ইতিহাস

উম্মাহর আকাশে জ্বলজ্বলে তারা | ইবরাহিম নাখয়ী রহ.

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

আবু হানিফা রহ.বলেছেন, ‘ইবরাহিম সালিম (আবদুল্লাহ ইবনু ওমর রা.এর পুত্র) এর চেয়েও অধিক প্রাজ্ঞ। যদি সাহাবি হওয়ার শ্রেষ্ঠত্ব না থাকত, তবে আমি বলতাম ইবরাহিম ইবনু ওমর রা.এর চেয়েও অধিক প্রাজ্ঞ।’ (১)

অনুবাদ করছিলাম। হঠাৎ এই লাইনগুলো লিখে চমকে যাই। ভাবতে থাকি কে এই ইবরাহিম, যার সম্পর্কে ইমামে আজম আবু হানিফা রহ. এত বড় মন্তব্য করলেন! চলুন জেনে নেই কে এই ইবরাহিম আর তাঁর সম্পর্কে ইমাম আজমের এমন মন্তব্যের কী রহস্য?

শুধু ইবরাহিম বললে হয়তো অনেকেই চিনবেন না। তবে হাদীস নিয়ে যাদের পড়াশোনা তাদের চিনে নিতে অবশ্য ভুল হবে না। কিন্তু সাথে যদি ‘নাখয়ী’ শব্দটি জুড়ে দেই তাহলে হয়তো অনেকের কানেই ভেসে বেড়াবে পরিচিত একটি শব্দ। হাদীসের সনদে কতবার পাঠ করতে হয়েছে এই মহিমান্বিত নামটি!

বলছি ইবরাহিম নাখয়ী রহ.এর কথা। যিনি একইসাথে ছিলেন একজন বিদগ্ধ ফকিহ এবং বিশিষ্ট হাদীস বিশারদ। তাঁর উপাধি ছিল ছাইরাফিয়্যুল হাদীস অর্থাৎ হাদীসের খাজাঞ্চি। এই উপাধি থেকেই বুঝা যায় তাঁর সম্পর্কে ইমাম আবু হানিফার এমন মন্তব্য মোটেও অমূলক ছিল না।

তিনি ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ তাবেয়ী। সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব, ইমাম শাবি, হাসান বসরি এবং ইবনু সিরীন প্রমুখ বিশিষ্ট তাবেয়ীর হামআসর ছিলেন তিনি। ইবনু সিরীনের সঙ্গে বসেছিলেন মাসরুক, আলকামা প্রমুখ বিশিষ্ট তাবেয়ীর দরসগাহে। তাঁর এক চোখ অন্ধ ছিল। মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন বলেছেন, ‘তোমরা যে ইবরাহিমের কথা বলছ, আমার মনে পড়ে সে ঐ যুবক যে আমাদের সাথে মাসরুকের দরসে বসত। মনে হতো সে যেন আমাদের মাঝে নেই। অথচ সে আমাদের সাথেই ছিল।’ (২)

তাঁর পুরো নাম ইবরাহিম ইবনু ইয়াজিদ ইবনুল আসওয়াদ ইবনু আমর ইবনু রবিয়া ইবনু হারিসা ইবনু সাদ ইবনু মালিক ইবনুন নাখা। কুনিয়্যাত বা উপনাম ছিল আবু ইমরান। ইয়ামানের প্রসিদ্ধ মুদহাজ গোত্রের শাখা গোত্র নাখার দিকে সম্বন্ধ করে তাঁকে নাখয়ী বলা হয়। (৩) জন্মেছিলেন ৪৭ হিজরিতে। তাঁর মায়ের নাম ছিল মালিকা বিনতে ইয়াজিদ আন-নাখইয়্যাহ। যিনি ছিলেন প্রসিদ্ধ সাহাবি আসওয়াদ ইবনু ইয়াজিদ আন-নাখয়ী রা.এর বোন। (৪) আয়েশা রা. সহ আরও অনেক সাহাবিকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল তাঁর। যদিও তাঁদের কাছ থেকে কোনো হাদীস বর্ণনা করেছেন বলে প্রমাণিত হয়নি। (৫)

কী বিস্ময়কর! এক চোখ অন্ধ। যিনি কখনো কিছুই লিপিবদ্ধ করেননি। কিন্তু তাঁর কুওয়াতে হাফেজা এতই মজবুত ছিল যে, তাঁকে দেয়া হয়েছিল হাদীসের খাজাঞ্চি উপাধি। তাঁর সিকাহ তথা নির্ভরযোগ্য হওয়া নিয়ে কেউই সন্দেহ পোষণ করেননি। প্রসিদ্ধ তাবেয়ী সাইদ ইবনু জুবাইর রহ. তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তোমাদের মাঝে ইবরাহিম নাখয়ী থাকা সত্ত্বেও তোমরা আমার কাছে ফতওয়া চাইতে এসেছ?’ (৬) তাঁকে হাদীসের খাজাঞ্চি উপাধি দিয়েছিলেন হাদীস এবং ফিকহ শাস্ত্রের অনন্য নক্ষত্র আহমাদ ইবনু হাম্বল রহ.। (৭)

ইমাম শাবি এবং তিনি একই সঙ্গে কুফার বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একজন শাসকের তুলনায় তাঁর প্রভাব কোনো অংশেই কম ছিল না। ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর গোত্র কুফায় এসে বসতি স্থাপন করে। ফলত তিনি বেড়ে উঠেন কুফায়। তখন কুফার অবস্থান ছিল ইলমের শিখরে। একদল বিশিষ্ট সাহাবি তখন কুফায় বিলিয়ে যাচ্ছেন অকৃপণ ইলম। যাদের অগ্রপথিক ছিলেন প্রসিদ্ধ সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা.। এমন এক বর্ণিল সময়েই বেড়ে উঠেন ইবরাহিম নাখয়ী রহ.। নিজ সময়ের উর্বরতার প্রভাব যে তাঁর মাঝেও পড়বে তা নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কাছে নেই। এছাড়াও তাঁর গোত্রের জন্য বরকতের দোয়া করেছিলেন স্বয়ং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। যার সাক্ষ্য দিয়েছেন সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা.। রাসুলের সেই দোয়ার যথাযথ প্রতিফলন ঘটেছিল ইবরাহিম নাখয়ীর মাঝে। নিজ মামা আসওয়াদ ইবনু ইয়াজিদ এবং আলকামা, মাসরুক, আবদুর রহমান ইবনু ইয়াজিদ, শুরাইহ ইবনুল হারিস, যির ইবনু হুবাইস রহ. প্রমুখ প্রসিদ্ধ তাবেয়ীর কাছ থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই ইবরাহিম নাখয়ী কুরআন ও তাফসীর পাঠে মনযোগী হয়েছেন। করেছেন হাদীস মুখস্থ। শুধু তাই নয়, ফিকহের ক্ষেত্রেও তিনি অর্জন করেছিলেন অসামান্য দক্ষতা। নিজ সময়ে ইরাকের ফকিহগণের মধ্যে তিনি যে শীর্ষস্থানে ছিলেন এ নিয়ে কারো সন্দেহ ছিল না। তাঁর এই অনন্য প্রতিভা এবং জ্ঞানে মুগ্ধ হয়ে শত শত ইলমপিপাসু এসে ভীড় জমায় কুফায়। আ’মাশ এবং হাম্মাদ ইবনু সুলাইমান প্রমুখ প্রসিদ্ধ তাবে তাবেয়ীগণ ছিলেন তাঁর ছাত্র। (৮)

হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের প্রতি তিনি প্রচন্ড ঘৃণাপোষণ করতেন। তাঁর মৃত্যুতে তিনি শুকরিয়া আদায় করেছিলেন। ইলমে আমলের সমন্বয়ে বর্ণাঢ্য ৪৯ বছরের এক জীবন কাটিয়ে ৯৬ হিজরীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।(৯)

তথ্যসুত্র:
(১) আশ-শাফেয়ী হায়াতুহু ওয়া আসরুহু, ইমাম আবু যাহরাহ: ৬৬, দারুল ফিকরিল আরবি।
(২) তবাকাতু ইবনি সাদ: ৬/২৭৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ।
(৩) ওফায়াতুল আইয়ান, ইবনু খাল্লিকান: 1/25।
(৪) ওফায়াতুল আইয়ান, ইবনু খাল্লিকান: 1/25।
(৫) ) সুল্লামুল উসুল ইলা তবাকাতিল ফুহুল, হাজি খলিফা: ১/৬৬, মাকতাবাতু ইরসিকা, ইস্তাম্বুল।
(৬) তবাকাতু ইবনি সাদ: ৬/২৭৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ।
(৭) মিরয়াতুজ জমান, সিবত ইবনুল জাওজি: ১০/১১৭, দারুর রিসালাতিল ইলমিয়্যাহ।
(৮) সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম যাহাবি: ৪/৫২১, মুওয়াসসাসাতুর রিসালাহ।
(৯) সিয়ারু আলামিন নুবালা, ইমাম যাহাবি: ৪/৫২১, মুওয়াসসাসাতুর রিসালাহ। এখানে মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ৫৮ ছিল বলেও একটি মতের উল্লেখ রয়েছে।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: