আত্মশুদ্ধি

সুখ ও সৌভাগ্যের উৎস | শায়খ আলী তানতাবি রাহ

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

অনুবাদ: আবদুল্লাহ তালহা

একই যোগ্যতার দু‘জন ব্যক্তিকে দুটি বোঝা বহন করতে দেওয়া হলো। একজন এমন অবস্থা প্রকাশ করল যেন তার কাঁধে দুটি বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। আরেকজন মনের সুখে গান গেয়ে গেয়ে তার বোঝাটি বহন করে চলেছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে, তার কাঁধে কিছুই নেই।

অনুরূপ দেখা যায়, একই রকম দু‘জন ব্যক্তি অসুস্থ হয়েছে। রোগও অভিন্ন। একজনের মন অত্যন্ত ভারাক্রান্ত। ভয়ে সে শুকিয়ে গেছে। সে যেন শুধু মৃত্যুর অপেক্ষা করছে। সে দেহের চেয়ে মনের রোগে বেশি ভয়াবহভাবে আক্রান্ত হয়েছে। এই মহারোগ থেকে বাঁচতে পারছে না।

আরেকজনের অবস্থা হলো অসুস্থ হওয়া সত্বেও অত্যন্ত সবর ও ধৈর্যের সাথে রয়েছেন। সুস্থতার অপেক্ষা করছে। খুব দুআ-কান্নাকাটি করছে। এভাবে সে নিজে নিজেই সুস্থতার দিকে অগ্রবর্তী হচ্ছে। আর প্রথমজন যেন নিজেই নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।

আরেকটি উদাহরণ বলি। দুজন ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ডের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। একজন প্রচণ্ড ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছে। মৃত্যু-চিন্তায় তার আহার-নিদ্রা সব বন্ধ হয়ে গেছে। এভাবে লোকটি যেন মৃত্যুর আগেই হাজার বার মৃত্যুস্বাদ গ্রহণ করে নিচ্ছে।

আর দ্বিতীয়জনের কোনো ভাবান্তর নেই। সে নিজেকে সম্বরণ করে নিয়েছে। চিন্তাকে সঠিক করে নিয়েছে যে, যতই দুশ্চিন্তা আর দুঃখকে প্রশ্রয় দেই, এসব তো আমার মৃত্যু ঠেকাতে পারবে না। এই সু-চিন্তার কারণে তার জন্য যে উপকারটা হয়েছে, তা হলো মৃত্যুর আগে তাকে বারবার মরতে হচ্ছে না।

‘বাসমার্ক’ নামের একজন শক্ত সামর্থ্য মানুষ ছিলেন। যুদ্ধের ময়দানের সৈনিক। বীরযোদ্ধা। কিন্তু বেচারা ধুমপান ছাড়া এক মূহুর্তও অতিক্রম করতে পারত না। একটি সিগারেটের আগুনে আরেকটি ধরিয়ে নিত।এভাবেই তার দিন-রাত অতিবাহিত হতো। সিগারেটের ধোঁয়া না দেখলে যেন তার চিন্তাশক্তি স্থবির হয়ে পড়ত। একবার হলো কি….. যুদ্ধের মধ্যে তার সিগারেট শেষ হয়ে গেল। প্যাকেটে মাত্র একটি শলাকা। এই মূহুর্তে আরো শলাকার ব্যবস্থা করা যাবে না নিশ্চিত সে। সে চিন্তা করে দেখল, এই একটি মাত্র শলাকা এখুনি ফুরিয়ে ফেলা যাবে না, কোনো বড় সংকটে পড়ে গেলে ধরাবে। এভাবে এক হপ্তা পার হয়ে গেল, কিন্তু ধুমপান করার মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো না। পরবর্তীতে সে যখন দেখল, এভাবে ধুমপান ছাড়াও দীর্ঘদিন অতিবাহিত করা যায়, তখন থেকে ধুমপান ছেড়ে দিল। সারাজীবনের জন্য এই বদাভ্যাস ত্যাগ করল। বাসমার্ক চিন্তা করে দেখল, জীবনের সুখ বা সৌভাগ্যকে একটি ধম্র-শলাকার মোড়কে আটকে রাখার কোনো মানে হয় না।

বিশিষ্ট্য লেখক ও ইতিহাস গবেষক ‘শায়খ খাদারি’ শেষ বয়সে একটা মারাত্মক মনরোগে আক্রান্ত হলেন। সবসময় তাঁর মনে হতো, তার পেটে বোধহয় সর্প বিশেষ কিছু আছে। অনেক ডাক্তার-বদ্যি দেখালেন। সবাই তার রোগের কথা শুনে হেঁসেই শেষ। পেটে বলে সাপ হয়! ডাক্তারগণ তাঁকে বললেন, পেটে ছোটো ছোটো কৃমি হতে পারে। কখনো সাপ ঢুকতে পারে না । এ অসম্ভব। কিন্তু লেখক সাহেব তাদের কথা বিশ্বাস করতে পারলেন না। শেষমেষ তিনি একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের নিকট গেলেন। তিনি মানসিক রোগ সম্পর্কেও ভালো জ্ঞান রাখতেন। তিনি শায়খ খাদারির সব কথা মনযোগ দিয়ে শুনলেন। এরপর শায়খকে জোলাপ জাতীয় ‍ওষুধ খাইয়ে টয়লেটে ঢুকিয়ে দিলেন। আগে থেকেই ডাক্তার সাহেব টয়লেটে একটা মরা সাপ ফেলে রাখার ব্যবস্থা করেছিলেন। লেখক খাদারি সাহেব একটু সুস্থতা অনুভব করলে ডাক্তার তাকে সেই সাপ দেখালেন। তা দেখে তিনি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। দারুণ সুস্থতা অনুভব করতে লাগলেন । তার চেহারা আলোক-উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। পরমানন্দে তিনি বারবার ‘আলহামদু লিল্লাহ’ পড়তে লাগলেন।

দেখুন, এখানে বড় রোগ কোনটি?

বেচারা এতোদিন পর্যন্ত নিজেই নিজেকে অসুস্থ করে রেখেছিলেন। এজন্য দীর্ঘ সময় তাকে বেশ কষ্ট পেতে হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি বড় ধরনের আর কোনো রোগে আক্রান্ত হননি।

আসল ঘটনা হলো, শায়খ খাদারির পেটে কোনো সাপই ছিল না। থাকার প্রশ্নই নেই। সাপ ছিল তার মস্তিষ্কে। পরবর্তীতে যখন তিনি মানসিক শক্তি দিয়ে বুঝতে পারলেন সাপ চলে গেছে তখন সুস্থ হয়ে গেলেন। এই মানসিক শক্তিটা অনেক বড় জিনিস। এটাকে চিনতে হবে। তাহলে তা আপনার থেকে অনেক বিস্ময়কর বিষয় প্রকাশ করবে।

এই শক্তিটা লুক্কায়িত থাকে। ভয় বা আনন্দ একে জাগিয়ে তোলে। আপনাদের কারো কি কখনো এমনটি ঘটেনি যে, প্রচণ্ড ‍অসুস্থ অবস্থায় ঘুম থেকে উঠেছেন। শরীর ভারি হয়ে আছে। মাথা ঝিম ধরে আছে। এপাশ থেকে ওপাশ হতে পারছে না। এমন মূহুর্তে দেখলেন, একটি সাপ আপনার দিকে এগিয়ে আসছে। এখন কী করবেন? বিমুর্ষ হয়ে পড়ে থাকবেন! ঠিকই লম্ফ দিয়ে বিছানা থেকে উঠে পড়বেন। এক দৌঁড়ে বাড়ি, বাড়ির বারান্দা আর উঠোন পেরিয়ে চলে যাবেন রাস্তায়। তখন কি দেহের সেই অবসন্নতা থাকবে!!

আবার দেখবেন, এমন হয়েছে যে, একজন ব্যক্তি একেবারে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে অফিস থেকে ফিরেছে। প্রচুর ক্ষুধা তার পেটে। ঘুমে চোখ ঢুলুঢুলু। এখন দরকার একটি আরাম কেদারা, শরীরটা একটু এলিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিছুই করার মতো অবস্থা নেই। এমন সময় প্রিয় বন্ধুর মেসেজ এসে পৌঁছল, কিছুক্ষণের মধ্যে সে আসছে বা অফিসের মেনেজারের চিঠি এসে পৌঁছল যে, এখুনি অফিসে যেতে হবে। গেলে প্রমোশন হবে। তৎক্ষণাত সেই অবসন্নতা কি আর থাকবে! মোটেই থাকবে না। বরং পূর্বের চেয়ে আরো প্রফুল্লতা স্ফূর্তি অনুভব করবেন। তখনই দৌঁড় দিবেন স্টেশনের দিকে বন্ধুকে রিসিভ করতে বা অফিসে, প্রমোশন লেটার গ্রহণের জন্য।

এই মানসিক শক্তিটাই হলো প্রকৃত সুখ। এটাই সৌভাগ্যের উৎস। অনেক সময় প্রস্তর ফেটেও স্বচ্ছ সুপেয় পানি বের হয়। সেটা বের করার কৌশল জানতে হয়। অনুরূপ মন-মানসেও সুখের খাজানা থাকে। তা বের করার তরিকা জানতে হয়।
,
প্রিয় পাঠক! আপনি অনেক ধনী। কিন্তু আপনি যে সত্তাগত কত সম্পদের মালিক তা জানেন না। ফলে তার প্রতি উন্নাসিক হয়ে, তাচ্ছিল্যতাবশত তা নষ্ট করে ফেলছেন।

আপনাদের কারো যখন খুব মাথা ব্যথা, পেট ব্যথা বা দাঁত ব্যথা হয় তখন সে সামনে দুনিয়া অন্ধকার দেখে। কিন্তু আমার কৌতুহল হলো, যখন সে সুস্থ ছিল কেন তখন দুনিয়াকে উজ্জ্বল শুভ্ররূপে দেখল না!!

এখন অসুস্থতার কারণে বেচারা এক লোকমা খাবার খেতে পারে না বা এক টুকরো রুটি মুখে দিতে পারে না। এখন সে কাউকে খেতে দেখলে হিংসায় মরে যায়। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো, যখন সুস্থ ছিল তখন কেন এসব খাবারের প্রতি যথাযোগ্য মূল্যায়ন করেনি!
আসল সমস্যা হলো, যখন নেয়ামত থাকে তখন আমরা নেয়ামতের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করি না!

আর যখন তা হাতছাড়া হয়ে যায় তখন কেন আফসোস করি!!
কেন বৃদ্ধ তার যৌবনের জন্য আফসোস করে! কেন যুবক চাঞ্চল্যময় যৌবন পেয়েও এই নেয়ামতের জন্য আনন্দিত হয় না!!
কেনই বা আমরা সৌভাগ্য বা সুখ হারিয়ে গেলে তার জন্য আফসোস করি। আমরা যখন নেয়ামতের মধ্যে ডুবে থাকি তখন কেন তা অনুভব করি না! প্রত্যেকেই অতীতের জন্য আফসোস করে। হাতছাড়া হয়ে যাওয়া নেয়ামতের জন্য কান্নাকাটি করে। তাহলে কেন বর্তমান হাতছাড়া হওয়ার আগেই এর মূল্যায়ন করি না !!
,
সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! আমরা মনে করি ধন-সম্পদই সুখ ও সৌবাগ্যের মূল। আসলে কি তা বাস্তব!
আপনারা কি সেই রাজার গল্পটা শুনেছেন, যে অত্যন্ত অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়িত। তাঁর কাছে হাজির করা হয়েছে নানান পদের সুস্বাদু খাবার। কিন্তু সে কিছুই খেতে পারছে না। এমন সময় বাতায়নের ফাঁক গলিয়ে তার দৃষ্টি পড়ল, বাগানের মালীর উপর। বেচারা সামান্য তেল মাখিয়ে রসিয়ে রসিয়ে রুটি খাচ্ছে। একটি লোকমা মুখে পুরতেই আরেকটি তুলে আনছে ঠোঁটের কাছে। তখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত রাজা আফসোস করে বলছেন, যদি এই মালীর মতো হতে পারতাম!!

কেন ! কেন আপনি আপনার সুস্থতাকে বিরাট নেয়ামত মনে করেন না? সুস্থতার এই নেয়ামতের জন্য কি কোনো পয়সা ব্যয় করতে হয়!আপনাকে যদি এখন হাজার ডলার দেওয়া হয় তবু কি আপনি একটি চোখ দান করবেন?

ঐ লোকটির গল্প কি আপনা জানা আছে, যে হারিয়ে গেল ধু ধু মরভূমির মধ্যে। ক্ষুতপিপাসায় মরার দশা। এমন সময় দেখল, একটি ছোট্টো জলাশয়। তার পাশে একটি চামড়ার ব্যাগও রাখা আছে। আশ মিটিয়ে বেচারা পানি পান করল। এরপর সে কিছু খেজুর বা খাদ্যের আশায় ব্যাগটা খুলল। ব্যাগের মধ্যে দৃষ্টি পড়তেই সে চরম হতাশ হয়ে পড় গেল। ব্যাগভর্তি স্বর্ণ। কিন্তু, চতুর্পাশে কোনো খাবার নেই। এক সময় সে ক্ষুধায় মরে গেল।

আরেক লোকের গল্প। ঘটনাচক্রে সে কদরের রাত পেয়ে গেল। সেই রাতে সে খুব করে আল্লাহর কাছে দোয়া করল, আল্লাহ যেন এমন ফায়সালা করেন যে, সে যা-ই স্পর্শ করবে তা সোনা হয়ে যাবে। আল্লাহ তার দোয়া কবুল করলেন। কিন্তু…. কিন্তু বেচারা পড়ে গেল মহা বিপদে। যাতেই তার হাত লাগে তা স্বর্ণ হয়ে যায়। কিছুই খেতে পারে না সেই। পানির গ্লাস ধরলেও তা হয়ে যায় স্বর্ণ। দুঃখে একবার সে তার মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। তৎক্ষণা মেয়ের দেহ স্বর্ণে পরিণত হয়ে যায়।

এখন সে দোয়া কান্নাকাটি শুরু করে দিল, যেন এই বিপদ আল্লাহ তার থেকে দূর করে দেন।

জনৈক রাজার ঘটনা আছে। একবার সে তার ধনভান্ডারে প্রবেশ করল। এমন সময় দরজা হয়ে গেল বন্ধ। এক সময় বেচারা রাজা জলখাবার না পাওয়ায় সেখানেই মরে পড়ে রইল।

কেন ভাই! কেন স্বর্ণ-রূপার লোভ করেন। আপনি নিজেই তো কত শত স্বর্ণ-রূপার মালিক হয়ে বসে আছেন। দৃষ্টিশক্তি, সুস্থতা, সময়- এগুলো কি স্বর্ণ-রূপার চেয়েও দামী নয়? কেন আমরা আমাদের সময় ও সুস্থতাকে কাজে লাগাই না! জীবনের মূল্য কেন আমরা উপলব্ধি করি না।

মাসখানেক আগে একটি পত্রিকা আমার কাছে একটি লেখা চায়। আমি গড়িমসি করতে থাকি। এই লিখি লিখব করতে করতে অতিবাহিত হয়ে যায় অনেক দিন ও সময়। অনেকগুলো দিন অতিবাহিত হলেও আমি সে সময়গুলো কোনো কাজে লাগাতে পারলাম না। বিষয়টা এমন হলো যে, বিরাট একটা বাক্স আছে, কিন্তু ভেতরটা পুরাই ফাঁকা। দেখতে দেখতে লেখা জমা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসল। হাতে মাত্র একদিন। এখন সময়কে কাজে লাগানোর জন্য উঠেপড়ে লাগলাম। তখন একেকটা মিনিট আমার নিকট হয়ে গেল এক ঘন্টার মতো। ঘন্টা হয়ে গেল দিনের মত। এখন এই একদিনই যেন হয়ে গেল হিরা-মানিকভর্তি একটি কৌটার মতো। এখন প্রতিটি মূহুর্তই আমি কাজে লাগাতে চাচ্ছি। এমনকি লেখাটির একটি বড় অংশ লিখে ফেললাম বাসস্টপেজে বসে। অথচ আমি মানুষের ভিরে বসে ট্রামের অপেক্ষা করছি। এই সময়টুকু আমার নিকট সেই দিবসগুলোর চেয়েও বেশি বরকতময় মনে হতে লাগল। এখন হাতছাড়া হওয়া প্রতিটি দিনের জন্য আফসোস করতে লাগলাম। প্রতিদিনই তো আমি এই একই স্থানে ঘন্টাখানেকের চেয়ে বেশি সময় বসে ট্রামের অপেক্ষা করেছি। সেই দিনগুলোতে যদি এই সময়টুকুতেও লেখাটি নিয়ে চিন্তা-ফিকির করতাম তাহলে এতোটা পেরেশানিতে পড়তে হতো না। আরো অনেক কিছু চিন্তা করে লিখতে পারতাম!

প্রিয় বন্ধু অধ্যাপক ‘বাহজাহ আল বাইতার’ দীর্ঘদিন হলো দিমাশক ও বইরুতের মধ্যে সফর করেন। এসব জায়গায় কয়েকটি কলেজ ও স্কুলে ক্লাস করান। তো চলতি পথে ট্রেনে তিনি ইমাম কাসেমির ‘কাওয়াইদুদ তাহদীস’ কিতাবটিতে নযর বুলাতে থাকেন। পরবর্তীতে এই নযর বুলানোর সময়ে তিনি কিতাবটিতে যে তালীক-তাখরীজ করেছেন তা সহ কিতাবটি পুনর্মুদ্রণ করা হয়।

ফিকহে হানাফির সর্বশেষ ফকীহ ইবনে আবেদিন শামী সর্বদাই অধ্যয়ন করতেন। এমনকি ওযু করার সময় বা খানা খাওয়ার জন্য যখন বসতেন তখন কোনো শাগরেদকে নির্দেশ দিতেন কিতাব শোনানোর। আর এভাবেই তিনি তাঁর সুবিখ্যাত ফতোয়াগ্রন্থ ‘হাশিয়া’ (হাশিয়া ইবনে আবেদিন) রচনা করেন। ইমাম সারাখসি তো আরো বিস্ময়কর কাজ করেছেন। জেলে বন্দী থাকা অবস্থায় পৃথিবীবিখ্যাত বৃহৎতম ফিকহের কিতাব ‘আল মাবুসত’ রচনা করেছেন।

এজন্য যারা সময় সংকীর্ণতার অভিযোগ করে, আমি তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হই। সময় কি নিজে নিজে সংকীর্ণ হয়ে যায়? না।
তা তো সংকীর্ণ হয় আমার আপনার গাফলতি আর উদাসিনতায়।

একটু চিন্তা করে দেখুন, একটি ছাত্র পরীক্ষার সময় কত পড়ে। রাত নেই, দিন নেই শুধু পড়া আর পড়া। আমি চিন্তা করি, এমন পড়া যদি কেউ প্রতিদিন নয়, প্রতি সপ্তাহে একবার পড়ে তাহলে সে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আল্লামা হয়ে যাবে।

আপনি হাজার হাজার পৃষ্ঠা রচনাকারী ‘ইবনুল জাওযি’ ‘তাবারি’ ‘সুয়ুতি’ ‘জাহিজ’সহ সালাফদের দিকে লক্ষ্য করুন। একটিবার ‘নিহায়াতুল আরাব’ বা ‘লিসানুল আরব’এর মতো কিতাবের দিকে দৃষ্টিপাত করুন। কেউ কি এখন এই কিতাবগুলো সম্পূর্ণটুকু অধ্যয়ন করতে সাহস করতে পারবে!- এমন একটি কিতাব নিজ থেকে রচনা করা তো দূরের বিষয়।

চিন্তা করে দেখুন তো, মানব মস্তিষ্ক কি বিরাট সম্পদ নয়। এটা কি সীমাহীন মূল্যবান নয়। আমরা কেন মস্তিষ্ককে কাজে লাগাই না! যদি মস্তিষ্ককে কাজে লাগাই তাহলে বিস্ময়কর অনেক কিছুর জন্ম দিবে।
আমি অনেক দার্শনিক বা আবিস্কারকের কথা বলছি না।

আপনাদেরকে খুব নিকটের সহজ কিছু উদাহরণ দেই। আপনারা নিশ্চয় ইমাম বুখারী রহ,এর কথা শুনেছেন। একবার তাঁকে প্রায় শ‘খানেক হাদিস সনদ – মতন এলোমেলো করে পরীক্ষা করা হল। কিন্তু তিনি সবগুলো হাদিসের সঠিক সনদ ও মতন উল্লেখ করে বলে দেন।

ইমাম শাফেয়ী রহ. ইমাম মালেক রহ.এর দরসে বসে মনযোগ সহকারে সব আলোচনা শুনতেন। এরপর মুখস্থ শক্তি থেকে সেসব খাতায় তুলে নিতেন। আপনি যদি ‘আসমায়ি’ ও ‘হাম্মাদ রাবিয়া’ এবং তাদের মুখস্থ কবিতা শোনেন, আপনি যদি ইমাম আহমাদ ও ইবনে মাঈনের বর্ণনাকৃত হাজার হাজার হাদিসের দিকে লক্ষ্য করেন বা এ ধরনের ব্যক্তিত্বদের কর্ম ও কীর্তির দিকে দৃষ্টিপাত করেন তাহলে হতবাক হয়ে যান!

অথচ চিন্তা করলে দেখবেন আপনার মাঝেও এমন যোগ্যতা আছে। কিন্তু সেই যোগ্যতাকে আপনি কাজে লাগান না।
একটু ভেবে দেখুন তো, কত মানুষের নাম আপনার মুখস্থ। কত স্থানের নাম, পেপার-পত্রিকা, নোবেল-সিনেমার নাম আপনার জানা। কত শত প্রকারের খাবার আপনে চেনেন। অনুরূপ নিত্যদিনের কত গল্প-ঘটনা আপনার মস্তিষ্কে আছে। যদি এসব বাতিল আর অর্থহীন বস্তুর জায়গায় আপনি নির্ভেজাল ইলম রাখতেন তাহলে আজ যাদের কথা আমরা আলোচনা করছি, আপনিও তাদের কাফেলার একজন হয়ে যেতে পারতেন।
‘ফারুক কফিঘরে’ এক ওয়েটারকে চিনতাম। সেখানে সে প্রায় বিশ বছর কাজ করছে। বিকালে যখন শ‘খানেক চা-কফি প্রেমী আসত তখন সে একসাথে সবার ওর্ডার নিত। কেউ মিষ্টি কফি খাবে তো কেউ সুগার-ফ্রী কফি খাবে। কেউ বা রং চা পান করবে, আর কেউ পান করবে দুধ চা। ঠিকই সে একসাথে সবার ওর্ডার নিয়ে ঠিক ঠিক সবার কাছে সেই বস্তু নিয়ে আসত। একটুও ভুল হতো না তার।
প্রিয় পাঠক! যা বলছিলাম……..। নিশ্চয় সুস্থতা, সময় ও মস্তিষ্ক অনেক মূল্যবান সম্পদ। যে ব্যক্তি সফলতা অর্জন করতে চায় তার জন্য এসব হলো চাবিকাঠি।

মনের সুখ-শান্তির জন্য আরেকটি মৌলিক ভিত্তি হলো ঈমান। ঈমান ক্ষুধার্তকে তৃপ্ত করে। গরিবকে ধনী করে। দুঃখ-জর্জরিত ব্যক্তিকে সান্ত্বনা দেয়। দুর্বলকে শক্তিশালী করে। কৃপণকে দানশীল বানিয়ে দেয়। সর্বোপরি ঈমান মানুষকে জীব-জন্তুর স্তর থেকে মানব-স্তরে উন্নীত করে। আপনি আপনার চেয়ে জ্ঞানে-গুণে, পোস্ট-পজিশনে উপরের লোকদের দিকে তাকান, তাহলে দেখতে পাবেন তাদের চেয়ে নিম্নস্তরে থেকেও আপনি অনেক সুখে শান্তিতে আছেন।
.
একটু গভীরভাবে ভাবলে আপনি অনুভব করতে পারবেন, আগেকার যুগের আমীর উমরাদের চেয়েও আপনি অনেক সুখে আছেন। বাদশাহ হারুনুর রশিদ কুপির আলোতে কাজ করতেন। রাতে ঘুমানোর সময় তার মাথার উপরে পাখা ঘুরতো না। তার যানবাহন ছিল উট-ঘোড়া। অথচ এই যুগে আপনি বিদ্যুতের সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে ঘুমাতে পারছেন। চলতে পারছেন অত্যাধুনিক সব যানবাহনে। তাদের দিমাশক থেকে মক্কা যেতে এক মাস লেগে যেত, সেখানে আপনি চলে যেতে পারছেন মাত্র কয়েক ঘন্টায়।
,,
সম্মানিত পাঠক! আমার লেখার সারকথা হলো, আপনারা সকলেই সৌভাগ্যের অধিকারী। কিন্তু আপনারা অনেকেই তা উপলব্ধি করতে পারেন না। আপনার মাঝে যে সম্পদ আল্লাহ নেয়ামত হিসেবে দিয়ে রেখেছেন তা যদি সময়মতো কাজে লাগাতে পারেন তাহলে সৌভাগ্য নিজ থেকে এসে আপনাকে ধরা দিবে। সুখ-শান্তির দুয়ার এমনিতেই উন্মুক্ত হয়ে যাবে। যদি সুখ অনুভব করতে চান তাহলে নিজের দিকে তাকান। মানুষের দিকে তাকাবেন না। নিজের দিকে তাকিয়ে যখন আল্লাহকে নিয়ে ভাববেন, তাঁর প্রতিটি নেয়ামতের কথা স্মরণ করে শুকরিয়া আদায় করবেন এবং বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করবেন তখন আপনি হতে পারবেন দুনিয়ার সবচেয়ে সফল, সুখী ব্যক্তি। মানসিক দিক থেকে সুস্থ সবল মানুষ। আর এ পথেই আপনি দুনিয়া ও আখেরাত- উভয় জাহানে প্রভূত কল্যাণ লাভ করতে পারবেন। ইনশাআল্লাহ।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: