আত্মশুদ্ধি

সালাফদের সালাত-প্রেম | আব্দুল্লাহ তালহা

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

ইসলামের মূল স্তম্ভগুলো অন্যতম হলো সালাত। এই সালাত আদায় না করলে তার যেন ঈমানই ধ্বংস হয়ে যায়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন অত্যন্ত সালাত-প্রেমী মানুষ। পৃথিবীর ইতিহাসে রাসূলের চেয়ে সালাতকে ভালোবাসা পোষণকারী কোনো ব্যক্তিকে পাওয়া যাবে না। হযরত রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন, হে বিলাল! সালাতের মাধ্যমে আমাদেরকে প্রশান্তি দাও। অর্থাৎ নামাজের ঘোষণা দিয়ে আমাদের মনকে শীতল করে দাও। আল্লাহর রাসূল সা. আরেকটি হাদিসে বলেছেন, আমাদের চোখের শীতলতা রয়েছে সালাতে।

রাসূল সা.এর সালাতের প্রতি প্রেম ও ভক্তির কারণে দেখা যায়, তিনি রাতের সালাতে এতো দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতেন যে, তাঁর পদদ্বয় ফুলে ফেঁটে ফেঁটে যেতো। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

রাসূল সা.এর এই অতুলনীয় সালাত-প্রেম তাঁর সাহাবি রা. এবং যুগ পরম্পরায় সালাফে সালেহিনের জীবনেও প্রভাব সৃষ্টি করেছিল। এজন্য সাহাবা রা.সহ তাবেয়িন ও তাবে তাবেয়িন এবং পরবর্তী প্রতিটি যুগের আল্লাহওয়ালা বুযুর্গদের মাঝেও দেখা গিয়েছে অনন্য সালাত-প্রেম। সেসব সহ¯্র ঘটনা থেকে দু’চারটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি-

১/ ইমাম তাবরানি রহ. লিখেছেন, যখন যুননুরাইন হযরত ওসমান রা.কে হত্যা করার জন্য দুরাচাররা তাঁর গৃহ বেষ্টন করে নিয়েছিল তখন হযরত ওসমান রা.এর স্ত্রী তাদেরকে তিরস্কার করে বললেন, ‘তোমরা তাঁকে হত্যা কর বা না-কর, তিনি এমন ব্যক্তি ছিলেন যিনি এক এক রাকাতে গোটা একটি রাত অতিবাহিত করে দিতেন। সেই নামাজে তিনি সম্পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করতেন’

২/ মুফাসসির-সর্দার হাবরুল উম্মাহ হযরত ইবনে আব্বাস রা. জীবনের শেষাংশে দৃষ্টি হারিয়ে ফেলেন। চিকিৎসক তাঁকে বললেন, আমরা আপনার চিকিৎসা করব, আপনাকে শুধু এতোটুকু করতে হবে যে, শুয়ে শুয়ে নামাজ আদায় করবেন। অর্থাৎ সুস্থ হওয়া পর্যন্ত তিনি জামাতে শরিক হতে পারবেন না এবং সিজদাও করতে পারবেন না।

হযরত ইবনে আব্বাস রা. এই অপারেশনে রাজি হলেন না। তিনি অন্ধত্বকেই বরণ করে নিলেন। কারণ, হযরতের ইবনে আব্বাস রা.এর নিকট জামাতে নামাজ ও সিজদায় কপোল লুটিয়ে দেওয়া ছিল দৃষ্টিশক্তির চেয়েও অনেক প্রিয়।

৩/ কুরআনের পাখী হযরত ইবনে মাসউদ রা.র নামাজের প্রতি এতোই গভীর ভালোবাসা ছিল যে, তিনি নফল রোযা রাখতেন না। কেননা নফল রোযায় শরীল দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে তিনি অধিক পরিমাণে নফল নামাজ পড়তে পারবেন না।

৪/ হযরত আদি বিন হাতেম রা. বলেন, এমন কোনো সময় আসেনি যে, নামাজের আযান দিয়েছে অথচ আমি ওযু অবস্থায় ছিলাম না। ইসলাম গ্রহণের পর থেকে সারা জীবন আমার এই একই অবস্থা ছিল।

৫/ হযরত সাঈদ বিন মুসাইয়াব রা.-এর মৃত্যুক্ষণে তাঁর ছোটো ছোটো সন্তানরা শিয়রে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। তখন তাদেরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বললেন, তোমরা কেঁদো না। আল্লাহর প্রতি সুধারণা রাখো। তোমার পিতার এই মসজিদে চল্লিশ বছর কখনো তাকবিরে তাহরীমে ছুটে যায়নি।

৬/ হযরত সুলাইমান বিন মিহরান আমাশ রহ. তাঁর নিজের সম্পর্কে বলেছেন, চল্লিশ বছর আমার তাকবীরে তাহরিমা একবারও ছুটে যায় নি।

৭/ বিশিষ্ট তাবেয়ি ইমামে রাব্বানি মুহম্মদু বিন ওয়াসি’ (মৃত্যু-১২৩ হি.) জীবনের শেষপ্রান্তে এসে বলেন, দুনিয়ার সবচেয়ে সুস্বাদু যে বস্তুটি এখনো বাকি আছে তা হলো জামাতের সাথে সালাত আদায় এবং এরপর ভাই-বন্ধুদের সাক্ষাৎ।

৮/ বিশিষ্ট আল্লাহপ্রেমী তাবেয়ি আমের বিন আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের রহ. সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, যখন তাঁর জীবনের শেষ নিঃশ্বাসগুলো নির্গত হচ্ছিল তখন তিনি মুআজ্জিনের আযানের আওয়াজ শুনতে পেলেন। পাশে থাকা মানুষদেরকে বললেন, আমাকে জামাতে নিয়ে চলো। তারা বলল, হযরত! আপনি তো অত্যন্ত অসুস্থ। তিনি বললেন, আল্লাহর প্রতি আহ্বানকারীর আওয়াজ শুনেও কীভাবে আমি বসে থাকতে পারি! আমের বিন আব্দুল্লাহর পীড়াপিড়ির কারণে সেবকরা তাঁকে মসজিদের জামাতে নিয়ে হাজির হলো। সেটা ছিল মাগরিবের সালাত। হযরত আমের বসে বসে নামাজ পড়তে লাগলেন। শেষ রাকাতে দ্বিতীয় সিজদা হতে মাত্র উঠেছেন এমন সময় মালাকুল মওত এসে হাজির হলেন। নামাজরত অবস্থায়ই আল্লাহর এই প্রিয় বান্দা আল্লাহর দিকে রওনা হয়ে গেলেন।

এই আল্লাহওয়ালা আমের বিন আব্দুল্লাহ রহিমাহুল্লাহ সারা জীবন দুআ করেছেন যে, হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট হাসানাহর মৃত্যু চাই। হাসানাহর মৃত্যু কী- জিজ্ঞেস করা হলে হযরত আমের বললেন, সিজদারত অবস্থায় মৃত্যু। আল্লাহ তাঁর এই প্রিয় বান্দার সারা জীবনের আরজি কবূল করেছেন।

৯/ ইমাম আবু ইসহাক সাবেয়ি আল-কুফি মৃত্যুর দু’বছর পূর্বে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন। ধরে দাঁড় না করালে দাঁড়াতে পারতেন না। কিন্তু একবার যখন দাঁড়াতে পারতেন তখন নামাজে এক হাজার আয়াত তিলাওয়াত করতেন। তিনি বলেছেন, হে যুবক-দল! তোমরা তোমাদের যৌবন ও শক্তি-সামর্থ্যকে গনীমত মনে করে খুব কাজে লাগাও। আমার এমন রাত খুব কমই অতিবাহিত হয়েছে যে রাতে আমি অন্তত এক হাজার আয়াত তিলাওয়াত করিনি। কখনো কখনো এক রাকাতে সম্পূর্ণ সুরা বাকারা তিলাওয়াত করেছি। আমি হারাম মাসগুলোর অধিকাংশ সময় রোযা  রেখেছি। আর প্রত্যেক মাসের সুন্নাহ-সম্মত তিনদিন এবং সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রেখেছি। কখনো এর ব্যতিক্রম হয়নি।

১০/ ইমাম আলী বিন হুসাইন রহ.-এর জীবনীতে উল্লেখ আছে, তিনি যখন সালাতে দাঁড়াতেন তখন তাঁর মাঝে এক ভীতিকর অবস্থা ছড়িয়ে পড়তো। একবার কেউ এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, তুমি বোঝো না, সালাতে আমি কত বড় সত্বার সামনে দাঁড়াই!

জামাতের সাথে সালাত ছুটে যাওয়ার কারণে সালাফদের হাসরাত- আফসোস!!

সালাফগণ জামাতের প্রতি ফরজ সালাতের ব্যাপারে এতোই গুরুত্বশীল ও উদ্গ্রীব ছিলেন যে, কখনো যদি অনিচ্ছাকৃতও জামাত ছুটে যেত অসম্ভব মন বেদনায় ভুগতেন। ছোটো বাচ্চাদের মতো ডুকরে ডুকরে কাঁদতেন। তাঁদের অনেকে এমনভাবে জামাত ছুটে যাওয়াকে কবিরা গুনাহ মনে করতেন।

একবার হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রা.এর এশার জামাত ছুটে গেল। এতে হযরত ইবনে ওমর রা. এতোই ব্যথিত হলেন যে, সেই রাতে সারারাত জেগে নফল নামাজ পড়লেন।

হযরত মুহাম্মদ বিন সামাআ তামিমি নিজের সম্পর্কে বলেন, চল্লিশ বছর যাবত এক ওয়াক্ত নামাজেও আমার তাকবীরে তাহরিমা ছুটেনি। শুধু যেদিন আমার মা ইন্তিকাল করেন। সেদিন একটি তাকবীরে তাহরিমা ছুটে যাওয়ায় পঁচিশ রাকাত নফল নামাজ পড়েছিলাম।

হযরত সাঈদ বিন আব্দুল আজিজ তানুখি রহ.। যিনি সমকালে শামের একজন বড় ফকীহ ছিলেন। একবার তাঁর জামাত ছুটে যায় তখন তিনি অঝোরে কাঁদতে থাকেন।

শেষকথা:

বিশিষ্ট তাবেয়ি হযরত ইউনুস বিন ওবায়দুল্লাহ রহ. বলেছেন, কোনো বান্দার মাঝে যদি দু’টি বস্তু ঠিক হয়ে যায় তাহলে তার জীবনের সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। এক, সালাত। দুই, তার জিহ্বা।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: