লা তাকুম মিনাল গাফিলীন | তাসনীম জান্নাত

লা তাকুম মিনাল গাফিলীন

শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান আরিফী হাফি.-এর একজন বন্ধু ছিলেন। খুব আমলদার ব্যক্তি। কখনো কখনো রুকইয়াও (শরয়ী ঝাড়ফুঁক) করতেন। তিনি শায়েখ আরেফীকে একজন কোটিপতির কাহিনী শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, একদিন আমার কাছে একজন বড় ব্যবসায়ীর ছেলে ফোন দিয়ে বললো, আমার বাবা খুব অসুস্থ। মেহেরবানী করে আপনি যদি এসে তাকে রুকইয়া (শরয়ী ঝাড়ফুঁক) করতেন! বন্ধু বলেন, আমি তার অনুরোধে তাদের বাড়িতে গেলাম। বাড়িটি দেখতে ছিলো রাজপ্রাসাদের মতো। আমি সেখানে যাওয়ার পর তারা সব ভাই মিলে আমাকে স্বাগত জানালো।

আমি তাদের কাছে তাদের বাবার রোগ সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তাদের একজন আমাকে বললো, শাইখ আমাদের পিতা লিভারের ব্যাধিতে আক্রান্ত। তার লিভার বড় হয়ে গিয়েছে। কিছুদিন আগে তার ব্লাড ক্যান্সারও ধরা পড়েছে। চিকিৎসকগণ পরীক্ষা নিরীক্ষা করে জানিয়েছেন যে, তিনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না। আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। তারপর আমি তাদের বাবার কক্ষের দিকে অগ্রসর হলাম। কক্ষে প্রবেশের পূর্বে তাদের একজন আমাকে বললো, আমরা আমাদের বাবাকে তার আসল রোগ সম্পর্কে জানতে দেইনি। কারণ আসল রোগের কথা জানতে পারলে তার স্বাস্থ্য আরো খারাপ হতে পারে। তার পেরেশানী বেড়ে যেতে পারে।

তারপর আমরা তার পিতার কক্ষে প্রবেশ করলাম। বেশ সুন্দর এবং প্রশস্ত মনোরম একটি কক্ষ। মাঝখানের এক খাটে পঞ্চাশোর্ধ একজন ব্যক্তি শুয়ে আছেন। চেহারায় যথেষ্ট আভিজাত্যের ছাপ রয়েছে। আমি তার সঙ্গে মুসাফাহা করে তার মাথার কাছে বসলাম। সন্তানরাও তাকে ঘিরে বসলো । ভদ্রলোক তাদেরকে কক্ষ থেকে চলে যেতে বললেন। তারা চলে যাওয়ার পর ভদ্রলোক কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বাচ্চাদের মতো অঝোরে কাঁদতে লাগলেন। তিনি বললেন, শাইখ, গত ত্রিশ বছর যাবত আমি দুনিয়া উপার্জনের পিছনে ছুটছি। এমনকি দুনিয়ার মোহ আমাকে সালাত থেকে দূরে রেখেছে। কুরআন তেলাওয়াত, যিকিরের হালকা ইত্যাদি সকল নেক আমল থেকে আমাকে গাফেল করে রেখেছে। যখন কেউ আমাকে উপদেশ দিয়ে বলতো, হে আল্লাহর বান্দা, এবার আখেরাতের প্রতি একটু মনোযোগী হও। জামাআতের সাথে সালাত আদায়ের প্রতি যত্নবান হও। নফল সালাত, সাওম ও ইবাদাত করো।

সন্তানদের উত্তম তারবিয়াতের প্রতি গুরুত্ব দাও। কুরআনুল কারীম তেলাওয়াত করো। তখন আমি বলতাম, ষাট বছর পর্যন্ত আমি দুনিয়া কামাই করবো। যখন আমার বয়স ষাট হয়ে যাবে তখন সমস্ত কিছু থেকে অবসর হয়ে ইবাদত বন্দেগীতে মনোযোগী হবো। ব্যবসার সকল দায় দায়িত্ব অন্যদের কাঁধে অর্পন করে আমি দায়িত্বমুক্ত হয়ে যাবো। বাকী জীবন আমার উপাার্জিত সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় খরচ করবো এবং ইবাদত বন্দেগীতে কাটিয়ে দিবো। কিন্তু আমার অবস্থা আপনি দেখতেই পাচ্ছেন। আমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছি। বিভিন্ন রোগ-ব্যধিতে আমি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। যা দিনদিন শুধু বেড়েই চলেছে। একথা বলে তিনি আরো জোরে জোরে কাঁদতে লাগলেন।

আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, আপনি কাঁদবেন না। আল্লাহ তাআলা আপনাকে শেফা দান করবেন ইনশাআল্লাহ। এমনকি আপনি যদি মারাও যান তারপরও আপনার ধনসম্পদ ও সন্তানরা আপনার উপকারে আসবে। তারা আপনার জন্য মসজিদ নির্মাণ করবে যা আপনার জন্য সাদাকায়ে জারিয়া হবে। ইয়াতীমদের লালন পালন করবে। আপনার পক্ষ হয়ে দান সাদাকা করবে। আপনার জন্য দুআ করবে। আমি এতটুকু বলতেই তিনি চিৎকার করে উঠলেন, বললেন, হয়েছে। এবার থামুন। এবার তিনি আরো জোরে বাচ্চাদের মতো কাঁদতে লাগলেন এবং আমার কথাগুলো আওড়াতে লাগলেন। এভাবেই কিছুসময় অতিবাহিত হয়ে গেলো।

তারপর তিনি কিছুটা শান্ত হয়ে বললেন, শাইখ, আপনি এদের ব্যাপারে কিছুই অবগত নন। আমি বললাম, কেনো? কী হয়েছে? তিনি বললেন, আমার ছেলেরা যারা আমার জন্য ভালোবাসা ও সহানুভূতি দেখাচ্ছে, তারা গতরাতে আমার কাছে একত্রিত হয়েছিলো। অনেকক্ষণ যাবত কথাবার্তা বলছিলো। আমি চাচ্ছিলাম যে, তারা আমার কামরা থেকে বের হয়ে যাক। তাই আমি ঘুমের ভান ধরে পড়ে রইলাম। অল্পসময় পরে নাকও ডাকতে শুরু করলাম। তারা ভাবলো আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। কিছুক্ষণ পরে তারা আমার ধনসম্পদ নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। আমি মারা গেলে  তারা আমার ধনসম্পদ থেকে কতটুকু উত্তরাধিকার পাবে ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করলো। এই বোকারা মিরাছ বন্টনের ব্যাপারে কিছুই জানে না। তাই তারা মিরাছ নিয়ে ঝগড়া বিবাদ শুরু করলো। একপর্যায়ে তারা আমার একটি বাড়ি নিয়ে বাদানুবাদে লিপ্ত হলো। যেটি অন্যগুলো অপেক্ষা অভিজাত এলাকায় নির্মিত। তারা প্রতেকেই আকাঙ্খা করছিলো যে, এ বাড়িটি তার ভাগে পড়ুক। এটুকু বলে তিনি আবার জোরে জোরে কাঁদতে শুরু করলেন।

বেশ কিছুসময় পর তিনি স্বাভাবিক হলে আমি তাকে কিছু সান্ত্বনার বাণী শুনিয়ে বিদায় নিয়ে চলে এলাম। তখন আমি আস্তে আস্তে এই আয়াত তেলাওয়াত করছিলাম,

مَا أَغْنَى عَنِّي مَالِيَهْ، هَلَكَ عَنِّي سُلْطَانِيَهْ

অর্থ : আমার ধনসম্পদ আমার কোনো কাজেই আসলো না। আমার ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি বিলুপ্ত হয়েছে। (সূরা হাক্কাহ,আয়াত : ২৮-২৯)।

(সূত্র: শায়খ মুহাম্মাদ আরেফী হাফি. তাঁর রচিত  رحلة الى السماءগ্রন্থে এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন)।

প্রিয় পাঠক, আজ আমাদের সকলের অবস্থা কি এই ব্যক্তির মতো নয়? আমাদেরকেও কি দুনিয়ার মোহ সালাত থেকে গাফেল করে রাখেনি? দুনিয়ার পিছু ছুটতে ছুটতে আমরা কি আখেরাতকে ভুলে বসিনি? আজ মুসলিম উম্মাহর চরম অধঃপতন এর কারণ কি গাফলত নয়? আমরা সবাই দুনিয়ার মোহে মোহগ্রস্ত হয়ে আছি। দুনিয়ার চাকচিক্য আমাদেরকে তার দাস বানিয়ে রেখেছে।

আল্লাহ তাআলা এই গাফলতের নিন্দা করে এরশাদ করেছেন,

يَعْلَمُونَ ظَاهِرًا مِّنَ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ عَنِ الْآخِرَةِ هُمْ غَافِلُونَ

অর্থ : তারা পার্থিব জীবনের বাহ্যিক দিক সম্পর্কে জানে। আর আখিরাত সম্পর্কে তারা উদাসীন ।(সূরা রূম,আয়াত: ৭)।

এই গাফলত বা উদাসিনতা এমন এক রোগ যা আত্মশুদ্ধির ক্ষেত্রে অনেক বড় প্রতিবন্ধক। দিনের পর দিন চলে যাচ্ছে। আমরা ক্রমশ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলছি। অথচ এখনো নিজেকে বদলাবার সময় হলো না। গুনাহ ছাড়তে পারলাম না। এভাবেই একদিন চলে আসবে অবধারিত মৃত্যু।

কবির ভাষায় :

اَلنَّاسُ فِي غَفَلَاتِهِمْ

وَ رَحَا الْمَنِيَّةِ تَطْحَنُ

অর্থ : মানুষ উদাসিনতায় নিমজ্জিত। অথচ মৃত্যুর চাকা দ্রুত ঘুরে চলছে।

(সূত্র : তাফসীরে ইবনে কাসীর: ৩/২১৯)।

আমরা কেউ মৃত্যুর বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারি না। আমরা বিশ্বাস করি, মৃত্যুর পরেও জীবন আছে। যে জীবন অনন্ত অসীম। দুনিয়ার জীবন তো শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু পরকালের জীবন শেষ হবার নয়। একটু কি ভেবে দেখেছি, কী হবে তখন আমাদের? কী অবস্থায় দাঁড়াবো আমরা মহান রাব্বুল আলামীনের সামনে?? মৃত্যুর জন্য কোনো প্রস্তুতি আছে আমাদের??? গাফলতের চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে আছি। এখনো কি সময় হয়নি জাগ্রত হবার?

গাফেলদের ব্যাপারে কুরআন হাদীসে অনেক শাস্তির কথা এসেছে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَلَمَّا وَقَعَ عَلَيْهِمُ الرِّجْزُ قَالُوا يَا مُوسَى ادْعُ لَنَا رَبَّكَ بِمَا عَهِدَ عِندَكَ ۖ لَئِن كَشَفْتَ عَنَّا الرِّجْزَ لَنُؤْمِنَنَّ لَكَ وَلَنُرْسِلَنَّ مَعَكَ بَنِي إِسْرَائِيلَ – فَلَمَّا كَشَفْنَا عَنْهُمُ الرِّجْزَ إِلَىٰ أَجَلٍ هُم بَالِغُوهُ إِذذَا هُمْ يَنكُثُونَ-

فَانتَقَمْنَا مِنْهُمْ فَأَغْرَقْنَاهُمْ فِي الْيَمِّ بِأَنَّهُمْ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا وَكَانُوا عَنْهَا غَافِلِينَ-

অর্থ : আর যখন তাদের উপর কোনো আযাব নিপতিত হতো তখন তারা বলতো হে মূসা! তোমার প্রতিপালক তোমাকে যেভাবে বলে রেখেছেন সেভাবে আমাদের জন্য দুআ করো। যদি আমাদের উপর থেকে এ আযাব দূরীভূত করে দাও তবে অবশ্যই আমরা তোমার উপর ঈমান আনবো এবং বনী ইসরাঈলকে তোমার সাথে যেতে দিবো। অতপর যখন আমি তাদের উপর থেকে আযাব তুলে নিতাম নির্ধারিত একটি সময় পর্যন্ত, যেখান পর্যন্ত তাদের পৌঁছানোর উদ্দেশ্য ছিলো, তখনি তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতো। পরিণামে আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করি এবং তাদেরকে সমুদ্রে নিমজ্জিত করি। কেননা তারা আমার আয়াত সমূহকে মিথ্যা সাবস্ত করতো এবং এ ব্যাপারে তারা ছিলো গাফেল। ( সূরা আরাফ, আয়াত: ১৩৪-১৩৬)

হাদীসে এসেছে, গাফেলদের দুআ কবুল হয় না। আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন,

ادْعُوا اللَّهَ وَأَنْتُمْ مُوقِنُونَ بِالْإِجَابَةِ ، وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ لَا يَسْتَجِيبُ دُعَاءً مِنْ قَلْبٍ غَاافِلٍ لَاهٍ

অর্থ : তোমরা কবুল হওয়ার পূর্ণ আস্থা নিয়ে দুআ করো। নিশ্চয় আল্লাহ গাফেল, উদাসীন ও অমনোযোগী অন্তরের দুআ কবুল করেন না।

(সূত্র : সুনানে তিরমিযী, হাদীস নং : ৩৪৭৯)।

যারা আল্লাাহ তাআলা থেকে উদাসীন থাকে এবং এ অবস্থায় তাদের মৃত্যু হয় কতই না মন্দ তাদের জীবনের পরিসমাপ্তি।

গাফেলদের মধ্যে একদল হলো কাফের। যারা তাওহীদের প্রতি ঈমান আনে না। কিয়ামতের দিন তাওহীদ থেকে তাদের এই গাফলত তাদের জন্য আফসোসের কারণ হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَأَنذِرْهُمْ يَوْمَ الْحَسْرَةِ إِذْ قُضِيَ الْأَمْرُ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ وَهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ

অর্থ : আর আপনি তাদেরকে পরিতাপের দিনের ব্যাপারে সতর্ক করুন। যখন সকল বিষয়ে ফায়সালা হয়ে যাবে। এখন তারা গাফেল এবং তারা বিশ্বাস স্থাপন করছে না। (সূরা মারইয়াম, আয়াত : ৩৯)।

তাদের এই গাফলতের সবচে ভয়াবহ শাস্তি হলো জাহান্নাম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا وَرَضُوا بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَاطْمَأَنُّوا بِهَا وَالَّذِينَ هُمْ عَنْ آآيَاتِنَا غَافِلُونَ-

أُولَٰئِكَ مَأْوَاهُمُ النَّارُ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ-

অর্থ : নিঃসন্দেহে যে সব লোক আমার সাক্ষাত লাভের আশা রাখে না এবং পার্থিব জীবন নিয়ে তাতেই প্রশান্তি অনুভব করছে এবং যারা আমার নিদর্শন সমূহ সম্পর্কে গাফেল এমন লোকদের ঠিকানা হবে জাহান্নামের আগুন। সেসবের বদলাস্বরূপ, যা তারা উপার্জন করেছিলো। (সূরা ইউনূস , আয়াত :৭-৮)।

আমাদের দায়িত্ব হলো, নিজেরা গাফলতের ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়া এবং অমুসলিমদেরকে দাওয়াত দেয়া। যাতে তারা গাফলত থেকে জেগে উঠতে পারে এবং ঈমান আনতে পারে।

গাফলত বা উদাসিনতার বিভিন্ন কারণ রয়েছে। অন্যতম কিছু কারণ হলো, গুনাহের আধিক্য, পার্থিব ভোগবিলাস, নফসের অনুসরণ, অবৈধ বিনোদন, অহেতুক ক্রীড়া কৌতুক।

গাফেলদের সাথে উঠাবসা করা ও মেলামেশা করাও গাফলতের অন্যতম কারণ।

প্রিয় পাঠক, আমরা কীভাবে গাফলত থেকে বাঁচতে পারি এর উপায়ও ইসলামি শারিয়াহ আমাদের বাতলে দিয়েছে।

গাফলতের উত্তম প্রতিষেধক হলো যিকির। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَاذْكُر رَّبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ الْغَافِلِينَ

অর্থ : আর স্মরণ করো তোমার প্রতিপালককে মনে মনে, কাকুতি মিনতি করে, ভীতসন্ত্রন্ত হয়ে, সকাল সন্ধ্যায় এবং গাফেলদের অর্ন্তভুক্ত হয়ো না। (সূরা আরাফ : ২০৫)।

কবর যিয়ারত করাও গাফলত দূর হওয়ার অন্যতম উপায়। আনাস ইবনে মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

أَلَا إِنِّي قَدْ كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ ثَلَاثٍ ثُمَّ بَدَا لِي فِيْهِنَّ: نَهَيْتُكُمْ عَنْ زِيَارَةِ الْقُبُوْرِ، ثُمَّ بَدَا لِي أَنَّهَا تُرِقُّ الْقَلْبَ وَتُدْمِعُ الْعَيْنَ وَتُذَكِّرُ الْآخِرَةَ فَزُوْرُوْهَا –

অর্থ : শুনো রাখো , আমি তোমাদেরকে ৩ টি কাজ থেকে নিষেধ করেছিলাম। তারপর এ সকল বিষয় আমার কাছে স্পষ্ট হয়। ঐ ৩ কাজের ১টি হচ্ছে, আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করতাম। তারপর আমার কাছে স্পষ্ট হলো, কবর যিযারত অন্তরকে নরম করে। চোখকে অশ্রুসিক্ত করে। আখিরাতকে স্মরণ করিয়ে দেয়। অতএব এখন তোমরা কবর যিয়ারত করো। (মুসনাদে আহমাদ , হাদীস নং :১৩০৭৫)।

আরেকটি উপায় হলো, দুনিয়ার হাকীকত নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। দুনিয়ার হাকীকত নিয়ে চিন্তাভাবনা করলে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব, তুচ্ছতা মনে জাগ্রত হয়। নিজেকে বদলাবার অনূভুতি তৈরি হয়। আর তখন আত্মশুদ্ধির পথ সহজ হয়ে যায়।

আমাদের আত্মশুদ্ধির জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো হাক্কানী রাব্বানী আলেমকে মুরুব্বী হিসেবে গ্রহণ করা। এতে আমরা তার থেকে সঠিক দিক নির্দেশনা পাবো এবং সেই অনুযায়ী চলতে পারবো। নিয়মিত তাহাজ্জুদের সালাত আদায়ের অভ্যাস করতে পারি। তাতে আমরা গাফেলদের অন্তর্ভূক্ত হবো না। আর আল্লাহ তাআলার কাছে কায়মনো বাক্যে গাফলত থেকে বাঁচার জন্য এই দুআ করবো –-

اَللّهُمَّ إِنِّي أَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ ، وَالْكَسَلِ ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْقَسْوَةِ ، وَالْغَفْلَةِ ، وَالْعَيْلَةِ ، وَالذِّلَّةِ ، وَالْمَسْكَنَةِ ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الْفُسُوقِ ، وَالشِّقَاقِ ، وَالنِّفَاقِ ، وَالسُّمْعَةِ ، وَالرِّيَاءِ ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ الصَّمَمِ ، وَالْبَكَمِ ، وَالْجُنُونِ ، وَالْبَرَصِ ، وَالْجُذَاِم ، وَسَيِّءِ الْأَسْقَامِ –

অর্থ : হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করি অক্ষমতা থেকে,অলসতা থেকে। আমি আপনার কাছে আরো আশ্রয় প্রার্থনা করি নির্দয়তা , উদাসিনতা , অভাব, লাঞ্চনা এবং নিঃস্বতা থেকে। আমি আপনার কাছে আরো আশ্রয় প্রার্থনা করি পাপাচার, অনৈক্য,    কপটতা, সুখ্যাতি কামনা ও রিয়া থেকে। আমি আপনার কাছে আরো আশ্রয় প্রার্থনা করি,বধিরতা,নির্বাকতা, পাগলামি, শ্বেতরোগ, কুষ্ঠরোগ এবং খারাপ রোগসমূহ থেকে।

(সূত্র : সহীহ ইবনে হিব্বান,হাদীস নং :১০২৩)।

প্রিয় পাঠক, আল্লাহ তাআলার আযাব হঠাৎ করে আসে না। তিনি বান্দাকে বিভিন্নভাবে সর্তক করেন। কিন্তু আমরা সর্তক হই না। গাফলতের ঘুম থেকে জাগ্রত হই না। বর্তমানে আমরা করোনা ভাইরাস নামক মহামারীর এক ভয়াবহ অবস্থা অতিক্রম করছি। একটু ভেবে দেখি, আল্লাহ তাআলার এই আযাব নাযিলের পিছনে আমাদের গাফলতই কি দায়ী নয়? সময় এখনো আছে। আসুন আমরা গাফলতের ঘুম থেকে জাগ্রত হই। তাওবা করি। আল্লাহর পথে ফিরে আসি। নিজেকে শুধরাই। শুদ্ধ জীবন গঠন করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফীক দান করুন। আমীন।

পরিশেষে প্রিয় জুনাইদ জামশেদ রাহিমাহুল্লাহর সেই বিখ্যাত নাশিদ দিয়ে শেষ করতে চাই,

মেরা দিল বাদাল দে, মেরা গাফলাত মে ডুবা দিল বাদাল দে……..।

তথ্যসূত্র:

আল কুরআনুল কারীম।

তাফসীরে ইবনে কাসীর।

সুনানে তিরমিযী।

মুসনাদে আহমাদ।

সহীহ ইবনে হিব্বান।

رحلة الى السماء – শাইখ মুহাম্মাদ বিন আব্দুর রহমান আরিফী হাফি.

الغفلة  – শাইখ মুহাম্মাদ সালেহ আল মুনাজ্জিদ হাফি.

Facebook Comments