ঈমানদীপ্ত দাস্তানের স্বরুপ সন্ধানে (পর্ব-১) | ইসমাইল রেহান

ঈমদানদীপ্ত দাস্তান-এর স্বরুপ সন্ধানে

সংক্ষিপ্ত অনুবাদ  : ইমরান রাইহান

(এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ রচিত ‘ঈমানদীপ্ত দাস্তান’ বইটি সম্পর্কে নতুন করে কিছু বলার নেই। ইসলামি ঘরানার পাঠকদের কাছে বৃহৎ আকারের এই ঐতিহাসিক উপন্যাস বেশ জনপ্রিয়। জনপ্রিয়তার দিক থেকে অন্য লেখকদের বইয়ের চেয়ে এই বইটি বেশি এগিয়ে কারণ, এর পাঠকরা অনেক সময় একে একটি ইতিহাসগ্রন্থই মনে করেন। বইয়ের পাতায় পাতায় লেখক মুসলিম ও অমুসলিম ঐতিহাসিকদের প্রচুর উদ্ধৃতি দিয়েছেন ফলে যে কেউ ভাববে এটি নিরেট ইতিহাসগ্রন্থ। অনেককেই দেখা যায়, এই বইয়ের তথ্যকে ইতিহাস হিসেবে উদ্ধৃত করে থাকেন। অথচ বাস্তবতা হলো এই বইয়ের ৯৫ ভাগ তথ্যই কাল্পনিক, ইতিহাসের সাথে এর সামান্যতম সম্পর্কও নেই। লেখক যেসব উদ্ধৃতি দিয়েছেন তার বেশিরভাগই বানোয়াট।

কিন্তু পাঠকরা এ সম্পর্কে সচেতন নয়। কাল্পনিক সাহিত্যকে যখন নিরেট ইতিহাস মনে করা হয় তখনই জটিলতার সুত্রপাত। আলতামাশ তার এই বইতে রেফারেন্সের নামে পাঠকের সাথে যে প্রতারণা করেছেন তা তুলে ধরা খুবই জরুরি। ইতিহাস ও কল্পনাকে পৃথক করে পাঠককে দেখানো দরকার, এই বইতে ইতিহাসের অংশ কতটুকু। জরুরী এই বিষয়টি নিয়েই কলম ধরেছেন পাকিস্তানের জনপ্রিয় ইতিহাস গবেষক মাওলানা ইসমাইল রেহান। তিনি রচনা করেছেন ‘দাস্তান ঈমান ফারুশোকি এক তাহকিকি জায়েজা’ শিরোনামে সুবিশাল এক গ্রন্থ। প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি এই বইয়ের নির্বাচিত অংশ অনুবাদ করবো। বিস্তারিত আলোচনা এড়িয়ে গিয়ে আলতামাশের তথ্য বিকৃতির মূল জিনিসগুলো সংক্ষেপে অনুবাদ করে দিব।

ইসমাইল রেহান আলোচনা করেছেন মূল উর্দু সংস্করণ “দাস্তান ঈমান ফারুশোকি’ সামনে রেখে। তবে আমি উদ্ধৃতির ক্ষেত্রে পরশমনি প্রকাশনের ‘ঈমানদীপ্ত দাস্তান’ সামনে রাখবো যেন সাধারণ পাঠক সহজে মিলিয়ে নিতে পারেন। আমরা যারা আলতামাশের লেখার মন্ত্রমুগ্ধ পাঠক, তারা এই লেখাগুলো পড়তে পারি কিংবা বন্ধুদের মধ্যে এমন কেউ থাকলে তার কাছে পৌঁছাতে পারি। —ইমরান রাইহান)

ঈমানদীপ্ত দাস্তান—একটি সামগ্রিক পর্যালোচনা

১৯৭৫ সালে মাসিক হেকায়াতে প্রকাশিত হয় দাস্তান ঈমান ফারুশোকি’র প্রথম পর্ব। হেকায়াত পত্রিকার সম্পাদক এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ ছিলেন এই সিরিজের লেখক। তিনি পাকিস্তানের একজন বিখ্যাত সাংবাদিক। কিছুদিন তিনি নসিম হিজাজির সাথে মিলে কাজ করেছিলেন। পরে তিনি আলাদা হয়ে হেকায়াত পত্রিকা প্রকাশ করেন। শুরু থেকেই আলতামাশ তার লিখনশৈলী দিয়ে পাঠককে মুগ্ধ করে ফেলেন। হেকায়াত পত্রিকাও দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ১৯৭৯ সালে এই সিরিজ সমাপ্ত হলে বই আকারে প্রকাশিত হয়। অল্পকদিনের মধ্যেই এর প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকে এই বইটি প্রকাশিত হতেই থাকে। পাকিস্তানের ইতিহাসে আর কোনো ইতিহাস কিংবা ঐতিহাসিক উপন্যাসের বই এতটা বিক্রি হয়নি।(১)

১৯৯৯ সালে আলতামাশ মারা গেলে হেকায়াত পত্রিকা আবার এই সিরিজটি ছাপা শুরু করে। এতে নতুন অনেক পাঠক তৈরী হয় এবং বইটির বিক্রি আবার বাড়তে থাকে। এই বইয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পাঠক এর প্রতিটি কথাকে সত্য মনে করে। নাসিম হিজাজি কিংবা আসলাম রাহির বইকে তারা ঐতিহাসিক উপন্যাস মনে করলেও আলতামাশের এই বইকে তারা ইতিহাসের এক গোপন নথি মনে করে।

বিস্তারিত আলাপে প্রবেশের পূর্বে আমরা মোটাদাগে ঈমানদীপ্ত দাস্তান সিরিজ সম্পর্কে মূল্যায়ন উপস্থাপন করবো, যেন পাঠক এক নজরে এর সমস্যাগুলো জানতে পারেন।

১। ঈমানদীপ্ত দাস্তানে বর্ণিত বেশিরভাগ ঘটনাই হয় বানোয়াট নয়তো ঐতিহাসিক বর্ণনার বিপরীত।

২। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবী ও নুরুদ্দিন জেংগির পক্ষ থেকে আমিরদের কাছে পাঠানো যেসব পত্রের কথা বইতে বর্ণনা করা হয়েছে সবগুলোই বানোয়াট।

৩। বইয়ে উল্লেখিত সুলতান আইয়ুবী ও তার আমিরদের সকল বক্তৃতা বানোয়াট।

৪। অনেক ক্ষেত্রে লেখক ঐতিহাসিকদের মতবিরোধ বর্ণনা করে নিজের মত উপস্থাপন করেছেন। বাস্তবতা হলো এসব ঘটনার বেশিরভাগই কাল্পনিক। এসব ঘটনা ঐতিহাসিকরা উল্লেখই করেননি, মতবিরোধ তো পরের কথা।

৫। সর্বশেষ খন্ডের শেষ ৫০/৬০ পৃষ্ঠা ব্যতিত সকল যুদ্ধের বর্ণনা, সেনাবিন্যাস, আহত নিহতদের সংখ্যা সবই কাল্পনিক।

৬। ইহুদি ও খ্রিস্টান তরুণী গোয়েন্দাদের ঘটনা, মুসলিম প্রশাসক ও সেনাদের ফাঁদে ফেলার গল্প সবই বানোয়াট ও কাল্পনিক।

৭। সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবির গোয়েন্দাবাহিনী ও এর প্রধান আলি বিন সুফিয়ানের সকল ঘটনা কাল্পনিক। আলি বিন সুফিয়ানও কাল্পনিক চরিত্র। বাস্তবে এমন কারো অস্তিত্ব ইতিহাসে ছিল না।

৮। সুলতানের সেনাবাহিনির বেশিরভাগ সেনাপতির নাম কাল্পনিক।

৯। বেশিরভাগ জায়গায় লেখক যেসব ইতিহাসগ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়েছেন তাতে এমন কোনো তথ্যই নেই। লেখক এখানে পাঠকের সাথে স্পষ্ট প্রতারণা করেছেন। তিনি নিজের মত একটি বানোয়াট ঘটনা লিখে ঐতিহাসিকদের নামে চালিয়ে দিয়েছেন।

১০। অনেক ক্ষেত্রে তিনি বানোয়াট সব গ্রন্থ ও ঐতিহাসিকের নাম লিখেছেন। এসব নামের কোনো ঐতিহাসিকের অস্তিত্বই ছিলনা কখনো। আবার কখনো এমন বইয়ের নাম লিখেছেন যা কখনো লেখাই হয়নি।

১১। পুরো ১৫০০ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসে শুধু শেষ ৮ পৃষ্ঠাতেই তিনি সঠিক রেফারেন্স দিয়েছেন এবং আমানতদারিতার সাথে তথ্য উদ্ধৃত করেছেন।

১২। লেখক পুরো বইয়ের ঘটনা বর্ণনা করেছেন বাইতুল মুকাদ্দাস জয় করা পর্যন্ত সময়কাল নিয়ে। এ সময় বড় যুদ্ধ খুব বেশি হয়নি। তবু তিনি নানা কাল্পনিক ঘটনা বানিয়েছেন। অপরদিকে তৃতীয় ক্রুসেডের মত বিশাল ঘটনা নিয়ে মাত্র ৩০ পৃষ্ঠা লিখেছেন।

১৩। রজব, ফইজুল ফাতেমি, জেনারেল নাজি, হাতিম আল আকবর, ফখরুল মিসরি, সিপাহসালার নাসির, আল বারাক, হাসান বিন আবদুল্লাহ, আহমাদ কামাল, হাদিদ, ইমাদ শামি, হাবিবুল কুদস, মুবি, আছেফা, বালিয়ান এই চরিত্রগুলো সবই কাল্পনিক।

১৪। বইয়ে বর্ণিত কথোপকথনগুলোর ৯৯ ভাগই মিথ্যা।

১৫। ক্রুসেডারদের বক্তৃতা ও পত্রগুলোও কাল্পনিক।

১৬। মুসলিম সেনা ও সেনাপতিদের একাংশের যে চিত্রায়ন (মদ ও নারী নিয়ে ব্যস্ত থাকা) করা হয়েছে বইতে ইতিহাসের সাথেও এর কোনো সম্পর্ক নেই। এটিও কাল্পনিক।

এবার দেখা যাক বইয়ের কোনো অংশগুলো সত্য ও ঐতিহাসিকভাবে প্রমানিত।

১। সিরিয়ার শাসক নুরুদ্দিন জেংগি ও মিসরের ফাতেমি শাসক আল আযিদ ঐতিহাসিক চরিত্র। তবে তাদেরকে ঘিরে যেসব গল্প বর্ণনা করা হয়েছে বইতে তার ৯৯ ভাগই মিথ্যা।

২। আল মালিকুল আদিল, তকিউদ্দিন উমর, ইবনু শাদ্দাদ, ফকিহ ঈসা আল হাকারি, নুরুদ্দিন জেংগির স্ত্রী রাজিয়া খাতুন, এরা প্রত্যেকে বাস্তব চরিত্র। তবে তাদেরকে নিয়ে লেখা ঘটনাগুলো বেশিরভাগই কাল্পনিক।

৩। ইমারাতুল ইয়ামানি ও মুজাফফর উদ্দিন বিন যাইনুদ্দিন এই দুজনের অস্তিত্ব ঐতিহাসিকভাবে প্রমানিত। দুঃখের বিষয়, মুজাফফর উদ্দিন ছিলেন একজন মুজাহিদ কিন্তু লেখক তাকে বানিয়ে দিয়েছেন গাদ্দার। অথচ এটি সম্পূর্ন বাস্তবতা বিবর্জিত।

৪। চতুর্থ ও পঞ্চম খন্ডে বাহাউদ্দিন ইবনু শাদ্দাদের বরাত দিয়ে যেসব তথ্য দেয়া হয়েছে তার কিছু অংশ সঠিক।

এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ—বহুরুপী এক ফেরিওয়ালা

হেকায়াত পত্রিকার সম্পাদক এনায়েতুল্লাহ একজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব। একজন কলামিস্ট ও সাহিত্যিক হিসেবে তিনি বেশ পরিচিত ছিলেন। এনায়েতুল্লাহ ছাড়াও তিনি আহমাদ ইয়ার খান, সাবের হুসাইন রাজপুত, মীম আলপ, আলতামাশ ইত্যাদি ছদ্মনামে লিখতেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন মুনকিরে হাদিস। ঈমানদীপ্ত দাস্তান যখন হেকায়াত পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তখন এর লেখকের নাম ছিল আলতামাশ। সিরিজের শুরুতে এনায়েতুল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে একটি ভূমিকা লেখেন। সেখানে তিনি লেখেন, ১৯৭৪ সালের শেষের দিকে মুহতারাম আলতামাশ সাহেব পাকিস্তানে আসেন এবং আমার সাথে দেখা করেন। আমি তার এই এহসান কখনো ভুলবো না।

এরপর তিনি আরো কিছু কথা লিখেন, যার খন্ডন সামনে আসবে ইনশাআল্লাহ।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট, এনায়েতুল্লাহ বলতে চাচ্ছেন তিনি ও আলতামাশ পৃথক ব্যক্তি। তিনি আলতামাশকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে যিনি জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন দেশে কিছুদিন অবস্থান করেছেন। পুরো বিষয়টিই বানোয়াট। আলতামাশ নামে কোনো ব্যক্তির অস্তিত্বই ছিল না কখনো। তাকে কেউ চেনে না, তার সম্পর্কে কেউ জানে না, অথচ তিনি লিখে ফেলছেন ১৫০০ পৃষ্ঠার এক গ্রন্থ। এটি কী করে সম্ভব। নিশ্চিতভাবেই বলা যায় এটি কারো ছদ্মনাম। এখন প্রশ্ন আসে এই ছদ্মনাম আসলে কার? তিনি কোথায় থাকতেন কী করতেন? এত সাড়া জাগানো একটি বই লেখার পরেও কেন তিনি সবার চোখের আড়ালে রয়ে গেলেন? তার সম্পর্কে হেকায়াত পত্রিকায় কোনো তথ্য এলো না কেন? যারা এনায়েতুল্লাহ রচিত বইগুলো পড়েছেন তারা জানেন আলতামাশ আর এনায়েতুল্লাহর লেখার ধরন একই।

এনায়েতুল্লাহর বইগুলোতেও তরুণী মেয়েদের ষড়যন্ত্র ইত্যাদি বেশ প্রকট করে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যেটা করা হয়েছে আলতামাশের বইতে। আলতামাশের লেখা পড়লেও বুঝা যায়, এই লেখকের হাত বেশ শক্ত। এটি মোটেও অখ্যাত কারো রচনা নয়। আলতামাশই যে এনায়েতুল্লাহ এর বড় প্রমান হলো জাহাংগির বুক ডিপো থেকে প্রকাশিত ‘দাস্তান ঈমান ফারুশোকি’র মলাটে আলতামাশের নাম থাকলেও ভেতরে লেখা থাকতো এনায়েতুল্লাহর নাম। একাধিক সংস্করণেই এমনটি হয়েছে যার ফলে এটি স্পষ্ট এনায়েতুল্লাহ আর আলতামাশ একই ব্যক্তি।

(চলবে)

টীকা

১। ভারতেও এই বইটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে। মাওলানা নুরুল হাসান রাশেদ কান্ধলভীও তার পাকিস্তান সফরে বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ভারতে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় আলতামাশের উপন্যাস।

Facebook Comments