নেশা, মাদক ও জুয়া বর্জনে ইসলামের শিক্ষা | জাহিদ হাসান

নেশা,-মাদক-ও-জুয়া-বর্জনে-ইসলামের-শিক্ষা

ইসলাম ইনসাফের ধর্ম, কল্যাণের ধর্ম। ইসলামে কখনো কোনো কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয়নি। মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর, এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ইসলামে এবং কোন কাজটি ক্ষতির কারণ সেটাও বলে দেওয়া হয়েছে। আজ আমরা আলোচনা করবো, নেশা-মাদক-জুয়া বর্জনে ইসলামের শিক্ষা কী। খালি চোখেই এই বিষয়গুলো নিয়ে আমরা বিরূপ ধারণা পোষণ করি। আজ কুরআন-হাদীসের আলোকে আমরা আলোচনা করবো।

নেশা ও মাদক বর্জনে ইসলামের শিক্ষা 

নেশা ও মাদক মানব সভ্যতার চরম শত্রু। এটা জীবন ও সম্ভাবনাকে নষ্ট করে, শান্তির পরিবারে অশান্তির আগুন প্রজ্জ্বলিত করে এবং সমাজে অনাচার ও অস্থিরতা সৃষ্টি করে। নেশা ও মাদক সভ্যতার চাকা পিছনের দিকে ঘুরিয়ে দেয়। তাই কল্যাণের ধর্ম ইসলামে নেশা ও মাদক সম্পূর্ণ হারাম।

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে:
“হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, পূজার বেদী ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন কর। যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো এ-ই চায় যে, মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করবে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখবে। সুতরাং, তোমরা কি নিবৃত্ত হচ্ছ।” (সূরা মায়িদাহ: ৯০-৯১)

এ আয়াতে মাদক সম্পর্কে চূড়ান্ত বিধান দেওয়া হয়েছে এবং একে ঘৃণ্য ও বর্জনীয় ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, একে উল্লেখ করা হয়েছে পূজার বেদীর সাথে।

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন,
‘যখন শরাব (মদ) হারাম করা হলো, তখন আল্লাহর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবীগণ একে অপরের কাছে গিয়ে বললেন, ‘শরাব হারাম হয়েছে এবং একে শিরকের মতো (মারাত্মক গুনাহ) সাব্যস্ত করা হয়েছে।’ (আত তারগীব ওয়াত তারহীব ৩/১৮০, হাদীস: ৩৫৭৬)

মদ হারাম হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যেসব পাত্রে মদ প্রস্তুত ও পরিবেশন করা হতো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেগুলো অন্য কাজের জন্যও ব্যবহার নিষেধ করেছেন। জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করতে যখন ইসলামের আবির্ভাব হয়, তখন আরব জাতি ছিল মদে আসক্ত, অতিথি আপ্যায়নসহ কোনো অনুষ্ঠান মদ পরিবেশন ছাড়া চিন্তাও করা হতো না। ঘরে ঘরে বিভিন্ন ধরনের মদ তৈরি হতো। এর ধারাবাহিকতায় সাহাবায়ে কেরামও (রা.) মদ পান করতেন।

এক অনুষ্ঠানে কিছু সাহাবা মদ পান করছিলেন, এক একজন এক এক অবস্থায় ছিলেন। কেউ খাচ্ছিলেন, কেউ ঢালছিলেন, কেউ ঠোঁটের সঙ্গে গ্লাসটি লাগাচ্ছেন। এমন সময় এক ঘোষণাকারী ঘোষণা করল, মদকে হারাম করে আয়াত নাজিল হয়েছে। অমনি যে যার অবস্থায় থেমে গেলেন। যিনি মুখে নিয়েছেন তিনি কুলির মতো করে ফেলে দিলেন, এক ঢোকও পান করলেন না। যিনি গ্লাস ঠোঁটে ছুঁইয়েছেন, তিনি তা নামিয়ে ফেললেন। যার যার ঘরে যত মদ ছিল, শুধু ওই একটি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে স্বেচ্ছায় সব মদ ছুড়ে ফেলে দেয়া হলো। মদিনার অলি-গলি এমনভাবে ভিজে গেল, যেন মদ বৃষ্টি হলো।

হাদীস শরীফের ঘোষণায় নেশা ও মাদক সম্পূর্ণরূপে হারাম, তা যে নামের হোক, আর যেভাবেই তা গ্রহণ করা হোক। ইরশাদ হয়েছে:
‘সকল নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্য হারাম’। [১]

