নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রিয়নবী ﷺ | তাসনীম জান্নাত

নারীর-অধিকার-প্রতিষ্ঠায়

জাহেলিয়্যাতের যুগে কন্যাসন্তানকে জীবিত মাটি চাপা দিয়ে হত্যা করা হতো। কন্যাসন্তানকে মনে করা হতো বাবার জন্য চরম অপমানজনক। সে যুগে মেয়েদের বেঁচে থাকার কোনো অধিকার ছিলো না। ছিলো না পৃথিবীর বাতাসে বুকভরে শ্বাস নেবার অধিকার। জন্মের সময় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া কন্যাসন্তানরা বেড়ে উঠতো অনাদরে, অবহেলায়। বড় হওয়ার পর অনেককে হতে হতো মর্মান্তিক মৃত্যুর শিকার। এ অসভ্য বর্বর রীতির অন্ধকারে যখন গোটা আরব ছেয়ে গেছে, তখনই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী হিসেবে আবির্ভূত হলেন। তিনি এই কুপ্রথাকে চিরতরে মুছে ফেললেন। শুধু তাই নয়, কন্যাসন্তানের পিতাকে দিলেন জান্নাতের সুসংবাদ। হাদিসে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” مَنْ وُلِدَتْ لَهُ ابْنَةٌ، فَلَمْ يَئِدْهَا، وَلَمْ يُهِنْهَا، وَلَمْ يُؤْثِرْ وَلَدَهُ عَلَيْهَا – يَعْنِي الذَّكَرَ – أَدْخَلَهُ اللهُ بِهَا الْجَنَّةَ “

অর্থ- হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, যার কন্যাসন্তান জন্মগ্রহন করলো, অতপর সে তাকে জীবিত মাটি চাপা দিলো না, অপমান করলো না এবং পুত্রসন্তানকে তার উপর প্রাধান্য দিলো না—আল্লাহ তাআলা তাকে সেই কন্যার কারণে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং -১৯৫৭)

অন্য হাদিসে আছে,

عَنْ حَرْمَلَةَ بْنِ عِمْرَانَ قَالَ: سَمِعْتُ أَبَا عُشَانَةَ الْمُعَاعَافِرِيَّ قَالَ: سَمِعْتُ عُقْبَةَ بْنَ عَامِرٍ يَققُولُ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: مَنْ كَانَ لَهُ ثَلَاثُ بَنَاتٍ فَصَبَرَ عَلَيْهِنَّ، وَأَطْعَمَهُنَّ، وَسَقَاهُنَّ، وَكَسَاهُنَّ مِنْ جِدَتِهِ كُنَّ لَهُ حِجَابًا مِنَ النَّارِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

অর্থ, হযরত উকবা ইবনে আমের রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যার তিনজন কন্যাসন্তান রয়েছে, অতপর সে তাদের ব্যাপারে ধৈর্যধারণ করেছে এবং সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পানাহার ও পোশাক পরিধানের ব্যবস্থা করেছে, কিয়ামতের দিন কন্যাসন্তানরা তার জন্য জাহান্নামে প্রবেশের পথে প্রতিবন্ধক হবে । (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং-৩৬৬৯)

অন্য রেওয়ায়েতে আছে,

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: مَنْ عَالَ جَارِيَتَيْنِ حَتَّى تَبْلُغَا، جَاءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَنَا وَهُوَ وَضَمَّ أَصَابِعَهُ

অর্থ – হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি দুটি মেয়েকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া পর্যন্ত লালন পালন করলো, সে কিয়ামতের দিন এমতাবস্থায় আসবে যে, আমি আর সে এরকম হবো। এই বলে তিনি স্বীয় আঙ্গুল সমূহ মিলিয়ে দেখালেন।  (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং – ২৬৩১)

হাদিসের এই ঘোষণার মাধ্যমে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিষ্ঠা করলেন কন্যাসন্তানের অধিকার। শুধু উচ্চারণেই নয় রাসুলের আচরণেও ছিলো কন্যার প্রতি ভালোবাসা, মমতার পূর্ণবহিঃপ্রকাশ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কন্যাদেরকে অনেক ভালবাসতেন। তাঁর সবচে প্রিয় কন্যা ছিলেন জান্নাতী নারীদের সরদার সাইয়্যেদা ফাতেমা রাযি.। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

فَاطِمَةُ بَضْعَةٌ مِنِّي، فَمَنْ أَغْضَبَهَا أَغْضَبَنِي

অর্থ : ফাতেমা আমার অংশ। অতএব যে তাকে রাগান্বিত করলো, সে আমাকে রাগান্বিত করলো।  (সহিহুল বুখারি, হাদিস নং -৩৭৬৭)

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে মসজিদে গিয়ে দু’রাকআত সালাত আদায় করতেন। অতপর ফাতেমা রাযি.-এর ঘরে তাশরীফ রাখতেন।

ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সফর থেকে ফিরতেন তখন তার মেয়ে ফাতেমাকে চুমু দিতেন। (উসদুল গাবাহ : ৭/২১৬)।

সে যুগে বোনদেরও কোনো অধিকার ছিলো না। মন্দ আচরণই যেন ছিলো তাদের প্রাপ্য। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোনদের সাথে ভালো আচরণকারীদের প্রতিও জান্নাতের সুসংবাদ শোনালেন।

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الخُدْرِيِّ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لاَ يَكُونُ لأَحَدِكُمْ ثَللاَثُ بَنَاتٍ أَوْ ثَلاَثُ أَخَوَاتٍ فَيُحْسِنُ إِلَيْهِنَّ إِلاَّ دَخَلَ الجَنَّةَ

অর্থ : হযরত আবু সাইদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন তোমাদের যে ব্যক্তির তিনটি মেয়ে বা তিনটি বোন আছে অতপর সে তাদের সাথে ভাল আচরন করে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (সুনানুত তিরমিযী, হাদিস নং -১৯১২)

সে সময় স্ত্রীদের ছিলো করুণ অবস্থা। সমাজে তাদের কোনো সম্মান ছিলো না। দাসীদের মতো আচরণ করা হতো তাদের সাথে।সামান্য থেকে সামান্যতর ভূলক্রটির জন্য সহ্য করতে হতো অমানুষিক নির্যাতন। তাদের জন্য পৃথিবীটা ছিলো জলন্ত নরকতুল্য। যেখান থেকে বের হবারও কোনো পথ ছিলো না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সকল অনাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। শোনালেন স্ত্রীদের সাথে ভালো আচরণের ফযিলতের কথা । যে স্ত্রীদের দাসী মনে করা হতো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকেই বানিয়ে দিলেন স্বামীর হুসনে আখলাকের সনদপত্র। হাদিসে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: خِيَارُكُمْ خِيَارُكُممْ لِنِسَائِهِمْ

অর্থ : হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, তোমাদের মধ্যে সবচে উত্তম লোক তারাই, যারা তাদের স্ত্রীদের নিকট ভালো। (সুনানু ইবনে মাজাহ, হাদিস নং-১৯৭৪)।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং স্ত্রীদের সাথে কেমন আচরণ করতেন, এর বিবরণও হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।

عَنْ عَائِشَةَ، رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، أَنَّهَا كَانَتْ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَفَرٍ قَالَتالَتْ: فَسَابَقْتُهُ فَسَبَقْتُهُ عَلَى رِجْلَيَّ، فَلَمَّا حَمَلْتُ اللَّحْمَ سَابَقْتُهُ فَسَبَقَنِي فَقَالَ: هَذِهِ بِتِلْكَ السَّبْقَةِ

অর্থ : হযরত আয়েশা রায়ি. থেকে বর্ণিত যে, তিনি এক সফরে রাসুলের সাথে ছিলেন। তিনি বলেন, আমি তার সাথে দৌড়ের প্রতিযোগিতা করলাম এবং জয়ী হলাম। অতপর যখন আমার শরীর ভারী হয়ে গেলো তখন আবার দৌড় প্রতিযোগিতা করলাম এবার তিনি জয়ী হলেন এবং বললেন, এ বিজয় সেই বিজয়ের পরিবর্তে।  (আবু দাউদ, হাদিস নং-২৫৭৮)

অন্য হাদিসে রয়েছে,

 عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهَا، قَالَتْ: مَا غِرْتُ  عَلَى أَحَدٍ مِنْ نِسَاءِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْههِ وَسَلَّمَ، مَا غِرْتُ عَلَى خَدِيجَةَ، وَمَا رَأَيْتُهَا، وَلَكِنْ كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُكْثِرُ ذِكْرَهَا، وَرُبَّمَا ذا ذَبَحَ الشَّاةَ ثُمَّ يُقَطِّعُهَا أَعْضَاءً، ثُمَّ يَبْعَثُهَا فِي صَدَائِقِ خَدِيجَةَ، فَرُبَّمَا قُلْتُ لَهُ: كَأَنَّهُ لَمْ يَكُنْ فِي الدُّنْيَا امْرَأَةٌ إِلَّا خَدِيجَةُ، فَيَقُولُ إِنَّهَا كَانَتْ، وَكَانَتْ، وَكَانَ لِي مِنْهَا وَلَدٌ

অর্থ : হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের মধ্যে খাদিজা রাযি.–এর প্রতি আমার যে পরিমাণ ঈর্ষা হতো অন্য কারো প্রতি সেরূপ হতো না। অথচ আমি তাকে দেখিনি। কিন্তু নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশি বেশি তাকে স্মরণ করতেন। কখনো কখনো তিনি বকরী জবেহ করে এর গোশত টুকরো টুকরো করে খাদিজা রাযি.-এর বান্ধবীদের নিকট পাঠাতেন। আমি মাঝে মাঝে বলতাম, যেনো খাদিজার মতো মহিলা দুনিয়ায় আর কেউই নাই !

তখন তিনি বলতেন, সে এমন এমন ছিলো (প্রশংসা করতেন) । তার গর্ভে আমার সন্তান রয়েছে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং -৩৮১৮)

প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন নারীকে মা হিসেবে যে সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন তা অতুলনীয়। পৃথিবীর কোনো সভ্যতা মাকে এত সম্মান দেয়নি। প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মায়ের র্মযাদাকে নিয়ে গেছেন অতি উচ্চে। তিনি ঘোষণা করেছন, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত।

হাদিসে এসেছে,

عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ جَاهِمَةَ السَّلَمِيِّ، أَنَّ جَاهِمَةَ جَاءَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، أَرَدْتُ أَنْ أَغْزُوَ وَقَدْ جِئْتُ أَسْتَشِيرُكَ، فَقَالَ: هَلْ لَكَ مِنْ أُمٍّ؟؟ قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: فَالْزَمْهَا، فَإِنَّ ا الْجَنَّةَ تَحْتَ رِجْلَيْهَا

অর্থ : মুআবিয়া বিন জাহিমা সালামি রাযি. থেকে বর্ণিত যে, জাহিমা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন যে, হে আল্লাহর রাসুল, আমি জিহাদ করতে ইচ্ছুক। আপনার কাছে পরামর্শ চাইতে এসেছি। তিনি বললেন, তোমার কি মা আছে ? সে বললো, হ্যাঁ। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি তার সাথেই থাকো। কেননা জান্নাত তার পায়ের নিচে। ( সুনানুন নাসায়ী, হাদিস নং- ৩১০৪)

অন্য হাদিসে এসেছে,

 عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ قَالَ: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ف فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي؟ قَالَ: أُمُّكَ قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: ثُمَّ أُمُّكَ قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَاللَ: ثُمَّ أُمُّكَ قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: ثُمَّ أَبُوكَ

অর্থ : হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে বললো, হে আল্লাহর রাসুল, আমার উত্তম সাহচর্যের সবচে বেশি হকদার কে ? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বললো, অতপর কে ? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বললো, অতপর কে? তিনি বললেন, তোমার মা। সে বললো, অতপর কে? তিনি বললেন, তোমার বাবা। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং – ৫৯৭১)

আরেক হাদিসে এসেছে,

عَنْ أَسْمَاءَ بِنْتِ أَبِي بَكْرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَتْ: قَدِمَتْ عَلَيَّ أُمِّي وَهِيَ مُشْرِكَةٌ فِي عَههْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَاسْتَفْتَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قُلْتُ: وَهِيَ رَاغِبَةٌ، أَفَأَصصِلُ أُمِّي؟ قَالَ: نَعَمْ صِلِي أُمَّكِ

অর্থ : আসমা বিনতে আবু বকর সিদ্দীক রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে আমার মা আমার কাছে আসলেন। তখন তিনি মুশরিকা ছিলেন। আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট জানতে চাইলাম, আমার মা আমার কাছে সাহয্যের জন্য এসেছে। আমি কি তার সাথে ভালো ব্যবহার করবো? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তোমার মায়ের সাথে ভালো ব্যবহার করো।(সহিহ বুখারি, হাদিস নং-২৬২০)

 

শৈশবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর মাকে হারান। কিন্তু তাঁর দুধ মা হালিমা সাদিয়া রাযি. জীবিত ছিলেন। তিনি রাসুলের নিকট আসলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্মানে বসার জন্য নিজের চাদর বিছিয়ে দিতেন। (উসদুল গাবাহ : ৭/৬৯)

প্রিয় পাঠক, এভাবেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীকে কন্যা, বোন, স্ত্রী এবং জননী হিসেবে দিয়েছেন অধিকার। সমাজে নারীকে করেছেন সম্মানিতা। সকল কুপ্রথা থেকে নারীকে করেছেন মুক্ত। জাহিলিয়্যাতের যামানায় নারীদের শিক্ষার কোনো অধিকার ছিলো না। যে যুগে নারীজন্ম ছিলো কলঙ্ক সে যুগে নারীশিক্ষার কথা কল্পনা ছিলো রীতিমতো দুঃসাহসের ব্যাপার। যেখানে নেই বেঁচে থাকার অধিকার সেখানে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হওয়ার স্বপ্ন অলীক কল্পনা ছাড়া কিছুই নয়।

কন্যা, বোন, স্ত্রী এবং জননী হিসেবে শুধু নয়, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীকে স্বমহিমায় উজ্জ্বল হওয়ারও সুযোগ দিয়েছেন। তিনি নারীকে দিয়েছেন শিক্ষার অধিকার। ইলমের নুরে নুরান্বিত হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। পুরুষ সাহাবিগণ যেভাবে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতেন তেমনি নারী সাহাবিগণও পিছিয়ে ছিলেন না। তাদেরকেও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৃথকভাবে দীন শিখাতেন। কোনো কোনো সময় উম্মাহাতুল মুমিনীনদের মাধ্যমে তারা বিভিন্ন মাসআলা জিজ্ঞাসা করতেন। হাদিসে এসেছে,

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الخُدْرِيِّ قَالَتِ النِّسَاءُ لِلنَّبِيِّ صَلَّىى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: غَلَبَنَا عَلَيْكَ الرِّجَالُ، فَاجْعَلْ لَنَا يَوْمًا مِنْ نَفْسِكَ، فَوَعَدَهُنَّ يَوْمًا لَقِيَهُنَّ فِيهِ، فَوَعَظَهُنَّ وَأَمَرَهُنَّ، فَكَانَ فِيمَا قَالَ لَهُنَّ: مَا مِنْكُنَّ امْرَأَةٌ تُقَدِّمُ ثَلاَثَةً مِنْ وَلَدِهَا، إِلَّا كَانَ لَهَا حِجَابًا مِنَ النَّارِ فَقَالَتِ امْرَأَةٌ: وَاثْنَتَيْنِ؟ فَقَالَ: وَاثْنَتَيْنِ

অর্থ : আবু সাইদ খুদরী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহিলারা নবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললো, পুরুষরা সবসময় ইলম শেখার জন্য আপনার কাছাকাছি থাকে। সুতরাং আপনি আমাদের জন্য একটি দিন নির্ধারণ করুন। (যেন আমরা আপনার কাছ থেকে দীন শিখতে পারি)। তখন তিনি তাদেরকে একটি দিনের প্রতিশ্রুতি দিলেন, যেদিন তিনি তাদের সাথে সাক্ষাত করতেন। অতপর তিনি তাদেরকে উপদেশ দিতেন এবং (বিভিন্ন বিষয়ে) আদেশ দিতেন। একবার তিনি তাদেরকে বললেন, তোমাদের কোনো মহিলার তিনটি সন্তান মারা গেলো সে তার জন্য জাহান্নামের পথে প্রতিবন্ধক হবে। তখন এক মহিল বললো, যদি দুইজন মারা যায়? তিনি বললেন, দুইজন মারা গেলেও। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং – ১০১)।

ইসলামপূর্ব যুগে নারীদের উত্তরাধিকারের যোগ্য মনে করা হতো না। মিরাছের একচ্ছত্র দখলদারিত্ব ছিলো পুরুষদের। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অন্যায় নীতিকে মূলোৎপাটন করে মিরাছে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করলেন। উহুদযুদ্ধের পর হযরত সাআদ বিন রাবী রাযি. এর স্ত্রী রাসুলের দরবারে উপস্থিত হয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, সাআদ উহুদযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। আর এরা হচ্ছে সাআদ বিন রাবীর দুই কন্যা। তার শাহাদাতের পর তার চাচা সব সম্পত্তি দখল করেছে। মেয়ে দুটিকে কোনো সম্পদ দেইনি। সম্পদ ছাড়া মেয়ে দুটিকে বিবাহ দেয়া যাচ্ছে না। একথা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ ব্যাপারে আল্লাহই ফায়সালা করবেন। তারপরই উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সূরা নিসার ১১ ও ১২ নং আয়াত অবর্তীণ হয়। অবতীর্ণ হওয়ার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুই মেয়েকে ডেকে বললেন, সাআদের উভয় মেয়েকে দুই তৃতীয়াংশ এবং মাকে অষ্টমাংশ দাও। তারপর অবশিষ্ট যা থাকবে তা হবে তোমার। (তাফসীরে ইবনে কাসীর :১/৬৬১)

এটাই মানব ইতিহাসে নারীর উত্তরাধিকার লাভের প্রথম উদাহরণ।

বিদায় হজ্জের দিন। লক্ষাধিক সাহাবা উপস্থিত। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাবালে রহমত থেকে সাহাবাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছেন। সেদিনও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভুলে যাননি নারী অধিকারের কথা। দরাজ কন্ঠে জনসমুদ্রকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

أَلاَ وَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا

অর্থ : সাবধান, আমি তোমাদেরকে নারীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করার অসিয়ত করছি। (সুনানুত তিরমিযী : ১১৬৩)

এভাবেই রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীকে করেছেন মহিমান্বিত। বর্বরতার ভয়াল থাবা থেকে নারীকে দিয়েছেন মুক্তি।

সবশেষে বলতে চাই, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায়  রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন অগ্রদূত। তাঁর কারণেই নারীজাতি ফিরে পেয়েছে অধিকার, হয়েছে সম্মানের পাত্র।

লেখিকা : আলেমা

Tijarah-Shop

Facebook Comments