আহমদ উসমান

উমারে সালিস | আহমাদ উসমান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr
৪ এপ্রিল, ১৯৯৬।
আজ থেকে ২৪ বছর পূর্বে ঠিক আজকের এই তারিখ। দিনটি ছিল বিষ্যুদবার। বসন্ত সকালের অবাধ্য রোদ তীব্র হতেই কান্দাহারে বসেছে ১৫,০০ আলেম, বরেণ্য ইসলামী ব্যক্তিত্ব ও জিহাদি নেতৃবৃন্দের ছোটখাটো এক সমাবেশ। উপস্থিত ছিলো ৩৫ বছরের এক টগবগে যুবক। একেবারে সাদামাটা, গায়ে পুরনো একটা চাদর জড়ানো, মাথায় লম্বা পাগড়ি এলোমেলোভাবে পেচানো। উলামাদের সাথেই জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন। দেখতে নেতৃত্ব সুলভ বৈশিষ্ট্যের কোন ছাপ স্পষ্ট না, অথবা বিশিষ্ট কেউ হতে পারে মনেই হচ্ছেনা। অথচ আজকের জলসার মূল আকর্ষণ হচ্ছে এই যুবককে ঘিরে।
এই যুবকটি আর অন্যকেউ নয়, আমরা যাকে চিনি, জানি মোল্লা ওমর নামে। সেদিন এই সভায় উপস্থিত উলামায়ে কেরাম মোল্লা ওমরকে বাইয়াত প্রদান করেন এবং তাকে ‘আমীরুল মুমিনীন’ উপাধিতে ভূষিত করেন। উলামায়ে ইসলামের সর্বসম্মতিক্রমে তার কাঁধে আফগান নেতৃত্বের ভার তুলে দেয়া হয়। নেতৃত্ব কাঁধে নেয়ার পর উলামাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, যদি কোন আলিম অক্ষম নেতৃত্বের কারণে আমাকে পাকড়াও করেন তাহলে আমি সাথে সাথে পদত্যাগ করবো। এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় আফগানের ইমারাতে ইসলামীর। এবার একটু চলুন মোল্লা ওমরের অতিবাহিত দিনগুলোতে ঘুরে আসি।
১৯৬০ সাল। কান্দাহারে এক ধর্মীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করে এক শিশু। নাম রাখা হয় মুহাম্মাদ ওমর। বাবা মৌলভী গোলাম ছিলেন গ্রামে একজন সম্মানিত আলেম ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব। ওমরের জন্মের পাঁচ বছরে পিতা মৃত্যুবরণ করলেন। পিতার মৃত্যুর পর ওমর চাচাদের হেফাজতে উরুজগান প্রদেশে চলে যায়। চোখ মেলতেই ওমরের অবলোকিত হয়েছে সুউচ্চ পর্বতশ্রেণী। শৈশবে মুখোমুখি হয়েছে জীবনের কণ্টকাকীর্ণ পথের। সাত বছর বয়স থেকে সূচনা হলো ওমরের ইলমে দ্বীন শিক্ষা অর্জন। কিন্তু এই ইলমে দ্বীন অর্জন আর সমাপ্ত হয়নি। তবে এই ক্ষুদ্র জীবনে অধিকাংশ সময় পার হয়েছে সম্পুর্ন ধর্মীয় এক পরিবেশে। তাই বলা যায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ না হলেও ইলমীভাবে মুহাম্মাদ ওমর একটা নির্দিষ্ট অবস্থানে পৌঁছেছিল।
কৈশোর পার করে সবে তারুণ্যের অদমনীয় ছোয়া গায়ে লাগলো ওমরের। এমন সময় ১৯৭৯ সালে সোভিয়েতরা আফগান দখল করে নিল। চোখের সামনেই মাতৃভূমিতে একের পর এক মর্মান্তিক দৃশ্যাবলী ঘটে গেল। খুন চেপে বসলো ওমরের রক্তে। এখনই দাখলদারিত্বের বিরুদ্ধে সর্বাত্মকভাবে জিহাদ করার সময়। তাই হাতের কিতাব শেলফে রেখে দিয়ে তুলে নিল ক্ল্যাসিনকোভ। পড়াশোনা স্থগিত করে জিহাদের দায়িত্ব আঞ্জাম দিতে ঝাপিয়ে পড়ল যুদ্ধক্ষেত্রের তপ্ত আগুনে।
ওমরের জিহাদ ছিল আগ্রাসী শত্রুর হাত থেকে ইসলাম ও মুসলমানদের রক্ষার উদ্দেশ্যে। বলা হয়ে থাকে যুদ্ধের ময়দানে সাহসের দিক দিয়ে সে ছিলো কিংবদন্তী। তার সাহসিকতা ও বাহাদুরিতে দুশমন সর্বদা ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতো। ওমর রুশ বিরোধী যুদ্ধে মোট তিনবার আহত হন। এরমধ্যে এক যুদ্ধে মারাত্মক আহত হয়ে একচক্ষু হারান। কিন্তু কোন জখমি ওমরকে বসিয়ে রাখতে পারেনি, বরং প্রতিবার জখমের মাধ্যমে এই কিংবদন্তীর জীবন শুরু হতো নতুনভাবে। ওমরের অকল্পনীয় সাহসিকতা ও বিভিন্ন ফ্রন্টে তার সফল ভূমিকার কারণে উরুজগান প্রদেশের কয়েকটি জেলার মুজাহিদদের আমির নির্বাচিত হন। অতঃপর ওমরের সুদক্ষ নেতৃত্বে মুজাহিদরা বড় বড় বিজয় ছিনিয়ে আনল। ৬ ফুট ৬ ইঞ্চি লম্বা ওমরের রুশদের সাথে বীরদর্পে লড়াইয়ের ঘটনা খুব দ্রুত দক্ষিণ আফগানে ছড়িয়ে পড়লো। সেই থেকে সবার কাছে পরিচিত হয়ে উঠলেন মোল্লা ওমর নামে।
সোভিয়েতের ইউনিয়নের বিরুদ্ধে সেই জিহাদে কেটে গেল প্রায় এক যুগ। ১৯৯০ সালে রুশরা নাকে খত দিয়ে আফগান ছাড়ে। বিজয়ের পর মোল্লা ওমর আপন গ্রামে ফিরে আসলেন। তার অসমাপ্ত দ্বীনি ইলম অর্জনে পুনরায় মনোনিবেশ করলেন। মুজাহিদদের নিষ্ঠাপূর্ণ ত্যাগ ও কোরবানির ফলে রুশদের পতন হয়। কিন্তু আফগান জাতির দুর্দশার অবসান ঘটেনি।
গতকালও যারা রুশদের বিরুদ্ধে বুকটান করে দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের একটা অংশ ক্ষমতার লোভে আজ গোটা আফগানজুড়ে গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিল। পুরো আফগান একটি দুর্দশাগ্রস্থ রাষ্ট্রে পরিণত হলো। মাদকদ্রব্য, সন্ত্রাসী ছেয়ে গিয়েছিল দেশটি। চারিদিকে অপরাধ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, বিরতিহীনভাবে চলতে লাগলো হত্যা, লুন্ঠন আর অমানবিক কার্যকলাপ।
নিরাপত্তাহীনতায় সয়লাব হয়ে গেল। বাহিরে জনগণের না ছিল জানমালের কোন হেফাজত কিংবা ঘরের ভিতর শান্তিতে বসবাসের সুযোগ। সময় গড়িয়ে যেতে লাগলো৷ কিন্তু নৈরাজ্য, বিশৃঙ্খলার কোন কমতি নেই। দেশব্যাপী জনগণের অবিরাম দুঃখকষ্ট প্রতিদিন বেড়েই চললো।
ন্যায়পরায়ন মুজাহিদরা উদ্বিগ্ন থাকতেন ক্রমবর্ধমান এই অবনতির ব্যাপারে। সাধারণ মানুষ চাচ্ছিল কেউ একজন জেগে উঠুক আর তাদের পক্ষে লড়াই করে আফগানিস্তানের নিরাপত্তা দিক। এমন সময় কান্দাহারের একটা ঘটনা নতুন মোড় এনে দেয়।
কান্দাহারের স্থানীয় ক্যাডাররা দুইজন কিশোরীকে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। রাতভর মিলিটারি ক্যাম্প তারা মেয়ে দুটির সম্ভ্রমহানি করে। সুবিচার পাওয়ার জন্য সাধারণ জনগণ স্থানীয় মোল্লার কাছে গেল, এবার যা করার মোল্লাই করবে যে আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধের এক অভিজ্ঞ যোদ্ধা মোল্লা ওমর। মোল্লা ওমর দায়িত্ব থেকে পালানোর মতো লোক কখনোই ছিলেননা। ফলে এই ঘটনার পর মোল্লা ওমরের পক্ষে বসে থাকা অসম্ভব ছিল, দাঁড়িয়ে গেলেন এবং অন্যায়, অবিচার, যুলুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দিলেন।
মোল্লা ওমর যুদ্ধের জন্য সাথে নিলেন মাত্র ত্রিশ জন ছাত্রের একটি কাফেলা। অস্ত্র বলতে ছিল ১৬ টা রাইফেল, তাও মান্ধাতা আমলের। এই স্বল্প অস্ত্র এবং তার গ্রুপ নিয়ে মোল্লা ওমর আক্রমণ করলেন কমান্ডার ক্যাম্পে। মুজাহিদদের আচমকা আক্রমণে কমান্ডারদের কিছু পালিয়ে গেল আর বাকিদের মৃত্যু হলো। জালিমদের জন্য শিক্ষাস্বরূপ তাদের লাশ ক্যাম্পে ঝুলিয়ে রাখলো। বন্দি মেয়েদেরকে মুক্ত করে পরিবারের হাতে তুলে দিল। এরই মাধ্যমে যাত্রা হলো তালেবান নামক ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দেয়া মুজাহিদ বাহিনীর। দুনিয়া নতুন করে প্রত্যক্ষ করলো ন্যায়বিচারের সাহসী বাহিনীকে। যে বাহিনীর অপেক্ষায় সুদীর্ঘকালব্যাপী মজলুম জনতা প্রহর গুনছিল।
মোল্লা ওমর মুজাহিদের নেতৃত্বে এই সফল অভিযানের ঘটনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল, সাধারণ মানুষের চোখে পুনরায় আশার প্রদীপ জ্বেলে উঠল। মোলা ওমরের পাশে জড়ো হতে থাকলো সাহসী যুবকেরা, তারা আসছিল এবং দলে দলে তার সাথে যোগ দিচ্ছিল। দিনে দিন তালেবানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগলো। মোল্লা ওমর এবার কান্দাহার প্রশাসনকে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে আদেশ করলেন কেননা তারা সঠিকভাবে শাসন করতে ব্যার্থ হয়েছে, গোটা রাজ্যকে দুর্নীতির আখড়া বানিয়ে ছেড়েছে। কয়েকদিন পরই তালিবরা গোটা কান্দাহার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিল। প্রশাসনকে শরয়ী আইনের আদলে তালেবানরা ঢেলে সাজায়। মোল্লা ওমরের দৃষ্টি সমগ্র আফগানে নিবদ্ধ ছিল, নিছক কান্দাহারে সীমাবদ্ধ ছিলনা। তাই তালিবরা কান্দাহার পার করে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যায় আফগানের অন্যান্য ভূমির দিকে।
৯০ সালে রুশরা আফগান ছেড়ে যাওয়ার সময় তাদের পুতুল নাজিবুল্লাহকে রেখে যায়। যে ছিল আফগানের লাখ লাখ মানুষ হত্যাকারী। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত নাজিবুল্লাহ কাবুলে ক্ষমতাসীন থাকে। এরপর কাবুলের ক্ষমতায় আসলেন জামায়াত ইসলামীর আমীর বোরহানুদ্দিন রব্বানী। রব্বানীর নীতিহীন শাসনামলে সামাজিক অস্থিরতা ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যায়। রব্বানী সরকারের সেনাপ্রধান হন আহমাদ শাহ মাসুদ। যার সাথে পূর্ব থেকে দ্বন্দ্ব চলছিল হিজবের প্রধান গুলবুদ্দিন হেকমতিয়ারের সাথে। এর জের ধরেই ৯৩ সালে রব্বানী আর হেকমতিয়ার সরাসরি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এসব নেতারা ১৫ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আল্লাহর পক্ষ হতে অর্জিত বিজয়ের সঠিক মূল্যায়ন করতে ব্যর্থ হয়। তাদের এই গৃহযুদ্ধের ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় সাধারণ মানুষের। কিন্তু ৯৪ সালে কান্দাহার থেকে উঠে আসা তালিব ঝড় এই সব শত্রুকে এক করে দেয়।
তালিবরা ৯৫ সালের ভিতরে আফগানের প্রায় সবগুলো প্রধান অঞ্চল দখল করে নেয়। একে একে কুন্দুজ, গজনি, মাজার ই শরীফ, হেরাতসহ বড় শহরগুলো তালিবদের হস্তগত হয়। বিরোধীদের সকল প্রতিরোধ তালিবকে দমাতে চরমভাবে ব্যর্থ হলো। ইতিমধ্যে দখলকৃত অঞ্চলগুলোতে মোল্লা ওমরের সুদক্ষ শাসন সকলে অবলোকন করলো। ৯৬ সালের ৪ এপ্রিল আমীর নির্ধারনের জন্য কান্দাহারে বসে উলামাদের মজমা। তারা মোল্লা ওমরকে আমীরুল মুমিনীন ঘোষণা করে তার হাতে বাইয়াত দেন। এর কয়েকমাস পরই সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে তালিবরা বিজয়ী বেশে কাবুলে প্রবেশ করে। সূচনা হয় বিশ্বের বুকে আফগানে এক নতুন শাসনব্যবস্থা।
মোল্লা ওমরের নেতৃত্বে ইমারাতে ইসলামীর শাসনব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত হয় শরয়ী আইন দ্বারা। যা হয়েছিল ১৯২৪ সালে সর্বশেষ খিলাফত দেভলেত ই উসমানীয়্যাহর পতনের পর প্রথম বাস্তবিক ইসলামি শাসনব্যবস্থা। এই ইমারাতে ইসলাম সাধারণ মানুষকে তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছে, নৈরাজ্য দমন করেছে, সুবিচার দিয়েছে, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, ধর্ষণ, লুটতরাজ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে এনেছে উত্থিত হওয়া শরীয়াহর ব্যানারে। আফগান ছিল ড্রাগের জন্য বিখ্যাত। পুরো বিশ্বের ৯০ শতাংশ পপি ও ৭০ শতাংশ হিরোয়িন উৎপাদিত হতো আফগানে। দুই হাজার সালে আমীরুল মুমিনীন ঘোষণা দিলেন আফগানে আর কোন পপি চাষ হবে না। এই ঘোষণার এক বছরের মাথায় মাদকদ্রব্য পাচার ও চাষের হার ৭০ থেকে নেমে আসে ১ শতাংশে। তাক লাগিয়ে দিল সমগ্র বিশ্বকে। যা ছিল আধুনিক ইতিহাসে বে-নজির ঘটনা। শুধুমাত্র শরয়ী আইন অনুসরণ করার মাধ্যমে আমীরুল মুমিনীন এটা সম্ভবপর করে দেখিয়েছেন।
তালেবান শাসনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি গুড়িয়ে দেয়া। ইউনেস্কো এই বুদ্ধমূর্তিগুলোকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছিল। মোল্লা ওমর আলিমদের কাছে এবিষয়ে মতামত চান, তারা বললেন যে, মূর্তি ভেঙে ফেলা ওয়াজিব। সেমতে তিনি মূর্তি ভেঙে ফেলতে মনস্ত করলেন। মূর্তি ভাঙার বিপক্ষে পুরো বিশ্ব সোচ্ছার ছিল। তাদের আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ, এমনকি মুসলিম দেশসমূহ পর্যন্ত এই মূর্তি রক্ষা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল। জাপান সরকার বিপুল অর্থের বিনিময়ে মূর্তিটি কিনে নেয়ার আবদার করেছিল। বিশ্বের অনেক উলামায়ে কেরাম মূর্তি রক্ষার পক্ষে ফতওয়াও দিয়েছিলেন। কিন্তু এ সবের উত্তরে মোল্লা ওমর সুলতান মাহমুদ গজনভীর ভাষায় দৃপ্তকন্ঠে বলেছেন- ‘আমি মূর্তি ব্যবসায়ী হয়ে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে চাইনা। আমি মূর্তি সংহারক হিসেবে আল্লাহর সামনে হাজির হতে চাই।’
মুসলমানদের প্রতি মোল্লা উমর রহ. ছিলেন অনেক সদয় ও উদার। বিশেষ করে, আরব মুজাহিদীনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অপরিসীম। নাইন-ইলেভেন হামলার পর আমেরিকা যখন মহান মুজাহিদ মুজাদ্দিদে মিল্লাত ইমাম শহীদ শায়খ আবু আব্দিল্লাহ উ-সামা বিন মুহাম্মাদ বিন আওয়াদ রহ. কে তাদের নিকট হস্তান্তর করতে চাপ দেয়, এমনকি গোটা বিশ্বের উলামায়ে কেরাম আমীরুল মুমিনীনকে বুঝাতে চেষ্টা করেন যে, মাত্র একজন ব্যক্তির জন্য বহুল প্রতীক্ষিত এবং পৃথিবীর বুকে উদিত একমাত্র ইসলামী ইমারাতকে ধ্বংস হতে না দিয়ে বরং উসামাকে তাদের হাতে তুলে দেওয়াই উত্তম হবে।
জবাবে আমীরুল মুমিনীন যা বলেছিলেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি বলেছিলেন, “উসামা আমাদের মেহমান। তাঁকে শত্রুদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। এমনকি যদি হারামাইনের ভূমি থেকে একটি কুকুরও আমাদের নিকট আশ্রয় নিতো, তবুও আমরা তাকে তাদের নিকট হস্তান্তর করতাম না।” উলামায়ে কেরামকে তিনি বলেছিলেন, “আপনারা উসামাকে হস্তান্তরের জন্য একটি শরয়ী দলীল নিয়ে আসেন; তাহলে আমি তাঁকে হস্তান্তর করতে দ্বিধা করবো না।” তাঁর এই উত্তর শুনে উলামায়ে কেরাম লা-জওয়াব হয়ে গিয়েছিলেন। এবং তারা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন যে, আল্লাহর কসম! আল্লাহর কসম! ইনি এ যুগের মানুষ নন; বরং ইনি তো সাহাবায়ে কেরামের যামানার মানুষ।
উ- সামা রাহ. কে হস্তান্তর না করায় আমেরিকা আফগানিস্তানে ইতিহাসের সবচেয়ে ন্যাক্কারজনক ও বর্বরোচিত হামলা শুরু করে। ফলে ইসলামী ইমারাত এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। কিন্তু মোল্লা ওমর সামান্যতম বিচলিত হলেননা, পূর্বের মতো আবারো বিশ্ব শুনতে পেল দৃপ্তকন্ঠে তার অনমনীয় ঘোষণা- ‘বুশ আমাদেরকে পরাজয়ের অঙিকার করেছে, আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আমাদেরকে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমরা দেখে নিব কার অঙ্গিকার ও প্রতিশ্রুতি সত্যে পরিণত হয়।’ আজকে বিশ্ববাসীর কাছে দৃশ্যমান আদতে কে এই যুদ্ধে বিজয় হয়েছে। আমেরিকার সাথে তালিবের দীর্ঘ যুদ্ধ অবসান হওয়ার পূর্বেই ওমর আস-সালিস ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল মাসে মৃত্যুবরণ করেন। আল্লাহ তার উপর রহম করুন।
এই মর্দে মুমিন আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন। কিন্তু এ শিক্ষাই দিয়ে গেছেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে- সফলতা শুধুই আল্লাহর বিধান পুরা করার মাঝেই নিহিত। চাই পুরো দুনিয়া বিরোধী হোক! কিন্তু আল্লাহ সাথে থাকলে কোনো পরওয়া নেই। যদি উদ্দেশ্য হাসিলে মনযিল পর্যন্ত পৌঁছা যায়; তাহলে তো কামিয়াব। আর যদি মনযিলে পৌঁছার আগেই রাস্তায় প্রাণ আল্লাহর কাছে সঁপে দিতে হয়; তাহলেও কামিয়াব। আমীরুল মুমিনীন মোল্লা মুহাম্মাদ উমর আস-সালিস রহ. ছিলেন এ বিজয়ী উম্মাহর এক কিংবদন্তী মহানায়ক এবং ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এক সুদৃঢ় ঢাল। যিনি বাদশাহী ত্যাগ করেছেন; তবুও দ্বীনের পতাকাকে নিচু হতে দেননি।
পৃথিবীর বুকে দ্বীনের সূর্যকে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত করে আবারও প্রমাণ করেছিলেন যে, ইসলাম কখনো কারো অধীনতা বরদাশত করে না; বরং সর্বদা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতেই পছন্দ করে। বন্ধুত্ব এবং শত্রুতার ক্ষেত্রে অনুপম দৃষ্টান্ত মোল্লা মুহাম্মাদ উমর রহ. এর জীবনকে আজও স্মরণীয় ও অলংকৃত করে রেখেছে। মুমিনদের প্রতি তাঁর দায়িত্বশীলতা ও ভালোবাসা আর কুফরের প্রতি তাঁর কঠোরতা ও বিদ্বেষ ছিল সত্যিই বেনজির। তার রেখে যাওয়া আদর্শ কিয়ামত পর্যন্ত বেঁচে থাকবে। তিনি নিজের রক্ত দিয়ে বিজয়ের গল্প লিখে গিয়েছেন, তিনি কিংবদন্তীদের কিংবদন্তী এবং যারা অবমাননাকর সময়ে মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে চায় তাদের জন্য একজন অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: