সংকলন
আয়শা রা
জীবনী তানযীল আরেফিন আদনান

আয়েশা বিনতে আবি বকর (রা.) । তানযীল আরেফিন আদনান

আয়েশা রা. ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, প্রত্যুৎপন্নমতি মেয়ে। ভাষাপাণ্ডিত্বেও তাঁর দখল কম ছিল না। ফলে তাঁর কথা অন্যের ওপর খুব সহজেই প্রভাব ফেলত।

এরকম আরও বিভিন্ন কারণে তিনি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী ছিলেন। আর তাঁর প্রতি এই ভালোবাসা কোনো গোপন বিষয় ছিল না; বরং এটা স্বতঃসিদ্ধ বিষয় ছিল।

আমর ইবনুল আস রা. একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, আয়েশা আমার সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি। আমর ইবনুল আস পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, পুরুষদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি কে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আয়েশার পিতা (আবু বকর) আমার প্রিয় ব্যক্তি।

আমর ইবনুল আস রা. কেবল জানতে চেয়েছিলেন, কোন ব্যক্তি তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয়! আর তিনি উভয় উত্তরেই আয়েশা রা. এর নাম সংযুক্ত করে দিলেন। তিনি চাইলে বলতে পারতেন, আবু বকর আমার প্রিয়। কিন্তু তিনি বললেন, আয়েশার বাবা আমার প্রিয়। যেন তিনি বোঝাতে চাচ্ছেন, আয়েশার নাম উচ্চারণ করাটাই আমার প্রিয়।

 

সাহাবাদের মাঝে ইলমের দিক দিয়ে আয়েশা রা. এর মর্যাদা সবচেয়ে বেশি হওয়ার কারণ হলো তাঁর প্রখর মেধা। এর সাথে আরও যুক্ত হয়েছিল আয়েশা রা. এর ঘরে সবচেয়ে বেশি ওহী অবতীর্ণ হওয়া, নারী সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের সামাধান সরাসরি হুজুরের কাছে থেকে জানতে পারা, বিভিন্ন সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপদেশ শুনতে পারা, এবং রাসূলের সাথে সবচেয়ে বেশি সফরসঙ্গী হওয়া। এ ছাড়াও তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রচুর মাসআলা শিখেছেন, এবং কুরআনের কোথাও অস্পষ্ট থাকলে তাও তিনি সরাসরি রাসূলের কাছ থেকে শিখেছেন।

আয়েশা রা. কুরআনের শানে নুযুল ও হাদীসের শানে উরুদ (অবতীর্ণ হওয়ার কারণ) এর ব্যাপারেও পারদর্শী ছিলেন। একজন ব্যক্তির মাঝে এত যোগ্যতা পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর বিষয়ও বটে।

আয়েশা রা. এর হাদীস বর্ণনার পরিসংখ্যানও চোখ কপালে তুলে দেয়ার মতো। এটা আরও স্পষ্ট হয় যখন অন্যান্য স্ত্রীর হাদীস বর্ণনার পরিসংখ্যান সামনে আসবে।

আয়েশা রা. সর্বমোট ২২১০টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর কাছাকাছি ৩৭৮টি হাদীস বর্ণনা করেছেন উম্মে সালামা রা.। অন্যান্য স্ত্রীদের হাদীস বর্ণনার পরিমাণ হলো,

মাইমুনা রা. ৭৬ টি হাদীস, উম্মে হাবীবা রা. ৬৫টি হাদীস, হাফসা রা. ৬০টি হাদীস, জুওয়াইরিয়া ও সাওদা রা. ৫টি হাদীস, যাইনাব বিনতে জাহাশ রা. ৯টি হাদীস, সফিয়্যাহ রা. ১০টি হাদীস বর্ণনা করেছেন।

সমস্ত উম্মাহাতুল মুমিনীনের হাদীস আয়েশা রা. এর বর্ণিত হাদীসের এক তৃতীয়াংশ পরিমাণও নয়। এর বাইরে আরও অসংখ্যা ফতওয়া তো রয়েছেই, যা আয়েশা রা. নারী-সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রদান করেছিলেন।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, আয়েশা রা. কবিতাচর্চা, বংশপরম্পরা মুখস্থ করা এবং চিকিৎসাশাস্ত্রেও পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন। তাঁর এমন চতুর্মুখী যোগ্যতা দেখে উরওয়া ইবনু যুবাইর একবার আশ্চর্য হয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আমি আপনার ব্যাপারে যতই চিন্তা করি ততই আশ্চর্য হই। আপনি শ্রেষ্ঠ ফকীহ। এর কারণে খুঁজতে গিয়ে দেখলাম, কেনই-বা আপনি শ্রেষ্ঠ ফকীহ হবেন না, যার স্বামী হলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং যার পিতা হলেন রাসূলের অন্যতম সহযোগী আবু বকর রা., তাঁর এমন শ্রেষ্ঠ ফকীহ হওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। এরপর দেখি আপনি আরব জাতির ইতিহাস, তাদের বংশ পরম্পরা এবং কবিতা চর্চায়েও বেশ পারদর্শী। এরপর ভাবলাম, এটা স্বাভাবিক, কারণ আপনার পিতা আবু বকর হলেন কুরাইশের শ্রেষ্ট জ্ঞানীদের একজন। কিন্তু আমি এটা ভেবে আশ্চর্য হই যে, আপনি চিকিৎসাবিদ্যা কোত্থেকে শিখলেন? আয়েশা রা. জবাবে বললেন, হে উরওয়া , রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তখন আরবের বিভিন্ন প্রতিনিধিদল তাঁকে দেখতে আসত। তাঁর চিকিৎসার জন্য নানান ওষুধের ব্যবস্থা করা হতো। আমি সেগুলো দিয়ে তাঁর চিকিৎসা করতাম। এভাবে দেখতেই দেখতেই আমি চিকিৎসাবিদ্যা শিখে ফেলেছি।

এভাবেই তিনি প্রায় অর্ধ শতাব্দি পর্যন্ত উম্মাহের ফিকহ-ফতওয়া ও ইলমের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ছিলেন। এমন কোনো সমস্যা ছিল না, যার সমাধান তাঁর কাছে না পাওয়া যেত।

আবু মূসা আশআরী রা. বলেন, আমরা সাহাবীগণ হাদীস নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়লে আয়েশা রা. এর শরণাপন্ন হতাম, এবং আমরা এ বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো না কোনো ইলম অবশ্যই পেতাম।

মাসরুক রহ. বলেন, আল্লাহর শপথ, আমি অনেক প্রবীণ সাহাবীকেও দেখেছি, ইলমুল ফারায়েয নিয়ে তিনি আয়েশা রা. এর শরণাপন্ন হয়েছেন।

আতা রহ. বলেন, আয়েশা রা. ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ ফকীহ, সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী এবং সাধারণ বিষয়ে সবচেয়ে উত্তম সিদ্ধান্তদানকারী।

তিনি যে পরিমাণ শরয়ী সমস্যার সমাধান দিতে পারতেন তিনি ব্যতীত অন্য কোনো স্ত্রী তেমন পারতেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অধিক সুহবত তাঁকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিল।

 

তাঁর বদান্যতা

আয়েশা রা. এর দানের পরিধিও ছিল তাঁর ইলমের মতো বিস্তৃত। কোনোকিছুই তিনি জমা রাখতেন না; দুহাত ভরে দান করে দিতেন।

উম্মে দাররাহ এর সূত্রে ইবনু সাইদ বর্ণনা করেন, একবার আয়েশা রা. এর কাছে এক হাজার দিরহাম হাদিয়া এল। সেদিন তিনি সিয়াম পালন করছিলেন। কিন্তু পুরোটাই তিনি দান করে দিলেন। উম্মে দাররাহ বলেন, আমি তাঁকে বললাম, ইফতারির জন্য গোশত ক্রয় করতে এক দিরহাম রাখলেও পারতেন। তখন তিনি বলেন, আমাকে তখনই স্মরণ করিয়ে দিলে রেখে দিতাম।

সিয়াম অবস্থায়ও তিনি এভাবে নিজেকে ভুলে গিয়ে পুরো এক হাজার দিরহাম দান করে দিলেন, ফলে ইফতার করার জন্যও কিছু বাকি রইল না।

উরওয়া রহ. বলেন, আয়েশা রা. কিছুই জমা করতেন না। আল্লাহ যা রিযিক দিতেন সবটুকুই দান করে দিতেন।

১৭ই রমজান মঙ্গলবার রাতে তাঁর আখেরাতের সফর শুরু হয়। রাতেই তারাবির নামাজের পর তাঁকে পূর্ব-ওসিয়ত অনুযায়ী জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়। তাঁর জানাযার নামাজ পড়ান আবু হুরায়রা রা.।

আল্লাহ তাআলা তাঁর ওপর রহম করুন। তাঁকে সন্তুষ্টির চাদরে ঢেকে নিন। এবং তাঁকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

 

Facebook Comments

Related posts

মাওলানা রাশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ. : ‌কিছুগুণ, কিছু বৈ‌শিষ্ট্য | ইফতেখার জামিল

সংকলন টিম

ইমাম আবূ হানীফা রহঃ এর জীবন ও কর্ম | মাওলানা মুহসিনুদ্দীন খান

সংকলন টিম

খাইরুদ্দিন বারবারোসা | ইমরান রাইহান

সংকলন টিম

Leave a Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: