প্রতিযোগিতা-১

আমার আইডল | মনিরুজ্জামান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

১.

আমার আইডল কোনো গায়ক, নায়ক, খেলোয়াড় হতে পারে না। আমার আইডল হবেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌; যার আদর্শ‌ই সর্বোত্তম। আসুন, আজ তাঁর কিছু বৈশিষ্ট্য জেনে নিই।

১) তিনি ছিলেন সর্বোত্তম চেহারার ও সর্বোত্তম শারীরিক কাঠামোর অধিকারী। তিনি খুব বেশি খাটো‌ও ছিলেন না,আবার খুব বেশি লম্বা ও ছিলেন না। (বুখারী:৩৫৪৯, মুসলিম:২৩৩৭)।

২) তাঁর দেহ ছিল খুব আকর্ষণীয়। আর তাঁর চুল বেশি কোঁকড়ানো কিংবা একেবারে সোজাও ছিল না। তিনি ছিলেন গৌরবর্ণের। পথ চলতে তিনি সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে চলতেন।(শারহুস‌ সুন্নাহ:৩৬৪০)।

৩) তিনি ছিলেন পূর্ণিমার চাঁদের থেকেও সুন্দর। (মিশকাত‌ ৫৭৯৪)।

২.

আজ আমার আইডল তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ কে নিয়ে আরো কিছু কথা জানব ইনশাআল্লাহ।

১) তিনি ছিলেন শুভ্রকায় ও লাবণ্যময় । (সহিহ মুসলিম:৬২১৮)।

২) আনাস (রা:) বলেন, রাসূল  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর করতল অপেক্ষা অধিকতর কোমল কোন পুরু বা পাতলা রেশম আমি স্পর্শ করিনি। আর তাঁর শরীরের সুগন্ধ অপেক্ষা অধিকতর সুগন্ধ কোন বস্তু আমি কখনো শুঁকিনি।(বুখারী ১৯৭৩, মুসলিম ৬২০০)।

৩) তাঁর দু কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান প্রশস্ত ছিল।। মাথার চুল কানের লতি পর্যন্ত লম্বা ছিল। (বুখারী:৩৫৫১)।

৪) আরেক বর্ণনা মতে, তাঁর মাথার চুল ছিল দুই কানের মধ্যভাগ পর্যন্ত লম্বা। (নাসাঈ‌:৫২৩৪)।

৫) তাঁর পৃষ্ঠদেশের উপর এক টুকরো বাড়তি গোশত ছিল। যাকে বলা হয় মোহরে‌ নবুওয়াত। (সিলসিলা সহীহাহ:২০৯৩)।

৬) তাঁর মোহরে নবুওয়্যাত ছিল মুষ্টিবদ্ধ আঙুলের ন্যায়। (শামায়েলে তিরমিযী:১৮)।

৩.

আজ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এর পোশাক সম্পর্কে কিছু information জানব ইনশাআল্লাহ।

১) তাঁর সবচেয়ে পছন্দনীয় পোশাক ছিল জামা। (ইবনে মাজাহ‌:৪০২৭)। আরেক বর্ণনা মতে, তাঁর সর্বাধিক প্রিয় কাপড় ছিলো ইয়ামানে তৈরি চাদর হিবারা‌। (বুখারী:৫৮১৩)।

২) তিনি সাদা কাপড় পরিধান করতে এবং সাদা কাপড় দিয়ে দাফন দিতে উৎসাহিত করেছেন। (নাসাঈ‌:৫৩২৩)।

৩) তিনি সবুজ চাদর পরিধান করতেন। (নাসাঈ‌:১৫৭২)। এছাড়া, তিনি লাল রঙের নকশী চাদর পরিধান করতেন বলেও এক হাদিসে পাওয়া যায়। (মুসলিম:১১৪৭)।

৪) তিনি একটি আংটি তৈরি করিয়েছিলেন,যার বৃত্ত ছিল রৌপ্যের। এতে ‘মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ অঙ্কিত ছিলো। (মুসলিম:৫৬০৩)। তিনি ডান হাতে আংটি পরিধান করতেন। (আবু দাউদ:৪২২৮)।

৫) তিনি মোটা লুঙ্গি পরিধান করতেন। (বুখারী:১৮৫৮)।

৬) তিনি কালো পাগড়ি পরিধান করতেন। (মুসলিম:৩৩৭৫)।

৭) তিনি কালো রঙের মোজা পরিধান করতেন। (আবু দাউদ:১৫৫)।

৮) তিনি চামড়ার জুতা পরিধান করতেন। (বুখারী:৩১২৭)। তাঁর প্রতিটি জুতায় দুটি করে ফিতা ছিল। (ইবনে মাজাহ:৩৬১৪)।

৪.

আজ আমার আইডল তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এর খাওয়া দাওয়া ও পানাহারের পদ্ধতি সম্পর্কে জানব ইনশাআল্লাহ।

১) তিনি তিন আঙ্গুল দিয়ে আহার করতেন।(মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা‌:২৪৯৫৫)।

২) তিনি ঠেস দিয়ে কিংবা হেলান দিয়ে আহার করতেন না। (ইবনে হিব্বান:৫২৪০)। এছাড়া, তিনি টেবিল জাতীয় উঁচু স্থানে বসে আহার করতেন না। (বুখারী:৫৬১৫)।

৩) তিনি মুরগী খেতেন। (মুসলিম:৪৩৫৪)।

৪) তিনি লাউ খুব পছন্দ করতেন। (শরহুস সুন্নাহ:২৭৬১)।

৫) তিনি মিষ্টি ও মধু খুব পছন্দ করতেন। (বুখারী:৫৪৩১)।

৬) তিনি বকরীর‌ পাঁজরের ভুনা গোশত পছন্দ করতেন। (নাসাঈ‌:১৮৩)। তিনি বকরীর সামনের উরুর‌ তথা রানের গোশত পছন্দ করতেন। (বুখারী:৪৭১২)। তিনি বকরীর কাঁধের গোশত‌ও খেয়েছেন বলে হাদিসে পাওয়া যায়। (বায়হাকী:৭০১)।

৭) তিনি শুকনো রুটি ও সিরকা খেতেন। (মিশকাত:৪২২২)।

৮) তিনি চর্বিযুক্ত খাবার‌ও আহার করেছিলেন বলে হাদিসে পাওয়া যায়। (ইবনে মাজাহ:৩৪৪২)।

৯) তিনি কাঁচা খেজুরের সাথে শসা খেতেন। (মুসলিম:৫৪৫১)। এছাড়া, তিনি তাজা খেজুরের সাথে তরমুজ খেতেন। (আবু দাউদ:৩৮৩৮)।

১০) তিনি পানি পান করার সময় তিন নিঃশ্বাসে পান করতেন। (বুখারী:২৫)।

৫.

আজ আমার আইডল তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এর বাচনভঙ্গি, হাসি, কৌতুক সম্পর্কে জানব ইনশাআল্লাহ।

১) তিনি তাড়াতাড়ি এবং একনাগাড়ে বলতেন না। বরং, ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে কথা বলতেন। সবাই তাঁর কথা বুঝতে পারতো। (শরহুস‌ সুন্নাহ:৩৬৯৬)।

২) তিনি গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা তিনবার বলতেন। (মুজামুস‌ সগীর‌:৯১২১)।

৩) তিনি অধিকাংশ সময় নীরব থাকতেন। বিনা প্রয়োজনে কোনো কথা বলতেন না। (শুয়াবুল‌ ঈমান:১৩৬২)।

৪) তিনি ব্যাপক অর্থবোধক বাক্যালাপ করতেন। তাঁর কথাবার্তা অধিক বিস্তারিত ও ছিল না আবার অধিক সংক্ষিপ্ত‌ও ছিল না। (শুয়াবুল‌ ঈমান:১৩৬২)।

৫) তিনি সবসময় মুচকি হাসতেন। (মুসনাদে আহমাদ:১৭৭৫০)।

৬) তিনি সত্য কথার উপর কৌতুক করতেন। (মুসনাদে আহমাদ:৮৭০৮)। যেমন: তিনি একবার হযরত আনাস‌ (রা:) কে বলেছিলেন,”হে দু’কান‌ওয়ালা!”(আবু দাউদ:২০০৪)।

৭) তিনি মাঝে মাঝে কোনো কোনো কবির কবিতার অংশবিশেষ আবৃত্তি করতেন। যেমন: তিনি ইবনে‌ রাওয়াহা‌ (রা:) এর কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। (আদাবুল‌ মুফরাদ‌:৮৬৭)।

৮) তাঁর মজলিশে সাহাবীগণ মাঝে মাঝে কবিতা আবৃত্তি করতেন। তিনি মাঝে মাঝে চুপ থাকতেন মাঝে মাঝে আবার মুচকি হাসতেন। (ইবনে হিব্বান:৫৭৮১)।

৬.

এই পর্ব থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এর চরিত্র সম্পর্কে আলোকপাত করা হবে ইনশাআল্লাহ।

তাঁর চরিত্রের সার্টিফিকেট স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজিদেই দিয়েছেন।

আল্লাহ তাআলা বলেন, وَ اِنَّکَ لَعَلٰی خُلُقٍ عَظِیۡمٍ

“আর নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।” (সূরা ক্বলাম‌:৪)।

হাদিস থেকে তাঁর কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো।

১) হযরত আয়েশা (রা:) কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন,’কুর‌আন‌ই ছিলো তাঁর চরিত্র।’ (মুসনাদে আহমাদ:৬/৯১)।

২) হযরত আনাস (রা:) দশ বছর তাঁর খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। অথচ, একটিবারের জন্যও তিনি এই কথা বলেননি, তুমি এই কাজটা কেনো করলে? তিনি হযরত আনাস (রা:) এর কাজে উহ!পর্যন্ত ও বলেননি। (বুখারী:৬০৩৮)।

৩) তিনি কখনো কারো সাথে অশোভনীয় কথা বলতেন না। বাজারে হৈচৈ করতেন না। মন্দের প্রতিকার মন্দ দিয়ে করতেন না। (শুআবুল‌ ঈমান:৭৯৪৪)।

৪) তিনি নিজের জন্য কখনোই প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি। (মুসনাদে আহমাদ:২৫০২৯)।

৫) তিনি ছিলেন সদা হাস্যোজ্জোল ও বিনম্র স্বভবের অধিকারী। তিনি রূঢ়ভাষী বা কঠিন হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন না। তিনি উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতেন না, অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করতেন না, অপরের দোষ খুঁজে বেড়াতেন না এবং কৃপণ ছিলেন না। তিনি অপছন্দনীয় কথা হতে বিরত থাকতেন। তিনি কাউকে নিরাশ করতেন না, আবার মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও দিতেন না। (শরহুস সুন্নাহ:৩৭০৫)।

৬) তিনটি বিষয় থেকে তিনি নিজেকে দূরে রেখেছিলেন: ঝগড়া বিবাদ করা, অহংকার করা, অনর্থক কথাবার্তা বলা। আর তিনটি কাজ থেকে বিরত থাকতেন: গীবত করা, কারো দোষত্রুটি তালাশ করা, কাউকে অপবাদ দেওয়া/কাউকে লজ্জা দেওয়া। (শরহুস সুন্নাহ:৩৭০৫)।

৭.

আজ আমার আইডল তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এর চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ দিক বিনয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য জানব ইনশাআল্লাহ।

১) তিনি সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ হ‌ওয়া সত্ত্বেও তাঁকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করা পছন্দ করতেন না। তিনি তাঁকে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল বলে সম্বোধন করতে বলছেন। (বুখারী:৩৪৪৫)।

২) আনাস (রা:) বলেন, সাহাবীদের কাছে রাসূলের থেকে প্রিয় ব্যক্তি ছিলো না। তবুও সাহাবীরা তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়াতেন না। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ তাঁর জন্য দাঁড়ানো পছন্দ করতেন না। (মুসনাদে আহমাদ:১২৩৬৭)।

৩) তিনি পোশাকের মধ্যে উকুন তালাশ করতেন, নিজেই ছাগল দোহন‌ করতেন এবং নিজের কাজ নিজেই সম্পন্ন করতেন। (মুসনাদে আহমাদ:২৬২৩৭)।

৪) তিনি কেমন বিনয়ী ছিলেন সে সম্পর্কে একটি হাদিস দেখলে স্পষ্ট হবে। তিনি বলেন, “যদি ছাগলের একটি খুর খাওয়ার জন্য‌ও আমি আমন্ত্রিত হ‌ই, তবুও আমি তা গ্রহণ করবো।” (বুখারী:২৫৬৮)।

৫) স্বীয় সঙ্গীদের খোজ-খবর রাখতেন এবং লোকদের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুসন্ধান করে (কোন প্রকার জটিলতা থাকলে) তা সংশোধন করে দিতেন। ভালোকে সমর্থন করে তাকে শক্তিশালী করতেন এবং খারাপকে খারাপ বলে প্রতিহত করতেন। কোন প্রকার মতবিরোধ সৃষ্টি না করে সবকিছুতেই মধ্যমপন্থা অনুসরণ করতেন। লোকদের সংশোধন করতে কোন প্রকার অলসতা করতেন না। (শারহুস সুন্নাহ:৩৭০৫)।

৬) তিনি ছিলেন কুমারী নারীর থেকেও অধিক লজ্জাশীল। (বুখারী:৬১০২)।

৮.

আজ আমার আইডল তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এর চরিত্র সম্পর্কে আরো কিছু জানব ইনশাআল্লাহ।

১) তিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ ব্যতীত তাঁর হাত দিয়ে কাউকে মারেননি; এমনকি তাঁর স্ত্রী ও খাদেমকেও না। (মুসলিম:২৩২৮)।

২) তিনি হাদিয়া গ্রহণ করতেন এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন। (বুখারী:২৫৮৫)।

৩) তাঁর সমীপে কেউ আবেদন করলে তিনি তার দিকে এমন মগ্ন হতেন, যতক্ষণ আবেদনকারী নিজেই না ফিরতেন, ততক্ষণ পর্যন্ত তার জন্য মগ্ন থাকতেন এবং কেউ তাঁর হাত ধারণ করলে, তিনি নিজে স্বীয় হাতকে টেনে নিতেন না, যতক্ষণ না সে লোক স্বীয় হাত টেনে না নিয়েছে। (আবু নাঈম আদ‌ দালায়েল‌)।

৪) তিনি তাঁর ছেলে ইব্রাহীম কে চুমো দিতেন এবং ঘ্রাণ নিতেন। (বুখারী:১৩০৩)। তিনি অন্যের সন্তানকেও চুমো দিতেন এবং আদর করতেন। (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ‌)।

৫) তিনি শিশু কিশোরদের সালাম দিতেন। (বুখারী:৬২৪৭)।

৯.

আজ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এর আরো কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানব ইনশাআল্লাহ।

১) কোন ব্যক্তি সম্পর্কে কোন প্রকার ত্রুটির সংবাদ পৌঁছলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নাম উল্লেখ করে বলতেন না যে, অমুকের কী হয়েছে? বরং তিনি এভাবে বলতেন: লোকদের কী হলো যে, তারা এমন এমন কথা বলে? (আবু দাউদ:৪৭৮৮)।

২) এক বেদুইন মসজিদের ভিতর পেশাব করা আরম্ভ করলে, সাহাবীরা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য দাঁড়িয়ে গেলেন। অত:পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,”তোমরা তাকে বারণ করো না, ছেড়ে দাও এবং পেশাবের জায়গায় এক বালতি পানি ঢেলে দাও। নিশ্চয়ই তোমরা সহজতা আরোপকারী  হিসাবেই প্রেরিত হয়েছ, কঠোর হয়ে প্রেরিত হওনি।” (বুখারী:৬১২৮)। সুবহানাল্লাহ!!

৩) এক দিনের ঘটনা। তিনি মোটা ঝালর‌ যুক্ত নাজরানী চাদর পরিধান করেছিলেন। এমতাবস্থায় এক বেদুঈন তাঁকে সজোরে টানতে লাগল। ফলে তাঁর ঘাড়ে দাগ পড়ে গেল। বেদুঈন লোকটি বলতে লাগল, তোমার কাছে যে সম্পদ আছে, তা আমাকে দাও। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এই কথা শুনার পর তার দিকে তাকিয়ে শুধু মুচকি হাসি দিলেন এবং তাকে সম্পদ দেওয়ার আদেশ দিলেন। (মুসলিম:২৩২৮)। সুবহানাল্লাহ! আল্লাহু আকবার! কী অপরুপ চরিত্র!

৪) তাঁর নিকট একবার কিছু লোক এসে বললো, হে আল্লাহর রাসূল! দাউস‌ গোত্র অবাধ্য। তারা ইসলাম গ্রহণ করতে অস্বীকার করছে। তাদের জন্য বদদুয়া করুন ‌। তখন তিনি দুয়া করে বললেন, “হে আল্লাহ! আপনি দাউস‌ গোত্রকে হেদায়েত দান করুন।” (মুসলিম:৬৬১১)।

৫) তিনি একবার এক ব্যক্তির নিকট ঋণী ছিলেন। লোকটি ঋণ আদায় করতে এসে তাঁর উপর অত্যন্ত কর্কশ ভাষায় কথা বলতে শুরু করল। এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ সাহাবীদের‌কে আদেশ দিলেন বড় উট তাকে দিয়ে দিতে। (আহমাদ‌:৯৩৯০)।

১০.

আজ আমার আইডল তথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে দানশীলতা সম্পর্কে জানব ইনশাআল্লাহ।

১) তাঁর কাছে কেউ কোনো কিছু চাইলে তিনি কখনো ‘না’ বলতেন না। (মুসলিম:৬১৫৮)।

২) তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ দানশীল। রমজান মাসে তাঁর দান আরো বেড়ে যেত। যখন জিব্রাঈল‌(আ:)তার কাছে আগমন করতেন,তখন তিনি মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষানোর মতো অধিক দান করতেন। (বুখারী:১৯০২)।

৩) একদা এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এলে তাকে দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী (উপত্যকা) পরিমাণ ছাগলভেড়া দান করলেন। অতঃপর সে নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গিয়ে বলল, হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা মুসলমান হয়ে যাও। যেহেতু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ অভাবের ভয় করেন না। (মুসলিম:৬১৬০)।

৪) হুনাইন যুদ্ধে জয়লাভ হলে সাফওয়ান বিন উমাইয়াকে তিনি প্রথমতঃ ১০০টি উট দান করলেন। তারপর আরো ১০০টি, তারপর আরো ১০০টি। সাফওয়ান বলেন, “আল্লাহর কসম! আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমাকে যা দান করার দান করলেন, তখন তিনি আমার নিকট সবচেয়ে ঘৃণ্য ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু যখন আমাকে দিতে থাকলেন, তখন তিনি আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তি হয়ে গেলেন।” (মুসলিম:৬১৬২)।

৫) হাকিম‌ বিন হিযাম‌ (রা:) একবার নবীজীর কাছে কিছু আবেদন করায় তিনি তাকে দিলেন। পরে আবার আবেদন জানালে আবার দিলেন। পরে আবার আবেদন জানালে আবার দিলেন। (বুখারী:২৭৫০)।

১১.

আজ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এর ইবাদত‌ বন্দেগী সম্পর্কে জানব ইনশাআল্লাহ।

১) তিনি সালাতে‌ দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেন, ফলে তাঁর পা মুবারক ফুলে যেত। (মুসলিম:৭৩০২)।

২) তিনি কখনো কখনো রাতে ৯ রাকাত সালাত আদায় করতেন। (মুসলিম:১৭৩৩)। আবার ১১ রাকাত (বুখারী:১১৪৭); আবার ১৩ রাকাত (বুখারী:১১৩৮) সালাত‌ও আদায় করতেন।

৩) তিনি যদি রাতে তাহাজ্জুদ না পড়তে পারতেন তাহলে তার পরের দিন চাশতের‌ সময় ১২ রাকাত সালাত আদায় করতেন। (শারহুস সুন্নাহ:৯৮৬)।

৪) তিনি অত্যন্ত শুদ্ধ সুন্দরভাবে নামাজে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। (মুসলিম:১৭৪৬)।

৫) তিনি প্রতিটি আয়াত থেমে থেমে আলাদা আলাদা তিলাওয়াত করতেন। (আবু দাউদ:৪০০৩)।

৬) তিনি সালাত আদায়ের সময় কান্না করতেন। তাঁর কান্নার আওয়াজ এমন ছিল, চুলার উপর রাখা কোনো পাত্র টগবগ করলে যেমন শব্দ হয়। (সুনানে‌ নাসাঈ‌:১২১৪)। এছাড়া, তিনি সিজদাতে গেলেও ক্রন্দন করতেন। (মুসলিম:২১৪০)।

৭) তিনি একবার আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা:) এর কুরআন শ্রবণ করে ক্রন্দন করেছিলেন। (বুখারী:৪৬৮২)।

৮) তিনি রমজান মাস ছাড়া শাবান‌ মাসে সর্বাধিক রোজা রাখতেন। (সুনানে নাসাঈ‌:১১৭৮)।

৯) তিনি প্রতি মাসে তিনটি করে রোজা রাখতেন। (মুসনাদে আহমাদ:৩৮৬০)।

১০) তিনি সোম ও বৃহস্পতিবারের রোজা খুব পছন্দ করতেন। (ইবনে‌ মাজাহ‌:১৭৩৯)।

১২.

আমরা অনেকেই দুঃখ কষ্টে হা-হুতাশ করি। কিন্তু আমার আইডল যে কতো কষ্ট করেছেন তা হয়তো অনেকেরই অজানা। আজ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম‌ এর কষ্টকর জীবন নিয়ে কিছু জেনেই সমস্ত পর্বগুলোর ইতি টানব ইনশাআল্লাহ।

১) তাঁর কাছে কখনো পেটভরে খাওয়ার মতো খেজুর থাকতো না। (মুসলিম:৭৬৫০)।

২) তাঁর পরিবারে কখনো কখনো ১ মাসের অধিক সময় ধরে চুলায় আগুন জ্বলত‌ না। শুধু পানি ও খেজুর খেয়ে জীবন ধারণ করতেন। (বুখারী:৬৪৫৮)।

৩) তিনি এবং তাঁর সাহাবীরা এমন অবস্থায় যুদ্ধ করেছেন যে, তখন তাঁদের গাছের বাকল এবং পাতা খেয়ে জীবনপাত‌ করতে হতো। (বুখারী:৩৭২৮)।

৪) তাঁর কাছে কখনো রুটি গোশত একত্রিত হতো না। (মুসনাদে আহমাদ:১৩৮৮৬)।

৫) তিনি এবং তাঁর পরিজন মৃত্যু পর্যন্ত টানা দুইদিন পরিতৃপ্ত হয়ে যবের রুটি খেতে পান নি। (বুখারী:৫৪১৬)।

৬) আবু হুরায়রা (রা:) বলেন, তিনি কোনোদিন যবের রুটিও পরিতৃপ্ত হয়ে খান নি। (বুখারী:৫৪১৪)। এছাড়া, তিনি কখনো ভুনা (গোটা) বকরী স্বচক্ষে দেখেন নি। (বুখারী:৫৪২১)।

৭) তাঁর পরিবারের কাছে কোনো সকাল অথবা সন্ধ্যা এক সা‌’ তথা আড়াই কেজি খাদ্যবস্তু থাকতো না। অথচ, তাঁর পরিবারে তখন ৯ জন সদস্য ছিল। (বুখারী:২০৬৯)।

৮) তিনি সারাদিন ক্ষুধার্ত থাকার ফলে পেটের উপর ঝুঁকে থাকতেন। তিনি ক্ষুধা নিবারণের জন্য নিম্ন মানের খুরমাও পেতেন না। (মুসলিম:৭৬৫০)।

৯) তাঁর বিছানা ছিল চামড়ার তৈরি এবং এর ভিতরে ছিল খেজুর গাছের ছোবড়া। (বুখারী:৬৪৫৬)।

১০) আয়েশা (রা:) তাঁর একখানা তালি দেওয়া চাদর এবং একখানা মোটা লুঙ্গি বের করে বলেছিলেন, এই দুইটির মধ্যেই রাসূলের মৃত্যু হয়েছে। (বুখারী:৩১০৮)।

১১) তিনি মৃত্যুর সময় একটি তলোয়ার, একটি খচ্চর এবং কিছু জমি ছাড়া আর কিছুই রেখে যান নি। উপরন্তু সেগুলোও সাদাকা‌ করে যান। (বুখারী:২৯১২)।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: