ইসলামের ইতিহাসে সিরাত চর্চার সূচনা এবং মৌলিক সিরাত পরিচিতি | আব্দুল্লাহ বিন বশির

মৌলিক-সিরাত-পরিচিতি

মানুষের একটি স্বভাবজাত বিষয় হলো, সে তার অনুসরণীয় ব্যক্তির জীবনাচারকে নিজের ভিতর ধারণ করতে চায়। জীবনের চলার পথে ঐ ব্যক্তির জীবন থেকে নিজের জীবনে চলার শক্তি খুঁজে পায়। আর তা থেকে খুঁজে নেয় জীবন চলার পাথেয়। এটা শুধু সাধারণ মানুষের মাঝেই নয় বরং আল্লাহ্‌ তায়ালাও নবিদেরকে অপর নবির ঘটনা শুনিয়ে এগিয়ে চলার শক্তি যোগাতেন। আল্লাহ্‌ তায়ালা বলেন, ‘হে নবি আমি আপনার নিকট নবিগণের ঘটনাসমুহ বর্ণনা করে আপনার অন্তরে শক্তি যোগাই। আর এইসব ঘটনার মধ্যে আপনার নিকট যে বানী আসছে তাতে রয়েছে মুমিনের উপদেশ ও স্মারক’। (সুরা হুদ ,আয়াত ১২০।)

এ কারণে দেখা যায় পুরবর্তি ওলামায়ে কিরাম ও বরেণ্য ব্যক্তিদের জীবনী আলোচনা করা ছিল পরবর্তি ওলামায়ে কিরামের একটি বিশেষ আমল। তারা তা থেকে শিক্ষা ও শিষ্টাচার শিক্ষা করতেন। অর্জন করতেন জীবনের চালিকা শক্তি।

ইমাম আবু হানিফা রহ. বলেন, ‘ওলামায়ে কেরামের জীবন নিয়ে আলোচনা করা ও তাদের মজলিসে বসা আমার নিকট অনেক ফিকহ শিক্ষা করা থেকেও উত্তম। তাতে মানুষের জন্যে রয়েছে শিষ্টাচার ও উত্তম আখলাক শিক্ষা’। (জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহি ১/৫০৯, দারু ইবনিল জাওযী, প্রথম মুদ্রণ ১৪১৪ হি.)

সকল পূর্ববর্তী ও পরবর্তীদের মধ্যে সর্বশেষ্ঠ ও সর্বনুসরণীয় জীবন হলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। কারণ তা ছিল সমস্ত কলুষতা মুক্ত ও আদর্শেপূর্ণ একটি জীবন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী শুধু আলোচনা নয়, বরং তা একটু একটু শিক্ষা করা ছিল শুরুর যুগের মুসলমানদের নিয়মিত অভ্যাস।

যাইনুল আবেদিন আলি ইবনে হুসাইন বিন আলি বলেন, আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত শিক্ষা করতাম যেমন আমরা কুরআন শিক্ষা করেছি। (শরহুল মাওয়াহিবুল লাদুনিয়্যাহ ২/২২৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, প্রথম মুদ্রণ ১৪১৭ হি.)

ইসমাইল ইবনে মুহাম্মদ বলেন, দাদাজান সা’দ বিন আবি ওয়াক্কাস রা. আমাদেরকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুদ্ধজীবন শিক্ষা দিতেন আর বলতেন, হে আমার সন্তানেরা! এইগুলো তোমাদের দাদাদের সম্মানগাথা। এই আলোচনাগুলো তোমরা নষ্ট করে দিওনা। (শরহুল মাওয়াহিবুল লাদুনিয়্যাহ ২/২২৯, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, প্রথম মুদ্রণ ১৪১৭ হি.)

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত আলোচনা করে শিক্ষা লাভ করা ও তার রঙে নিজেকে ও সমাজকে রাঙিয়ে তোলা ছাড়াও তা লিপিবদ্ধ করে পরবর্তী উম্মাহের জন্যে রেখে যাওয়া ছিল সালাফদের এক অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যাতে উম্মত সরাসরি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে উত্তম আদর্শ গ্রহণ করতে পারে। নবির রঙে রাঙিয়ে তুলতে পারে নিজের জীবন ও সমাজকে। আর লিখিত আকারে সিরাত চর্চার শুরুটাই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়।

 

‘ইসলামের ইতিহাসে সিরাত চর্চার সূচনা’ কিভাবে হয়েছে তা বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে মৌলিক কিছু কথা বুঝতে হবে।

১.  রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের প্রতিটি অংশ; কীভাবে কথা বলেছেন, খানা খেয়েছন, হাঁটা-চলা করেছেন, পরিচিত-অপরিচিতদের সাথে কিরূপ আচরণ করেছেন, কীভাবে যুদ্ধ পরিচলানা করেছেন এবং সাহাবাদের দ্বীন শিক্ষা তথা আকিদা-বিশ্বাস, দৈনন্দিনের জীবন থেকে রাষ্ট্রজীবনে ইসলামের প্রতিটি বিধান, এই সবকিছুর সমষ্টি হলো ‘সিরাতুন্নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’। আর এই ব্যপক অর্থে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত চর্চা ঐদিন থেকে শুরু হয়েছে যেদিন থেকে ‘হাদিস’ সংকলন শুরু হয়েছে। আর ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত—রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাআইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশাতেই হাদিস সংকলনের কাজ শুরু হয়।

(ক) সুনানে আবু দাউদে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা শুনতাম মুখস্থ রাখার জন্য সব লেখে রাখতাম। কুরাইশের কিছু মানুষ আমাকে তা থেকে নিষেধ করলো—তুমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা শুনো তাই লেখে রাখো অথচ তিনি একজন মানুষ। তিনি রাগের মাথায়ও কথা বলেন আবার খুশি মনেও কথা বলেন। এই কথা শুনে আমি লেখা থেকে বিরত থাকলাম। এবং রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিষয়টি অবগত করলাম। তিনি নিজের মুখের দিকে আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করে বললেন, যে সত্ত্বার হাতে আমার জান তার কসম এই মুখ দিয়ে শুধু সত্য ও হক কথাই বের হয়। (সুনানে আবি দাউদ হাদিস নং ৩৬৪১, কিতাবুল ইলম অধ্যায়)

(খ) সুনানে নাসায়িতে আছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইয়েমেনবাসীর জন্যে একটি কিতাব লিখিয়ে দেন, যাতে ফরজ, সুন্নাত ও দিয়াতের আহকামসমুহ ছিল। এবং আমর ইবনে হাযমকে দিয়ে তা প্রেরণ করেন। (সুনানে নাসায়ী হাদিস নং ৪৮৫৩)

এই কিতাবটি সাহাবা ও তার পরবর্তী জামানায় প্রসিদ্ধ ছিল। উলামায়ে কেরাম তা থেকে অনেক মাসআলা সমাধান করতেন। হযরত উমর রা. আঙ্গুল কেটে ফেললে কি দিয়াত আসবে এই বিষয়ে এই কিতাব থেকে সমাধান দিয়েছেন। (তাওযিহুল আফকার ২/২১৪, ‘আকসামুত তাহাম্মুল’ অধ্যায়, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ , প্রথম প্রকাশ ১৪১৭।)

এরকম ঐতিহাসিক আরো অনেক ঘটনাই প্রমাণ করে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশাতেই হাদিস সংকলনের কাজ শুরু হয়। তবে তা ব্যপক ছিল না।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় যে কিতাবগুলো বিভিন্ন সময় লিখিয়েছেন তা মুহাদ্দিসগণ স্বতন্ত্র কিতাবে জমা করেছেন। এর মাঝে প্রসিদ্ধ হলো হাফেজ ইবনে তুলুন রহ. (মৃত্যু ৯৫৩ হি.) রচিত ‘ই’লামুস সায়িলিন আন কুতুবি সায়্যিদিল মুরসালিন’ নামক কিতাবটি।

 

২. ইসলামের প্রথম যুগে ‘সিরাতুন্নবী’ শব্দটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুদ্ধ জীবনের সাথেই শুধু ব্যবহার হতো। আল্লামা শিবলি নোমানী রহ. বলেন, “প্রথম যুগের মুহাদ্দিস ও রিজালশাস্ত্রের বড় বড় পণ্ডিতদের নিকট রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুদ্ধজীবনের বর্ণনা করাকেই সিরাত বলা হতো। সিরাত ইবনে ইসহাককে মাগাযী ইবনে ইসহাকও বলা হয়। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ফাতহুল বারীতে এই উভয় নামই উল্লেখ করেছেন।……. কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত বিষয়টি এমনই ছিল। তৃতীয় শতাব্দীতে সিরাতের যে সমস্ত কিতাবগুলো প্রসিদ্ধ তাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুদ্ধজীবনের আলোচনাই বেশি ছিল। যেমন সিরাত ইবনে হিশাম, সিরাত ইবনে আয়েজ, সিরাত ইবনে উমাবী ইত্যাদী। এরপর ধীরে ধীরে সিরাত শিরোনামের কিতাবগুলোতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুদ্ধ জীবন ছাড়াও অন্যান্য বিষয়গুলোর অন্তর্ভুক্তি হতে থাকলো। এই কারণেই মুহাদ্দিসদের পরিভাষায় ‘মাগাযী’ ও ‘সিরাত’ হাদিসে শাস্ত্রের অন্যান্য বিষয় থেকে একটু ভিন্ন। এমনকি বিভিন্ন সময় সিরাত বিশেষজ্ঞ ও মুহাদ্দিসদের আলাদা দুটি জামাত মনে করা হয়। (সিরাতুন্নবী -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ভুমিকা, আল্লামা শিবলি নুমানী পৃ.২৬)

এই অর্থে ‘সিরাতুন্নবি’ হাদিসশাস্ত্রেরই একটি ভিন্ন ফন। এবং স্বতন্ত্র শাখা। কুরআন-হাদিস থেকেই ফিকহ নির্গত হয়েছে। কিন্তু ফিকহ্‌টাই কুরআন-হাদিস নয়। তদ্রুপ হাদিস শাস্ত্র থেকেই সিরাতশাস্ত্রের উৎপত্তি কিন্তু সিরাত হাদিস শাস্ত্র নয়।

 

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সিরাত চর্চার শুরু 

ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্নভাবে ইসলামের শুরু যুগ থেকে সিরাত চর্চা মানুষের মাঝে থাকলেও তার ব্যপক প্রচলন ও গুরুত্বারোপ শুরু হয় খলিফা উমর ইবনে আব্দুল আজিজের জামানায়। তিনি আলাদাভাবে সিরাত চর্চার মজলিস কায়েম করা নির্দেশ দেন। এবং হাদিস সংকলের পাশাপাশি বিশেষভাবে সিরাত সংকলনের গুরুত্বারোপ করেন।

তিনি আসেম ইবনে উমর বিন কাতাদাহকে দামেশকের জামে মসজিদে সিরাতের দরসের আদেশ দেন। (তাবকাতে ইবনে সাদ ৫/৩৩৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১৪১০ হি.)

 

লিখিত আকারে সিরাত চর্চা

সর্বপ্রথম সিরাত কে লিখেছেন সে নিয়ে অনেক মতবেধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন সর্বপ্রথম সিরাত সংকলন করেছেন ‘উরওয়া বিন যুবায়ের’। (কাশফুয যুনুন ২/১৭৪৬, ‘মাগাযীউর রাসুল -সালাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- অধ্যায়।)

কিন্তু পরবর্তীতে একটি দুর্ঘটনায় তার সমস্ত কিতাবাদি পুড়ে যায়। সম্ভবত সেই দুর্যোগে এই কিতাবটিও পুড়ে যায়। যার কারণে আজ এই কিতাবের নাম ও তার উদ্ধৃতি শুধু সিরাতের কিতাবসমূহের পাওয়া যায়। (আসসিরাতুন নাবাউয়্যাহ ফি যাউইল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ পৃ.৩৮, দারুল কলম)

এছাড়াও ঐ সময়ে আরো বেশ কিছু সিরাতের কিতাব লেখা হয়েছে বলে ইতিহাস থেকে জানা যায়। তবে এগুলো সংক্ষিপ্ত ও বিচ্ছিন্ন জমাকৃত কিছু দস্তাবেজ, যা কোনো স্বতন্ত্র কিতাব নয়। ইবনে ইসহাকসহ পরবর্তি সিরাতের ইমামগণ উরওয়া ইবনে যুবায়ের ও ঐ সময়ে লিখিত কিতাব সমূহ থেকে সিরাতের অনেক ঘটনা উল্লেখ করেছেন। এবং তা থেকেই শুধু ঐ কিতাবসমূহের নাম আমরা জানতে পারি।

সামগ্রিকভাবে লিখিত আকারে সিরাত চর্চার শুরু হয় ইমাম যুহরীর সময় থেকে। এবং ইমাম যুহরী থেকেই সিরাত চর্চা একটি বিস্তৃতিরূপ লাভ করে।

ইমাম যুহরি ছিলেন নিজ জামানার সবচে বড় আলেম। হাদিস-ফিকহ সব শাস্ত্রেই তিনি ছিলেন জামানার এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। ইতিহাসে সর্বপ্রথম ‘সিরাত’ বিষয়ে স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করেন ইমাম যুহরী রহ.। সুহাইলি রহ. (মৃত্যু ৫৮১হি.) বলেন, ‘ইসলামের ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত সিরাতগ্রন্থ হলো ইমাম যুহরীর’। (আর রাওজুল আনফ ১/১৫৫, দারু ইহয়ায়িত তুরাছ, প্রথম প্রকাশ ১৪২৪।)

আলি ইবনে বুরহানুদ্দিন (মৃত্যু ১০৪৪ হি.) বলেন, সর্বপ্রথম সিরাত বিষয়ক কিতাব লেখেন ইমাম যুহরী। (আস সিরাতুল হালাবিয়্যা ১/৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, দ্বিতীয় প্রকাশ ১৪২৭।)

এরপর তার ছাত্ররাই ইতিহাসের পাতায় ‘সিরাত’ চর্চায় অগ্রজ ভূমিকা পালন করেছেন। যেমন মুসা বিন উকবা, ইবনে ইসহাক, ইয়া’কুব বিন ইবরাহিম প্রমুখ। এরা সকলেই নিজ যামানাতে সিরাত বিষয়ক প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব। আর এদের সকলের মাঝে অন্যতম সেরা ছিলেন মুসা ইবনে উকবা ও ইমামুল মাগাযী ইবনে ইসহাক।

 

মৌলিক সিরাত পরিচিতি

মৌলিক সিরাত পরিচিতি শিরোনামে এখানে শুধু ঐ কিতাবগুলো উল্লেখ করা হবে যেগুলোর উপর সিরাত শাস্ত্রের মুল ভিত্তি।

১. সিরাতে মুসা ইবনে উকবাহ

মুসা ইবনে উকবাহ। ১৪১হি.তে মৃত্যু বরণ করেন। তার রচিত সিরাতগ্রন্থটি অনেক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কিন্তু সংক্ষিপ্ত ছিল। ইমাম মালেক রহ.কে সিরাতের কিতাব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলো। উত্তরে তিনি বললেন, তোমরা মুসা ইবনে উকবার সিরাতকে গুরুত্বের সাথে পড়ো। কেননা তা এই বিষয়ে সবচে বিশুদ্ধ। (তাহজিবুল কামাল ২৯/১১৯, ‘মুসা ইবনে উকবা’ জীবনী অধ্যায়।)

ইমাম মালেক রহ. এর দুটি কারণ উল্লেখ করেন। ১. অন্যান্য সিরাতবিদদের মত বেশি বেশি ঘটনা উল্লেখ করার বদলে তিনি শুধু তার নিকট যে ঘটনাগুলো বিশুদ্ধ তা উল্লেখ করেছেন। ২. তিনি বেশ পরিপক্ব বয়সে হাদিস ও সিরাতের জ্ঞান চর্চা শুরু করেন। যার কারণে ইলম অন্বেষণে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করতে পেরেছেন। (তাহজিবুল কামাল ২৯/১১৯, ‘মুসা ইবনে উকবা’ জীবনী অধ্যায়।)

আল্লামা শিবলি নুমানী রহ. এই সিরাতের বেশকিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে লেখেন, ‘আজ এই সিরাতটির কোনো নুসখা বিদ্যমান নেই। তবে একটি সময় পর্যন্ত কিতাবটি বেশ প্রসিদ্ধ ও সচারাচর ছিল। প্রাচীন সকল সিরাতের কিতাবে এই কিতাবের উদ্ধৃতি পাওয়া যায়’। (সিরাতুন্নবী -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ভুমিকা, আল্লামা শিবলি নুমানী পৃ.৩৪)

২. সিরাত ইবনে ইসহাক

ইবনে ইসহাক রহ. সিরাত শাস্ত্রের সবচে বড় মহাপণ্ডিত। ইমামুল মাগাযী নামে তিনি স্বীকৃতি লাভ করেন।  সিরাত শাস্ত্রে তিনি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছেন যে, তার পরে এই শাস্ত্রে যারাই কাজ করবে সকলেই তার মুখাপেক্ষি। ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, যারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুদ্ধজীবন সম্পর্কে গভির জ্ঞান অর্জন করতে চায়, তারা সকলেই এই বিষয়ে ইবনে ইসহাকের মুখাপেক্ষি। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৭/ ৩৬, মুয়াসসাসাতুর রিসালা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৫হি.)

ইবনে আদি রহ. বলেন, মুহাম্মদ ইবনে ইসহাকের এই একক বৈশিষ্ট্য যে, তিনি (আব্বাসী) খলিফাদের অন্যদিক থেকে ফিরিয়ে সিরাতমুখি করেছেন। তারপরে  সিরাত শাস্ত্রে লিখিত কোনো কিতাবই তার কিতাবের মত মর্যাদা পায়নি। (আল কামেল ফি যুয়াফাইর রিজাল ৭/২৭০, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, প্রথম মুদ্রণ ১৪১৮ হি.।)

 

ইবনে ইসহাক রহ. ‘সিরাত’ সংকলনের পেক্ষাপট

একবার ইবনে ইসহাক রহ. খলিফা মানসুরের দরবারে যান। খলিফার সামনে তার ছেলে বসা ছিল। খলিফা ইবনে ইসহাককে জিজ্ঞাসা করলো, এই ছেলেকে চিনো ? ইবনে ইসহাক বললো, জি! খলিফার ছেলে। খলিফা আদেশ করলো, ‘যাও, তার জন্যে সৃষ্টির শুরু থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত সমস্ত সমস্ত ইতিহাস লেখে দাও। ইবনে ইসহাক রহ. খলিফার কথামতে তার ছেলের জন্যে একটি কিতাব রচনা নিয়ে যায়। খলিফা কিতাব দেখে বলে, ইবনে ইসহাক! তুমি তো অনেক বড় কিতাব লেখে ফেলেছো। যাও এটাকে সংক্ষিপ্ত করে নিয়ে আসো। ইবনে ইসহাক রহ. তা সংক্ষিপ্ত করে দেন। খলিফা তা নিজের রাজভাণ্ডারে জমা করে রাখেন। আর তাই আজকের সিরাত ইবনে ইসহাক। (তারিখে বাগদাদ ১/২৩৭, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ।)

৩. সিরাত ইবনে হিশাম

আজ পৃথিবীর যেখানেই সিরাত ইবনে ইসহাকের আলোচনা হবে তার সাথে আবশ্যকিয়ভাবে আরেকটি কিতাবের নাম উঠে আসবে। আর তা হলো ‘সিরাত ইবনে হিশাম’। কারণ ‘সিরাত ইবনে ইসহাক’ আজ অতটুকু সকলের সামনে সুপ্রসিদ্ধ হয়ে সংরক্ষিত আছে, যা সিরাত ইবনে হিশামের মধ্যে রয়েছে।

আব্দুল মালিক ইবনে হিশাম ইবনে আইয়ুব আজজুহালি। ২১৮ হি.তে মৃত্য বরণ করেন। ইবনে ইসহাকের ছাত্র যিয়াদ আলবুকায়ী থেকে তিনি কিতাবটির দরস গ্রহণ করেন। এবং সিরাত ইবনে ইসহাককে পরিমার্জন ও কিছু সংস্করণ করে নতুন অবয়বে পেশ করেন। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ১০/৪২৯।)

এই পরিমার্জনে তিনি কয়েকটি কাজ করেছেন;

১. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেহেতু ইসমাইল আ.-র বংশ থেকে, তাই ইসমাইল আ. থেকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সংক্ষিপ্তকারে সকলের জীবনী নিয়ে আলোচনা করেছেন।

২. ইবনে ইসহাক রহ. তার সিরাতে অনেক অপ্রয়োজনীয় বিষয় এনেছেন যার সাথে সিরাতের কোনো সম্পর্ক নেই, তা তিনি বাদ দিয়ে দিয়েছেন। যেমন এমন অনেক ঘটনা এনেছেন যার সাথে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, দ্বীনের বা সংশ্লিষ্ট কিতাবের কোনো সম্পর্ক নেই। বা এমন অনেক শে’র বা কবিতা এনেছেন যা সমাযে প্রচলিত নয়। বা যার কোন হদিস নেই।

৩. সিরাত ইবনে হিশামে কোনো শব্দ অস্পষ্ট থাকলে তা স্পষ্ট করেছেন। বা দুর্বোধ্য শব্দ আসলে তা ব্যাখ্যা করেছেন।

৪. ঘটনা যাচাইয়ে অনেক সতর্কতার পরিচয় দিয়েছেন। এবং নির্ভরযোগ্য ঘটনাগুলো উল্লেখে যত্নবান ছিলেন। (দেখুন সিরাত ইবনে হিশামে লেখকের ভুমিকা ১/৩৬, দারু ইহয়ায়িত তুরাস, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪২১ হি.)

আবু শুহবা রহ. বলেন, ‘এই কারণে মানুষ সিরাত ইবনে হিশামের কথা ভুলে গেছে এবং সিরাত ইবনে হিশামকে আলোচনায় রেখেছে। সিরাত ইবনে হিশাম ছাড়া সিরাত ইবনে ইসহাকের নামও কেউ নেয় না। মুতায়াখখিরিনদের মিকট ‘সিরাত ইবনে ইসহাক’ বলতে ‘সিরাত ইবনে হিশাম’ এমনটি হয়ে গেছে।  তবে মুতাকাদ্দিমীনদের নিকট সিরাত ইবনে হিশামের নিজস্ব পরিচয় ছিল’। (আস সিরাতুন নাবাউইয়্যাহ ফি যাওইল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ.১/৩৩, দারুল কলম)

৪. মাগাযীয়ে ওয়াকিদি 

মুহাম্মদ বিন উমর বিন ওয়াকিদ। ১৩০হি.তে জন্মগ্রহণ করেন। দাদার দিকে নিসবত করে ওয়াকিদি বলা হয়। এবং এই নামেই প্রসিদ্ধি লাভ করেন। হাদিস শাস্ত্রে বেশ দুর্বল রাবী হলেও রাসুল সাল্লাল্লাহি আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত, সাহাবাদের জীবনী সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। যাহাবী রহ. বলেন, ‘অনেক ইলমের অধিকারী ছিলেন। কিন্তু ভালো-খারাপের সংমিশ্রণ করে ফেলেছেন। যার কারণে মুহাদ্দিসিন তাকে পরিত্যাগ করেছেন। তা সত্ত্বেও রাসুল সাল্লাল্লাহুই আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাত ও সাহাবাদের জীবনের ইলম অর্জনে তার থেকে কেউ অমুখাপেক্ষি নয়’। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৫/৪৫৫)

পরবর্তি সময়ের মুয়াররিখিন এবং সিরাতবিদগণ ওয়াকিদি রহ.-র কিতাব থেকে উদ্ধৃতি পেশ করেছেন। ইবনে সা’দ রহ. তার ‘তাবকাত’-র সিরাত অংশে ওয়াকিদি রহ.-র উদ্ধৃতিতে প্রচুর রেওয়ায়েত করেছেন।

৫. ইবনে সা’দ রহ.-র সিরাত

এটা মূলত ইবনে সা’দ রহ. লিখিত ‘তাবকাতে ইবনে সা’দ’-র একটি অংশ। ইবনে সা’দ রহ. ছিলেন ওয়াকিদি রহ.-র কাতেব। তাই তাকে ‘কাতেবে ওয়াকিদি’ বলা হয়। ওয়াকিদি রহ. মুহাদ্দিসদের নিকট অপছন্দনীয় হলেও ইবনে সা’দের ব্যাপারে তার উচ্ছ্বাসিত প্রশংসা করেছেন। হাফেজ ইবনে হাজার রহ. বলেন, ইবনে সা’দ রহ. একজন নির্ভরযোগ্য, চৌকান্না বড়মাপের হাফেজুল হাদিস।(তাহজিবুত তাহজিব ৯/১৮২)

ইবনে সা’দ রহ. ‘তাবকাত’ লেখেন। যাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবী ও তাবেয়ীনদের জীবনী সন্নিবেশিত করেছেন। এই ‘তাবকাত’-র প্রথম দুখণ্ডে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনী এনেছেন। আর তাই হলো ‘সিরাতে ইবনে সা’দ’। যাহাবী রহ. এই ‘তাবকাত’ সম্পর্কে লেখেন, “ইবনে সা’দ একজন বিজ্ঞ ও চৌকুস আলেম।যে তার ‘তাবকাতে’ নজর বুলাবে সে তার ইলমের সামনে নত হতে বাধ্য। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ১০/৬৬৫)

খতিব বাগদাদি রহ. বলেন, ইবনে সা’দ একজন নির্ভরযোগ্য আলেম। তিনি সাহাবা ও তার সময় পর্যন্ত তাবেয়ীনদের নিয়ে একটি বড় কিতাব লেখেন। তাতে তিন বেশ সুন্দর কাজ করেছেন। (তাহজিবুত তাহজিব ৯/১৮২)

ওয়াকেদি রহ. থেকে ইবনে সা’দ রহ. প্রচুর রেওয়ায়েত করেছেন তার এই সিরাত অংশে। কিন্তু তিনি যেহেতু রেওয়ায়েতে সতর্কতা অবলম্বন করতেন, তাই তার এই কিতাবটি অধিকাংশে খুরাফাত ও জাল বর্ননা থেকে মুক্ত। খতিব বাগদাদি রহ. বলেন, ‘ইবনে সা’দ আমাদের নিকট একজন নির্ভরযোগ্য। এবং অধিকাংশ রেওয়ায়েতের ক্ষেত্রে তিনি সতর্কতা অবলম্বন করতেন’। (তাহজিবুত তাহজিব ৯/১৮৩)

আল্লামা শিবলী নোমানী রহ. বলেন, ‘এই কিতাবে (তাবকাতে ইবনে সা’দের সিরাত অংশ) বেশ পরিমান ওয়াকিদি রহ. থেকে রেওয়ায়েত আনা হয়েছে। তবে যেহেতু সবকিছু সনদসহ উল্লেখিত হয়েছে ওয়াকিদির রেওয়ায়েতকে সহজেই পার্থক্য করা যায়। (সিরাতুন্নবী -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ভুমিকা, আল্লামা শিবলি নুমানী পৃ.৩৬)

৬. ইমাম তাবারি রহ.-র সিরাত

মুহাম্মদ বিন জারির বিন ইয়াজিদ বিন কাসির আততাবারি। ২২৪ হি.তে জন্মগ্রহণ করেন। নিজ জামানার সবচে বড় আলেম ছিলেন। ফিকহে তাকে মুজতাহিদ ইমাম গণ্য করা হতো। খতিব বাগদাদি রহ. বলেন, তিনি ছিলেন একজন ইমাম যার কথা দিয়ে ফায়সালা করা হতো। … তিনি এত বেশি ইলমের অধিকারী ছিলেন তার সমকালীন কেউ তার সমকক্ষ ছিলনা। … পূর্ববর্তিদের ইতিহাস সম্পর্কে তার পাণ্ডিত্ত্ব ছিল অনেক। এবং এই বিষয়ে তার একটি প্রসিদ্ধ কিতাব রয়েছে ‘তারিখুল উমামি ওয়াল মুলুক’। (তারিখে বাগদাদ ২/১৬১, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ।)

ইতিহাসের এই কিতাবে তাবারি রহ. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিরাতের একটি বড় অংশ উল্লেখ করেছেন। যা আমার সামনে থাকা নুসখায় তিনশত পৃষ্ঠা প্রায়।

পরবর্তী সিরাত গবেষকগণ ‘তারিখে তাবারির’-র উদ্ধৃতিতে তাদের কিতাবে সিরাতের প্রচুর ঘটনা উল্লেখ করেছেন।

 

এই হলো সিরাতের কয়েকটি মৌলিক প্রসিদ্ধ কিতাব। সিরাত শাস্ত্রে এই কিতাবগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।  আল্লামা শিবলী নোমানী রহ. বলেন, ‘বর্তমানে যদিও সিরাতের হাজারো কিতাব রয়েছে কিতাব রয়েছে। কিন্তু এই সকল কিতাবের মুল উৎস হলো এই কয়েকটি কিতাব। যেমন সিরাত ইবনে ইসহাক ,ওয়াকিদি, ইবনে সাদ, তাবারী। এছাড়া যে সমস্ত কিতাব এখন রয়েছে তাতে যত ঘটনা আসে তা বেশির অংশ এই কিতাবগুলো থেকেই নেওয়া। (সিরাতুন্নবী -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ভুমিকা, আল্লামা শিবলি নুমানী পৃ.৪৯)

এখানে কিছু কথা সুবিশেষ উল্লেখযোগ্য,

সিরাত বিশেষজ্ঞগণ ব্যতিতও ঐসময়ের মুহাদ্দিগণ তাদের হাদিসের কিতাবসমুহে ‘মাগাযী’ ও ‘সিয়ার’ বিষয়ে হাদিসসমুহ বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন। এবং সিরাতবিদদের তুলনায় মুহাদ্দিসগণ ঘটনা বর্ণনায় যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। তাই সিরাত বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের অন্যতম একটি বড় মাধ্যম হলো হাদিসের কিতাবসমূহ।

সিরাতবিশেষজ্ঞগণ যদিও তাদের কিতাবে সব ঘটনা ‘সনদসহ’ উল্লেখ করেন, কিন্তু মুহাদ্দিসিনে কিরামের মত তারা রেওয়ায়েতে সতর্কতা অবলম্বন করেননা। তার একটি মৌলিক কারণ তো হলো এই যে, আহকাম ব্যতিত অন্যসকল বিষয়ে রেওয়ায়েত করার ক্ষেত্রে মুহাদ্দিসগণ শিতিলতার পথ অবলম্ভন করেছেন। আর সিরাতের অনেক ঘটনার সাথেই যেহেতু আহকামের সম্পর্ক নেই তাই সিরাতবিদ ও মুয়াররিখগণ ঘটনা যাচাইয়ে শক্ত হননি। আর এই শিথিলতা কারণে মোটাদাগে একটি সমস্যা এই হয়েছে, মুয়াররিখিন এমন অনেক বর্ণনাকারী থেকে সিরাতের ঘটনাসমূহ গ্রহণ করতেন যারা মুহাদ্দিসদের নিকট গ্রহণযোগ্য ছিলেন না। এবং সিরাতবিদগণ

সিরাতবিশেষজ্ঞ আর মুহাদ্দিসদের মাঝে যদি কোনো ঘটনা নিয়ে ইখতেলাফ হয়ে যায় তাহলে  প্রাধান্য পাবে কোনটি, এই নিয়ে ওলামায়ে কেরামের মাঝে দুধরনের মত পাওয়া যায়। কেউ কেউ বলেন, ‘মুহাদ্দিসদের রেওয়ায়েত প্রাধান্য পাবে। কারণ তারা রেওয়ায়েত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সিরাতবিশেষজ্ঞদের তুলনায় বেশি সতর্ক ছিলেন। আবার কেউ কেউ সিরাতবিশেষজ্ঞদের বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ এই বিষয়ে মাহেরে ফন।

(বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন, সিরাতুন্নবী -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ভুমিকা, আল্লামা শিবলি নুমানী ও আস ‘সিরাতুন নাবাউইয়্যাহ ফি যাওইল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ’ ভুমিকা, আবু শুহবা রহ., দারুল কলম)

 

এইহলো ইসলামের ইতিহাসে সিরাত চর্চার সূচনা এবং মৌলিক সিরাত পরিচিতি। সবিশেষ মাওলানা মনযুর নোমানী রহ.-র একটি বক্তব্য দিয়ে প্রবন্ধটি শেষ করছি। একটি সিরাত মাহফিলে তিনি তার কথা এই বক্তব্য দিয়েই শেষ করেছেন। তিনি বলেছিলেন,–

‘প্রিয় ভাই ও বন্ধুরা, আল্লাহ্‌ তায়ালার পয়গম্বরগণের ও পৃথিবীর আধ্যাত্মিক রাহবারদের মধ্যে একমাত্র তার (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের) ব্যক্তিত্বই এমন, যার জীবনের ছোট বড় ঘটনাবলি এবং শিক্ষা ও নির্দেশনা এতটা বিস্তারিতভাবে এবং এত নির্ভরযোগ্য পদ্ধতিতে ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষণ করা হয়েছে যে, আমার ও আপনার জন্যে আজ তার পবিত্র জীবন অধ্যায়ন সেভাবেই সম্ভব, যেভাবে তার প্রতিবেশি ও সঙ্গীবৃন্দ তার জীবদ্দশায় তাকে অবলোকন করেছিলেন।

এই মুহূর্তে কোনোরকম রাখ-ঢাক ছাড়া স্পষ্ট বলে দেওয়াই ভালো মনে করি যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবন ও তার শিক্ষার ব্যাপারে যে নির্ভরযোগ্য ইতিহাস সংরক্ষিত আছে, আমি নিজে যখন তা অধ্যায়ন করি তখন আমার মনে হয়, আমি যেন তাকে, তার কর্ম-ব্যস্ততা ও তার আশপাশের গোটা পরিবেশকে সচক্ষে অবলোকন করছি। এবং তার অমীয় বাণী নিজ কানে শ্রবণ করছি। আমি কসম করে বলতে পারি, আমার অনেক বুযুর্গ ও বন্ধু, যাদের সঙ্গে আমার চলাফেরা ও ওঠা-বসা হয়েছে তাদেরকেও এতটা জানিনা যতটা নির্ভরযোগ্য ইতিহাসের মাধ্যমে আমার হাদি ও রাহনুমা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানি। আর এটা আমার কোনো বিশেষত্ব নয়। আপনাদের মধ্যে যারা নেক নিয়তে তার শিক্ষা ও পবিত্র সিরাত অধ্যায়ন করবেন ইনশাআল্লাহ্‌ তার অনুভূতিও এমনই হবে।

একথা আমি আমার মুসলিম ভাইদেরও বলছি এবং অমুসলিম ভাইদেরও বলছি, এই সমুন্নত আদর্শ থেকে উপকৃত হওয়ার সকল সুযোগ ও উপকরণ বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও তা থেকে উপকৃত না হওয়া  নিঃসন্দেহে অনেক বড় বাঞ্চনা। আল্লাহ্‌ আমাদের সবাইকে সে চক্ষু, সে কর্ণ এবং সেই হৃদয় দান করুন, যা দ্বারা আমরা বাস্তবকে তার প্রকৃত রূপে প্রত্যক্ষ করতে পারি।, শ্রবণ করতে পারি, অনুধাবন করতে পারি এবং তা থেকে উপকৃত হতে পারি। আমীন’।  (নির্বাচিত প্রবন্ধ ১/১১৩-১১৪, মাওলানা আব্দুল মালেক দা.বা.)

 

তথ্যপঞ্জি :

১. আলকুরআনুল কারিম।

২. সুনানে আবি দাউদ, শায়খ আওয়ামা তাহকিকৃত নুসখা, দ্বিতীয় মুদ্রণ ১৪২৫ হি.

৩. সুনানে নাসায়ী, দারু ইবনিল জাওযী প্রথম মুদ্রণ ১৪৩২ হি.

৪. সিরাত ইবনে হিশামে, দারু ইহয়ায়িত তুরাস, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪২১ হি.

৫. তাবকাতে ইবনে সাদ, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, ১৪১০ হি.

৬. আল কামেল ফি যুয়াফাইর রিজাল, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, প্রথম মুদ্রণ ১৪১৮ হি.

৭. জামিউ বায়ানিল ইলমি ওয়া ফাজলিহি, দারু ইবনিল জাওযী, প্রথম মুদ্রণ ১৪১৪ হি.

৮. তারিখে বাগদাদ, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, প্রথম মুদ্রণ ১৪১৭ হি.

৯. আর রাওজুল আনফ, দারু ইহয়ায়িত তুরাছ, প্রথম প্রকাশ ১৪২৪ হি.

১০. তাহজিবুল কামাল (শামেলা ভার্সন)

১১. সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, মুয়াসসাসাতুর রিসালা, তৃতীয় মুদ্রণ ১৪০৫ হি.

১২. তাহজিবুত তাহজিব (শামেলা ভার্সন)

১৩. শরহুল মাওয়াহিবুল লাদুনিয়্যাহ, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, প্রথম মুদ্রণ ১৪১৭ হি.

১৪. আস সিরাতুল হালাবিয়্যা, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, দ্বিতীয় মুদ্রণ ১৪২৭ হি.

১৫. কাশফুয যুনুন (শামেলা ভার্সন)

১৬. তাওযিহুল আফকার, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ , প্রথম মুদ্রণ ১৪১৭ হি.

১৭. সিরাতুন্নবী -সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ভুমিকা, আল্লামা শিবলি নুমানী, দারুল ইশায়াত করাচি, প্রকাশকাল ২০০৪ ইং.

১৮. আসসিরাতুন নাবাউয়্যাহ ফি যাউইল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ, আবু শুহবা রহ., দারুল কলম।

১৯. নির্বাচিত প্রবন্ধ ১/১১৩-১১৪, মাওলানা আব্দুল মালেক দা.বা.)

লেখক : তরুণ আলেম

Tijarah-Shop

Facebook Comments