সংকলন
আত্মশুদ্ধি আব্দুল্লাহ বিন বশির

৯৯ কুফর ও এক ঈমান: ওলামায়ে দেওবন্দ কী বলে? | আব্দুল্লাহ বিন বশির

তাকফির। ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাশাপাশি একটি সংবেদনশীল অধ্যায়। কাজটি যেমন জরুরি আবার বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে পূর্ণ সতর্কতাও অত্যান্ত জরুরি। কারণ একজন মুমিনকে ইসলাম থেকে বের করে দেওয়া এক জঘন্যতম অন্যায়। আবার একজন কাফেরকে মুসলিম মনে করাও ইসলামকে ক্ষতি করার জন্য যথেষ্ট। মুফতি শফী রহ. বলেন, কোনো মুমিনকে কাফের বলা ভয়ংকর একটি অন্যায় কারণ এতে নিজের ঈমানকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলাহয়, তাতে ঈমানকে কুফর বলা আবশ্যক হয়। তদ্রুপ কোনো নিশ্চিত কাফেরকে মুমিন বলাও একটি সমপরিমাণ অন্যায় কারণ তাতেও কুফরকে ঈমান বলা আবশ্যক হয়। সুতরাং এটা স্পষ্ট, নিজের খেয়াল খুশিমতো কাউকে কাফের ও মুমিন বলা নিঃসন্দেহে বক্তার কুফরি প্রকাশ করে। যদি তা নাও হয়, তাহলে এহেন কাজ কুফরের ঝুঁকি থেকে মুক্ত নয়।-ঈমান আউর কুফর; কুরআন কি রোশনি ম্যে পৃ. ৬৬ (জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া ১/১০৫)।

তাকফিরের বিষয়টি সংবেদনশীল এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ওলামায়ে দেওবন্দ এবিষয়ে অনেক সতর্কতা অবলম্বন করেন৷ কিন্তু তা কখনোই এই নয় যে, তারা সতর্কতার নামে দ্বীনের তাহরিফ করেছেন বা কোনো বিষয়ের সঠিকতাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন।

কিন্তু ওলামায়ে দেওবন্দের সতর্কতার দোহায় দিয়ে তাকফিরের সতর্ক বিষয়কে আরো সংবেদনশীল ও একটি অস্পষ্টতা তৈরি করতে একটি ইবারত ও ফুকাহাদের একটি বক্তব্য খুব সামনে আনা হয়। এবং তা দিয়ে যে ব্যাখ্যা করা হয় তা বিবেকের বিচারেও কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য মনে হয় না।

ইবরাতটি হলো,

وفي الخلاصة وغيرها إذا كان في المسألة وجوه توجب التكفير ووجه واحد يمنع التكفير فعلى المفتي أن يميل إلى الوجه الذي يمنع التكفير تحسينا للظن بالمسلم زاد في البزازية إلا إذا صرح بإرادة موجب الكفر فلا ينفعه التأويل حينئذ

ইবনে নুজাইম রহ. খোলাসাতুল ফাতওয়া ও অন্য কয়েকটি ফাতাওয়ার কিতাব থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, যদি কোনো মাসআলায় অনেকগুলো দিক থাকে যা কুফরি আবশ্যক করে আর একটি দিক থাকে যা কুফরিকে আবশ্যক না করে তাহলে মুফতির জন্য আবশ্যক হলো সে একটি দিকের দিকে লক্ষ্য করেই ফতোয়া দেওয়া। তবে যদি ব্যক্তি কুফরির বিষয়টি স্পষ্ট করে দেয় তাহলে ভিন্ন।- আল বাহরুর রায়েক ৫/১৩৪

এই ইবারতটি পেশ করে একবার একজন সম্মানিত ব্যক্তি বেশ গরম হয়ে বলেছেন, ‘এরা ফিকহ ফতোয়া বুঝেনা, যেমনে তেমনে তাকফির করে। দেখো ফুকাহারা কি বলে। নিরানব্বই কুফর থাকে আর এক ইমান থাকে সেখানেও তাকফির করতে সতর্কতার কথা আছে। আর মাননীয়….অমুক নামাজ পড়ে। দ্বীনের কথা বলে তাকে কাফের বলে দিচ্ছে। কোনো ভয় নেই এদের? ’

যাইহোক, উক্ত কথাটি যে ফিকহের বিচারে গ্রহণযোগ্য না তা স্পষ্ট। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত অন্যভাবে লেখার ইচ্ছে করলেও পরবর্তীতে ভাবি যে, এই বিষয়ে ওলামায়ে দেওবন্দের অবস্থান কি, তা আগে সমাধান করতে হবে। তখন থেকে ওলামায়ে দেওবন্দের যে উদ্ধৃতিগুলো পেয়েছি তা পেশ করছি আশা করি এই বিষয়ে সকল অস্পষ্টতা দূর হয়ে যাবে।

১. ইমাম আনওয়ার শাহ কাশমিরী রহ. (মৃত্যু ১৩৫৩ হি.)

ইমাম আনওয়ার শাহ কাশমিরী রহ.-এর সহিহ বুখারীর দরসের বিখ্যাত সংকলন গ্রন্থ ‘ফয়জুল বারীতে” বলেন,

واعلم أن في كتب فقهنا أن من كان فيه تسع وتسعون وجها من الكفر، ووجه من الإسلام، فإنه لا يحكم عليه بالكفر، والتبس ذلك على بعض من لا دراية لهم في الفقه، فغلطوا في مراده. فزعموا أن أحدا لو أتى على أفعال الكفر عدد ما ذكرنا وأتى بفعل واحد من الإسلام، فإنه لا يكفر، وهو باطل، ليس فيه أدنى ريب وريبة، كيف وأن مسلما لو أتى بفعل من أفعال الكفر، فإنه يكفر، فكيف إذا كان جل أفعاله كفرا.

وإنما كانت مسألة الفقهاء في جنس الأقوال، فنقلوه في الأفعال، ومرادهم أن أحدا منهم لو قال كلمة، احتملت وجها من الإسلام، نحملها عليه، ولا نحملها على أوجه الكفر وإن كثرت، لأنا ما لم نتبين الحال، ولم ندر أنه أراد هذا الاحتمال، لا نحكم عليه بالكفر بتلك الكلمة المحتملة، ولا نبادر إلى الإكفار، أما إذا تبين غيه من رشده، وانفصل اللبن عن الرغوة، وحصحص الحق، وظهر الباطل، ولم يبق أمره كالأفواه، تنقل من بلد إلى بلد، بل أعلن بكفره على المنائر والمنابر، وسود به الصحائف والدفاتر، فإنه كافر مكفر بلا ريب، ولا يتأخر عن إكفاره إلا مصاب أو مجهول ولو كان معنى كلامهم ما فهموه، لما ساغ حكم الكفر على أحد أبد الدهر، ومن يعجز عن إخراج احتمال ضعيف. وهذا مسيلمة الكذاب، قد كان يشهد بنوبة سيدنا ونبينا محمد صلى الله عليه وسلم إلا أنه كان يحب أن يشترك معه في الأمر، فهل أنقذه ذلك من الكفر والضلال، فليتنبه العلماء لهذه الدقيقة، ولا يتأخروا في مثل هذه المحال، وليخش العزيز الجبار، فإنه شديد المحال

জেনে রাখুন, আমাদের ফিকহের কিতাবসমূহে আছে, ‘যে ব্যক্তির মধ্যে কুফরির ৯৯টি দিক আছে, আর ঈমানের ১টি দিক আছে, তার কাফের হওয়ার হুকুম দেওয়া হবে না।’

যাদের ফিকহের জ্ঞান নেই, তাদের কতকের নিকট উক্তিটি অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। ফলে মর্ম বুঝতে তারা ভুল করেছে। তারা মনে করেছে, কোনো ব্যক্তি যদি উল্লিখিত সংখ্যক কুফরি কর্ম করে, আর একটিমাত্র ইসলামের কর্ম করে, তাহলে সে কাফের হবে না।

তাদের এ ধারণা বাতিল। এতে সামান্যতম সংশয় ও সন্দেহ নেই। এমন ধারণা কীভাবে সঠিক হয় যখন বাস্তবতা হলো, কোনো মুসলমান একটিমাত্র কুফরি কাজ করলেও কাফের হয়ে যায়। এমতাবস্থায় কেমন পরিণতি হবে ঐ ব্যক্তির, যার অধিকাংশ কর্ম কুফরি!?

বস্তুত ফকিহগণের বিষয়টি ছিল কওল তথা বক্তব্য সংশ্লিষ্ট। কিন্তু তারা একে কর্মের ক্ষেত্রে স্থানান্তর করেছে। ফকিহগণের উদ্দেশ্য হলো, যদি কোনো ব্যক্তি এমন কোনো উক্তি করে, যা ইসলামের অনুকূল হওয়ার একটি সম্ভাবনা থাকে, আমরা তার সে অর্থ গ্রহণ করবো। উক্তিটি কুফরি হওয়ার অনেক সম্ভাবনা থাকলেও সে অর্থ গ্রহণ করবো না, যতক্ষণ না অবস্থা যাচাইপূর্বক জানবো যে, সে উক্ত সম্ভাবনা গ্রহণ করেছে। এই যাচাই করার পূর্বে তাড়াহুড়া করে তাকে কাফের বলব না।

তবে যখন কারো গোমরাহি তার হেদায়েত থেকে সুস্পষ্টরূপে পৃথক হয়ে যাবে, দুধ ফেনা থেকে আলাদা হবে, সত্য প্রতিভাত হবে, মিথ্যা প্রকাশ পাবে, তার বিষয়টি মুখের কথার মতো থাকবে না, এক দেশ থেকে অন্য দেশে স্থানান্তরিত হবে, বরং সে মিনার ও মিম্বরে তার কুফরের ঘোষণা করবে, কুফর লিখে লিখে কাগজ-পত্র ও খাতা-খতিয়ান কালো করবে, তাহলে সে নিঃসন্দেহে কাফের, এবং তাকে তাকফির করা হবে। তাকে কাফের বলা থেকে শুধু সে-ই পিছিয়ে থাকবে, যে মূর্খ অথবা সঠিক জানার ভানকারী।

ফকিহগণের উক্তির অর্থ যদি সেটাই হত যা এসকল মূর্খ লোকগুলো বুঝেছে, তাহলে কখনও কারো উপর কুফরের হুকুম আরোপিত হত না। কারণ, কে এমন আছে, যে (তার উক্তি বা কর্ম সঠিক হওয়ার) কোনো দুর্বল সম্ভাবনা দেখাতে অক্ষম হবে?

মুসাইলামাতুল কাজ্জাব সে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত স্বীকার করতো। তবে শুধু নবুওয়াতের কিছু বিষয়ে সে অংশীদারের দাবী করতো। তার এই নবুওয়াতের স্বীকার কি তাকে কাফের ও গোমরাহ হওয়া থেকে রক্ষা করতে পেরেছে? ওলামায়ে কেরাম এই সুক্ষ বিষয়ে সতর্ক থাকুন এইধরনের অসম্ভব বিষয়ের কারণে তাকফির করা থেকে বিরত থাকবেন না। আল্লাহকে ভয় করুন।-ফয়জুল বারী ৬/৪০৩

 

ad

২. হাকিমুল উম্মাত আশরাফ আলি থানভি রহ. (মৃত্যু ১৩৬২ হি.)

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. ‘নিরানব্বই কুফর ও এক ইমান’ এই সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন,

اس کا یہ مطلب نہیں کہ اگر ننانوے باتیں کفر کی موجب پائی جاویں تب بھی فتوی نہ دیں گے، ننانوے تو بہت ہوتی ہیں اگر ایک امر بھی موجب کفریقینی پا یا جاوے تب بھی فتوی دینگے، بلکہ مطلب یہ ہے کہ خوداس امر میں بہت سے احتمال میں بعض احتمالات پر تو وہ موجب کفر ہے اور وہ احتمالات ننانوے ہیں اور بعض احتمال پرو و موجب کفر نہیں اور وہ ایک ہے تو اس صورت میں اس امر کو محمول اسی احتمال پر کر ینگے جوموجب کفر نہیں اور تکفیر سے احتیاط کریں گے۔

এই কথার এই অর্থ নয় যে, নিরাব্বই কথা এমন বললো যেগুলোর দ্বারা কুফর আবশ্যক হয় তখনো তাকে কাফের আখ্যা দেওয়া হবে না। নিরাব্বই তো অনেক দূরের বিষয়, যদি কোনো ব্যক্তি থেকে একটি বিষয়ও এমন প্রকাশ পায় যার দ্বারা নিশ্চিতরূপে স্পষ্ট হয় যে, সে কুফরি কথাই বলেছে তাহলেও তাকে তাকফির করা হবে। এই কথার (নিরানব্বই কুফর ও এক ইমান) অর্থ হলো যে নির্দিষ্ট একটি কাজ বা কথা যা ব্যক্তি থেকে প্রকাশ পেয়েছে সে কথা বা কাজটির অনেকগুলো সম্ভবনা আছে যা কুফরকে আবশ্যক করে যদিও তা নিরাব্বইটি হোক, আর অন্যান্য কিছু সম্ভবনা যা কুফরকে আবশ্যক করছে না চাই তা একটিই হোক, ঐ অবস্থায় ব্যক্তিকে কাফের আখ্যায়িত করা হবে না। বরং সতর্কতা অবলম্বন করা হবে।-ইমদাদুল ফাতাওয়া ১০/৯১ (শাব্বির আহমদ কাসেমীর তাহকিককৃত নুসখা)

 

৩. মাওলানা ইদরীস কান্ধলবী রহ. (মৃত্যু ১৩৯৪ হি.)

শাইখুল হাদিস ওয়াত তাফসির মাওলানা ইদরীস কান্ধলবী রহ. বলেন,

ایک شبہ اور اس کا جواب

علماء میں مشہور ہے کہ جس میں ۹۹ ہیں کفر کی ہوں اور ایک وجہ ایمان کی ہوتو اس کی تکفیر نہ کی جائے ۔سو جاننا چاہئے کہ اس کلام کا یہ مطلب ہرگز نہیں کہ جو شخص اسلام اور دین کی ۹۹ باتوں کا منکر اور مکذب ہو اور ایک بات دین کی مانتا ہو اس کو کافر نہ کہا جائے یہ سراسر غلط اور مہمل ہے ۔ کیونکہ اس معنی پر تو یہود اور نصاری کو بھی کافر کہنا جائز نہ رہے گا۔ کیونکہ یہود اور نصاری کم از کم ۵۰ فیصدی اسلام کی باتوں کو مانتے ہیں بلکہ دنیا میں کوئی کافر ایسا نہیں کہ جو اسلام کی تمام باتوں کا منکر ہو۔ علماء کے اس قول کا مطلب یہ ہے کہ کسی شخص نے کوئی مجمل اور محتمل کلمہ کفر زبان سے نکالا جس کے معنی میں 99 احتمال کفر کے ہیں اور ایک احتمال ایمان کا بھی ہے تو ایسے محتمل اور مشتبہ قول کی بنا پر اس کی تکفیر نہیں کی جائے گی اور یہ مطلب نہیں کہ اگر کوئی شخص شریعت کے تین سوحکموں کو مانتا ہے اور صرف تین حکموں کو نہیں مانتا مثلا زنا کاری اور شراب خواری اور رشوت ستانی کو حلال سمجھتا ہے تو کیا یہ شخص کافر نہ ہوگا، کیونکہ سو میں ننانوے کا قائل ہے اور صرف ایک حکم کا منکر ہے۔ جو شخص حکومت وقت کے ۹۹ قوانین کو مانتا ہو اور سو میں سے صرف ایک علم کو نا قابل عمل قرار دیتا ہوتو حکومت کے نزدیک ایسا شخص باغی ہے اور تختہ دار یا حبس دوام کا مستحق ہے حالانکہ یہ شخص حکومت کے ۱۹۹ حکام کو مانتا ہے صرف ایک حکم نہیں مانتا اور اس کے خلاف تقریر یں کرتا ہے۔

একটি সংশয় ও তার জবাব : আলিমগনের মধ্যে এমন একটি কথা প্রসিদ্ধ আছে, যে ব্যক্তি শতকরা ৯৯ ভাগ কুফরিতে লিপ্ত এবং মাত্র একভাগ ঈমান পোষন করে, তাকে কাফির বলা যাবেনা; কিন্তু এটা জানা উচিত, এর অর্থ এই নয়—যে ব্যক্তি দ্বীনের ৯৯টি কথাকে অস্বীকার করে ও মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং দ্বীনের একটি মাত্র কথাকে স্বীকার করে, তাকে কাফির বলা যাবেনা। এটা চরম ভুল। কেননা, এ কথার ভিত্তিতে তো ইহুদি ও খ্রিস্টানদেরও কাফির বলা যাবেনা। কারণ, ইহুদি ও খ্রিস্টানরা ইসলামের কমপক্ষে ৫০ ভাগ কথাকে মানে। ইসলামের সব কথাকে অস্বীকার করে, এমন কোনো কাফের দুনিয়াতে নেই। আলিমগণের এই বক্তব্যের অর্থ হলো, অস্পষ্ট ও সংশয়পূর্ণ কোনো কথা কেউ যদি মুখ থেকে বের করে ফেলে, যে কথার মধ্যে ৯৯ ভাগ কুফরির সম্ভবনা থাকে এবং একভাগ ঈমানের সম্ভবনা থাকে, তাহলে এহেন সংশয় ও সন্দেহমূলক কথার উপর ভিত্তি করে তাকে কাফির বলা যাবেনা; কিন্তু তাদের কথার এই অর্থ নয় যে, যদি কোনো ব্যক্তি শরীয়তের ৯৯ শতাংশ হুকুম মানে, কেবল এক শতাংশ কথা না মানে, যেমন : ব্যভিচার করা মদ্যপান করা ও ঘুষ খাওয়ায়েকে হালাল মনে করে, তবে সে কি কাফের হবে না? সে তো কেবল তিনটি হুকুমই অমান্য করেছে; আর বাকি সব হুকুমই তো মান্য করেছে। যে ব্যক্তি রাষ্ট্রের ১০০টি আইনের মধ্যে ৯৯টিই মানে, কেবল একটি আইন মানে না, সে ব্যক্তি প্রসাশনের নিকট বিদ্রোহী বলে বিবেচিত হবে এবং ফাঁসি বা যাভজ্জীবন কারাদণ্ড তার জন্য অবধারিত; অথচ সে ৯৯টি আইন মান্য করে কেবল একটি আইনের বিরোধিতার কারণে তাকে এই শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। -আকায়েদুল ইসলাম ১৯১ পৃ.

৪. মুফতিয়ে আজম শফী রহ. (মৃত্যু ১৩৯৬ হি.)

মুফতি শফী রহ. ‘ইমান আউর কুফর; কুরআন কি রোশনি ম্যে’ একটি পুস্তিকা রচনা করেন। সেখানে ফুকাহাদের সে প্রসিদ্ধ বক্তব্য বক্তব্য থেকে যে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করা হয় তা স্পষ্ট করেন।

প্রথমে তিনি ফুকাহাদের সে প্রসিদ্ধ ইবারতটি উল্লেখ করেন,

‌إذا ‌كان ‌في ‌المسألة ‌وجوه توجب الكفر، ووجه واحد يمنع، فعلى المفتي أن يميل إلى ذلك الوجه كذا في الخلاصة في البزازية إلا إذا صرح بإرادة توجب الكفر، فلا ينفعه التأويل حينئذ

যদি মাসআলায় কুফর সাব্যস্তকারী কয়েকটি দিক থাকে, আর কুফর প্রতিহতকারী ১টি দিক থাকে, তাহলে মুফতির জন্য জরুরি হলো ঐদিকটির প্রতি ধাবিত হওয়া। তবে যদি উক্তিকারী কুফর সাব্যস্তকারী দিকটির উদ্দেশ্য হওয়ার কথা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে, ব্যাখ্যা করা দ্বারা কোনো লাভ হবেনা।-ফাতাওয়া হিন্দিয়া ২/২৮৩

অতপর এই ইবারত উল্লেখ করে মুফতি শফী রহ. বলেন,

تنبیہ: یہ معلوم ہونا چاہۓ کہ فقہاءکے اس کلام کے یہ معنے نہيں، جو بعض جہلاء نے سمجھے ہیں کہ کسی شخص کے عقائد و اقوال میں ایک عقیدہ و قول بھی ایمان کا ہو، تو اس کو مومن سمجھو، کيوکہ یہ معنے ہو تو پھر دنیا میں کوئی کافر حتی کہ شیطان ابلیس بھی کافر نہیں رہتا، کیونکہ ہر کافر کا کوئی نہ کوئی عقیدہ اور قول تو ضرورہي ایمان کےموافق ہوتا ہے، بلکہ مقصد حضرت فقہاء کا یہ ہے کہ کسی شخص کی زبان سے نکلا ہوا کوئی کلمہ جو لغت و عرف کے اعتبار سے مختلف معانی پر محمول ہو سکتا ہے ،جن میں ایک معنے کے اعتبار سے یہ کلمہ کفریہ سے نکال جاتا ہیں، اور دوسرے تمام معانی اس کو عقیدہ کفریہ ٹھرا تے ہیں ، تو ایسی حالت میں مفتی پر لازم ہے کہ اس کے کلام کو صحیح معنے پر محمول کر کے اس کو مومن ہی قرار دے، بشرطیہ کہ وہ خود ایسی تصریح نہ کردے کہ اس کی مراد معنی کفری ہیں ،

“সতর্কীকরণ : জানা উচিত, মহান ফকিহগণের এ বক্তব্যের মর্ম কতক মূর্খ বুঝেছে, কোনো ব্যক্তির আকিদা ও উক্তিতে একটি আকিদা ও উক্তিও যদি ঈমানের অনূকুলে থাকে, তাকে ইমানদার মনে করতে হবে। তাদের এ বুঝ সঠিক নয়। কারণ, তা উদ্দেশ্য হলে পৃথিবীতে কোনো কাফের এমনকি ইবলিস শয়তানও কাফের থাকবে না। কেননা প্রত্যেক কাফেরের কোনো না কোনো উক্তি ও আকিদা তো ঈমানের অনুকূলে অবশ্যই থাকে। বরং ফকিহগণের উদ্দেশ্য হলো, কোনো ব্যক্তির মুখ থেকে যদি এমন কোনো শব্দ নিঃসৃত, ভাষায় ও মানুষের ব্যবহারে যার বিভিন্ন অর্থ হওয়ার সম্ভবনা থাকে, যেগুলোর একটি গ্রহণ করলে শব্দটি কুফরি আকিদা থেকে বের হয়ে যায়, অন্য অর্থগুলো গ্রহণ করলে তা কুফরি আকিদা বলে বিবেচিত হয়, তাহলে মুফতি সাহেবের জন্য তার বক্তব্যের সঠিক অর্থ গ্রহণ করে তাকে ঈমানদার গণ্য করা আবশ্যক। অবশ্য সে নিজেই যদি স্পষ্ট করে বলে যে, কুফরি অর্থই তার উদ্দেশ্য, তাহলে ভিন্ন কথা।’’-) ঈমান আউর কুফর; কুরআন কি রোশনি ম্যে পৃ. ৬৫ (জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া ১/১০৩)। (১)

সবিশেষ তাকফির বিষয়ে সতর্কতা ওলামায়ে আহলুস সুন্নাহ কেমন ছিলো তার একটি ছোট্ট উদাহরণ দেই। ইবনে নুজাইম রহ.-এর পরিচয় কোনো তালেবে ইলম বা আহলে ইলমকে দেওয়ার মত কিছু নেই। মহান এই হানাফী ফকিহ তার জগত বিখ্যাত কিতাব ‘আল-বাহরুর রায়েক’-এর আহকামুল মুরতাদ অংশ একজন মানুষ কি কি কাজ কথা ও আকিদা রাখলে কাফের হয়ে যাবে তা বিস্তারিত উল্লেখ করে অত:পর ফিকহের এই উচ্চ যোগ্যতা সম্পন্ন মহান ফকিহ সতর্কতার জন্য লেখেন,

ولقد ألزمت نفسي أن لا أفتي بشيء منها

আমি নিজের উপর আবশ্যক করে নিলাম আমি কখনোই কাউকে তাকফিরের ফতোয়া দিবোনা।-আল-বাহরুর রায়েক ৫/১৩৫

 

টিকা:

১] পুস্তিকাটির চমৎকার অনুবাদ করেছেন উস্তাদে মুহতারাম মাওলানা সফিউল্লাহ ফুয়াদ দা.বা.। ‘ইমান কুফর ও তাকফির’ এই নামে বইটি প্রকাশিত হয়েছে সওগাত প্রকাশন থেকে।

Facebook Comments

Related posts

সূফীদের সংগ্রামী জীবন (পর্ব-১) |

সংকলন টিম

সালাফে-সালেহীনের ইবাদতময় জীবন (পর্ব-৩) | ইজহারুল ইসলাম

সংকলন টিম

সুবাস জড়ানো অলিন্দে | আহমাদ সাব্বির

সংকলন টিম

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
%d bloggers like this: