ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর দরবারবিমুখতা | মাহমুদ সিদ্দিকী

ইমাম আবু হানিফা রহ. এর দরবারবিমুখতা

ইমাম আবু হানিফা রাহমাতুল্লাহি আলাইহি। খলিফা, আমির-উমারা ও রাজকীয় দায়-দায়িত্বকে সবসময় পরিহার করে চলতেন। এই ব্যাপারে এতটাই দৃঢ়চেতা ছিলেন যে, বিচারপতির দায়িত্ব গ্রহণ না করার অভিযোগে কারাবরণ করেছেন, নির্যাতন সহ্য করেছেন। মৃত্যুও কারাগারেই হয়েছে। কেন এত দৃঢ়ভাবে এসব থেকে বেঁচে থাকতেন, এত বেছে চলতেন? নিচের ছোট্ট ঘটনাটা থেকে এর উত্তর পাওয়া যাবে।

‘খারিজা ইবনে মুস’আব বলেন- একবার খলিফা মনসুর আবু হানিফার জন্য দশ হাজার দিরহাম উপঢৌকনের ব্যবস্থা করেছেন। উপঢৌকন গ্রহণ করবার জন্য আবু হানিফাকে খলিফার দরবারে ডাকা হলো। তো, তিনি আমার সাথে পরামর্শ করলেন। বললেন- খলিফা এমন এক ব্যক্তি, যদি তার উপঢৌকন সরাসরি প্রত্যাখ্যান করি, তাহলে চটে যাবেন। আর যদি তা গ্রহণ করি, তাহলে আমার দ্বীনদারিতে এমন সব বিষয় অনুপ্রবেশ করবে, যা আমি অপছন্দ করি। (বলুন তো, এখন কী করা যায়?) আমি তাকে পরামর্শ দিলাম- এত অর্থ খলিফার চোখে বিরাট কিছু। যখন আপনাকে উপঢৌকন গ্রহণের জন্য দরবারে ডাকা হবে,তখন বলবেন- খলিফার কাছে আমার এটা আশা ছিল না। পরামর্শ মোতাবেক আবু হানিফা খলিফার দরবারে এই কথা উত্থাপন করলে মনসুর উপঢৌকন প্রদান থেকে বিরত রইলেন।’

কারণটা ইমাম আযম স্পষ্টভাবেই বলে দিয়েছেন- ‘আর যদি তা গ্রহণ করি, তাহলে আমার দ্বীনদারিতে এমন সব বিষয় অনুপ্রবেশ করবে, যা আমি অপছন্দ করি।’

এজন্য মৃত্যু অবধি তিঁনি খলিফা ও খেলাফতকে পাশ কাটিয়ে চলেছেন। কখনো কোনো উপহার-উপঢৌকনও গ্রহণ করেননি।
‘আবু হানিফার বিশিষ্ট ছাত্র ইমাম হাসান ইবনে যিয়াদ বলেন- আবু হানিফা কখনো এদের কারুর কাছ থেকে কখনো কোনো পুরস্কার বা উপঢৌকন গ্রহণ করেননি।’ (১)

এই-জাতীয় ঘটনা আমাদের সালাফদের মধ্যে অসংখ্য রয়েছে।
ইমাম লাইছ ইবনে সা’দ। দ্বিতীয় হিজরি শতাব্দীর ফকিহ ও মুহাদ্দিস। থাকতেন মিশরে। মিশরের মানুষ যেকোনো ফতওয়া ও হাদিসের জন্য তাকিয়ে থাকতেন তাঁর দিকে। বুখারি-মুসলিমসহ হাদিসের নির্ভরযোগ্য কিতাবাদি ইমাম লাইছের রেওয়ায়েতে ভরপুর। ইরাকে গেলে খলিফা তাকে মিশরের প্রতিনিধি হওয়ার প্রস্তাব করেন। লাইছ বিনয়ের সাথে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। সেই ঘটনা নিজে ছাত্রদেরকে জানান।

‘ইমাম লাইছ ইবনে সা’দ বলেন- আবু জাফর আমাকে বললেন, আপনি আমার পক্ষে মিশরের দায়িত্ব গ্রহণ করুন। আমি বললাম, আমিরুল মুমিনিন, আমি এ কাজের পক্ষে দুর্বল। আমি একজন আজাদকৃত গোলাম। আবু জাফর বললেন, আপনার মধ্যে কোনো দুর্বলতা নেই। বরং এই দায়িত্ব গ্রহণ করার ব্যাপারে আপনার নিয়ত দুর্বল।’ (২)

দুটো ঘটনাই হিজরি দ্বিতীয় শতাব্দীর। ইমাম আবু হানিফার ওফাত ১৫০ হি. আর ইমাম লাইছের ওফাত ১৭৫ হি. তে। ইতিহাসের পাতায় ইসলামী খেলাফতের কথাই সেই সময়ে লেখা। এত আগে, খায়রুল কুরুনের এত কাছাকাছি সময়ে যখন খেলাফত ও ক্ষমতাযন্ত্রের বিষয়ে এই মু’আমালা- যদি ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম লাইছ থাকতেন বর্তমানে, গণতন্ত্র ও ক্ষমতাতন্ত্রের বিষয়ে তাদের মু’আমালা কেমন হত? সে-যুগে এবং এ-যুগে- উভয় যুগেই সবচেয়ে সত্য যে বিষয়টি তা হলো- রাষ্ট্র ও ক্ষমতা উলামাদেরকে চায় নিজের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করতে। যারাই এই নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন তাদের ক্ষেত্রেই ইমাম আযমের এই কথার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে- ‘আর যদি তা গ্রহণ করি, তাহলে আমার দ্বীনদারিতে এমন সব বিষয় অনুপ্রবেশ করবে, যা আমি অপছন্দ করি।’
তখন কিছু করার থাকে না। করার কেবল বাকি থাকে আফসোস আর আক্ষেপ।

(১) মানাকিবুল ইমাম আবি হানিফা ওয়াসাহিবাইহি আবি ইউসুফ ওয়া মুহাম্মদ ইবনিল হাসান আশ-শাইবানি, ইমাম যাহাবি ২৬ পৃ.
(২) -ওয়াফায়াতুল আ’ইয়ান, ইবনে খাল্লিকান ৪/১২৯-১৩০ পৃ.

Facebook Comments