কাদিয়ানিদের গোড়া কথা | মাহদি হাসান কাসেমি

কাদিয়ানিদের-গোড়া-কথা

১৮৬৮ সালের কোনো এক সকাল। পাঞ্জাবের শিয়ালকোটের কোর্টের ইহুদি ডেপুটি কমিশনার পারকিনসন বসে আছে তার কার্যালয়ে। পাশেই রয়েছে পিয়ন মির্জা গোলাম আহমাদ, যাকে তার পিতা তার হারানো জায়গীর ফিরে পাবার আশায় গোলামির আবরণে চাকুরি দিয়েছিল এখানে। হঠাৎ ছদ্মবেশী ইংরেজ গোয়েন্দা, পাঞ্জাব মিশনারীর ইনচার্জ বাটলার এম.এ. এর আগমন। দাঁড়িয়ে গেল পারকিনসন, ‘আপনার কোনো প্রয়োজন হুজুর? আমাদের ডেকে পাঠালেই তো পারতেন! কষ্ট করে আসার প্রয়োজন কি ছিল?’[1] অদূরে দাঁড়ানো মির্জা গোলাম আহমাদ। অস্ফুট স্বরে ‘আমি ঐ মুনশির সঙ্গে সাক্ষাত করতে এসেছি’ ইংগিত করেই তড় তড় করে এগিয়ে গেলেন তার দিকে। দীর্ঘদিন ভারতে মিশনারীর ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করে সেদিন বিদায় নিচ্ছিল বাটলার এম.এ.।[2] বেশ পরিবর্তন করে এ ভারতবর্ষে ইংরেজদের শিকড় মজবুত করিয়েছিল। তাদের ক্ষমতা করেছিল সুসংহত। গুপ্তচরবৃত্তির মাধ্যমে স্বীয় হাত রঞ্জিত করেছিল নিরপরাধ মাজলুম মুসলিমদের রক্তে।

আজ তার বিদায়ের দিন। অগণিত ভক্তকুল অপেক্ষায়। সামান্য কথা বলতেও উদগ্রীব দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা। কিন্তু তিনি সবকিছুই ফেলে রেখে নীরব নির্জনে সাক্ষাতে এসেছেন এক পিয়নের। নাম তার গোলাম আহমাদ। যার সঙ্গে ধর্মীয় বিভিন্ন দিক নিয়ে পূর্ব থেকেই আলোচনা হতো তার। গোলাম আহমাদ কথা বলতেন। ইংরেজদের খিদমতে ফিদা হওয়ার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করতেন। সুযোগও মিলে গিয়েছিল বার কয়েক। আর সেও মনিব ভক্তির পরাকাষ্ঠা উপস্থাপন করে স্থাপন করেছিল গোলামির এক অনন্য নজির। তাইতো সে ছিল স্বজাতির সঙ্গে গাদ্দারির ক্ষেত্রে বাটলার এম.এ. এর বারেবারে পরীক্ষিত, বিশ্বস্ত ও একান্ত অনুগত। সেজন্যই বিদায়কালে সবাইকে ফেলে দীর্ঘক্ষণ আলাপ হলো তাদের। কথা হলো। হলো অজানা অজস্র ষড়যন্ত্র।

বাটলার এম.এ. সেদিন ইংল্যান্ড গেলেন, তার দিনকয়েক পর পারকিনসনের পরোক্ষ অনুমতিতে গোলাম আহমাদ চাকুরি থেকে ইস্তফা দিয়ে চলে গেলেন কাদিয়ান।

১৮৫৭ সালের আযাদি আন্দোলন এমন একটি অ্যাটমবোমো ছিল যে, তার ভয়ংকর পরিস্থিতি ইংরেজরা ভুলতেই পারছিল না। ঘুমোতে পারছিল না তা ভেবে ভেবে। হয়তো দুঃস্বপ্ন হয়েও ধরা দিত তাদের খাবের ঘরে। তাইতো তার ১২ বছর পর ১৮৬৯ সালে ভারতের জনগণের অবস্থান, বিশেষত মুসলমানদের মনোভাব ও হালাত পর্যবেক্ষণ করতে একদল ইংরেজ প্রতিনিধিদের আগমন ঘটে এ উপমহাদেশে। যেই প্রতিনিধিদলে সমন্বয় ঘটেছিল তাদের বুদ্ধিজীবী, রাজনীতি বিশ্লেষক, সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ ও ধর্মীয় পোপসহ বিভিন্ন সেক্টরের বিশেষজ্ঞদের। তাদের পর্যবেক্ষণে, তারা মুসলমানদেরই সবচেয়ে গুরুতর ও খতরনাক বলে মনে করল। মুসলমানদের কারণে যেকোনো মুহূর্তে ভারতবর্ষের সিংহাসন ছাড়া লাগতে পারে—এ সম্ভাবনাও প্রবলতর হলো। ফলে পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট প্রস্তুত করার সময় তারা মুসলমানদের দমননীতি ও ঐক্যহীনতা; বিশেষত তাদের ধর্মীয় আকিদা বিকৃতির উপর গুরুত্ব দিল। তাই মুসলমানদের ঐক্যকে টুকরো টুকরো করার লক্ষ্যে এমন কাউকে দাঁড় করানোর প্রস্তাব করে রিপোর্ট প্রস্তুত করল, যে নিজেকে নবী বলে দাবি করে ইসলামের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করবে। শারিয়াতের অকাট্য বিধানগুলোকে অপব্যাখ্যার সুরতে অস্বীকার করবে। বিশেষত জিহাদি চেতনা নিষ্প্রভ ও প্রশমিত করে জনগণকে গোলামির জিঞ্জিরে আবদ্ধ করবে। আর লাখো শহীদের তাজা খুনে সিঞ্চিত এ মাটির উপর সাদা ভাল্লুকদের শাসনক্ষমতা স্থায়ী করবে।

এ উপলক্ষ্যেই ১৮৭০ সালে লন্ডনে একটি কনফারেন্স করে তারা। যেখানে ভারত মিশনারীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরও দাওয়াত দেওয়া হয়। যাদের মধ্যে ছিল দু’বছর পূর্বে বিদায় নেওয়া সেই বাটলার এম.এ.। তারাও দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ করে উক্ত কনফারেন্সে একই প্রস্তাব রাখে।[3] ১৮৭১ সালে উইলিয়াম উইলসন হান্টারের পূর্ণ রিপোর্ট সামনে আসলে এ দু’দলের দাবি আরো শক্তিশালী হয়। যিনি তখনকার ভাইসরয় লর্ড মায়োর নির্দেশক্রমে ১৮৬৯ সাল থেকেই উপমহাদেশের সব জনগণকে নিরীক্ষণ করে আসছিলেন। শেষমেশ তার কাছেও মুসলমানদের ব্যাপারটা গুরুত্ব পায় বিশেষভাবে। তাই তিনি মুসলমানদের খলিফা মাহদির আগমন, হযরত ঈসা নাবিয়্যিয়ুনা আলাইহিস সালাম-এর অবতরণ, ভারত দারুল হরব হওয়া, সে সম্পর্কে উলামায়ে কিরামের ফতোয়া, বিশেষত জিহাদের ব্যাপারে তাদের আকিদা ও লালিত চিন্তাধারা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন। তাছাড়া পূর্ববর্তী সব আকিদাও ছিল এই জিহাদের উপর। তাই তিনি রিপোর্ট করতে বাধ্য হন যে,জিহাদ এমন এক মতবাদ, যা মুসলিমদের উৎসাহ-উদ্দীপনা, কঠোরতা ও জীবন উৎসর্গ করার ভিত্তি ধরনের সর্বপ্রকার আকিদা সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে তাদের ঐক্যবদ্ধরূপে গড়ে তুলতে পারে[4] ফলে মুসলমানদের রাজনীতি ও অবস্থান কলুষিত হয়ে পড়ে সাদা ভাল্লুকখ্যাত ব্রিটিশদের কাছে। মুসলিমদের ভয়ংকর রূপেই গণ্য করতে থাকে তারা। এমনকি তাদের শেষ আঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় নিরীহ তাওহিদি জনতা।

অপরদিকে মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানি ১৮৬৮ সালে চাকুরি থেকে ইস্তফা দিয়ে এসেই লেখালেখি ও ধর্মীয় মুনাযারার দিকে দৃষ্টিপাত করে।[5] সে সময় সে লিপিবদ্ধ করে বারাহিনে আহমাদিয়্যাত  নামক গ্রন্থ। যে গ্রন্থ প্রকাশের জন্য চাঁদা কালেকশন করে তার বড় একটা অংশ সে আত্মসাৎ করে।[6] উক্ত গ্রন্থে সে তার কথিত কতক ইলহামেরও সমাবেশ ঘটায়। আত্মভোলা মুসলমানগণ প্রথমে তার ধোঁকা বুঝতে না পেরে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়। পরেই বেরোতে থাকে থলের বিড়াল। তিনি প্রথমে নিজেকে মুজাদ্দিদ, ধর্মীয় সংস্কারক ও আত্মিক পথপ্রদর্শক বলে দাবি করতে থাকে। এবং ১৮৮৯ সালে আচমকা নিজেকে খলিফা মাহদি দাবি করে বাইআত নেওয়া শুরু করে। একইসাথে মাহদি সম্পর্কে মুসলমানদের আকিদাগুলো পুরোই উল্টে দিয়ে নিজেকে খুনখারাবি ও যুদ্ধবিগ্রহ বন্ধ করে শান্তিকামী বলে প্রচার করে।[7] এমনকি তার নাপাক হাতে ইসলাম ও মুসলমানদের বুকে সূচালো খঞ্জর বিদ্ধ করার লক্ষ্যে জিহাদের বিরুদ্ধে অজস্র বই লিখে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে ইংরেজ ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে থাকে মুসলিম বিশ্বে।[8] আবার তাদেরই ছত্রছায়ায় তাদের পক্ষ থেকে মিল্লাতে ইসলামিয়ার মধ্যে গোয়েন্দাবৃত্তি করে তাদের সম্ভাবনার স্বাধীন সূর্য উদয়ের নিয়ন আলোও ক্ষীণ করতে থাকে।

বিশেষত মির্জা কাদিয়ানির তখনকার মূল টার্গেট ছিল মুসলমানদের ভরসার শেষ কেন্দ্রবিন্দু অটোম্যান সাম্রাজ্য তথা উসমানি খিলাফাতকে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া।[9] কারণ তারাই ছিল তখন ইংরেজদের গলার সূচালো কাঁটা। যাদের কারণে বিশ্ব ইহুদিবাদ সংগঠন জায়নিজমও পারছিল না ফিলিস্তিনকে খুনরাঙা দরিয়ায় পরিণত করে তাদের অভিশপ্ত নাপাক পা দ্বারা বাইতুল মাকদিসকে অশুচি করতে। ফলে তাদের মাথাব্যথা ছিল আরো বেশি। মির্জা গোলাম আহমাদ কাদিয়ানিই তাদের সেসব উদ্দেশ্য পূরণকে নিজের জন্য ফরয করে নেয় এবং অটোম্যান সাম্রাজ্যকে ভেঙে খান খান করে পুরো পৃথিবীতে সাদা ভাল্লুকদের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ফিলিস্তিনে সন্ত্রাসবাদ ইহুদি রাজত্ব কায়েমের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়।

এই মির্জাই ইহুদি ও খ্রিস্টানদের আঁচলতলে গা ঢাকা দিয়ে ১৮৯৩ সালে নিজেকে মাসিহে মাওউদ বা প্রতিশ্রুত মাসিহ এবং ১৯০১ সালে প্রাণপ্রিয় নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খাতামুন্নাবিয়্যিন নামক মহামান্বিত চাদরকে টান দিয়ে কোটি কোটি মুসলমানদের বুকে শানিত ছুরি বিদ্ধ করে। ১৯০৮ সালের ২৬ই মে অভিশপ্ত এই নারকীয় কীট পায়খানায় ইহলিলা সাঙ্গ হওয়ার পূর্ব অবধি জারি রেখেছিল তার এসব প্রদাহজনক উপখ্যান। রক্তরাঙানো উপদান।

[1] আল-ফযল কাদিয়ান, ২৪ এপ্রিল ১৯৩৪।

[2] ডক্টর বাশারাত আহমাদ, মুজাদ্দেদে আজম, লাহোর, প্র. ১৯৩৯, ১৫ পৃ.।

[3] Extract from the printed Report, India Office Library, London

[4] ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টার, দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস, কমরেড পল বিশরজ, কলকতা, ১৯৪৫।

[5] তারিখে আহমাদিয়্যাত ১ম খণ্ড, সংকলক: মুহাম্মাদ শাহেদ কাদিয়ানি।

[6] ইশতিহারে মির্জা গোলাম আহমাদ, রিসালাতে তাবলীগ, তৃতীয় খণ্ড, কাদিয়ান, প্র. ১৯২২, ৩৪ পৃ.।

[7] তারিখে আহমাদিয়্যাত, ১ম খণ্ড।

[8] তাবলিগি রিসালাত, ২য় অধ্যায়, লেখক: মীর কাসিম আলি কাদিয়ানি, কাদিয়ান, পৃ. ২৬। তাবলিগে রিসালাত—৩/১৯৮।  বিস্তারিত মির্জা কাদিয়ানির লেখা আল হেজাজুল মাসিহ দ্রষ্টব্য।

[9] মির্জা গোলাম আহমাদ রচিত ‘নিশানে আসমানি।’

Facebook Comments