ইতিহাস

শিবাজি : কথিত রাম রাজত্বের স্বপ্নদ্রষ্টা । হাবিব আফনান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

শিবাজিকে ভারতের কে না চেনে! ছবি, নাটক, কার্টুন, প্রবন্ধ—সব জায়গায় শিবাজির “শিবা” নামের অবাধ বিচরণ। সে ছিল মারাঠা জাতির সর্দার। মারাঠাদের ডাকাতির কথা সর্বজনবিদিত। ডাকাতি করে গ্রামের পর গ্রাম বিরান করে করে ছেড়েছিল এরা। মারাঠা বর্গিদের নিষ্ঠুর অত্যাচারে মানুষ এত আতঙ্কগ্রস্ত ছিল যে; কচি-কচি বাচ্চাদের কান্না থামাবার জন্য বাংলার মায়েরা এখনও তাদের অত্যাচারের কথা তুলে ধরে-
ছেলে ঘুমাল পাড়া জুড়াল
বর্গি এলো দেশে,
বুলবুলিতে ধান খেয়েছে
খাজনা দিবো কিসে।

সে ভারতের জাতীয় বীর হিসেবে খ্যাত হওয়ার কারণ হলো—সে-ই সর্বপ্রথম ভারতীয়দেরকে রামরাজত্ব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। তার ব্যাপারে আরেকটা বিকৃত ইতিহাস রয়েছে। তা হলো সে নাকি বারবার সম্রাট আওরঙ্গজেব (র.) কে যুদ্ধে পরাজিত করেছিল। তার ইতিহাস পড়লে সে বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।

১৫৬৫ সালের যুদ্ধে বিজয়নগর রাজ্যের এক ঐতিহাসিক বিপর্যয়ের পরপরই দক্ষিণ ভারতে মুসলিম আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সে থেকে মারাঠারা বাহমনি, আহমদনগর, বিজাপুর, গোলাকুণ্ডা প্রভৃতি সুলতানদের অধীনে কাজ করত। যে সমস্ত মারাঠা পরিবার সুলতানদের অধীনে রাজকর্মের ভিত্তিতে আর্থিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, তাদের মধ্যে ভোঁসলে পরিবার অন্যতম। কৃষি কর্মই ছিল ভোঁসলেদের পারিবারিক বৃত্তি। শিবাজির পিতা শাহজি ভোঁসলে প্রথমে নিজাম শাহি সুলতানের অধীনে, পরে বিজাপুরের আদিল শাহি সুলতানের চাকরিতে যুক্ত থেকে প্রতিপত্তি বাড়িয়েছিল। উত্তর ভারতের মোগল আর দক্ষিণ ভারতের সুলতানদের মধ্যকার যুদ্ধ-বিগ্রহের সুযোগে তারা সুলতানি ও মোগল সাম্রাজ্যের দুর্গ দখল ও লুটতরাজ করত। ধর্মগুরু রামদাসের শিক্ষা-দীক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শিবাজি মারাঠাদের জাতীয় চরিত্র আরও সংগঠিত করে।

শিবাজি জুনারের কাছে শিবনের পাতর্বত্য দুর্গে জন্মগ্রহণ করে। শিবাজিকে সাধারণ ইতিহাসে মনে হয়, সে আদর্শ বীর, বিরাট যোদ্ধা, সুকৌশলী এবং আওরঙ্গজেবের চরম প্রত্যক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী। আরও ধারণা করা হয় যে, সম্রাট আওরঙ্গজেব নাকি শিবাজির কাছে বারবার পরাজয় বরণ করে নাজেহাল হয়েছিলেন। মোটকথা, শিশুকাল থেকেই মনে এ ধারণা ঠাঁই পেয়ে থাকে, শিবাজি কেবল মারাঠা জাতির বীর নয়, বরং সে ভারতের বিখ্যাত রাজাও বটে; তাই সে জাতীয় বীর। আর তাই ভারতের প্রধানতম ফটক মুম্বাইয়ে শিবাজির মুর্তি প্রতিস্থাপিত হয়েছে।

সমালোচকদের অপর পক্ষ কিন্তু শিবাজিকে সামান্য সৈনিক, দস্যু, পাহাড়ি ইঁদুর, বিশ্বাসঘাতক এবং অকৃতজ্ঞ বলেই মনে করেন। অবশ্য কোনটা সঠিক; তা নিয়ে সমীক্ষার প্রয়োজন। তবে আকবরের ভুলভ্রান্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ঢেকে যারা তাকে “মহামতি”, “আকবর দ্য গ্রেট”, “দিল্লিশ্বর” ও “জগদীশ্বর” উপাধি দিতে কুণ্ঠাবোধ করেনি, তারা নিজ গুণে বিপরীত পন্থায় আওরঙ্গজেবের নিন্দা বা হেয় প্রকাশ করতে পারে। সুতরাং আওরঙ্গজেবের সাথে যার যত বিবাদ-বিসংবাদ, তারাই হবে তত বীর, তত বাহাদুর। শিবাজির ক্ষেত্রেও তা ঘটেছে কি না তা ভাবার বিষয়।

সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে দাক্ষিণাত্যে এক নতুন জাতির অভ্যুত্থান হয়। সেটাই হলো মারাঠা জাতি। তারা যাযাবর ও দস্যুবৃত্তির জন্যে চিরদিন ইতিহাসে কুখ্যাতই ছিল। রাতের অন্ধকারে তারা অতর্কিতে বিভিন্ন গ্রাম ও শহরবাসীদের উপর চড়াও হয়ে লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করে ধন-দৌলত, অর্থ-সম্পদ নিয়ে চম্পট দিত। আমাদের বাংলাদেশে পর্তুগিজ ও মায়ানমারের মগ দস্যুদের (মায়ানমারের মগ বৌদ্ধরা) মত মারাঠা বর্গি জাতিও কুখ্যাত ছিল। তাদের অত্যাচারের কাহিনী গ্রামীণ ও ইতিহাসের পাতায় মজুত আছে।

শিবাজির পিতা শাহজি ভোঁসলে আহমদনগরের উচ্চ পর্যায়ের সামরিক কর্মচারী ছিল। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যখন মুসলিম শাসকরা অমুসলিমদের উচ্চ পর্যায়ে আসীন করেছে; তখন থেকেই মুসলমানদের পতন শুরু হয়েছে। সে তার প্রথমা স্ত্রী জিজাবাঈকে নানা কারণে উপেক্ষা করতে থাকে। তখন জিজাবাঈ শিশু শিবাজিকে নিয়ে এক ব্রাহ্মণের ঘরে আশ্রয় গ্রহণ করে। ব্রাহ্মণ শিক্ষিত ছিল না, কিন্তু শিবাজিকে একটা শিক্ষা দিয়েছিল, আর তা হচ্ছে সাম্প্রদায়িকতা। নিরক্ষর শিবাজির হৃদয়-ফলকে ব্রাহ্মণের কথা বিষবৃক্ষ রোপণের এক শক্ত বুনিয়াদ সৃষ্টি করে। শিবাজি বড় হয়ে ব্রাহ্মণের কথা বাস্তবায়িত করতে লাগল।

সেসময় মাওয়ালি অসভ্য এক পার্বত্য জাতির সাথে শিবাজির মিলন হয়। শিবাজি এ আশ্বাস দিয়ে হাত মেলাতে বলে যে, যদি তারা তার অধীনে লুটতরাজে শামিল হয়, তাহলে প্রত্যেকের অংশে মোটামুটি ভালো বখরা পড়বে এবং ভবিষ্যতে মোগল রাজধানী পর্যন্ত লুট করা যেতে পারে। শিবাজি মাওয়ালিদেরকে নিয়ে বিজাপুর রাজ্যে বারবার আক্রমণ করে। বিজাপুরের সুলতান শিবাজির উপর ক্ষুব্ধ হয়ে তার পিতা শাহজিকে বন্দি করে। পিতাকে উদ্ধার করার শক্তি তার ছিল না; তাই সে তার পিতার মুক্তির জন্য সম্রাট শাহজাহানের কাছে অনেক অনুনয়-বিনয়ের সাথে আবেদন রাখল। সম্রাটের শাহজাহানের মধ্যস্থতায় শাহজি মুক্ত হয়।

কিছুদিন চুপ থাকার পর শিবাজি অন্যায়ভাবে জাওয়ালি দখল করে। আওরঙ্গজেব তখন বিজাপুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যস্ত ছিলেন। সে অবসরে মোগল সাম্রাজ্যের দক্ষিণ-পশ্চিম ভূ-ভাগ আক্রমণ করে। সম্রাট সংবাদ পেয়েই সেখানে মোগল সৈন্য প্রেরণ করে মারাঠাদেরকে বিতাড়িত করেন। অবশ্য মনে রাখা প্রয়োজন যে, সেসময় আওরঙ্গজেব পিতার অসুস্থতার কারণে দিল্লি ফিরে যান। সেটা ছিল ১৬৫৮ সাল। শিবাজি আওরঙ্গজেবকে খুব ভয় করত। তাই সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না গিয়ে এ সুযোগটা গ্রহণ করল। তাছাড়া দিবালোকে সম্রাটের সামনে সম্মুখ সমরে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সাহস আদৌ তার ছিল বলে কোন প্রামাণ্য ইতিহাস পাওয়া যায় না।

শ্রীবিনয় ঘোষও তার “ভারতজনের ইতিহাসের” ৬২ পৃষ্ঠায় লিখেছে—“পিতার অসুস্থতার সংবাদ পাইয়া ঔরঙ্গজিব দাক্ষিণাত্য ছাড়িয়া চলিয়া গিয়াছিলেন। তারপর শিবাজির মৃত্যুর ২ বছর পর আবার দাক্ষিণাত্যে ফিরে আসেন। শিবাজির মৃত্যু হয় ১৬৮০ সালে। ১৬৫৮-১৬৮০ সালে এ ২২ বছর, আর শিবাজির মৃত্যুর পর ২ বছর, মোট ২৪ বছর পরে আবার সম্রাট আওরঙ্গজেব দাক্ষিণাত্যে ফিরে আসেন”। অতএব শিবাজি আওরঙ্গজেবের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হলে এ সময় আওরঙ্গজেব পুরো দাক্ষিণাত্য জয় করে নিতে পারতেন। তাছাড়া শিবাজি সারা জীবনে কোন যুদ্ধে আওরঙ্গজেবকে দেখতে পেয়েছিল কি না সন্দেহ। তাই শিবাজি যে সম্রাট আওরঙ্গজেবকে বারবার পরাজিত করেছিলেন—একথা সঠিক নয়।

সম্রাটের শাসনকালে ১১ বছর শাহজাদা শাহ আলম, ৬ বছর বাহাদুর খাঁ, ৪ বছর শায়েস্তা খাঁ, ২ বছর জয়সিংহ এবং ১ বছর দিলির খাঁ দাক্ষিণাত্যে সুবাদারি করেন। আওরঙ্গজেব দিল্লি থেকে ফরমান পাঠাতেন মাত্র। সম্রাট নন, তাঁর সেনাপতিরাই বারবার পরাজিত করেছেন শিবাজিকে, বারবার তাদেরকে বন্দি করেছেন আর সম্রাট আওরঙ্গজেব বারবার তাদের ক্ষমা করেছেন।

প্রথম জীবনে শিবাজি বিজাপুরের অনেক দুর্গে মাওয়ালিদের সাহায্যে আক্রমণ করে। তখন সুলতান ক্রুদ্ধ হয়ে তার বিরুদ্ধে দশ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী প্রেরণ করেন। সেনাপতি ছিলেন আফজাল খাঁ। এর পরের ঘটনা ১৯৪৬ সালে ছাপা, আমাদের দেশের (ভারতের) সরকারি স্কুলের পাঠ্যপুস্তক “ইতিহাস পরিচয়” থেকে তুলে ধরছি—
“শিবাজি দেখিলেন যে, প্রকাশ্য যুদ্ধে তিনি পারিবেন না, তাই তিনি এক মতলব আঁটিলেন; সন্ধির প্রস্তাব করিয়া তিনি আফজাল খাঁর সাথে সাক্ষাত করিতে চাহিলেন। সাক্ষাতের সময় কোন পক্ষেই বেশি লোকজন ছিল না। সাক্ষাতের সময় যখন উভয়ে আলিঙ্গন করিতেছিলেন; সেই সময়ে শিবাজি তাহার পোষাকের নিচে লুক্কায়িত ‘বাঘনাখ’ নামক অস্ত্র দ্বারা হঠাৎ আফজাল খাঁকে আক্রমণ করিয়া তাঁহাকে নিহত করিলেন। ইহার ফলে আফজাল খাঁর সৈন্যদল ছত্রভঙ্গ হইয়া পড়িল। তখন শিবাজি তাহাদিগকে আক্রমণ করিয়া অনায়াসেই পরাজিত করিলেন”। (পৃষ্ঠা ১৪৮-৪৯)

প্রাচীনকাল হতে নিয়ম আছে, সন্ধি বা কোন চুক্তি করার সময় শত্রুপক্ষকে হত্যা করা মানবতাবিরোধী। কিন্তু শিবাজির এ রকম বিশ্বাসঘাতকতা ইতিহাসে বিরল। মারাঠা-ভক্ত ঐতিহাসিকরা উল্টোভাবে আবার শিবাজির পরিবর্তে আফজাল খাঁকেই দায়ী করে। এখন আবার বিদ্যালয়ের ছাত্রদের কাছে তুলে ধরা হয়, আফজাল খাঁ আলিঙ্গনের সময় শিবাজিকে গলা টিপে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন, তাই শিবাজি “বাঘনাখ” দিয়ে তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে। কিন্তু একজন সুশিক্ষিত শক্তিশালী দশ হাজার সৈন্যের সেনাপতির পক্ষে শিবাজিকে হত্যা করার জন্য তো যুদ্ধই যথেষ্ট ছিল এবং সেটাই বীরত্বের নিদর্শন হতো। তিনি কিন্তু শিবাজির দুর্বল কাতর কণ্ঠের আবেদন কবুল করে বীরত্বের পরিবর্তে খোলামনে খালি হাতেই অগ্রসর হয়েছিলেন। প্রকৃত ইতিহাসের তথ্য এটাই।

শিবাজি নিজেকে খ্যাতির উচ্চ শিখরে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে নব প্রস্তুতি নিয়ে মাওয়ালি ও মারাঠা জাতির বাছাই করা সৈন্য নিয়ে মোগল ঘাঁটি আক্রমণ করে। সংবাদ পেয়ে আওরঙ্গজেব শায়েস্তা খাঁকে পাঠালেন শিবাজিকে পরাস্ত করতে। শায়েস্তা খাঁ মারাঠাদের বিতাড়িত করে পুনা, চাকান দুর্গ ও কল্যাণপুর অধিকার করেন। যুদ্ধ শেষে একদিন শায়েস্তা খাঁ পুনরায় রাত-শয্যায় বিশ্রাম করছিলেন। এমন সময় রাতের অন্ধকারে শিবাজি অতর্কিতে শায়েস্তা খাঁর কক্ষে আক্রমণ করল। শায়েস্তা খাঁর ঘুম ভেঙ্গে গেলে দেখলেন, দরজায় তরবারি হাতে শিবাজি। তিনি তখন জানালা ভেঙ্গে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করলে শিবাজির তরবারির আঘাতে তাঁর দুটি আঙ্গুল কাটা পড়ে।

অত্যন্ত পরিতাপ ও বিপজ্জনক ঘটনার এখানেই শেষ নয়; শিবাজি শায়েস্তা খাঁর নিরপরাধ এক অল্প বয়স্ক পুত্রকে পেয়ে গেল এবং সাথে সাথে সে নিজে তাকে খণ্ড খণ্ড করে কেটে পৈশাচিক আনন্দ উপভোগ করে। এ ঘটনাটি ঘটে ১৬৬৩ সালের এপ্রিল মাসে।

পরের বছর শিবাজি সুরাট বন্দর লুণ্ঠন করে। তীর্থ যাত্রীদের জাহাজ পর্যন্ত তার অত্যাচার থেকে নিষ্কৃতি পায়নি। এ সংবাদে আওরঙ্গজেব বললেন, “যে সম্মুখে আসে না, মানবতার ধার ধারে না; এ রকম একটা দস্যু বা পার্বত্যমূষিক না হয়ে শিবাজি যদি একজন রাজা বা বীর হতো, তাহলে আমি কয়েকদিনের জন্য গিয়ে তাকে সমুচিত শিক্ষা দিতাম”।

সম্রাট এবার জয়সিংহ এবং দিলির খাঁকে পাঠালেন পাহাড়ি ইঁদুর শিবাজিকে শায়েস্তা করতে। মোগল বাহিনী পুরন্দর দুর্গ অবরোধ করেন। দুর্গের ভিতরে শিবাজি সপরিবারে বাস করত। যুদ্ধে পরাজয় নিশ্চিত এবং পরাজিত হলে অশেষ লাঞ্ছনা ভোগ করতে হবে মনে করে শিবাজি ১৬৬৫ সালের জুন মাসে পুরন্দরের চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী তাকে ২৩ টা দুর্গ ও ১৬ লাখ টাকা বাৎসরিক রাজস্বের সম্পত্তি দিতে হলো এবং নিজে মোগল আনুগত্যের বিনিময়ে ১২ টা দুর্গ ও বাৎসরিক ৪ লাখ টাকা রাজস্বের সম্পত্তি রাখার অনুমতি দেওয়া হলো। যদিও শিবাজির চরিত্র তাদের জানা ছিল, তা সত্তেও বাদশাহর আইনে কেউ সন্ধি করতে এলে তাকে স্বাগত জানাতে হতো। তাই শিবাজিকে প্রাণে না মেরে বন্দি করে আগ্রায় নিয়ে যাওয়া হলো।

সম্রাট আওরঙ্গজেবের কাছে যথা সময়ে খবর পৌঁছুল, পাহাড়ি ইঁদুর খাঁচায় বন্দি। সম্রাট তাকে সম্মুখে আনিয়ে বললেন, “জয়সিংহ ও দিলির খাঁ তোমার প্রাণ ভিক্ষার জন্য অনুরোধ করেছে। আমি জানি, তুমি বহু নরহত্যার অপরাধে দায়ী, তবুও তোমাকে ক্ষমা করলাম। আর আগামীতে প্রজাদের উপর কোন অত্যাচার যেন না হয়”।

শিবাজি শুধু আক্রমণ করতেই জানত, সম্রাটের সাথে শালীনতা বজায় রেখে কথা বলতেও জানত না। তাই শিবাজির ব্যবহারে সম্রাট বিরক্ত হয়ে আদেশ দিলেন শিবাজিকে নজরবন্দি রেখে শিষ্টাচার শেখাতে। বন্দির প্রতি সব রকম সুব্যবহার করতেও সম্রাট আদেশ দিলেন। শিবাজির দেখাশুনার দায়িত্ব ছিল জয়সিংহের উপর। বন্দি অবস্থায় শিবাজি মোগল দরবারে আবেদন করে, সে ধর্ম পালনের জন্য বিপুল পরিমাণে মিষ্টি দরিদ্র ব্রাহ্মণদের জন্য পাঠাতে চায়। সম্রাট বললেন, “ধর্ম পালনের কথা বলেছে, অতএব আবেদন মঞ্জুর না করলে তার ধর্মে হস্তক্ষেপ করা হবে”। এভাবে ঝুড়িতে করে মিষ্টি পাঠানোর অজুহাতে শিবাজি নিজেই ঝুড়িতে বসে পলায়ন করে।

দাক্ষিণাত্যে গিয়ে শিবাজি প্রথমে চুপচাপ থেকে মারাঠাদের আরও সংগঠিত করে ১৬৭০ সালে মোগলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। পূর্বেকার মত সুরাট লুট করে জোরপূর্বক “চৌথ” আদায় করে এবং নিজেকে স্বাধীন রাজা বলে ঘোষণা দেয়। ১৬৮৭ সালে রায়গড়ে তার অভিষেক অনুষ্ঠিত হয়। শিবাজি রাজা হয়ে “ছত্রপতি” উপাধি ধারণ করে। সম্রাট আওরঙ্গজেব তখন উত্তর পশ্চিম সীমান্তে পাঠান উপজাতিদের দমনে ব্যস্ত। আওরঙ্গজেব শিবাজির এ চরম পর্যায়ের সংবাদ শুনে বুঝলেন, শিবাজিকে “পাহাড়ি ইঁদুর” মনে করে উপেক্ষা করা ঠিক হয়নি। তাই বিদ্রোহ দমন করে যখন দাক্ষিণাত্যের দিকে নিজে অভিযান পরিচালনার ইচ্ছা করলেন, তখন সংবাদ পেলেন শিবাজির মৃত্যু হয়েছে। এ সংবাদ শুনে তিনি যে ফারসি কবিতা পাঠ করেছিলেন তার অর্থ—“আমার দয়া, ক্ষমা, উদারতা, সহনশীলতা এবং দাক্ষিণাত্যে আমার অনুপস্থিতির সুযোগে শিবাজি ক্ষণিকের ইঁদুর রাজা হয়ে মরল”।

এ-ই হলো কথিত রামরাজত্বের কথিত স্বপ্নদ্রষ্টার প্রকৃত ইতিহাস! এই কাপুরুষ পাহাড়ি ইঁদুরকেই আজ ভারতীয়রা জাতীয় বীর বলে স্বরণ করে!

(“চেপে রাখা ইতিহাস” অবলম্বনে)

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: