর্ণতা অর্জনও একটি উদ্দেশ্য। দলিল দেখুন, আল্লাহ তাআলা বলেছেন—‘পৃথিবীতে ব্যাপকভাবে এবং তোমাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে যত বিপদ আক্রান্ত করে, তার সবই লিপিবদ্ধ আছে তাকদিরে; পৃথিবী সৃষ্টি করবার পূর্বেই। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলার জন্য তা খুব সহজ বিষয়’। এরপর আল্লাহ তাআলা বলছেন—‘(একথা তোমাদেরকে এজন্য বলে দেওয়া হয়েছে) যাতে তোমরা যা-কিছু হারাও সেজন্য দুঃখিত না হও, এবং যা-কিছু লাভ করো তার জন্য উল্লসিত না হও’।(১) অর্থাৎ আমাদেরকে এ বিষয়ের তা’লিম আল্লাহ তাআলা দিচ্ছেন, যাতে আমরা কোনো কারণে দুঃখিত কিংবা উল্লসিত না হই।

এখানে বিশেষভাবে যা লক্ষণীয় তা হলো—প্রথম আয়াতের বিষয়বস্তু তাকদির। দ্বিতীয় আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাকদির শিক্ষা দেবার কারণ ও উদ্দেশ্য বলে দিয়েছেন। তার মানে দাঁড়াচ্ছে—আল্লাহ তাআলা বলতে চাচ্ছেন, আমি তোমাদেরকে তাকদিরের বিষয় শিক্ষা দিয়েছি এজন্য যে, যখন তোমরা তাকদিরের ওপর বিশ্বাস রাখবে, তখন যেকোনো বিষয়ে তোমাদেরকে বিশেষ আনন্দ বা দুঃখ গ্রাস করবে না। আমাদের মাঝে এর উদাহরণও বর্তমান।

যেসব লোক তাকদিরের ওপর যথাযথ বিশ্বাস রাখেন, তারা বিপদ-আপদ ও দুর্যোগ-দুর্ঘটনায় তাকদির অস্বীকারকারীদের চেয়ে আলাদা ও অধিক অটল-অবিচল হয়ে থাকেন। উক্ত আয়াত থেকে বোঝা গেল—তাকদিরের ওপর বিশ্বাস রাখার ফলাফল হলো আমলের শুদ্ধতা বজায় থাকে। আরও স্পষ্ট করে বললে—সকল কিছুতে আল্লাহ তাআলার ওপর আস্থা ও তাওয়াক্কুলের আমল কেবল তাকদিরের ওপর বিশ্বাস থাকলেই সম্ভব। সুতরাং, খোদ আকিদা তো অর্জনীয় বিষয়ই; আমলের পরিপূর্ণতার ক্ষেত্রেও আকিদার বিশেষ দখল আছে”।(২)

তাকদিরের ওপর অবিচলতা ব্যতীত বান্দার জন্য বিপদে সবর করা মুশকিল। তাকদিরের ওপর অবিচলতা থাকলে সবর করা সহজ হয়। এজন্য যে-কয়েকটি বিষয়ের ওপর বিশ্বাস রাখাকে ইমানের মৌলিক আকিদার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তার একটি হলো এই তাকদির; ভালো-মন্দ যা-কিছু হয় তার সব তাকদিরে পূর্ব থেকেই নির্ধারিত আছে। হাদিসে জিবরিলে মানবরূপে আগমনকারী জিবরিল আলাইহিসসালাম যখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইমানের পরিচয় জিজ্ঞেস করেন, তখন নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বলেছিলেন—“ইমান হলো বিশ্বাস রাখা আল্লাহর প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি, রবপ্রেরিত সকল নবি-রাসুলের প্রতি, আখেরাত দিবসের প্রতি; এবং বিশ্বাস রাখা তাকদিরের প্রতি। ভালো-মন্দ যা-কিছু হয়, তাকদির অনুযায়ীই হয়”। (৩)

অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন—“(হে নবি,) আপনি বলে দিন—আমাদের কাছে (ভালো-মন্দ) কেবল তা-ই পৌঁছবে, যা আল্লাহ তাআলা আমাদের জন্য লিখে রেখেছেন। তিনি আমাদের অভিভাবক। মুমিনরা যেন আল্লাহ্ তাআলার ওপর ভরসা করে”।(৪) অর্থাৎ, আল্লাহ্ তাআলা বলে দিতে চাচ্ছেন—বস্তুবাদ ও পার্থিব উপকরণ হলো একপ্রকার প্রহেলিকা। এর আড়ালে মূল শক্তি হিসেবে সক্রিয় হলো আল্লাহ্ তাআলার নির্ধারিত তাকদিরের শক্তি।

এক্ষেত্রে থানভি রহ.-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। থানভি রহ. বলেন—“একবার এক ধনাঢ্য ব্যক্তির চিঠি আসে আমার কাছে। চিঠিতে লেখা—‘আপনার মাদরাসার জন্য দুইশ রুপি পাঠালাম, সাথে এও জানিয়ে রাখি, সামনে আপনাকে সাক্ষাতের জন্য দাওয়াত দেবো’। পত্র পড়ে তার মানি-অর্ডার ফেরত পাঠিয়ে দিলাম। সাথে পত্র লিখলাম—‘আপনি অর্থ পাঠিয়ে আমাকে প্রভাবিত করতে চাচ্ছেন। আপনার অর্থ আপনার কাছেই রাখুন। দাওয়াত দেবার হলে এবার দিন’। আমার এই কাজ দেখে অন্যরা বলতে লাগল, এত টাকা ফেরত পাঠিয়ে দিলেন কেন? মাদরাসার কোনো প্রয়োজনে লেগে যেত। উত্তরে আমি বললাম—‘এই অর্থ যদি মাদরাসার তাকদিরে থাকে, তাহলে পুনরায় আসবে’। দেখা গেল, পরবর্তীতে মানি-অর্ডার পুনরায় এলো; সাথে ক্ষমা চেয়ে পত্র দিল—‘আমার ভুল হয়ে গেছে। এই অর্থ নিরেট সওয়াবের উদ্দেশ্যে আমি দান করছি এবং আপনাকে সাক্ষাতের জন্য দাওয়াতের অনুরোধ প্রত্যাহার করছি’। তখন সেই অর্থ মাদরাসার জন্য গ্রহণ করে ফিরতি পত্রে লিখলাম—‘আপনার সুবুদ্ধির উদয় দেখে এখন আপনার সাথে সাক্ষাৎ করার ব্যাপারে আমি আগ্রহ পাচ্ছি’। কিছুদিন পর সেই ব্যক্তি দাওয়াত দিলে তার বাড়িতে যাই। অর্থ যেটা আসবার ছিল তা আসবেই, ফিরিয়ে দিলেও আসবে; এখন আপনারাই বলুন, তাকদির অস্বীকারকারী কোনো ব্যক্তি কি এমনটা করতে পারত”? (৫)

মোটকথা হলো, ভালো-মন্দ যা-কিছু আমাদের সাথে ঘটে, তার সবই তাকদিরে নির্ধারিত আছে। এজন্য বিচলিত হবার কিছু নেই। আমাদের উচিত হলো সবর ও সালাতের মাধ্যমে আল্লাহ্ তাআলার কাছে সাহায্য চাওয়া।

সূত্র
(১) সুরা হাদিদ, আয়াত-২২-২৩
(২) জাওয়াহিরাতে হাকিমুল উম্মত ১/৩৪-৩৫, সংকলন-মুহাম্মাদ ইকবাল কোরেশি
(৩) সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-৮
(৪) সুরা তাওবা, আয়াত-৫১
(৫) জাওয়াহিরাতে হাকিমুল উম্মত, ১/৮৯

আরও পড়ুন…

থানভীর পরশে -১ম পর্ব

থানভীর পরশে- ২য় পর্ব

Facebook Comments