ইবনে উমার হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি নাবীয়ে কারিম সালাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,
“সকল প্রকারের নেশা সৃষ্টিকারী দ্রব্যই হারাম।” (সহীহ ইবনে মাজাহ: ৩৩৮৭)

দায়লাম হিময়ারী (রা.) বলেন,
আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আরজ করলাম, ‘আল্লাহর রাসূল! আমরা এক ঠান্ডা দেশের অধিবাসী, আমাদেরকে কঠিন পরিশ্রমের কাজ করতে হয়, আমরা গম দ্বারা এক ধরনের পানীয় প্রস্ত্তত করে থাকি, যার দ্বারা আমরা কাজের শক্তি পাই ও শীতের মোকাবিলা করি।’ তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘সেটা কি নেশা সৃষ্টি করে?’ আমি বললাম, জী, হাঁ। তিনি বললেন, ‘তাহলে তা বর্জন কর।’ আমি বললাম, ‘লোকেরা তা বর্জন করতে প্রস্ত্তত হবে না।’ তিনি বললেন, ‘ত্যাগ না করলে তাদের সাথে লড়াই কর।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৩৬৮৩)

হযরত সা‘দ ইবনে আবী ওয়াককাস (রা.) থেকে বর্ণিত,
‘যে বস্ত্ত অধিক পরিমাণে গ্রহণ নেশা সৃষ্টি করে তা সামান্য পরিমাণে গ্রহণও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষিদ্ধ করেছেন’। (সুনানে নাসায়ী, হাদীস: ৫৬০৮, ৫৬০৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস: ৫৩৭০) [২] 

মাদকদ্রব্যের বেচাকেনা এবং এর সাথে যেকোনো পর্যায়ের সংশ্লিষ্টতা নিষিদ্ধ, আর তা আল্লাহর লা’নত ও অভিশাপের কারণ।
জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন,
“যখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় অবস্থান করছিলেন, তাঁকে বলতে শুনেছেন যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল শরাব বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছেন।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ২২৩৬, ৪২৯৬; সহীহ মুসলিম: ৪১৩২)

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে এক দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘খাম্র’ (শরাব) সম্পর্কে বলেছেন, ‘যিনি তা পান করা হারাম করেছেন, তা বিক্রি করাও হারাম করেছেন।’ (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৪১২৮)

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) বলেন,
“সূরা বাকারার শেষের দিকের (রিবা সংক্রান্ত) আয়াতসমূহ যখন নাযিল হলো, তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন এবং লোকদের সামনে তা তিলাওয়াত করলেন। এরপর শরাবের ব্যবসাও নিষিদ্ধ করলেন।” (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৪৫৯,২০৮৪,২২২৬,৪৫৪০-৪১,৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস: ৪১৩০, ৪১৩১)

হাদীসে আছে:
মাদকের উপর অভিশাপ; মাদক পানকারীর উপর অভিশাপ; পরিবেশনকারীর উপর অভিশাপ; বিক্রয়কারীর উপর অভিশাপ; ক্রয়কারীর উপর অভিশাপ; যে মাদক নিংড়ায় তার উপর অভিশাপ; যার আদেশে নিংড়ানো হয় তার উপর অভিশাপ; বহনকারীর উপর অভিশাপ; যার কাছে বহন করে নেওয়া হয় তার উপর অভিশাপ; আর যে মাদক বিক্রয়লব্ধ অর্থ ভোগ করে তার উপর অভিশাপ। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস: ৩৬৭৬; জামে তিরমিযী, হাদীস: ১২৯৫)

এককথায়, মাদক এমনই খবীছ বস্ত্ত যে, উৎপাদন, বিপণন, পরিবেশন ও গ্রহণের যেকোনো পর্যায়ে এর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অভিশাপের কারণ। আর এ তো বলাই বাহুল্য যে, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অভিশাপ যার উপর, তার জীবন কখনো শান্তির হতে পারে না।

মাদকের সাথে সংশ্লিষ্টতা তো নিষিদ্ধই, যে মজলিসে মদপান করা হয় ঐ মজলিসে উপস্থিত থাকাও নিষিদ্ধ।

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,
‘যে আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে, সে যেন ঐ দস্তরখানে না বসে যাতে মদ পান করা হয়।’ (দারিমী ২/১৫৩, হাদীস ২০৯২; মুসতাদরাকে হাকীম ৪/১৪৩ (৭০৭১)

ওমর ইবনে আব্দুল আযীয (রহ.) এর কাছে শরাব পানকারী কিছু লোককে হাজির করা হলো। তিনি তাদেরকে প্রহারের আদেশ দিলেন। বলা হলো, এদের মধ্যে একজন আছে, যে ‘সাইম’ (অর্থাৎ মজলিসে উপস্থিত থাকলেও সে মদ পান করেনি)। তিনি বললেন, ওকে দিয়েই শুরু কর। এরপর তার দিকে লক্ষ করে বললেন, তুমি কি কুরআনের এ আয়াত শোনোনি-
“তিনি তো কিতাবে তোমাদের প্রতি (এ বিধান) নাযিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছে এবং তার সাথে বিদ্রুপ করা হচ্ছে তখন তাদের সাথে বসবে না, যাবৎ না তারা অন্য প্রসঙ্গে লিপ্ত হয়। অন্যথায়, তোমরাও তাদের মতো গণ্য হবে।” (সূরা আন নিসা: ১৪০)

মাদক গ্রহণের পার্থিব ক্ষতি তো বলাই বাহুল্য; আমরা তা দেখছি ও শুনছি। আর আখিরাতে এর যে ভয়াবহ শাস্তি ভোগ করতে হবে সে সম্পর্কে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবধান করে গেছেন।

মাদক বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসংখ্য বাণী রয়েছে। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
‘মদ-আসক্ত ব্যক্তি জান্নাতে যাবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ৩৩৭৬)

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন,
“আমার উম্মতের একদল লোক মদ পান করবে, তারা মদকে অন্য পানীয়ের নামে নাম পরিবর্তন করে পান করবে। নেতাদের গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের মাধ্যমে সম্মান দেখানো হবে। যখন এ দিন আসবে তখন ভূমিধস, বানর, শূকরের মতো আকৃতি বিকৃতি হবে।” (বুখারি, ইবনে মাজাহ)

ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“শরাবপানে অভ্যস্তরূপে যে মারা যাবে, কিয়ামতের দিন সে একজন মূর্তিপূজকের ন্যায় আল্লাহর সম্মুখে দণ্ডায়মান হবে।”
আল্লাহপাক অঙ্গীকার করেছেন, যে মদ পান করবে তাকে ‘ত্বীনাতুল খাবাল’ অর্থাৎ জাহান্নামীদের দেহ থেকে বেরোনো ঘাম, রক্ত ও পুঁজ, যা জাহান্নামে জমা হবে তা পান করানো হবে। (মুসলিম)

মোটকথা, ইসলামে নেশা ও মাদক চরমভাবে ঘৃণিত ও বর্জনীয়। অথচ এ ঘৃণ্য ও বর্জনীয় বস্তুরই ব্যাপক বিস্তার ঘটছে ‘সভ্য’ যুগের মুসলিম-সমাজে। মাদকদ্রব্য মানুষের দৈহিক, মানসিক বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে। সেই সঙ্গে মাদকগ্রহীতা নেশার টাকা সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সমস্যা সৃষ্টি করে। ইসলাম কল্যাণ ও উপকারের ধর্ম। এ জন্য ইসলাম মাদক ও নেশাদ্রব্য গ্রহণকে হারাম করেছে।

আমাদের দেশে মাদকের বিরুদ্ধে যে ব্যবসা চলছে, এর সঙ্গে নৈতিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে, ইসলাম মাদকদ্রব্য হারাম করেছে তাই মাদককে সব স্তরে নিষিদ্ধ করতে হবে।

জুয়া বর্জনে ইসলামের শিক্ষা

নবীজির সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমলে দুই ব্যক্তি ঘোড়াদৌড়ের প্রতিযোগিতা লাগাত এবং পরস্পরে এ চুক্তিতে আবদ্ধ হতো, যে পরাজিত হবে সে বিজয়ী ব্যক্তিকে নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ প্রদান করবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একেও জুয়ার অন্তর্ভুক্ত করে হারাম ঘোষণা করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ)

হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জুয়া পরিহার করার প্রতি এত গুরুত্বারোপ করেছেন যে, শুধু জুয়াকেই হারাম করেননি; বরং জুয়ার ইচ্ছা প্রকাশকেও গোনাহ সাব্যস্ত করেছেন। যে ব্যক্তি অপরকে জুয়ার প্রতি আহ্বান করবে, তাকে তার এ গোনাহর প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে কিছু সদকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন:
‘যে ব্যক্তি অপরকে জুয়া খেলার প্রতি আহ্বান করবে, তার উচিত কিছু সদকা করে দেওয়া।’ (বুখারি, হাদিস: ৪৮৬০; মুসলিম, হাদিস: ১৬৪৭; তিরমিজি, হাদিস: ১৫৪৫; ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২০৯৬)

এ হাদিস থেকে এটাই প্রতীয়মান হয়, বাজি বা জুয়া ধরার কথা চিন্তা করাও গোনাহের মধ্যে পড়ে।

খেলা নিয়ে অনেকেই বাজি কিংবা জুয়ায় মেতে ওঠে! বিভিন্ন খেলাধুলার জয়-পরাজয়কে কেন্দ্র করে আমাদের দেশে অনেকেই বাজি ধরে। এ বাজির মাধ্যমে কারও কারও মনে আর্থিকভাবে কিছুটা লাভ করার লোভ জাগ্রত হয়। কিন্তু এ বাজি একধরনের জুয়া। আর ইসলামে বাজি কিংবা জুয়া সবই হারাম এবং নিষিদ্ধ।

আল্লাহ তায়ালা বলেন:
‘তারা আপনাকে (নবী) মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, ‘উভয়ের মধ্যেই রয়েছে মহাপাপ।’ (সূরা বাকারা: ২১৯)।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) সূরা বাকারার ২১৯নং আয়াতে বর্ণিত মাইসিরের ব্যাখ্যায় বলেন:
‘জাহেলি যুগে এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির সঙ্গে পরস্পরে স্বীয় অর্থসম্পদ এবং পরিবার-পরিজনকে বাজির উপকরণ হিসেবে পেশ করত। দুই ব্যক্তির যে অপরকে জুয়ার দ্বারা পরাজিত করত, সে অপরের ধনসম্পদ ও পরিবার-পরিজনকে নিয়ে যেত।’ (তফসির ইবনে জারীর তারাবী: ২/৩৫৮) ।

জুয়াকে আরবিতে ‘আল-কিমার’ ও আল-মায়সির’ বলা হয়। এমন খেলাকে ‘আল-কিমার’ ও আল-মায়সির’ বলা হয়, যা লাভ ও ক্ষতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকে। অর্থাৎ যার মধ্যে লাভ বা ক্ষতি কোনোটাই স্পষ্ট নয়।

ইসলামের আবির্ভাবের আগে ও নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের সময় তৎকালীন মক্কায় নানা ধরনের জুয়ার প্রচলন ছিল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবগুলোকে নিষিদ্ধ করেছেন।

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা মদ, জুয়া ও বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন।’ (বায়হাকি, হাদিস: ৪৫০৩)
আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান, জুয়ায় অংশগ্রহণকারী, খোঁটাদাতা ও মদ্যপায়ী জান্নাতে যাবে না।’ (দারেমি, হাদিস: ৩৬৫৩; মিশকাত, হাদিস: ৩৪৮৬)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত আছে,
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কায় এলেন, তখন কাবাঘরে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানান। কেননা, কাবা ঘরের ভেতরে মূর্তি ছিল। তিনি নির্দেশ দিলে মূর্তিগুলো বের করে ফেলা হয়। এক পর্যায়ে ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.)-এর প্রতিকৃতি বের করে আনা হয়। উভয় প্রতিকৃতির হাতে জুয়া খেলার তীর ছিল। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ! ধ্বংস করুন। আল্লাহর কসম! অবশ্যই তারা জানে যে, ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইল (আ.) তীর দিয়ে অংশ নির্ধারণের ভাগ্য পরীক্ষা কখনো করেননি। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাবাঘরে প্রবেশ করেন এবং ঘরের চারদিকে তাকবির বলেন। তবে ঘরের ভেতরে সালাত আদায় করেননি।” (বুখারি, হাদিস: ১৫০৩)

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন,
‘বলা হতো, উটের জুয়াড়িরা কোথায়? তখন দশজন প্রতিযোগী একত্রিত হতো এবং জুয়ার উটটির ক্রয়মূল্য হিসেবে দশটি উট শাবক নির্ধারণ করতো। তারা জুয়ার পাত্রে তীর স্থাপন করে সেটিকে চক্কর দেয়াতো, তাতে একজন বাদ পড়ে, নয়জন অবশিষ্ট থাকতো। এভাবে প্রতি চক্করে একজন করে বাদ পড়ে শেষে মাত্র একজন অবশিষ্ট থাকতো এবং সে বিজয়ী হিসেবে তার শাবকসহ অন্যদের নয়টি শাবকও লাভ করতো। এতে নয়জনের প্রত্যেকে একটি করে শাবক লোকসান হতো। এটাও এক প্রকার জুয়া।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নম্বর: ১২৭১)

আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বলেন,
‘তীর নিক্ষেপে বাজিধরা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।’ (ফাতহুল কাদির, হাদিস: ১২৭২)

ফুদাইল ইবনে মুসলিম (রহ.) তাঁর পিতার সূত্রে বর্ণনা করেন,
‘আলী (রা.) বাবুল কাসর থেকে বের হলে তিনি দাবা-পাশা খেলোয়াড়দের দেখতে পান। তিনি তাদের কাছে গিয়ে তাদের ভোর থেকে রাত পর্যন্ত আটক রাখেন। তাদের মধ্যে কতককে তিনি দুপুর পর্যন্ত আটক রাখেন। (বর্ণনাকারী বলেন, যারা অর্থের আদান-প্রদানের ভিত্তিতে খেলেছিল, তিনি তাদের রাত পর্যন্ত আটক রাখেন, আর যারা এমনি খেলেছিল তাদেরকে দুপুর পর্যন্ত আটক রাখেন।) তিনি নির্দেশ দিতেন, লোকজন যেন তাদের সালাম না দেয়।’ (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১২৮০)

জুয়া-বাজি থেকে প্রাপ্ত সবকিছু হারাম। সব ধরনের জুয়া-বাজি ইসলামে অবৈধ। হারাম ভোগ করে ইবাদত-বন্দেগি করলে, আল্লাহ তাআলা তা কবুল করেন না। তাই মুসলমান হিসেবে সব ধরনের জুয়া-বাজি থেকে দূরে থাকা আবশ্যক।

আমরা মুসলমান জাতি আজ নানা দিক থেকেই পথভ্রষ্ট হতে চলেছি। দেশে জুয়া খেলার কেন্দ্র আছে ভাবতেই অবাক লাগে। বাজির নামে এসব হারাম কাজ আমাদের জন্য খুবই লজ্জাজনক। আমাদের দেশের সাধারণ দর্শকরাও তাদের পছন্দের দলের পক্ষে বাজি লাগায়। এসব বাজি পারিবারিক ও সামাজিক অশান্তি সৃষ্টি করে। বাজিতে হেরে যাওয়া পক্ষ মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং হতাশাগ্রস্ত হয়ে আপনজনদের সঙ্গে বিরূপ আচরণ শুরু করে। বাজিতে হেরে যাওয়া পক্ষ অভাবগ্রস্ত হয়ে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। অনেক সময় ঝগড়া ও ফ্যাসাদ সংঘটিত হয়, এ বাজি ধরা নিয়ে। আর এসব ক্ষতির কারণে অনেকের সম্পর্কেও ভেঙে যায়। আর বাজিতে জিতে যাওয়া মানুষও লাভবান হয় না। কারণ এটি সম্পূর্ণরূপে হারাম ও মহাপাপ।

হারাম ও পাপ কাজ থেকে আল্লাহ আমাদের দুরে রাখুন, আমিন।

পাদটীকা :

[১] এটি একটি ‘মুতাওয়াতির’ হাদীস। মুহাদ্দিসগণের পরিভাষায়, মুতাওয়াতির ঐ সকল হাদীসকে বলে, যা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, যা এত সংখ্যক রাবীর সূত্রে বর্ণিত যে, এতে কোনো প্রকারের সন্দেহ-সংশয়ের অবকাশ থাকে না। বিখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, এ মর্মের হাদীস একত্রিশজন সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। (দ্র. ফতহুল বারী ৩/৭৩)

[২] এ মর্মের হাদীস হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) ও উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) থেকেও বর্ণিত হয়েছে। (সুনানে আবু দাউদ, ৩৬৮১; তিরমিযী, ১৮৬৫; ইবনে মাজা, ৩৩৯৩; আবু দাউদ ৩৬৮৭)

Facebook Comments