সংগ্রামী সাধক আবু মুসলিম খাওলানী রহ. | মঈনুদ্দীন তাওহীদ

আবু-মুসলিম-খাওলানী

ইমাম যাহাবী রহ. তার সম্পর্কে বলেন : তিনি ছিলেন তাবেয়ীদের সর্দার এবং সমকালীন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ যাহেদ ব্যক্তিত্ব। বিশুদ্ধ বর্ণনা অনুযায়ী আবু মুসলিম খাওলানীর প্রকৃত নাম আব্দুল্লাহ ইবনে সাওব।[১] ইয়ামান থেকে মদীনায় পৌঁছানোর আগেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রফীকে আলার সান্নিধ্যে চলে যান; এবং আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে খলীফা মনোনীত করা হয়।

ইয়ামানে নবুয়াতের দাবীদার ভণ্ডনবী আসওয়াদে আনাসীকে রুখতে তিনি অনন্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফেৎনার সে সময়ও তিনি ছিলেন ইসলামের ওপর চির অটল-অবিচল। আসওয়াদে আনাসী তাকে জ¦লন্ত আগুনে নিক্ষেপ করেছিল; কিন্তু আগুন ঈমানের বলে বলিয়ান এই মহান সাধকের কোনো ক্ষতি করতে পারেনি। আসওয়াদে আনাসীকে বলা হয়েছিল, ‘একে এই আগুন থেকে বের না করলে সে তোমার অনুসারীদের ধ্বংস করে দেবে।’ এ কথা শুনে আসওয়াদ ভয় পেয়ে আবু মুসলিম খাওলানীকে সেখান থেকে বের করার হুকুম দেয় এবং তাকে মদীনায় চলে যাওয়ার নির্দেশ প্রদান করে।

আবু মুসলিম খাওলানী তখন মদীনায় চলে আসেন। মদীনার আসার পর বাইরে সাওয়ারী বসিয়ে তিনি মসজিদে নববীতে নামাজ আদায় করা শুরু করেন। এদিকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কোথা থেকে এসেছেন?’ উত্তরে তিনি বললেন, ‘ইয়ামান থেকে।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আবার জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভণ্ডনবী যাকে আগুনে ফেলেছিল, তার এখন কী অবস্থা?’ এবার তিনি যেন এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে উত্তর দিলেন, ‘তিনি তো আব্দুল্লাহ ইবনে সাওব।’ কিন্তু উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু একথা শুনে বললেন, ‘আল্লাহর কসম দিয়ে বলছি, আমাকে বলুন, আপনিই কি সে ব্যক্তি নন?’ আবু মুসলিম খাওলানী এবার ছোট্ট করে হ্যাঁ সূচক জওয়াব দিলে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আনন্দের আতিশয্যে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। অনেকক্ষণ কাঁদার পর তিনি তাকে সাথে নিয়ে আবু বকর রাযিয়াল্লাহু আনহুর নিকট গেলেন। সেখানে তাকে নিজেদের পাশে বসিয়ে বললেন, ‘মহামহিম সেই সত্তার প্রশংসা আদায় করছি, যিনি আমাকে মৃত্যুর পূর্বে উম্মতে মুহাম্মাদীর এমন এক ব্যক্তিকে দেখালেন; যার সাথে ইবরাহীম খলীলের মতো আচরণ করা হয়েছে।’[২]

মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়কালে এই মনীষী শামে থাকতেন। তার প্রতি প্রভাবিত ছিল অনেক মানুষ। তিনি প্রচুর পরিমাণে আল্লাহর ইবাদত করতেন। আবু আতেকাহ বলেন : আবু মুসলিম খাওলানী মসজিদে একটি চাবুক ঝুলিয়ে রাখতেন। তিনি বলতেন, ‘একটা পশুর চাইতে আমিই এই চাবুকের অধিক হকদার।’ তিনি এবাদত করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গেলে পায়ের টাকনুতে চাবুক দ্বারা একটি বা দুটি প্রহার করতেন। বর্ণিত আছে যে, তিনি বলতেন, ‘জান্নাত বা জাহান্নাম সচোক্ষে দেখলেও হয়তো আমার জন্য বর্তমান আমল থেকে বেশি কিছু করার নেই।’ শুরাহবিল থেকে বর্ণিত, দুজন ব্যক্তি আবু মুসলিম খাওলানীর সাক্ষাতে এলেন। তাকে ঘরে না পেয়ে তারা দুজন মসজিদে চলে গেলেন। আবু মুসলিম খাওলানী তখন মসজিদে নামাজ পড়ছিলেন। তারা বসে রইলেন নামাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। দুজনের একজন সেদিন গণনা করেছিলেন যে, আবু মুসলিম খাওলানী তিনশত রাকাত নামাজ আদায় করেছেন।

আবু মুসলিম খাওলানী বৃষ্টির জন্য দুআ করলেই আল্লাহ তাআলা বৃষ্টি দিতেন। তিনি ছিলেন একজন মুস্তাজাবুদ দাওয়া ব্যক্তিত্ব। মুহাম্মাদ ইবনে যিয়াদ বর্ণনা করেন যে, কোনো এক নারী তার স্ত্রীর অনিষ্ঠ করতে চাইলে তিনি সেই নারীর জন্য বদদুআ করেন; এতে সেই নারী অন্ধ হয়ে যায়। মহিলাটি তার নিকট এসে তওবা করে ক্ষমা ভিক্ষা চাইলে তিনি প্রার্থনা করে বলেন, ‘হে আল্লাহ, এই নারী যদি একনিষ্ঠ হৃদয়ে তওবা করে; তাহলে তুমি তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দাও!’ আবু মুসলিম খাওলানীর এই দুআয় নারীটির দৃষ্টিশক্তি পুনরায় ফিরে আসে।

তিনি রোমান-মুসলিম যুদ্ধে অংশগ্রহন করেছিলেন। বর্ণিত আছে যে, যুদ্ধের সময় মুসলিম বাহিনী কোনো নদীর সামনে এলে তিনি বলতেন, ‘আল্লাহর নাম নিয়ে পাড় হয়ে যাও!’ সবার আগে তিনি পাড় হয়ে যেতেন; এরপর গোটা বাহিনীই সেই উত্তাল দরিয়া পাড় হয়ে যেত। সকলেই দরিয়ার এপাড়ে এসে পৌঁছলে তিনি বলতেন. ‘তোমাদের কারো কোনো বস্তু কি নদীতে পড়ে গেছে? যদি পড়ে যায় তাহলে এর জামানত আমি নিলাম।’ একবার এক ব্যক্তি নিজের একটি জিনিস ইচ্ছাকৃত নদীতে ফেলে দিল। নদী পাড় হয়ে সে বলতে লাগল, ‘আমার অমুক জিনিস নদীতে পড়ে গেছে।’ আবু মুসলিম খাওলানী বললেন, ‘আমার পেছন পেছন আসো।’ লোকটি তাকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেলে দেখা গেল, হারানো জিনিসটি একটি কাষ্ঠখণ্ডের সাথে ঝুলে আছে। আবু মুসলিম খাওলানি বললেন, ‘নাও, তোমার জিনিস উঠিয়ে নাও!’[৩]

আবু মুসলিম খাওলানী সম্পর্কে ইবনে কাসীর রহ. বলেন, ‘আবু মুসলিম খাওলানী রহ. নিয়মিত জিহাদে অংশগ্রহণ করতেন। প্রত্যেক বছর রোমকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেন; তার অনেক কাশফ, হালত ও অসংখ্য কারামত রয়েছে।[৪]

পূণ্যাত্মার মানুষ আবু মুসলিম খাওলানীকে শাসকশ্রেণী অনন্য মর্যাদা ও সমীহের দৃষ্টিতে দেখত; তার নিকট থেকে বরকত লাভের তামান্না রাখত। যে কোনো মুকাদ্দামায় তাকে আমীর বানানো হতো।

উম্মতে মুহাম্মাদীর এই মহামনীষী বাইজেন্টাইন ভূখণ্ডে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। জিহাদী নেশায় ডুবে থাকা এই মহান ব্যক্তিত্ব বুসর ইবনে আরতাতের সাথে শীতকালীন যুদ্ধভিযানে অংশগ্রহণ করতেন। এমন এক যুদ্ধেই অসুস্থ হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। তার ইন্তেকালের খবর পেয়ে মুআবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহু বলে উঠেছিলেন, ‘আবু মুসলিম খাওলানী আর কুরাইব ইবনে সাইফ আনসরারীর মৃত্যুতেই তো প্রকৃত বিপদের পাহাড় ভেঙে পড়েছে।’

তিনি ছিলেন একজন বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব। আল্লাহর সিদ্ধান্তে পূর্ণ সন্তোষ এই মনীষি বলতেন, ‘আমার যদি এমন কোনো পুত্র সন্তান জন্ম হয়, যাকে দেখলে হৃদয় জুড়িয়ে যায়; আর সে একপর্যায়ে টগবগে যুবকে পরিণত হয়ে আমার আত্মার উপশম হয়। এমন মুহুর্তেও যদি আল্লাহ তাকে আমার থেকে ছিনিয়ে নেয়; তবুও আল্লাহর এই সিদ্ধান্ত দুনিয়া ও দুনিয়ার যাবতীয় বস্তু থেকে আমার নিকট অতীব প্রিয়।’ [৫]

বস্তুত, এটা আবু মুসলিম খাওলানীর প্রভূভক্তির অনন্য দৃষ্টান্ত; কেননা, এখানে রয়েছে সকল কষ্টে ধৈর্যের স্তর অতিক্রম করে আল্লাহর সিদ্ধান্তেই সন্তুষ্ট হয়ে যাওয়ার স্তরে উন্নীত হওয়ার অনুপম উদাহরণ।

১। সিয়ারু আলামিন নুবালা, ৪/৭,৮।
২। প্রাগুপ্ত, ৪/৯।
৩। প্রাগুপ্ত।
৪। আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৮/১৪৬।
৫। সিফাতুস সফওয়া, ৪/২১৩; হুলিয়াতুল আওলিয়া, ২,১২৭।

Facebook Comments