আত্মশুদ্ধি

সূফীদের সংগ্রামী জীবন (পর্ব-২) | ইজহারুল ইসলাম

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

আলকমা ইবনে মারসাদ রহ. (মৃত:১২০ হি:) বলেন,

আটজন তাবেয়ীর মাঝে জুহদ (দুনিয়া বিমুখতা) সবচেয়ে বেশি ছিল। তারা হলেন,

১. আমের বিন আব্দুল্লাহ রহ.।

২.উয়াইস কারনী রহ.।

৩.হারাম ইবনে হাইয়্যান।

৪. রবী ইবনে খাইসাম।

৫.আবু মুসলিম খাওলানী রহ.।

৬.আসওয়াদ ইবনে ইয়াজীদ রহ.।

৭.মাসরুক ইবনে আজদা রহ.।

৮.হাসান বসরী রহ.।

[জুহদুস সামানিয়া মিনাত তাবেয়ীন, রিয়াতু ইবনে আবি হাতিম, তাহকীক, আব্দুর রহমান ফারতুয়ানী]

এই আটজনকে তাজকিয়া, জুহদ ও তাসাউফের ইমাম ও শিরোমণি মনে করা হয়। গবেষক আলেমগণ বলেছেন, এদের হাতেই মূলত: জুহদ ও তাসাউফ বিকশিত হয়। এজন্যই তাসাউফ ও জুহদের উপর লিখিত অধিকাংশ কিতাবে তাদের জীবন ও কর্ম আলোচিত হয়েছে।

উপর্যুক্ত আটজন তাবেয়ীর মাঝে সাতজন ছিলেন আল্লাহর পথের মুজাহিদ। তারা জিহাদের ময়দানে অংশগ্রহণ করে কুফফারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।

১. উয়াইস কারনী রহ. ।

খাইরুত তাবেয়ীন হযরত উয়াইস কারনী রহ.। সাহাবায়ে কেরামকে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ ও তার কাছ থেকে দুয়া চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন রাসূল স.। তার শাফায়াতে রবীয়া ও মুজার গোত্রের মতো অধিক সংখ্যক লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে । [তারিখুল ইসলাম, ইমাম যাহাবী রহ. , খ.২, পৃ.৫৫৮, আল-ইসাবা, ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বর্ণনা নং ৫০০]

ঐতিহাসিকগণ এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন যে, তিনি কোন এক যুদ্ধে ইন্তেকাল করেছেন। তবে কোন যুদ্ধ এবং কোন জায়গায় ইন্তেকাল করেছেন এ বিষয়ে মতানৈক্য করেছেন।

ইমাম ইবনে আসাকির রহ. বলেন,

خرج أويس راحلا إلي ثغر أرمينيا فأصابه البطن ، فألتجا إلي أهل خيمة فتوفي هناك

অর্থ: আর্মেনিয়ার সাগার নামক অঞ্চলে যুদ্ধের উদ্দেশ্য উয়াইস কারনী রহ. সফর করেন। হঠাৎ তিনি পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হন। পীড়ার কারণে একটি তাবুতে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানেই তিনি ইন্তেকাল করেন।

[তাহজীবু তারিখে দিমাশক, খ.৩, পৃ.১৭৭]

আব্দুল্লাহ ইবনে সালিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

অর্থ: আমরা হযরত উমর রা. এর খেলাফতকালে আজারবাইজানে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি। আমাদের সাথে উয়াইস কারনী রহ: ছিলেন। আমরা যখন যুদ্ধ থেকে ফিরছিলাম, তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। এরপর তিনি আরোগ্য লাভ করলেন না। ফলে সেখানেই ইন্তেকাল করলেন। আমরা সেখানে উপস্থিত হলাম। কাফন প্রস্তুত ছিলো। কবর খোড়া হয়ে গিয়েছিল। গোসলের পানিও প্রস্তুত ছিলো। আমরা তাকে গোসল দিলাম। কাফন পরিয়ে জানাজা সম্পন্ন করলাম। এরপর দাফন করলাম। আমাদের কিছু সাথী পরবর্তীতে বলল, চলো তার কবর চিনে রাখি। সেখানে গিয়ে দেখি, সেখানে কোন কবর নেই। কবরের চিহ্নও নেই।

[সিফাতুস সাফওয়া, ইবনুল জাওযী রহ. খ.৩, পৃ.৫৬, হিলয়াতুল আউলিয়া, খ.২, পৃ.৮৩]

কোন কোন ঐতিহাসিক বলেছেন, তিনি সিফফীন অথবা নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন।

২. আবু মুসলিম খাওলানী রহ.

বিখ্যাত তাবেয়ী ও বুজুর্গ ছিলেন। অসংখ্য কারামত তার হাতে প্রকাশিত হয়েছে। মিথ্যা নবুওয়াতের দাবীদার আসওয়াদ আনাসী তাকে আগুনে নিক্ষেপ করেছিল। কিন্তু আগুন তার কোন ক্ষতি করেনি। এরপর তিনি ইয়ামান থেকে মদীনায় এলেন। হযরত উমর রা. তাকে চুম্বন করে কেঁদে ফেললেন। এবং বললেন, সেই রবের প্রশংসা, যিনি আমাকে মুহাম্মাদ স. এর উম্মতের মাঝে এমন এক ব্যক্তিকে দেখার সৌভাগ্য দিয়েছেন, যার সাথে ইব্রাহীম আ. এর মতো আচরণ করেছেন।

আবু মুসলিম খাওলানী রহ. সম্পর্কে ইবনে কাসীর রহ. বলেন,

وكان ملازما للجهاد وفي كل سنة يغازي بلاد الروم وله مكاشفات، وأحوال و كرامات كثيرة جدا

অর্থ: আবু মুসলিম খাওলানী রহ. নিয়মিত জিহাদে অংশগ্রহণ করতেন। প্রত্যেক বছর রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন। তার অনেক কাশফ, হালত ও অসংখ্য কারামত রয়েছে।

[আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খ.৮, পৃ.১৪৬]

৩.হারাম ইবনে হাইয়্যান রহ.

বিখ্যাত আবেদ ও দুনিয়াত্যাগী ছিলেন। হযরত উমর ও উসমান রা. এর থেকে হাদীস শ্রবণ করেছেন। তার থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন ইমাম হাসান বসরী রহ.।

ইবনে সায়াদ ও অন্যান্য ঐতিহাসিক লিখেছেন, তিনি এক যুদ্ধে ইন্তেকাল করেন। [তবাকাতে ইবনে সায়াদ, খ.৭, পৃ.৯৪, তারীখুল ইসলাম, ইমাম জাহাবী, খ.৩, পৃ.২১২]

মৃত্যুর পূর্বে তিনি অসিয়ত করেছিলেন, তার রর্ম বিক্রি করে যেন ঋণ পরিশোধ করা হয়।

৪.আমের ইবনে আব্দুল্লাহ আল-কাইস

তিনি প্রত্যহ এক হাজার রাকাত নামায আদায় করতেন। বিখ্যাত আবেদ ও জাহেদ ছিলেন।

তার সংগ্রামী জীবন সম্পর্কে ইবনুল জাওযী রহ. একটি ঘটনা উল্লেখ করেছেন।

কোন এক যুদ্ধে মুসলমানরা গণীমত একত্র করছিল। আমের বিন আব্দুল্লাহ রহ. একটি গণীমতের একটি থলি নিয়ে এলেন। গণীমত সংগ্রহে নিয়োগপ্রাপ্ত দায়িত্বশীলকে সেটি অর্পণ করলেন।

অন্যান্য মুসলিম বলল, এই গণীমত আমরা কখনও দেখিনি। আমাদের সংগৃহীত কোন গণীমতই এতো মূল্যবান বা এর কাছাকাছি নয়। তারা জিজ্ঞাসা করল, আপনি কে?

তিনি বললেন, না। আল্লাহর শপথ। আমি তোমাদেরকে আমার পরিচয় বলব না। তোমরা আমার প্রশংসায় মগ্ন হবে। অন্যদেরকেও আমার পরিচয় দিবো না।

তাদের মাঝে একজন তাকে অনুসরণ করতে শুরু করল। এমনকি তার সঙ্গীদেরক কাছে এসে তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করল। তারা বলল, ইনি হলেন আমের বিন কায়স।

[সিফাতুস সাফওযা, খ.৩, পৃ.১৩৯]

৫. রবী ইবনে খাইসাম রহ. (মৃত্যু:৬৭ হি:)

তার সম্পর্কে বিখ্যাত সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন,

لو رأك رسول الله صلي الله عليه وسلم لأحبك

অর্থ: রাসূল স. তোমাকে দেখলে অনেক মহব্বত করতেন।

[হিলয়াতুল আউলিয়া, খ.২, পৃ.১০৬]

অশ্বারোহী হয়ে একটি যুদ্ধ অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে এক জায়গায় তিনি নামায আদায় করছিলেন। তার সামনে থেকেই এক চোর ঘোড়া চুরি করে নিযে যায়। তিনি বলেন, প্রভূর সাথে কথোপকথনে কোন কিছুই মনযোগ বিনষ্ট করতে পারে না। হে আল্লাহ, চোর যদি ধনী হয়, তাহলে তাকে হেদায়াত দান করো। আর যদি অভাবগ্রস্ত হয়, তাহলে তাকে ধনী বানিয়ে দাও।

[আজ-জুহদ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ., পৃ.৩১৪]

৬.মাসরুক ইবনে আজদা আল-কুফী রহ.

তাবেয়ী মাসরুক রহ. বিখ্যা আবেদ ছিলেন। ইমাম শা’বী রহ. বলেন, ইমাম মাসরুকের ইন্তেকালের সময় তার কাছে কাফন ক্রয়ের মতো সম্পদ ছিলো না।

হিশাম আল-কালবী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ইমাম মাসরুক রহ. কাদিসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এ যুদ্ধে তিনি আহত হন। আহতে হওয়ার কারণে তার হাত অবশ হয়ে যায়।

[হিলয়াতুল আউলিয়া, খ.৪, পৃ.১৫৫]

৭. হাসান বসরী রহ.

তাসাউফের এমন কোন কিতাব নেই, যেখানে তার কথা আলোচনা করা হয়নি। তিনি তাসাউফের প্রথম সারির ইমাম ছিলেন।

ইবনে সায়াদ বর্ণনা করেছেন, এক ব্যক্তি হাসান বসরী রহ. কে জিজ্ঞাসা করল, হে আবু সায়াদ, আপনি কি যুদ্ধ করেছেন? তিনি বললেন, হ্যা। আমি আব্দুর রহমান ইবনে সামুরার সাথে কাবুল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি।

[আত-ত্বাবাকাতুল কুবরা, খ.৩, পৃ.১৭৫]

ইমাম জাহাবী রহ. তাজকিরাতুল হুফফাজে লিখেছেন,

ولازم الجهاد ولازم العلم والعمل وكان أحد الشجعان الموصوفين

অর্থ: তিনি নিয়মিত জিহাদে অংশগ্রহণ করতেন । ইলম ও আমলে অগ্রণী ছিলেন। যুদ্ধে বিখ্যাত বীরদের অন্যতম ছিলেন।

[তাজকিরাতুল হুফফাজ, খ.১, পৃ.৮১, এছাড়াও দেখুন, তাহজীবুত তাহজীব, ইবনে হাজার আসকালানী রহ. খ.১, পৃ.৪৮৩]

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: