সূফীদের সংগ্রামী জীবন (পর্ব-৩) | ইজহারুল ইসলাম

সূফীদের-সংগ্রামী-জীবন

দ্বিতীয় হিজরী শতকের সূফীগণ

দ্বিতীয় হিজরী শতকের বিখ্যাত দুই বুজুর্গ, আবিদ ও জাহিদ হলেন, মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি ও মালিক ইবনে দিনার। তারা উভয়ে তাসাউফের বড় ইমাম ছিলেন। হাসান বসরী রহ. এর সংশ্রবে ধন্য হোন। জুহদ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে তাদের প্রসিদ্ধি আকাশচুম্বী।

মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি

ইমাম যাহাবী রহ. সিয়ারু আ’লামিন নুবালাতে মুহাম্মাদ ওয়াসি (মৃত:১২৩ হি:) এর পরিচয় দিয়েছেন এভাবে,

الإمام الرباني القدوة

অর্থ: আমাদের অনুসরণীয় আদর্শ আল্লাহ ওয়ালা বুজুর্গ ইমাম।

ইমাম মু’তামির তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন

ما رأيت أحدا قط أخشع من محمد بن واسع

অর্থ: আমি মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি এর চেয়ে খোদাভীরু কাউকে কখনও দেখিনি।

[সিয়ারু আ’লামিন নুবালা]

জা’ফর ইবনে সুলাইমান বলেন,

كنت إذا وجدت من قلب قسوة غدوت فنظرت إلى وجه محمد بن واسع كان كأنه ثكلى

অর্থ: যখনই আমি আমার কঠিন হয়ে যেত, আমি মুহাম্মাদ ইবনে ওয়াসি এর কাছে চলে যেতাম। এবং তার চেহারা দর্শন করতাম। এটাই যেন আমার কঠিন হৃদয়ের উপশম ।

[সিয়ারু আ’লামিন নুবালা]

হাম্মাদ ইবনে জায়েদ বলেন,

قال رجل لمحمد بن واسع اوصيني قال اوصيك أن تكون ملكا في الدنيا والآخرة قال كيف قال ازهد في الدنيا

অর্থ: এক ব্যক্তি মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি’কে বলল, আমাকে কিছু ওসীয়ত করুন। তিনি বললেন, আমি তোমাকে দুনিয়া ও আখিরাতের বাদশাহ হওয়ার অসিয়ত করছি। সে বলল, কীভাবে? তিনি বললেন, দুনিয়ার লোভ-লালসা ত্যাগ করে পরকালমুখী হও (জাহিদ হও)।

[সিয়ারু আ’লামিন নুবালা]

খুরাসানের আমির ও বিখ্যাত ইসলামী বীর সেনানী কুতাইবা ইবনে মুসলিম আল-বাহিলী (মৃত: ৯৬ হি:) মধ্য এশিয়া বিজয় করে ইসলামী শাসনাধীন করেন। তিনি প্রথম হিজরী শতকেই আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরান, চীনের কাশগর ও শিনজিয়াং অঞ্চলে ইসলামী পতাকা উড্ডীন করেন। বোখারা-সমরকন্দ, খাওয়ারিজম ও কাশগরের বিজেতা হিসেবে তিনি প্রসিদ্ধ।

বিখ্যাত বুজুর্গ মুহাম্মাদ ওয়াসি কুতাইবা ইবনে মুসলিমের সাথে বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন। খুরাসান ও মধ্য এশিয়ার যুদ্ধগুলোতে তিনি কুতাইবা ইবনে মুসলিমের সেনাবাহিনীতে ছিলেন।

ইমাম ইসমায়ী বলেন,

قال الاصمعي لما صاف قتيبة بن مسلم للترك وهاله أمرهم سأل عن محمد بن واسع فقيل هو ذاك في الميمنة جامح على قوسه يبصبص بأصبعه نحو السماء قال تلك الاصبع أحب الي من مئة ألف سيف شهير وشاب طرير

অর্থ:

কুতাইবা ইবনে মুসলিম যখন তুর্কীদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে সারিবদ্ধ করলেন, তুর্কিদের ব্যাপারে তার মনে সামান্য ভয়ের সঞ্চার হল। তিনি মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তাকে বলা হল, ওই তো সে ডান দিকে ধনুকের উপর ভর করে বসে আছে। আসমানের দিকে হাত উঠিয়ে আঙ্গুল নাড়ছে (দুয়া করছে) । কুতাইবা বললেন, তার এই আঙ্গুলগুলি আমার কাছে এক লাখ প্রসিদ্ধ তরবারী ও এক লাখ বীর যোদ্ধা থেকে অধিক প্রিয়।

[সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, হিলয়াতুল আউলিয়া, খ.২, পৃ.৩৫৩]

ইবনে ওয়াসি রহ. খুব কম হাদীস বর্ণনা করতেন। অধিকাংশ সময় চুপ থাকতেন। তাকে আবদাল হিসেবে গণ্য করা হয়। [আজ-জুহদ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ, পৃ.৩০৭]

তার বেশ-ভূসা খুবই সাধারণ ছিলো । পশমের কাপড় পড়তেন। গভর্ণর মালিক ইবনুল মুনজির তাকে বিচারকের পদ গ্রহণের নির্দেশ করে। তিনি এটি গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন। গভর্ণর তাকে ডেকে পাঠান। এবং বলেন, তুমি বিচারকের পদ গ্রহণ করো, নতুবা তোমাকে তিন শ বেত্রাঘাত করবো। তিনি বললেন,

إن تفعل فإنك مسلط وإن ذليل الدنيا خير من ذليل الآخرة

অর্থ: আপনি যদি বেত্রাঘাত করতে চান, সে ক্ষমতা আপনার আছে। তবে দুনিযার লাঞ্ছনা পরকালের লাঞ্ছনা থেকে অধিক উত্তম।

[সিয়ারু আ’লামিন নুবালা]

ইমাম ইবনে উয়াইনা রহ. বলনে,

قال ابن واسع لو كان للذنوب ريح ما جلس إلي أحد

অর্থ: ইবনে ওয়াসে রহ. বলেন, গোনাহের যদি দুর্গন্ধ থাকত, তাহলে কারও পাশে বসা যেত না।

[সিয়ারু আ’লামিন নুবালা]

সূফীদের সংগ্রামী জীবন (পর্ব-২)

সূফীদের সংগ্রামী জীবন (পর্ব-৪)

Facebook Comments