আত্মশুদ্ধি

সূফীদের সংগ্রামী জীবন (পর্ব-৪) | ইজহারুল ইসলাম

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

দ্বিতীয় হিজরী শতকের অন্যতম সূফী ছিলেন ইমাম মালিক ইবনে দিনার রহ। ত্বরীকত ও তাসাউফের শীর্ষস্থানীয় ইমাম ছিলেন তিনি। কুনুজুল আউলিয়া গ্রন্থকার বর্ণনা করেন, মালিক ইবনে দিনার রহ. দীর্ঘ দিন যাবৎ যুদ্ধে অংশ গ্রহণের অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান ছিলেন। পরবর্তীতে যুদ্দের উদ্দেশ্যে মুসলিম সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি ঘোড়ার পিঠে আরোহণের মতো শক্তি তার ছিলো না। লোকেরা তাকে একটি তাবুতে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি কান্না শুরু করেন। নিজেকে ভর্সৎসনা করে বলতে থাকেন, আমার শরীরে কল্যাণকর কিছু থাকলে আজ আমি জ্বরে আক্রান্ত হতাম না…।

মালিক ইবনে দিনার রহ. এর বিখ্যাত উক্তি

১. মানুষের অন্তরে দুনিয়ার ভালোবাসা প্রবল হলে ওয়াজ-নসীহত কোন ফল দেয় না।

২. কারও নিকৃষ্ট হওয়ার জন্য এটুকু যথেষ্ট যে, সে নিজে নেককার নয় আবার নেককারদের সমালোচনায় লিপ্ত।

দ্বিতীয় হিজরী শতকের মধ্যবর্তী সময়ের বিখ্যাত বুজুর্গ হলেন, উতবা আল-গোলাম রহ.। তিনি অধিক ইবাদত, কান্নাকাটির জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। আল্লাহর ভয় ও তাকওয়ার দিক থেকে তাঁকে হাসান বসরী রহ. এর সঙ্গে তুলনা করা হতো।

হিলয়াতুল আউলিয়াতে ইমাম আবু নুয়াইম ইস্পাহানী রহ. বর্ণনা করেন, ইমাম উতবা বলেন, আমার জন্য এমন একটি ঘোড়া ক্রয় করো, যেটা দেখে মুশরিকরা হিংসায় জ্বলতে থাকবে। তিনি শামের বিভিন্ন অঞ্চলে জিহাদে অংশগ্রহণ করেন।

উতবা রহ. এর সঙ্গে যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছেন বিখ্যাত বুজুর্গ আব্দুল ওয়াহিদ ইবনে যায়েদ। [হিলয়াতুল আউলিয়া, খ.৬, পৃ.১৬০, ১৬২]

আব্দুল ওয়াহিদ বিন যায়েদ রহ. এর বিখ্যাত উক্তি রয়েছে,

لكل طريق مختصر و مختصر طريق الجنة الجهاد

অর্থ: প্রত্যেক রাস্তার শর্টকাট (সংক্ষিপ্ত রাস্তা) থাকে। জান্নাতে যাওয়ার সংক্ষিপ্ত রাস্তা হলো জিহাদ

[হিলয়াতুল আউলিয়া, খ.৬, পৃ.১৫৭]

ইব্রাহীম ইবনে আদহাম রহ. [মৃত:১৬২ হি:]

============

দুনিয়ার সকল ঐশ্বর্য পায়ে দলে যিনি আল্লাহর পথিক হয়েছিলেন। রাজ সিংহাসন পরিত্যাগ করে যিনি দরবেশী গ্রহণ করেন। ইতিহাসের সেই অমর ব্যক্তিত্ব ইব্রাহীম ইবনে আদহাম রহ. শুধু বুজুর্গই ছিলেন না, আল্লাহর পথের অকুতোভয় মুজাহিদও ছিলেন।

ইমাম ইবনে আসাকির রহ. তার সম্পর্কে লিখেছেন, “তিনি একজন দু:সাহসী ঘোড়সওয়ার ও অকুতোভয় বীর যোদ্ধা ছিলেন। ”

[তাহজিবু তারিখি দিমাশক, খ.২, পৃ.১৭৯]

তিনি বাইজেন্টাইনে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

তার খোদাভীতি ও জুহদ সম্পর্কে প্রশংসা করেছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ., ইমাম আওজায়ী, ইমাম সুফিয়ান সাউরী, ইমাম নাসায়ীসহ অন্যান্য ইমামগণ।

ইমাম ইবনে হিব্বান রহ. বলেন,

“ইব্রাহীম ইবনে আদহাম রহ. বলখে জন্মগ্রহণ করেন। এরপরও তিনি হালাল রুজির জন্য শামের উদ্দেশ্যে সফর করেন। সেখানে তিনি আল্লাহর পথে যুদ্ধ ও পাহারায় অংশ গ্রহণ করতে থাকেন। সীমাহীন তাকওয়া, খোদাভীতি ও মোজাহাদা ছিলো তার আমৃত্যু ভূষণ। ”

ইমাম ইবনে কাসীর রহ. ও ইয়াকুত হামাবী তার ইন্তেকাল সম্পর্কে বলেন,

১৬২ হিজরীতে পারস্য সাগরের একটি দ্বীপে তিনি কাফেরদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। বিনিদ্র রজনী আল্লাহর রাস্তায় পাহারা দিতে থাকেন। কাফেরদের উদ্দেশ্য তীর উদ্যত অবস্থায় যুদ্ধের ময়দানে তিনি ইন্তেকাল করেন।

[আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খ.১০, পৃ.১৪৫, মু’জামুল বুলদান]

শাক্কীক বালখী রহ. [মৃত:১৯৪ হি:]

=========

বিখ্যাত সুফী শাক্কীক বালখী রহ. এর অমূল্য নসীহত তাসাউফের ভান্ডার সমৃদ্ধ করেছে। তাসাউফের বিখ্যাত এই ইমাম একজন বীর যোদ্ধাও ছিলেন। তাকওয়া, যুহদ ও মোজাহাদায় নিমগ্ন এই বুজুর্গ যুদ্ধের ময়দানে ছিলেন ইস্পাত কঠিন।

وروى محمد بن عمران ، عن حاتم الأصم قال : كنا مع شقيق ونحن مصافو العدو الترك ، في يوم لا أرى إلا رءوسا تندر وسيوفا تقطع ، ورماحا تقصف ، فقال لي : كيف ترى نفسك ، هي مثل ليلة عرسك ؟ قلت : لا والله ، قال : لكني أرى نفسي كذلك

তার শিষ্য হাতেম আল-আসম বর্ণনা করেন, “আমরা শাক্কীক বলখী রহ. এর সাথে একই কাতারে তুর্কিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিলাম। দিনটি ছিল ভয়াবহ। চারদিকে কর্তিত মস্তক, উড়ন্ত তীর আর তলোয়ার ভাঙার শব্দ। শাক্কীক বলখী রহ. আামাকে বললেন, হে হাতেম, এই দিনে তোমার অনুভূতি কী? আজকের দিনের অনুভূতি কি তোমার বাসর রাতের অনুভূতির মতো? হাতেম বললেন, আল্লাহর শপথ, না। শাক্কীক বলখী রহ. বললেন, আল্লাহর শপথ, আমার আজকের অনুভূতি ও আনন্দ বাসর রাতের মতোই।

[সিয়ারু আ’লামিন নুবালা]

তিনি ১৯৪ হি: সনে কুমলানের যুদ্ধে ইন্তেকাল করেন।

[সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, খ.৬, পৃ.৩১৩, তাহজীবু ইবনে আসাকির, খ.৬, পৃ.৩৩৫, হিলয়াতুল আউলিয়া, খ.৮, পৃ.৬৪]

সূফীদের সংগ্রামী জীবন (পর্ব-২)

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: