ইতিহাস

মামলুক সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেক | যুবায়ের বিন আখতারুজ্জামান 

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

[১২০৬ খ্রী. থেকে ১২৯০ খ্রী. পর্যন্ত সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবেক থেকে শুরু করে কায়কোবাদের শাসনামল পর্যন্ত সুলতানদের সাধারণত দাসবংশ বলা হয়। প্রকৃতপক্ষে, এই দাসবংশ নামকরণ ইতিহাসে প্রচলিত হওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই বলে আধুনিক ঐতিহাসিকগণ মত পোষণ করেন। তাদের যুক্তি অনুযায়ী এটা খুবই স্পষ্ট যে, প্রাথমিক আমলের তুর্কী সুলতানগণ ক্রীতদাস হিসেবে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেননি, কারণ যে সকল ক্রীতদাস সিংহাসনে অভিষিক্ত হয়েছিলেন, তারা সিংহাসন লাভের পূর্বে প্রত্যেকেই উচ্চ রাজকর্মচারী পদে নিযুক্ত ছিলেন। তাদের প্রত্যেকেই মুনিবদের থেকে মুক্তি লাভ করে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।]

প্রাককথন

কুতুবউদ্দিন সাহসী ও ধার্মিক প্রকৃতির লোক ছিলেন। তিনি বন্ধুদের নিকট ছিলেন উদার ও দিলখোলা এবং অপরিচিতদের নিকট ছিলেন সৌজন্য ও শিষ্টাচারপূর্ণ। যুদ্ধবিদ্যা ও শাসনকার্য পরিচালনায় তিনি ছিলেন অনন্য। সাহিত্যেও তার বেশ ভালো দখল ছিল। বাল্যকালে এক সওদাগর তাকে তুর্কীস্তান থেকে নিশাপুর নিয়ে এসে ফখরউদ্দিন বিন আব্দুল আজিজ কুফীর নিকট বিক্র‍য় করেছিলেন। তিনি কুতুবউদ্দিন আইবেককে বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন।

সেখানে তিনি আরবি, ফার্সী ও বিজ্ঞানে যথেষ্ট বুৎপত্তি লাভ করেন।  হঠাৎ করেই তার মুনিব মারা যান। তখন সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক যারা হলেন তারা সম্পত্তির অংশ হিসেবে তাকেও বিক্রয় করে দেন। এক ধনী সওদাগর তাকে উচ্চমূল্যে ক্রয় করে মুইজউদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরীর নিকট আসেন। সুলতান তাকে ক্রয় করলে এবং তার কনিষ্ঠ অঙ্গুলি ভাঙা ছিল বলে তাকে আইবেক (বলখ ও ঘোরের মধ্যবর্তী এক জায়গার নাম) নামে অভিহিত করলেন।

বাল্যকালের একটি ঘটনা

একরাতে মুইজউদ্দিন তার দরবারে এক বিরাট ভোজের ব্যবস্থা করেন এবং সেখানে ভৃত্যদের মধ্যে প্রচুর পুরস্কার বিতরণের আদেশ করেন। আইবেকও সেই দান গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ঘরে ফিরেই তিনি তার অংশ বন্ধুদের মধ্যে বণ্টন করে দেন। এ কথা সুলতান শুনলে তিনি আইবেককে ডেকে এর কারণ জিগ্যেস করেন।  আইবেক কৃতজ্ঞতার সাথে উত্তর দেন, “হুজুরের বদান্যতায় আমার সকল অভাব পর্যাপ্তভাবে পূরণ হয়েছে। অতিরিক্ত বস্তু দিয়ে নিজেকে ভারাক্রান্ত করার ইচ্ছা আমার নেই। হুজুরের অনুগ্রহ অক্ষুণ্ণ থাকলে আমার আর অতিরিক্ত কিছুর প্রয়োজন নেই”।

তার এই উত্তরে সুলতান এত খুশি হলেন যে, তিনি তৎক্ষনাৎ তাকে এমন একটি দায়িত্ব প্রদান করলেন, যার ফলে তিনি সর্বদা সুলতানের কাছাকাছি থাকেন। এই ঘটনার কিছুকাল পরেই সুলতান তাকে আমির-ই-আখুর বা অশ্বশালার তত্ত্বাবধায়কের পদ প্রদান করলেন।

সিপাহসালারের পদ

৫৮৮ হিজরীতে মুহাম্মদ ঘুরী তার শত্রু হিন্দুদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ করার পর বিজিত রাজ্য রক্ষার্থে যে বাহিনী রেখে যান, আইবেককে তার সিপাহসালারের পদ প্রদান করেন। এই সময় তাকে কুতুবউদ্দিন (ধর্মের স্তম্ভ খেতাব করা হয়)। এই কাজে নিযুক্ত থাকাকালে তিনি পার্শ্ববর্তী অনেক অঞ্চল দখল করেন এবং মিরাটের দুর্গ জয় করেন।  তিনি দিল্লীও অবরোধ করেন। কিন্তু শত্রুরা অবরোধকারীদের অপেক্ষায় এত বেশি ছিল যে, তারা নগর থেকে বের হয়ে অবরোধকারীদের উপর আক্রমণ করাই সমীচীন মনে করে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষেই বহু রক্তপাত হয়। যমুনার পানি রক্তে লাল হয়ে যায়। অবশেষে পরাজিত হয়ে রাজপুতরা পুনরায় প্রাচীরের ভিতরে আশ্রয় নেয়। দীর্ঘস্থায়ী অবরোধের পর তারা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

সুলতান উপাধি ধারণ

সুলতান মুহাম্মদ ঘুরী নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর কুতুবউদ্দিন আইবেক ‘সুলতান’ উপাধি ধারণ করে ১২০৬ খ্রীস্টাব্দে দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। সুতরাং ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রারম্ভ থেকে দিল্লীর সুলতানী ইতিহাস শুরু হয়। এর কিছুদিন পরেই কুতুবউদ্দিনকে কিরমান প্রদেশের শাসনকর্তা তাজউদ্দিন ইলদিজের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয়। বাঙলা দেশের ইখতিয়ার উদ্দিন এবং মুলতানের ও উঁচের শাসনকর্তা নাসিরউদ্দিন কুবাচা কুতুবউদ্দিন আইবেককে দিল্লীর সুলতান হিসেবে স্বীকার করে নেন। কিন্তু কুতুবউদ্দিনের ভাগ্যোন্নতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে তাজউদ্দিন শত্রুতামূলক মনোভাব নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হন। কুতুবউদ্দিন তার প্রতিদ্বন্দ্বী তাজউদ্দিনকে যুদ্ধে পরাজিত করে সাময়িকভাবে গজনী পর্যন্ত স্বীয় দখলে আনতে সমর্থ হন। তাজউদ্দিনের পাঞ্জাব অধিকারের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়।

কিন্তু  গজনীবাসীর গোপন সহায়তায় তাজউদ্দিন উৎসাহিত হয়ে অতর্কিত গজনী আক্রমণ করায় কুতুবউদ্দিন উপায়ন্তর না দেখে গজনী ত্যাগ করেন। এতে আফগানিস্তান ও ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ-সুবিধা বিনষ্ট হয়। ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা  বাবরের দিল্লী অধিকারের পূর্ব পর্যন্ত এই রাজনৈতিক ঐক্যবদ্ধতার সম্ভবনা আর ঘটেনি। তাই কুতুবউদ্দিন সম্পূর্ণ ভারতীয় সুলতানে পরিণত হন। মাত্র চার বছরের কিছু বেশি সময় রাজত্ব করার পর ১২১০ খ্রীস্টাব্দের নভেম্বর মাসে লাহোরে চৌগান (পোলো খেলার মত এক জাতীয় খেলা। মধ্যযুগের গোড়ার দিকে এটা ভারত ও পারস্যে খুব জনপ্রিয় খেলা ছিল) খেলতে গিয়ে ঘোড়া থেকে পড়ে কুতুবউদ্দিনের মৃত্যু হয়।

কুতুবউদ্দিনের চরিত্র ও কৃতিত্ব

কুতুবউদ্দিন আইবেক দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণে করে চার বছর রাজত্বকালের মধ্যে স্বাধীন সুলতান হিসেবে কোনো নতুন স্থান জয় করেননি। কিন্তু সদাশয় ও স্বাধীনচেতা শাসক হিসেবে তিনি সুষ্ঠু শাসন-ব্যবস্থা স্থাপন করতে সক্ষম হন। তিনি তার চারিত্রিক গুণাবলীর জন্য সমসাময়িকদের নিকট শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। সমসাময়িক ঐতিহাসিক মিনহাজ-উস-সিরাজের বর্ণনা হতে তার সদাশয়তার কথা স্পষ্টভাবে জানা যায়। কুতুবউদ্দিন ছিলেন তেজস্বী, উন্মুক্তমনা ও উদারচিত্ত সুলতান। ঐতিহাসিক হাসান নিজামী তার তাজ-উল-মা’আসির গ্রন্থে কুতুবউদ্দিনকে সুশাসক হিসেবে অজস্র প্রশংসা করেছেন। কুতুবউদ্দিন যে একজন অতিশয় ন্যায়পরায়ণ শাসক ও সুবিচারক ছিলেন  তা হাসান নিজামীর রচনায় উল্লিখিত আছে। কুতুবউদ্দিন নিরেপক্ষভাবে প্রজাদের শাসন করতেন এবং রাজ্যের শান্তি ও জন সাধারণের সমৃদ্ধি সাধনে তিনি আত্মনিয়োগ করেছিলেন। দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে তিনি সর্বদাই সচেষ্ট ছিলেন।

আইবেকের অসীম বদান্যতা সম্পর্কে প্রত্যেক লেখকই উচ্চ প্রশংসা করেছেন। তিনি মুক্ত হস্তে দান করতেন। এজন্য তিনি ‘লখ যখস’ অর্থাৎ ‘যিনি লক্ষ লক্ষ মুদ্রা দান করেছেন’ নামে ইতিহাস বিখ্যাত ছিলেন। তিনি ইসলাম ধর্মের একজন একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন এবং ইসলাম প্রচারে তিনি প্রবল উৎসাহ অনুভবে করতেন। তিনি দিল্লী ও আজমীরে দুইটি মসজিদ নির্মাণ করে ধর্মোৎসাহীর পরিচয় দিয়েছেন।

কুতুবউদ্দিন ভারতে মুসলিম শাসনের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। দিল্লীর প্রথম স্বাধীন মামলুক সুলতান হিসেবে তিনি ইতিহাসে পরিচিত হয়ে আছেন।

তথ্যসূত্র:

– A Comprehensive History Of India

– এন এডভান্সড হিস্ট্রি অব ইণ্ডিয়া

– ভারতে মুসলিম বিজয়ের ইতিহাস

– ভারতে মুসলিম রাজত্বের ইতিহাস

 

সংকলক:

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: