আত্মশুদ্ধি

সুন্নাত ও বিদআতের পরিচয় : কিছু মৌলিক কথা-১ | আল্লামা ইউসুফ লুধিয়ানভী রহ.

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

অনুবাদ : আব্দুল্লাহ বিন বশির

(বিভিন্ন লেখায় ও বয়ানে আমরা শুনি, ‘অমুক কাজটি সুন্নাত, অমুক কাজটি বিদআত’৷ কিন্তু আমাদের অনেকের কাছেই ‘সুন্নাত-বিদআত’-এর আসল হাকিকত ও বাস্তবতা পরিষ্কার নয়। ফলে আমরা বহু জায়গায় হোঁচট খাই এবং বিভ্রান্তির শিকার হই।
সুন্নাত ও বিদআত নিয়ে যতগুলো লেখা পড়ার তৌফিক হয়েছে, তার মধ্যে পাকিস্তানের বিখ্যাত আলেমে দ্বীন হযরত শহিদ ইউসুফ লুধিয়ানাবী রহ.-এর লেখাটি সহজবোধ্য ও ‘আম ফাহম’ মনে হয়েছে। লেখাটি সুন্নাত-বিদআতের মূল বিষয়টি বুঝতে বেশ সহায়ক হবে বলেই আমার ধারণা। গুরুত্বের বিবেচনায় ধারাবাহিকভাবে লেখাটির অনুবাদ আসবে ইনশাআল্লাহ্‌। আল্লাহ তাআলা আমাদের সুন্নাত আঁকড়ে ধরে বিদআত থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করুন। আমীন। —অনুবাদক)

১. সুন্নাত ও বিদআত পরস্পর বিপরীত। যখন কোনো কাজ বা আমল সম্পর্কে বলা হবে ‘এটা সুন্নাত’, তখন এর দ্বারা উদ্দেশ্য হবে কাজটি বিদআত নয়। পক্ষান্তরে যখন কোনো কাজ বা আমলের ক্ষেত্রে বলা হবে ‘এটা বেদআত’, তখন এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে—কাজটি সুন্নাতের খেলাফ।

২. আমার, আপনার এবং দুনিয়ার সমস্ত মানুষের ইমান হলো—‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তির পর একদিকে অন্য সমস্ত নবির শরিয়ত মানসুখ তথা রহিত হয়ে গেছে। অন্যদিকে কেয়ামত পর্যন্ত নবুওয়াতের দরজা বন্ধ।
আবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তার সত্তা মুবারকই একমাত্র মাধ্যম, যার দ্বারা আমরা জানতে পারবো—কোন কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি হবে ও কোন কাজে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যতীত এই বিষয়টি জানা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

আল্লাহ তায়ালা নিজের সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি জানাবার জন্যে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আয়না বানিয়েছেন। আর এই নববী আয়নাই হলো ‘দ্বীনে শরিয়ত’। যার পূর্ণাঙ্গতার ঘোষণা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের তিনমাস পূর্বে আরাফার ময়দানে দেওয়া হয়েছে৷ এখন এই ‘দ্বীনে শরিয়তে’ কোনো কিছু কমানোও যাবে না, বাড়ানোও যাবে না।

৩. সুন্নাত বলা হয় জীবনব্যবস্থাকে। ইসলামী পরিভাষায় সুন্নাত দ্বারা উদ্দ্যেশ হলো ‘নববী’ জীবনব্যবস্থা। ‘আকিদা’, ‘আখলাক’, ‘মুআমালাত’ ‘অভ্যাস’ অর্থাৎ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের জন্যে যে-জীবনব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন তাই হলো ‘সুন্নাত’। এবং তার বিপরীত হলো ‘বিদআত’। আর এই ‘সুন্নাত’-এর জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম হলো কুরআন-সুন্নাহ।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সুন্নাতের সাথে ‘খুলাফায়ে রাশিদিনে’র সুন্নাতকেও আঁকড়ে ধরা আবশ্যক করেছেন। এই জন্যে খুলাফায়ে রাশিদিনের সুন্নাতও নববী সুন্নাতের মতোই মর্যাদা রাখে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের অনেক মাহাত্ম্য ও ফাজায়েল বর্ণনা করেছেন। এবং দ্বীনের সমস্ত ক্ষেত্রে তাদের নির্ভরযোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার স্বীকৃতি দিয়েছেন।

এক হাদিস শরিফে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
أكرموا أصحابي فإنهم خياركم ثم الذين يلونهم، ثم الذين يلونهم، ثم يظهر الكذب
তোমরা আমার সাহাবাদেরকে সম্মান করো, কেননা তারা তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম। এরপর তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম; এরপর তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম। তারপর মিথ্যার ছড়াছড়ি হয়ে যাবে।

সাহাবাদের সম্পর্কে এই ধরনের অনেক ফজিলতপূর্ণ স্বীকৃতি হাদিস শরিফে এসেছে। অন্যদিকে কুরআনে কারিমে সাহাবাদের পুরো জামাতকে ‘মুমিন’ রবং ‘সর্বোত্তম উম্মত’ সম্বোধন করে তাদের অনুসরণ ও অনুকরণের আদেশ দেওয়া হয়েছে। আর যারা সাহাবাদের অনুসরণ আর অনুকরণ করবে না, তাদের গোমরাহ ও জাহান্নামি বলা হয়েছে। বহু আয়াতে সাহাবাদেরকে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও সন্তুষ্টির সুসংবাদ শোনানো হয়েছে। এই জন্যে তারাই হলো রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রকৃত সুন্নাতের একমাত্র আয়না। যে-কাজ সমস্ত সাহাবা ঐক্যমতের সাথে করেছেন, অথবা যে-কাজ তারা ঐক্যমত হয়ে বর্জন করেছেন সে কাজগুলো গ্রহণ করা আর না করার জন্যে সাহাবাদের এই ঐক্যমতই আমাদের জন্য অকাট্য দলিল। এখানে কোনো ধরনের পরিবর্তনের সুযোগ আমাদের নেই। আর যে-কাজ সাহাবাদের একটি অংশ করেছেন কিন্তু অপর অংশ তাতে কোনো নিন্দা বা বাধা দেননি, সেটাও নিঃসন্দেহে হক ও সঠিক এবং আমাদের জন্যে অনুসরণীয়। তাতে কোনো রকম সন্দেহ পোষণ করার অবকাশ নেই।

এই সব কথার উদ্দেশ্য হলো, কোনো একটি বিষয়ে সাহাবাদের আমল উক্ত কাজটি সুন্নাত হওয়ার একটি প্রমাণ। যেহেতু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনটি জামানার মানুষকে তথা সাহাবা, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ী সর্বোত্তম বলেছেন। তাই ঐ সময়ে কোনো রকম নিষেধাজ্ঞা ছাড়া মুসলমানদের আমল সুন্নাতের অন্তর্ভুক্ত হবে।

৪. সুন্নাতের উপরোক্ত ব্যাখ্যা থেকে বিদআতের পরিচয়ও স্পষ্ট হয়ে যায়; যে-কাজটি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবা, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের জামানায় মুসলমানদের মাঝে প্রচলিত ও অনুসৃত ছিলো না, তাকে দ্বীন মনে করে আমল করা হলো ‘বিদআত’৷

কিন্তু উক্ত কথাটির মূল হাকিকত ও বাস্তবতা বুঝতে হলে আরো কিছু বিষয় জানা আমাদের জন্যে জরুরি।
(ক) কোনো একটি আমলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যদি একাধিক পদ্ধতি বর্ণিত হয়, তাহলে প্রত্যেকটি পদ্ধতিকেই ‘সুন্নাত’ বলা হবে। এই পদ্ধতিসমূহের কোনো একটি গ্রহণ করে অপরটিকে বিদআত বলা জায়েয নয়। হাঁ, তবে যদি কোনো একটি রহিত হওয়া প্রমাণিত হয়, তাহলে ভিন্ন কথা।

যেমন : জামাতে নামাজে সুরা ফাতেহার পর জোরে ও আস্তে আমীন বলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে উভয়টি প্রমাণিত। এইজন্য উভয়টিই ‘সুন্নাত’। তাই দুটির কোনো একটি গ্রহণ করে অপরটির বিরোধিতা করা জায়েয নেই।

(খ) কোনো একটি কাজ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনের অধিকাংশ সময় করতেন। কিন্তু তার বিপরীতমুখী কাজও জীবনে এক-দুবার করেছেন। এই অবস্থায় ‘সুন্নাত’ হিসেবে ধর্তব্য হবে যা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বদা আমল ছিলো। আর যে কাজটির বৈধতার জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি এক-দুইবার করেছেন, তাকে বিদআত বলা জায়েয নয়। যদিও এখানে সুন্নাত হবে সর্বদা যে আমলটি করতেন।

(গ) রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবা, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়ীদের জামানার পর যে বিষয়গুলো অস্তিত্ব লাভ করেছে তা দুই প্রকার।
এক. ঐ নব্য সৃষ্ট বিষয়কেই শরিয়তের একটি বিষয় মনে করা হয়।
দুই. ঐ নব্য সৃষ্ট বিষয়কে শরিয়তের বিষয় মনে করা হয় না; বরং শরিয়তের হুকুম পালন করার একটি মাধ্যম মনে করা হয়।

যেমন : কুরআন ও হাদিসে দ্বীনের ইলম শিক্ষা করা ও শিক্ষা দেওয়ার অসংখ্য ফজিলত ও লাভের কথা বলা হয়েছে। এর প্রতি অনেক গুরুত্বারোপও করা হয়েছে। এখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবা, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের জামানার পর ইলমে দ্বীম অর্জনের যে-পদ্ধতিগুলো তৈরি হয়েছে তা গ্রহণ করা বিদআত নয়; যদি পদ্ধতিগুলো জায়েয হয়। কেননা এই পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করাকে শরিয়ত নয়; বরং শরিয়তের হুকুম পালনের একটি মাধ্যম মনে করা হয়।

তেমনিভাবে জিহাদের অনেক ফজিলত কুরআন-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। তো যে-সমস্ত মাধ্যমে জিহাদ করা যায়, যেসব অস্ত্রের মাধ্যমে করা যায়, তা গ্রহণ করা এই অস্ত্রগুলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবা,তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীদের জামানায় ছিল না বলে বিদআত হবে না। কারণ, এই পদ্ধতিসমূহ ও এই অস্ত্রগুলো গ্রহণ করা শরিয়ত নয়; বরং শরিয়তের হুকুম পালনের একটি মাধ্যম মনে করা হয়।

মূলকথা হলো, যে-সমস্ত বিষয় শরিয়তের হুকুম পালনের মাধ্যম ও ওসিলা হয়, তা ব্যবহার করা জায়েয। কিন্তু কোনো বিষয়কে শরিয়ত মনে করে তা সৃষ্টি করা হলো ‘বিদআত’।

(ঘ) কুরআন ও হাদিসের মাঝে অনেক উসুল ও কাওয়ায়েদ বর্ণিত হয়েছে। এবং মুজতাহিদ ইমামদের এই আদেশ করা হয়েছে, তারা এই কাওয়ায়েদ ও উসুলের আলোকে নবউদ্ভাবিত মাসআলাগুলোর সমাধান বের করবে।

সুতরাং আল্লাহ ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হুকুম পালনার্থে ফুকাহায়ে উম্মাত কুরআন ও হাদিসের আলোকে যে-মাসআলাগুলোর সমাধান দিয়েছেন, তাকেও বিদআত বলা যাবে না। কেননা তা কুরআন-সুন্নাহ থেকেই প্রমাণিত। এই জন্যেই কুরআন-সুন্নাহ এবং সাহাবা ও তাবেয়ীদের আমলের পর মুজতাহিদ ইমামদের ইজতেহাদকৃত মাসআলাসমূহকে দ্বীনের একটি অংশ মনে করা হয়। এবং আয়িম্মাদের ইজতিহাদ তথা কিয়াস শরিয়তের একটি স্বতন্ত্র দলিল।

(ঙ) যে কথা কুরআন-সুন্নাহে নেই, সাহাবা-তাবেয়ীদের আমল দ্বারাও তা প্রমাণিত নয়, মুজতাহিদ ও ফুকাহা উম্মতের কিয়াসও তা সমর্থন করে না—তা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়। কোনো বুযুর্গের ‘কাশফ’ ও ইলহাম দিয়ে যেমন তাকে দ্বীন বানানো যাবে না, তদ্রুপ কোনো শিক্ষিত ব্যক্তির জ্ঞানের আলোকেও তা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হবে না। কেননা শরিয়তের দলিল এই চারপ্রকার : কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াসের মাঝেই সীমাবদ্ধ। এই চার দলিল ছাড়া অন্য কোনোকিছুকে শরিয়তের দলিল বানানোই একটা বিদআত। তা দিয়ে কোনো বিষয় দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত হওয়া তো অনেক দূরের কথা।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: