নবীজির বহুবিবাহ প্রসঙ্গে ইসলাম বিদ্বেষীদের সমালোচনার জবাব | আব্দুল্লাহ আল মামুন

নবীজির বহুবিবাহ প্রসঙ্গে

Pearl S. Buck একজন বিখ্যাত মহিলা আমেরিকান উপন্যাসিক যিনি ১৯৩৮ সালে সাহিত্যে নোবেল প্রাইজ পেয়েছিলেন। তাঁর উপন্যাসগুলো ১৯০০ সালের চীনের সামাজিক পটভূমির উপর লিখিত। The Good Earth,  East Wind : West Wind, A House divided এইগুলো তাঁর Best Selling উপন্যাস। pearl s. buck এর উপন্যাসে আমরা ১৯০০ সালে চীনের অনেক ধনী ব্যবসায়ী, বড় বড় আমলা, রাজনীতিবীদরা নিজ স্ত্রী ছাড়াও যে ঘরে আরো অনেক রক্ষিতা রাখতো এই তথ্য পাই। এই রক্ষিতাদের গর্ভে চীনের এইসব ধনী ব্যবসায়ী, বড় বড় আমলা, রাজনীতিবীদদের সন্তানও হতো। কিন্তু এই শিশুগুলো কখনই তাদের পিতার পরিচয় পেত না। অনেকটা ঘরের কাজের ছেলের মত তাদের জীবন কাটতো।

পশ্চিম বাংলার একজন জনপ্রিয় উপন্যাসিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় “প্রথম আলো” উপন্যাসে ব্রিটিশ ভারতের সময়কাল ১৯০০ সালের দিকে ত্রিপুরার মহারাজ বীর চন্দ্র মাণিক্যের স্ত্রী ব্যতীত যে অনেকগুলো রক্ষিতা ছিল এই তথ্যও খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এই রক্ষিতাদের ঘরে বীর চন্দ্র মাণিক্যের অনেকগুলো সন্তানও ছিল যাদেরকে বলা হতো মহারাজের পৌরষত্যের প্রতীক। “প্রথম আলো” উপন্যাসে এই রক্ষিতাদের যখন বয়স ৪০ পেরিয়ে যেত তখন ত্রিপুরার মহারাজ বীর চন্দ্র মাণিক্য লাত্থি মেরে তার রাজপ্রাসাদ থেকে তাদেরকে তাড়িয়ে দিত—এই তথ্যও উল্লেখ আছে।

এই কাহিনীগুলো কিন্তু আমরা শিক্ষিত সমাজের সবাই জানি যে, ১৯০০ সালের দিকেও ভারত, চীন, বার্মায় ধনী ব্যক্তিরা স্ত্রী ছাড়াও অনেক রক্ষিতা রাখত। যাদেরকে ভদ্র ভাষায় উপ-পত্নী বলা হতো। কিন্তু এই তথাকথিত উপ-পত্নীদের না ছিল কোন সামাজিক স্বীকৃতি, না ছিল কোন সামাজিক নিরাপত্তা। এমনকি এই রক্ষিতা বা তথাকথিত উপ-পত্নীদের সন্তানেরাও কোন পিতৃ পরিচয় ছাড়াই বড় হতো। যদি ১৯০০ সালের দিকে যদি সমাজপতিরা বিয়ে বহির্ভূত উপায়ে কোন সামাজিক স্বীকৃতি ছাড়াই নারীদেরকে এইভাবে ভোগ করে তাহলে একটু চিন্তা করে দেখুন ১৮০০, ১৭০০ সালের দিকে ঐসব দেশে মেয়েদের কী অবস্থা ছিল।

 

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বহুবিবাহ নিয়ে ইসলাম বিদ্বেষীরা অনেকেই অনেক কথা বলেন। সিরাত সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় শার্ট প্যান্ট পড়া অনেক মুসলিম যুবকই বিভ্রান্ত হচ্ছে তাদের এইসব কথায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন উপ-পত্নী বা রক্ষিতা ছিল না। সিরাত বিশেষজ্ঞরা সর্বসাকুল্যে একমত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রী ছিলেন মোট ১১ জন আর দাসী ছিলেন মোট ২ জন। অনেকে আবার বলেছেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ২ জন দাসী মিশর বাদশাহ থেকে উপহার হিসাবে প্রেরিত মারিয়া কিবতিয়া এবং বনী কুরাইজা গোত্রের রাইয়ানা বিনতে শামাউনকেও বিয়ে করেছিলেন। তাহলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীর সংখ্যা হয় ১৩ জন এবং সেই হিসাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কোন দাসী ছিল না।

মারিয়া কিবতিয়ার গর্ভে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন পুত্র সন্তান হয়েছিল যার নাম ছিল ইব্রাহিম। ইব্রাহিমকে কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ৩য় পুত্র হিসাবেই ধরা হয়। যদিও মারিয়া কিবতিয়া ছিলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাসী। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীরা হলেন উম্মুল মুমেনিন বা উম্মতের মাতা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরেও খলিফা হযরত আবুবকর, উমর, ওসমান, আলী,  মুয়াবিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহুর সময়েও তাঁরা ভাতা পেতেন এবং তাঁদের মৃত্যুর পর খলিফা হযরত আবুবকর, উমর, ওসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুর ইমামতিতেই তাঁদের জানাজা হয়ছিল। অর্থাৎ, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কখনই কোন উপপত্নী বা রক্ষিতা ছিল না। কী কারণে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বহুবিবাহ তা নিয়ে আমি এই লেখায় বিস্তারিত আলোচনা করব।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একজন নবী ছিলেন। বুখারি মুসলিম শরীফে বর্ণিত আছে একজন নবীর গায়ে মোট ৪০ জন পুরুষের সমান শক্তি থাকে। অনেক নবীর আশ্চর্যজনক শারিরীক শক্তির কথা কোরআন হাদীসে পাওয়া যায়। যেমন দাউদ আলাইহিস সাল্লাম তাঁর সময়ের কাফের বাদশাহ জালুতকে জিহাদের ময়দানে মাত্র ৩ টা পাথরের টুকরার আঘাতে হত্যা করে ফেলেছিলেন। যদিও বাদশাহ জালুতের পুরা শরীর লোহার বর্ম দ্বারা ঢাকা ছিল। হযরত মুসা আলাইহিস সাল্লাম বনি ইসরাইল বংশের এক ব্যক্তিকে বাঁচাতে গিয়ে ফেরাউনের গোত্রের এক ব্যক্তিকে সামান্য একটা চড় মেরেছিলেন। আর মুসা আলাইহিস সাল্লামের সামান্য একটি চড়ের আঘাতেই ঐ ব্যক্তিটি মারা যায়।

খন্দকের যুদ্ধে পরিখা খননের সময় যেই পাথর সকল সাহাবিরা সম্মিলিতভাবেও ভাঙতে পারছিল না, সেই পাথর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাত্র ৩ টা হাতুড়ির আঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। মক্কার রুকানা নামক একজন বড় কুস্তিগীর ছিল। যাকে হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে শুরু করে কেউ কুস্তিতে হারাতে পারেনি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেই রুকানা কুস্তিগীরকে পরপর ৩ বার কুস্তিতে হারিয়েছিলেন যা দেখে মক্কার সকল কাফেররাও অবাক হয়ে গিয়েছিল। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শারিরীক শক্তি আমাদের থেকে অনেক অনেক বেশি ছিল এতে কোন সন্দেহ নাই। একজন পুরুষ যদি তার শারিরীক শক্তির তুলনায় একটি বিয়ে করেন তাইলে তো সেই হিসাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আরো অনেকগুলো বিয়ে করার কথা।

এখন আমরা দেখবো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবনের বিয়েগুলো জীবনের কোন কোন পর্যায়ে করেছিলেন এবং ঠিক কি কারনে করেছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ২৫ বছরের যুবক ছিলেন তখন তিনি বিয়ে করেছিলেন খাদিযা রাযিয়াল্লাহু আনহা কে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বিয়ের সময়  খাদিযা রাযিয়াল্লাহু আনহার বয়স ছিল ৪০ বছর। খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন একজন বিধবা নারী, যার আগে ২ টা বিয়ে হয়েছিল। সেই ঘরে খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার ২ টি ছেলে ও একটি কন্যা সন্তানও ছিল। খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার সাথে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটানা ২৫ বছর সংসার করেন। এই ২৫ বছর পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর কোন নারীকে বিয়ে করেননি।

খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার সাথে সংসার জীবনের বেশির ভাগ সময়টাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরের বাইরে কাটাতেন। বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ ও হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। খাদিজা রাযিয়াল্লাহু আনহার মৃত্যুর সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বয়স ছিল ৫০ বছর। সেই সময়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরে ৪ জন কন্যা সন্তান ছিল। এই কন্যা সন্তানদের দেখাশুনা করার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিধবা হযরত সাওদা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করেন। হযরত সাওদার বয়স ছিল তখন ৫০ বছর। হযরত সাওদা রাযিয়াল্লাহু আনহার স্বামী সাফওয়ান ইবনে উমায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহু একটি পুত্র সন্তান রেখে মারা গিয়েছিলেন।

এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করেন। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার বিয়ের বয়স নিয়ে সিরাত বিশেষজ্ঞদের মাঝে বিতর্ক আছে। মুসনাদে আহমদে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বিয়ের সময় আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক যুবতী হিসাবেই উল্লেখ করা হয়েছে।

অনেকেই বলেন, আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে বিয়ে করার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাল্যবিবাহ করতে উম্মাতকে উৎসাহ দিয়েছেন। নাউযুবিল্লাহ। এক আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা ছাড়া রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল স্ত্রীই তো ছিল বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা। তাহলে কি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতকে শুধু বিধবা/তালাকপ্রাপ্তা নারীদেরকে বিয়ে করতে বলেছিলেন? কখনোই নয়; বরং কোনো সাহাবি বিধবা নারীকে বিয়ে করলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ সাহাবিকে জিজ্ঞাস করতেন তুমি কুমারী নারীকে কেন বিয়ে করনি?

আয়েশার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হযরত ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর বিধবা কন্যা হাফসাকে বিয়ে করেন। হযরত হাফসার স্বামী বদর যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। এরপরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিধবা যয়নব বিনতে খুযায়মাকে বিয়ে করেন। যয়নব বিনতে খুযায়মার স্বামী ওহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। বিয়ের সময় যয়নব বিনতে খুযায়মার বয়স ছিল ৩০ বছর। মাত্র ৩ মাস দাম্পত্য জীবন যাপন করার পর যয়নব বিনতে খুযায়মা ইন্তেকাল করেন। এরপরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মে সালমাকে বিয়ে করেন। উম্মে সালমার স্বামী ১ টি পুত্র সন্তান রেখে ওহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। বিয়ের সময় উম্মে সালমার বয়স ছিল ৩০ বছর। এরপরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর আপন ফুফাত বোন তালাকপ্রাপ্তা যয়নবকে বিয়ে করেন। বিয়ের সময় যয়নবের বয়স ছিল ৩৭ বছর। বনু মোস্তালিক গোত্র মুসলমানদের কাছে হারার পর বনু মুস্তালিক গোত্রের গোত্রপতি হারিসের কন্যা জুয়াইরিয়াকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়ে করেন। জুয়াইরিয়ার স্বামী মুনায়েফ ইবনে সাফোয়ান মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে নিহত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে জুয়াইরিয়াই নিজের ইচ্ছাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বিয়ে করেন।

এরপরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবিবাকে বিয়ে করেন। উম্মে হাবিবার স্বামী উবাইদুল্লাহ ইবনে জাহাশ মুরতাদ হয়ে যাওয়ার কারণে স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে উম্মে হাবিবার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। বিয়ের সময় উম্মে হাবিবার বয়স ছিল ৩৬ বছর। এরপরে খয়বারের যুদ্ধে ইহুদিরা পরাজিত হওয়ার পর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম  ইহুদি নেতা হুয়াই বিন আখতারের কন্যা সাফিয়াকে বিয়ে করেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে বিয়ের আগে সাফিয়ার আরও ২ বার বিয়ে হয়েছিল।

এরপরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বশেষ বিয়ে হয়েছিল মায়মুনার সাথে। মায়মুনাও একজন তালাকপ্রাপ্তা নারী ছিলেন। তাঁর আগের স্বামী ছিলেন আবু রহম ইবনে আব্দুল উজ্জা। বিয়ের সময় মায়মুনার বয়স ছিল ৩২ বছর। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ২ জন দাসী রায়হানা ও মারিয়া কিবতিয়া যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নীত হন তখন তাঁদের বয়স ছিল যথাক্রমে ২৮ বছর ও ২৩ বছর।

আমরা এইখানে দেখতে পাই যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র আয়েশা ছাড়া আর সবাই ছিল বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা। অনেকের আবার পূর্বের স্বামীর ছেলে মেয়েও ছিল। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি জৈবিক চাহিদার জন্য বিয়ে করতেন নাউযুবিল্লাহ তাইলে অবশ্যই কুমারী নারীদেরকে বিয়ে করতেন। আমাদের দেশেও অনেক ধনী ব্যক্তি তাঁর ৪০ বছর বয়সে গ্রাম থেকে একটা কুমারী মেয়ে ধরে নিয়ে এসে বিয়ে করে।

কুমারী মেয়ে বিয়ে করা হচ্ছে একটা মানুষের Basic instinct. আর কুমারী মেয়ে বিয়ে করা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্য কোন কঠিন কাজ ছিল না। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি জৈবিক চাহিদার জন্যই বিয়ে করতেন নাউযুবিল্লাহ তাইলে কেন তিনি বিগত যৌবণা বিধবা তালাক প্রাপ্তা নারীদের কে বিয়ে করবেন ?

মক্কী জীবনে কাফেররা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে অনেকবারই বলেছিলেন যে আপনি চাইলে আরবের সবচেয়ে সুন্দরী নারীদের কে আপনার সামনে নিয়ে এসে হাজির করি। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন- “ আমার এক হাতে সূর্য্য আর এক হাতে চন্দ্র দিলেও আমি ইসলাম প্রচার থেকে পিছপা হব না। ” সুন্দর নারীদের প্রতি যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের লোভই থাকত নাউযুবিল্লাহ তাইলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐ সময়ই মক্কার কাফেরদের কথা মেনে নিয়ে সুন্দরী নারীদের কে হস্তগত করে ইসলাম প্রচার থেকে বিরত হয়ে যেতেন। বুখারি মুসলিম শরীফে অনেক হাদীসে বর্ণিত আছে একটানা ২ মাস উম্মুল মুমেনিনদের ঘরে চুলায় আগুন জ্বলত না। শুধু খেজুর আর পানি খেয়েই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আর উম্মুল মুমেনিনরা জীবন যাপন করতেন।

সেই যুগে আরবের একজন সাধারন ব্যক্তির গৃহেও ৪-৫ টা দাসী ছিল। রাস্তাঘাটে গরু ছাগলের মত দাস-দাসী কেনা বেচা হতো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিন্তু চাইলেই পারতেন বিয়ে না করেও তাঁর ইচ্ছামতো ৪-৫ টা দাসী ঘরে রাখতে। সেই যুগে আরবে এটা খুব সাধারণ একটা ব্যাপার ছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর পবিত্র বৈবাহিক জীবনের মাধ্যমে সমাজের দাসী প্রথাকে বিলুপ্ত করে উম্মতকে বৈবাহিক প্রথার দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে ও উৎসাহে অনেক সাহাবিও তাঁদের অধীনস্থ দাসীদেরকে মুক্ত করে দিয়ে বিয়ে করে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিলেন।

অনেক বড় বড় তাবেইনদের মা কিন্তু তাঁদের পূর্ব জীবনে দাসী ছিলেন। আর যৌনতা বা জৈবিক চাহিদা মানব জীবনের কোন অস্বীকার করার জিনিস নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও আমাদের মত একজন রক্ত মাংসের মানুষ ছিলেন এবং তাঁরও জৈবিক চাহিদা ছিল।  রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর স্ত্রীদের পালাক্রমে সময় দিতেন। অর্থাৎ যে স্ত্রীর সাথে তিনি ১ম রাতে থাকতেন ২য় রাতে তিনি অন্য স্ত্রীর সাথে থাকতেন। যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক স্ত্রীর সাথেই সব সময় থাকতেন তাইলে ঐ স্ত্রীর উপর যুলুম হয়ে যেত। কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পালাক্রমে প্রত্যেক স্ত্রীর সাথে থাকার কারণে কোন স্ত্রীর উপরই কোন যুলুম হয়নি।

ইসলাম নিছক ধর্ম না, ইসলাম হলো একটা জীবনব্যবস্থা। হাদীস সংরক্ষণ ও দ্বীনের ইলম শিক্ষার উদ্দেশ্যে একদল সাহাবি সার্বক্ষণিকভাবে মসজিদে নববীতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে থাকতেন। তাঁদেরকেই আসহাবে সুফফা বলা হতো। নারী সমাজের নিকট দ্বীন প্রচারের জন্যও অনুরূপ একটি জামাত সার্বক্ষণিকভাবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহচর্যে থেকে দ্বীন ইসলাম শিখে নারী সমাজের নিকট প্রচার করার প্রয়োজনীয়তা ছিল।

মেয়েদের সম্পর্কিত মাসআলা-মাসায়েলগুলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীগণ, যারা হলেন উম্মতের মাতা বা উম্মুল মুমেনিন, তাদের মাধ্যমে এসেছে। খোদ আয়েশা রাযিয়াল্লহু আনহা ২১০০ হাদীস বর্ণনা করেছেন। মেয়েদের এই মাসআলাগুলো মেয়েদের মাধ্যমেই আসা সম্ভব ছিল। পুরুষ সাহাবিদের মাধ্যমে এই মেয়েলী মাসআলাগুলো আসা কখনোই সম্ভব ছিল না, আর এটা শোভনও ছিল না। আর মেয়েদের এই মাসআলাগুলো বেশির ভাগ মাদানী জীবনেই নাযিল হয়েছিল। তাই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বেশির ভাগ বিয়েই তাঁর মাদানী জীবনে সংঘটিত হয়েছিল।  আর তাই বৈবাহিক বন্ধন ছাড়া আর কোন উপায়ে যদি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলাদের কে তাঁর সাথে রাখতেন তাইলে অদূর ভবিষ্যতে ইসলামের ভিতর মন্দিরের সেবাদাসী প্রথা বা গীর্জার সন্ন্যাসিনী বা Nun প্রথা চালু হয়ে যেত যা ইসলামের পর্দার বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক। আর তাই একমাত্র বিয়ের মাধ্যমেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মতের কাছে এই মাসআলাগুলো পৌছিয়ে দিয়েছেন। তাই যারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বহু বিবাহ নিয়ে অশ্লীল কথা বলে, তারা আসলে চাইছিল ইসলামের ভিতরেও যেন মন্দিরের সেবাদাসী প্রথা বা গীর্জার সন্ন্যাসিনী বা Nun প্রথা চালু হোক। যেহেতু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র বৈবাহিক জীবনের কারণে ইসলামের ভিতর কখনোই কোনোভাবেই মন্দিরের সেবাদাসী প্রথা বা গীর্জার সন্ন্যাসিনী বা Nun প্রথা চালু হতে পারবে না। তাই ইসলাম বিদ্বেষীদের এখন যত রাগ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র বৈবাহিক জীবনের উপর।

 

তথ্যসূত্র :

১. মাদারিজুন নবুওয়াত [নবুয়্যতের মর্যাদা], আল্লামা শায়খ আব্দুল হক্ক মুহাদ্দেস দেহলভী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

২. নবীয়ে রহমত, সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

৩. প্রিয় নবীর প্রিয় প্রসঙ্গ, মদীনা পাবলিকেশন্স, ৩৮/২, বাংলাবাজার, ঢাকা-১১০০। BY FARABI SAIFUR RAHMAN

Tijarah-Shop

Facebook Comments