আত্মশুদ্ধি

তাসাউফ : প্রাথমিক ধারণা ও সংক্ষিপ্ত শরয়ী বিশ্লেষণ | মুহাম্মদ সানাউল্লাহ

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

‘তাসাউফ’ এর পরিচয়: 

“তাসাউফ” শব্দটি “সূফুন” (صوف) শব্দমূল থেকে গৃহীত। যার মূল অর্থ হচ্ছে, পশমের পরিচ্ছদ গ্রহণ করা। পরবর্তীতে সেটা সূফী হওয়া বা সূফীয়ায়ে কেরামের আখলাকে নিজেকে সুসজ্জিত করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
আরবি প্রসিদ্ধ ডিকশনারি “মু’জামুল ওয়াসিতে” তাসাউফের অর্থ করা হয়েছে এভাবে—
التَّصوُّفُ: طريقة سلوكية قوامها التقشف والتحلي بالفضائل، لتَزْكُوَ النفسُ وتسموَ الروح.
“তাসাউফ হল একটি আদর্শ বা নীতি, যার মূল ভিত্তি হচ্ছে সংযম এবং উত্তম গুণাবলি দ্বারা সুসজ্জিত হওয়া, নফসের পরশুদ্ধি ও আত্মিক উন্নতির লক্ষ্যে।”

আর “মু’জামুর রায়েদ” এ তাসাউফের অর্থে বলা হয়েছে—
هو مذهب ديني أخلاقي فلسفي يقوم على الزهد في الدنيا والانصراف إلى الروح، ويعتمد على التأمل والتعبد والتقشف وما إليها من الرياضات النفسية والروحية للوصول إلى الغاية البعيدة، ألا وهي الاتصال بالذات الإلهية والفناء فيها.
“অর্থাৎ তাসাউফ একটি দর্শনভিত্তিক ধর্মীয় চারিত্রিক মতাদর্শ, যা দুনিয়া-বিমুখতা এবং আত্মিক-সাধনার উপর প্রতিষ্ঠিত। ধ্যান, ইবাদাত, সংযম ইত্যাদি আধ্যাত্মিক মেহনত মুজাহাদার উপর তার ভিত্তি। উদ্দেশ্য, চুড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছা, তা হল আল্লাহর সত্ত্বার সাথে সম্পর্ক স্থাপন এবং তার জন্য নিজেকে বিলীন করে দেওয়া।”

পবিত্র কোরআনে যা ব্যক্ত হয়েছে “তাযকিয়াহ” শব্দে। সূরা আ’লার ১৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন,
قد أفلح من تزكى. (যে তাযকিয়া অর্জন করেছে সে সফল হয়েছে)
অন্যত্র সূরা শামসের ৯ এবং ১০ নং আয়াতে ইরশাদ করেন,
قد أفلح من زكاها وقد خاب من دساها. (যে নিজের নফসকে পরিশুদ্ধ করেছে সে সফলকাম হয়েছে। আর যে নিজেকে কলুষিত করেছে সে ব্যর্থ হয়েছে।)
যার ব্যাখ্যায় ইবনুল জাওযী রহ. বলেছেন,
معنى “زكاها” طهرها من الذنوب، و أصلحها بالطاعة. অর্থাৎ সফলকাম সেই ব্যক্তি, যে নিজের আত্মাকে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করল এবং নেক আমল দ্বারা সজ্জিত করল। (ইবনে তাইমিয়া রহ. রচিত “তাযকিয়াতুন নফস, ৩৮ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)

ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, এই আয়াতে মানুষকে আত্মশুদ্ধির প্রতি আহ্বান করা হয়েছে এবং অন্তর  কলুষিত করে এমন সকল কাজ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। (“তাযকিয়াতুন নফস”, ৩৮ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)

সুতরাং তাসাউফ বা তাযকিয়ার মূল কথা হচ্ছে, আত্মার পরিশুদ্ধি, পাপ বর্জন ও নেক অর্জনের মাধ্যমে এবং এই সাধনায় সদা ব্যপ্ত থাকা,  চুড়ান্ত লক্ষ্যে (আল্লাহর সত্ত্বার সাথে সম্পর্ক স্থাপন এবং তার জন্য নিজেকে বিলীন করে দেওয়া) পৌঁছা পর্যন্ত।
“হাদীসে জিবরীলে” এই কথাটিই ব্যক্ত হয়েছে, জিবরাঈল আ. নবীজীকে জিজ্ঞেস করলেন,
ما الإحسان؟ “ইহসান কী?”

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বললেন, أن تعبد الله كأنك تراه، فإن لم تكن تراه فإنه يراك. “তুমি আল্লাহর ইবাদত করো এমনভাবে, যেন তুমি আল্লাহকে দেখছো, যদি তুমি না দেখতে পাও তবে (এ কথা অন্তরে জাগ্রত রাখ) নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাকে দেখছেন।”
ইমাম নববী রহ. এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন,
وهذا القدر من الحديث أصل عظيم من أصول الدين، وقاعدة مهمة من قواعد المسلمين، وهو عمدة الصديقين، وبغية السالكين.
“হাদীসের এই অংশটি দ্বীনের মূলনীতিসমূহের অন্যতম একটি মূলনীতি। মুসলমানদের দ্বীনী নীতিমালার মাঝে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটাই সিদ্দিকীনের মূল শিরোনাম এবং সুফী সাধকদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।” (ফাতহুল বারী: ১/১৪৮)

তাযকিয়াহ বা আত্মশুদ্ধির মূল উপাদান :

আত্মশুদ্ধির মৌলিক উপাদান তিনটি।
১/ ঈমান ও তাওহীদ।
২/ ইত্তেবায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
৩/ ফরজ, ওয়াজিব এবং সুন্নাহসমূহের পাবন্দি।

এগুলোই তাযকিয়াহ বা আত্মশুদ্ধির মৌলিক উপাদান। এর যথাযথ পাবন্দিকেই শরীয়তের দৃষ্টিতে তাযকিয়া বলে। পাশাপাশি কোন হক্কানী পীরের বাতলানো ওযিফা এই গুণগুলো অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়ক, এবং এর রওনক ও  ঔজ্জ্বল্যকে আরও বৃদ্ধি করে। কিন্তু এগুলোকে বাদ দিয়ে শরীয়তে তাসাউফের কোন অবস্থান নেই। নিম্নে এর সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ পেশ করা হল।

ঈমান ও তাওহীদ :

ঈমান এবং তাওহীদের পরিশুদ্ধি তাযকিয়ার প্রথম এবং প্রধান শর্ত। ঈমান ও তাওহীদের মযবুতি ছাড়া অন্তরের পরিশুদ্ধি সম্ভব নয়। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন,
لن يستغني القلب عن جميع المخلوقات إلا بأن يكون الله هو مولاه الذي لا يعبد إلا إياه.
“অন্তর সমস্ত মাখলুক থেকে তখনই অমুখাপেক্ষী হবে, যখন (মনে প্রাণে এ কথা বিশ্বাস করবে) আল্লাহই একমাত্র তার মাওলা। কেবল তারই ইবাদত সে করে।” (“তাযকিয়াতুন নফস”, ১৭ নং পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)

অপরদিকে তাওহীদের বিপরীত হচ্ছে শিরক। যা তাযকিয়া বা আত্মশুদ্ধির পথে সবচেয়ে বড় বাধা। পবিত্র কোরআনে যাকে “যুলুম” শব্দে আখ্যায়িত করা হয়েছে-
إن الشرك لظلم عظيم.
“নিশ্চয়ই শিরক সবচেয়ে বড় যুলুম।” (সূরা লুকমান: ১৩)
হাদীসে কুদসীর ভাষ্য-
يا ابن آدم! لو أتيتني بقراب الأرض خطايا، ثم لقيتني لا تشرك بي شيئا، لأتيتك بقرابها مغفرة.
হে আদম সন্তান! তুমি যদি গোটা দুনিয়া সমান পাপ নিয়ে আমার সাথে সাক্ষাৎ কর। আর দুনিয়াতে আমার সাথে কাউকে শরীক করোনি; তবে জেনে রেখো আমিও সমপরিমাণ ক্ষমা  নিয়ে তোমার সাথে সাক্ষাৎ করবো। (তিরমিযী: ৩৫৪০)

এই তাওহীদের প্রভাব সত্যিই বড় আশ্চর্য জনক! সালাফের জীবনীর পরতে পরতে তা পরিলক্ষিত হয়। এই যে হযরত বিলাল রা.। একজন হাবশী গোলাম। কিন্তু তাওহীদের প্রভাবে তার হৃদয় এতটাই উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল, যার সামনে শত কষ্ট-ক্লেশ কিছুই মনে হত না। তাই তো মরুভূমির উত্তপ্ত বালিতে বুকে পাথর চেপে রাখার কষ্টের চেয়েও “আহাদ” “আহাদ” শব্দের স্বাদ তার কাছে প্রবল ছিল।

وهل أنت إلا إصبع دميت * وفي سبيل الله ما لقيت
তুমি তো কেবল একটি আঙ্গুল, আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছ।
এই আঘাত তো আল্লাহর পথেই লাভ করেছো!

ইত্তেবায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম :

“তাযকিয়াতুন নফস” বা আত্মশুদ্ধির দ্বিতীয় স্তর হচ্ছে ইত্তেবায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মহা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পৃথিবীতে প্রেরণের মৌলিক কয়েকটি উদ্দেশ্যের একটি হচ্ছে এই “তাযকিয়া”। পবিত্র কোরআনে মহান রাব্বুল আলামীনের সুস্পষ্ট ভাষ্য—
كما أرسلنا فيكم رسولا منكم يتلو عليكم آياتنا ويزكيكم ويعلمكم الكتاب والحكمة ويعلمكم ما لم تكونوا تعلمون.
“যেমন আমি তোমাদের মাঝে রাসূল প্রেরণ করেছি তোমাদেরই মধ্য থেকে। যিনি তোমাদেরকে আমার আয়াত সমূহ পাঠ করে শুনান, তোমাদের আত্মার পরিশুদ্ধি করেন, তোমাদেরকে শিক্ষা দেন কিতাব এবং হিকমাহ, আর শিক্ষা দেন এমন কিছু যা তোমরা জানতে না।” (সূরা বাকারা: ১৫১)

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের প্রত্যেকটি মারহালাই ছিল “তাযকিয়াতুন নফস” এর এক একটি পাঠ। ঈমান, তাওহীদ, সবর, সততা, সহনশীলতা, চরিত্র মাধুরী সর্বক্ষেত্রেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন ছিল শিক্ষা। পবিত্র কোরআনে রাসূলুল্লাহর জীবনকে ‘উসওয়াহ’ বা অনুসরণীয় আদর্শ ঘোষণা করে ইরশাদ হয়েছে,
لقد كان لكم في رسول الله أسوة حسنة.
“তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর জীবনে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” (সূরা আহযাব: ২১)

সুতরাং মানুষের অন্তরের পরিশুদ্ধি কখনওই সম্ভব হবে না, যদি না জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হয় তার আদর্শ। ইত্তেবায়ে রাসূল হয় জীবনের প্রধান ব্রত। অতএব রাসূলের অনুসরণের বাইরে যারা তাসাউফ তালাশ করে, রাসূলের আদর্শকে ছেড়ে যারা ইশকে রাসূলের দাবি করে, তারা অবশ্যই ভণ্ড পথভ্রষ্ট।
قل إن كنتم تحبون الله فاتبعوني يحببكم الله.
বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহ তায়ালাকে ভালোবাস, তবে আমার অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন। (সূরা আলে ইমরান: ৩১)

ফরজ, ওয়াজিব এবং সুন্নাহ সমূহের পাবন্দি:

শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত প্রত্যেকটি ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাহ আত্মার পরিশুদ্ধির অন্যতম নিয়ামক। নফসের ‘তাযকিয়া’র ক্ষেত্রে এর বড় প্রভাব রয়েছে।
যেমন নামাজ : সকল ধরনের অশ্লীলতা এবং গুনাহের কাজ থেকে বিরত রাখে। পবিত্র কোরআনে সূরা আনকাবুতের ৪৫ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন,
وأقم الصلاة، إن الصلاة تنهى عن الفحشاء والمنكر.
“নামাজ যথাযথ আদায় করো, নিশ্চয়ই নামাজ সব ধরনের অশ্লীল ও অশোভনীয়  কাজ থেকে বিরত রাখে।”

অনুরূপভাবে যাকাত : অন্তরকে লোভ-লালসা আর কৃপণতার ব্যাধি থেকে মুক্ত করে। কোরআনের ভাষ্য-
خذ من أموالهم صدقة تطهرهم وتزكيهم بها.
“আপনি তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করুন, আর এর মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করুন।” (সূরা তওবা: ১০৩)
এমনিভাবে রোজা : পুরোটাই সাধনা আর আত্মশুদ্ধির সবক। তাই তো নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
من صام رمضان إيمانا واحتسابا، غفر له ما تقدم من ذنبه.
“যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখবে ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায়, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।” (বুখারী: ১৯০১)

একইভাবে হজ্ব : ইরশাদ হচ্ছে-
من حج هذا البيت فلم يرفث ولم يفسق، رجع كيوم ولدته أمه.
“যে ব্যক্তি এই ঘর (বাইতুল্লাহে) হজ্ব পালন করল, এবং কোন অশ্লীল ও পাপ কাজে জড়ায়নি, সে ঐ দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরল যেদিন তার মাতা তাকে প্রসব করেছেন।” (বুখারী: ১৮১৯)

এভাবে শরীয়তের প্রত্যেকটি আদেশ ও নিষেধ তাসাউফ বা তাযকিয়ার এক একটি সবক। শরীয়তের বিধি-বিধান যথাযথ পালনের মধ্যেই রয়েছে আত্মশুদ্ধির মূল উপাদান। তাসাউফ শরীয়তের বাহিরের কোন বিষয় নয়। আজ যারা তাসাউফের নামে শরীয়তের বাহিরে ভিন্ন কিছু প্রমাণ করতে চায়, নিঃসন্দেহে তারা গোমরাহ, পথভ্রষ্ট।

তাযকিয়ার জন্য বাইআতের আবশ্যকীয়তা কতটুকু?”

আত্মশুদ্ধির জন্য বাইআত বা কোন শায়খে তরীকত গ্রহণের আবশ্যকীয়তা কতটুকু? এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর বিষয়। এই স্থানটিতে অনেক বড় মানুষেরও পদস্খলন হয়। অনেকেই শিকার হন বিভিন্ন প্রান্তিকতার। হয়তো বাড়াবাড়ি, নয়তো ছাড়াছাড়ি। কেউ মনে করেন, ইসলামে বাইআত বা শায়েখে তরীকত বলতে কিছু নেই। আত্মশুদ্ধির জন্য কোরআন হাদীসই যথেষ্ট। এটা যেমন ছাড়াছাড়ি। অপর দিকে একদল লোক আছেন যারা বলেন, শায়খে তরীকত ছাড়া আত্মশুদ্ধি আদৌ সম্ভব নয়। এটা আরও মারাত্মক ভুল এবং বাড়াবাড়ি।

কেননা, পবিত্র কোরআনের স্পষ্ট ঘোষণা-
الۤمۤ ذَ ٰ⁠لِكَ ٱلۡكِتَـٰبُ لَا رَیۡبَۛ فِیهِۛ هُدࣰى لِّلۡمُتَّقِینَ.
“আলিফ-লাম-মীম। এটি এমন কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নেই। যা মুত্তাকীদের জন্য হেদায়েত।” (সূরা বাকারা: ১-২)
আরো এরশাদ হচ্ছে,
إِنَّ هَـٰذَا ٱلۡقُرۡءَانَ یَهۡدِی لِلَّتِی هِیَ أَقۡوَمُ.
“নিশ্চয়ই এই কোরআন সেই পথ প্রদর্শন করে, যা সর্বাপেক্ষা সরল।” (সূরা ইসরা: ৯)
এমনিভাবে হাদীসের মধ্যে এসেছে,
تَرَكْتُ فِيكُمْ أَمْرَيْنِ، لَنْ تَضِلُّوا مَا مَسَكْتُمْ بِهِمَا: كِتَابَ اللَّهِ، وَسُنَّةَ نَبِيِّهِ.
“আমি তোমাদের মাঝে দুই জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতদিন তা আঁকড়ে থাকবে পথভ্রষ্ট হবে না। তা হল, আল্লাহর কিতাব এবং তার রাসূলের সুন্নাহ।” (মুয়াত্তা মালেক: ২৬১৮)

এই সকল নুসূস থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, কোরআন ও সুন্নাহ সরল পথ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে সয়ংসম্পূর্ণ। যে কারো তাযকিয়া বা আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য যথেষ্ট। সুতরাং “শায়খে তরীকত ছাড়া আত্মশুদ্ধি আদৌ সম্ভব নয়” এ কথাটি কোনভাবেই শুদ্ধ নয়। এখন প্রশ্ন হল, তবে কি বাইআত বা শায়েখে তরীকত গ্রহণের কোনই প্রয়োজনীয়তা নেই? এই প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপন হয়েছে একটি চিঠি ও তার জবাবে। নিম্নে তার সার সংক্ষেপ তুলে ধরছি।

একটি চিঠি ও তার জবাব:
চিঠিটি লিখেছেন বিশিষ্ট ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইমাম শাতেবী রহ. (মৃত্যু: ৭৯০ হি.) সেই যুগের শ্রেষ্ঠ বুজুর্গ সুফি শায়েখ মুহাম্মদ বিন আব্বাদ আননাফজী রহ. (মৃত্যু: ৭৯২ হি.) এর কাছে।
চিঠিতে ইমাম শাতেবী রহ. জানতে চেয়েছেন যে, সুলূকের পথে অগ্রসর হতে চায় এমন ব্যক্তির জন্য কি একজন শায়েখে তরীকত গ্রহণ করা আবশ্যকীয়, নাকি শায়েখে তরীকত গ্রহণ না করে ইলম অর্জন এবং আহলে ইলমদের দিক নির্দেশনা অনুসরণ করেও সুলূকের পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব?

উত্তরে ইবনে আব্বাদ রহ. লিখলেন, সুলূকের পথে শায়েখ বা মুরুব্বি দুই ধরনের হয়ে থাকে। এক হচ্ছে তালীম ও তরবিয়ত উভয়টির শায়েখ। দ্বিতীয় হল, তরবিয়ত ছাড়া শুধু তালীমের শায়েখ।

শায়েখে-তরবিয়ত প্রত্যেক সালেকের জন্য আবশ্যক নয়। বরং যারা দূর্বল মনা, নিজের নফসের উপর নিয়ন্ত্রণ কম, কেবল তাদের জন্যই শায়েখে-তরবিয়তের প্রয়োজন। অপরদিকে শায়েখে-তালীম প্রত্যেক সালেকের জন্যই আবশ্যক।

তো দূর্বলমনাদের জন্য শায়েখে-তরবিয়ত বা শায়েখে-তরীকত গ্রহণের আবশ্যকীয়তার কারণ স্পষ্ট। কেননা তাদের অন্তরের পর্দা এত ভারি যে, কোন শায়েখে-তরবিয়ত বা মুরুব্বির তত্ত্বাবধান ছাড়া সে নিজে নিজে তা উপড়ে ফেলতে সক্ষম নয়। তারা হল দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীর মতো। দক্ষ ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া ব্যতীত যার আরোগ্য লাভ করা সম্ভব নয়।

আর যারা নিজের নফসের উপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণশীল, তাদের জন্য শায়েখে-তালীমই যথেষ্ট। শায়েখে-তালীমের কাছ থেকে শরয়ী জ্ঞান হাসিল করে সে নিজে নিজেই উদ্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সক্ষম। (শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ. তালীককৃত “রিসালাতুল মুস্তারশিদীন” ৩৮-৪০ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য।)

সুতরাং আত্মশুদ্ধির জন্য বায়আত বা শায়েখে-তরীকত গ্রহণেরও যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। আর এটা তো আহলে ইলম বা যারা ইলম অর্জনের পথে রয়েছেন তাদের জন্য। এর বিপরীত যারা সাধারণ মানুষ, ইলমের সাথে যাদের কোন সম্পর্ক নেই, তাদের জন্য কোন একজন হক্কানী পীর বা শায়েখের হাতে নিজেকে সঁপে দেয়ার কোন বিকল্প নেই।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে তাসাউফের হাকীকত বুঝা এবং এক্ষেত্রে আকাবির ও আসলাফের পথ ও মতের যথাযথ অনুসরণ করার তাওফীক দান করুন।

Facebook Comments

2 Comments

  1. জেড ইসলাম Reply

    লেখাটা কপি করতে চাইছিলাম বা সেভ করে রাখতে চাইছিলাম, কিন্তু এই সাইটে এই বিষয়গুলো বন্ধ করে রাখা হয়েছে। যা মোটেও ভাল কিছুর পরিচায়ক না এভাবে রেসট্রিকশন করে রাখা।
    খুশি হতে পারলাম না, বরং হতাশ হলাম।

    • সংকলন টিম Reply

      হতাশ হওয়ার কিছু নেই, কিছু কারণবশত এটা করেছি। আপনার কোন লেখা সংরক্ষণের প্রয়োজন হলে আমাদেরকে মেইল করতে পারেন, পিডিএফ দিতে চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: