আকিদা

আকিদার মৌলিক বিষয়াদি : কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে | হাবিব আফনান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

ইসলামে আকিদা-বিশ্বাস সহিহ করা এবং তাতে অটল থাকার গুরুত্ব অপরিসীম। যাদের আকিদা-বিশ্বাস সহিহ তারাই হকপন্থী, তারাই জান্নাতি। আর যারা হকপন্থী নয়, তারাই জাহান্নামি। রাসুল (সা.)-এর নিম্নোক্ত হকপন্থী বাতিলপন্থীদের সম্পর্কে বলা হয়েছে,
تفرقت الیهود علی احدی و سبعین فرقة او اثنتین و سبعین فرقة و النصاری مثل ذالک وتفرق امتی علی ثلاث وسبعین فرقة وفی روایة کلهم فی النار الا واحدة – قالوا من هی یا رسولله؟ قال ما انا علیه و اصحابی (ترمذی)
অর্থাৎ, ইহুদিরা একাত্তর/বাহাত্তর দলে বিভক্ত হয়েছিল। এমনিভাবেও খ্রিষ্টানরাও। আমার উম্মত তিহাত্তর দলে বিভক্ত হবে। তন্মধ্যে একদল ব্যতীত বাকি সবাই জাহান্নামে যাবে। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করলেন সেই দলটি কারা? রাসুল (সা.) বললেন তারা ঐ দল; যারা আমার ও আমার সাহাবিদের মত ও পথের অনুসারী।

এ হাদিসে হকপন্থী তথা মুক্তিপ্রাপ্ত ও জান্নাতি দলের পরিচয়ে বলা হয়েছে, “যারা আমার ও আমার সাহাবিদের মত ও পথের অনুসারী হবে”। পরিভাষায় এঁদেরকে বলা হয় “আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত”। এই দল বহির্ভূত যাবতীয় দল বাতিল সম্প্রদায়ভূক্ত। সুতরাং হকপন্থী ও জান্নাতি দলের অন্তর্ভুক্ত হওয়া ও থাকার জন্য যেমন ইসলামের সহিহ আকিদা-বিশ্বাস তথা আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত এর আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কে অবগতি লাভ করা এবং তার অনুসারী হওয়া প্রয়োজন; তদ্রুপ বাতিল সম্প্রদায়ের আকিদা-বিশ্বাস সম্পর্কে অবগতি লাভ পূর্বক তা থেকে বিরত থাকাও প্রয়োজন।

আশআরিয়া ও মাতুরিদিয়া :
আকিদার ক্ষেত্রে আহলে সুন্নত ওয়াল জামাআত দু’দলে বিভক্ত। তা হলো আশআরিয়া ও মাতুরিদিয়া। আশআরিয়া মতবাদটি ইমাম আবুল হাসান আলি ইবনে ইসমাইল আল-আশআরির দিকে সম্পৃক্ত। তার মতবাদ আশআরিয়া মতবাদ নামে আখ্যায়িত। যারা ইমাম আশআরি (র.) এর অনুসরণ করেন তাদেরকে আশআরি, আশআরিয়্যা ও আশাইরা বলা হয়। আর মাতুরিদিয়া মতবাদটি ইমাম আবু মানসুর মুহাম্মদ মুহাম্মদ ইবনে আহমদ আল-মাতুরিদি (র.) এর দিকে সম্পৃক্ত। তার মতবাদ মাতুরিদিয়া মতবাদ নামে আখ্যায়িত। যারা আকিদার ক্ষেত্রে ইমাম মাতুরিদি (র.) এর অনুসারী তাদেরকে মাতুরিদি বলা হয়।

আশআরিয়া মতবাদটি চতুর্থ হিজরি শতাব্দী আজ পর্যন্ত ইলমে কালামের সর্ববৃহৎ এবং প্রসিদ্ধতম মতবাদ হিসেবে চলে আসছে। পক্ষান্তরে আলেমদের উপর মাতুরিদিয়া মতবাদটির প্রভাব অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। আজও দীনি প্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসাসমূহে মাতুরিদিয়া মতবাদটিকে ইসলামি আকাইদের প্রসিদ্ধতম উৎস হিসেবে গণ্য করা হয়। এ মতবাদ বেশিরভাগ মাওয়ারাউন নাহার এর এলাকাসমূহে, হিন্দুস্তান ও পাকিস্তানের দেশসমূহে এবং তুর্কি এলাকায় বিস্তার লাভ করে আছে।

আকাইদের প্রকার ও স্তরগত পার্থক্য :
আকাইদের কিতাব সমূহে ইসলামি আকিদা সমূহ মূলত তিন প্রকার :
যথা:
১. যে সব আকিদা নিশ্চিত (یقینی و قطعی) ভাবে প্রমাণিত। এগুলো আবার তিন শ্রেণীর।
যথা:
(এক) যা কুরআনের জাহেরি বা প্রকাশ্য ইবারত দ্বারা প্রমাণিত।
(দুই) যার মূল বিষয়টা নবি (সা.) থেকে মুতাওয়াতির বর্ণনায় (চাই হাদিসের শব্দ মুতাওয়াতির হোক বা না হোক) প্রমাণিত।
(তিন) যে ব্যাপারে উম্মতের ইজমা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চাই তার দলিল নিশ্চিত (قطعی) হোক বা না হোক।

এই প্রথম প্রকারের তিন শ্রেণীর যে কোন শ্রেণীর কোন আকিদা অমান্যকারী কাফের।

২. যে সব আকিদা যুক্তিগত দলিল-প্রমাণ দ্বারা প্রতিষ্ঠিত এবং যার উপর শরিয়তের বুনিয়াদ বা শরিয়তের অধিকাংশ বিষয় যার উপর নির্ভরশীল। চাই তার সমর্থনে শরয়ি দলিল থাকুক বা না থাকুক। যেমন আল্লাহ তাআলার অস্তিত্ব। আল্লাহর গুণাবলী, নবুওয়তের প্রমাণ, জগতের অনিত্বতা ইত্যাদি।

এই প্রকারের আকিদার হুকুম প্রথম প্রকারের ন্যায়। তবে এসব ক্ষেত্রে আরও কিছু তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ রয়েছে। যেমন আত্মার নিত্বতা বা অনিত্বতার, আল্লাহ তাআলার গুণাবলী কি তার সত্তার হুবহু না সত্তা থেকে ভিন্ন এর বিষয়। এছাড়া এই দ্বিতীয় প্রকারের আকিদাসমূহের প্রারম্ভিক কিছু আলোচনা রয়েছে। যেমন পরমাণু এর অস্তিত্ব প্রমাণ করা, শরিয়তের উপাদান নিত্ব কিনা ইত্যাদি। এসব তাত্তিক বিশ্লেষণ ও প্রারম্ভিক বিষয়াদি; যা ইলমে কালামে বা আকাইদের কিতাবসমূহে প্রাসঙ্গিক ভাবে আলোচনা হয়ে থাকে। এগুলোর ক্ষেত্রে জমহুরের বিরোধিতাকারীদেরকে আমরা কাফের বলতে পারি না। তবে জমহুর মুসলিম বিরোধী।

৩. যে সব খবরে ওয়াহেদ দ্বারা প্রমাণিত বা উলামায়ে কেরাম যা কুরআন-হাদিস থেকে গবেষণা করে বের করেছেন। যেমন কুরআন নিত্ব না সৃষ্ট- এই বিষয়। ফেরেশতাদের চেয়ে নবিদের শ্রেষ্ঠ হওয়ার বিষয়। সাহাবিদের পারষ্পরিক শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়। নেক আমলের ইমানের অংশ কিনা এ বিষয় প্রভৃতি।

যে সব বিষয়ে ইমান রাখতে হয় :
মৌলিকভাবে যে সব বিষয়ে ইমান রাখতে হয় তা হল ৬ টি। যথা :
১. আল্লাহ তাআলার প্রতি ইমান।
২. ফেরেশতাদের প্রতি ইমান।
৩. আসমানি কিতাবসমূহের প্রতি ইমান।
৪. নবি-রাসুলদের প্রতি ইমান।
৫. পরকালের প্রতি ইমান।
৬. তাকদিরের প্রতি ইমান।

এ ছয়টি বিষয় বিভিন্ন আয়াতে বিচ্ছিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন :
امن الرسول بما انزل الیه من ربه والموءمنون،کل امن بلله و ملاءکته وکتبه ورسله
অর্থাৎ, রাসুলের প্রতি তার রবের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে, রাসুল ও মুমিনরা তার প্রতি ইমান এনেছে। সকলেই ইমান এনেছে আল্লাহ তাআলা, তার ফেরেশতা, তার (প্রেরিত) কিতাবসমূহ ও তার রাসুলদের প্রতি….।
(বাকারা : ২৮৫)

১. “আল্লাহ” এর উপর ইমান :
বিশুদ্ধতম মতানুসারে “আল্লাহ” শব্দটি সৃষ্টিকর্তার ইসমে জাত বা সত্তাবাচক নাম। আরবিতে বলা হয়,
الله علم علی الاصح للذات الواجب الوجود المستجمع بجمیع صفات الکمال
অর্থাৎ, “আল্লাহ” ঐ চিরন্তন সত্তার নাম, যার অস্তিত্ব অবশ্যম্ভাবী, যিনি সমস্ত গুণাবলীর অধিকারী।
আল্লাহ তাআলার প্রতি ইমান বলতে আল্লাহর জাত বা সত্তা ও তার সিফাত বা গুণাবলীর প্রতি বিশ্বাস করা এবং মেনে নেওয়াকে বুঝায় :
(ক) আল্লাহর সত্তা ও তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করা।

আল্লাহর অস্তিত্বের যুক্তিগত প্রমাণ :
আমরা জানি, জগতের সবকিছু (আল্লাহর জাত ও সিফাত ব্যতীত আসমান জমিন এতদুভয়ের মধ্যকার সবকিছু) অনিত্ব (حادث) বা সৃষ্ট। আর সব অনিত্ব বা সৃষ্ট বস্তুর জন্য সৃষ্টিকর্তা আবশ্যক।

আল্লাহর জাত বা সত্তার প্রতি ইমান রাখার পর্যায়ে কয়েকটি মৌলিক বিষয় রয়েছে। যথা :

১. তার সত্তা সমস্ত গুণাবলীতে আপনা আপনি আস্তিত্বশীল।
২. তার এমন, যিনি নিজ সত্তায় সুপ্রতিষ্ঠিত; তবে কোন নির্দিষ্ট স্থানের সাথে সংশ্লিষ্ট বা নির্দিষ্ট স্থানে সমাহিত ও গণ্ডিবদ্ধ নন। তিনি স্থান ও কালের গণ্ডি হতে মুক্ত। কারণ স্থান হয়ে থাকে দেহবিশিষ্ট বস্তুর জন্য, আর আল্লাহ তাআলা দেহ থেকে পবিত্র। তার কোন স্থান নেই অর্থাৎ, না তিনি আসমানে থাকেন, না জমিনে, না পূর্বে, না পশ্চিমে। সমগ্র জগত তার সামনে একটা অনু পরিমাণ বস্তু সমতুল্য। তিনি কীভাবে তার মধ্যে সমাহিত হতে পারেন? বরং তিনি সর্বত্র বিরাজমান। কোনো কিছু তার অগোচর নয়।

৩. তিনি عرض অর্থাৎ, কোন দেহের সাথে সংযুক্ত বিষয় নন। কেননা عرض বলা হলে তার সত্তার সূচিত বিষয় বা অনিত্ব (حادث) হওয়া অবধারিত হয়ে যায়। অথচ আল্লাহর সত্তা নিত্ব বা قدیم। অর্থাৎ যা অনাদিকাল থেকে বিদ্যমান। তদুপরি عرض বললে যার সাথে তিনি সংশ্লিষ্ট, তাকে তার মুখাপেক্ষী বলতে হয়। অথচ কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নন।
৪. তিনি কোনো উপাদান (جوهر) গঠিত দেহ বিশষ্ট নন। কেননা দেহ (جسم) একাধিক অংশের সমন্বয়ে গঠিত হয়ে থাকে। আর আল্লাহ তাআলার দেহ স্বীকার করলে তার একাধিক অংশ স্বীকার করতে হয়। আর একাধিক অংশের ক্ষেত্রে এক অংশ অপর অংশের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে। অথচ আল্লাহ তাআলা মুখাপেক্ষিতা হতে পবিত্র।

৫. তার সত্তা ডান-বাম, উপর-নিচ, সম্মুখ-পশ্চাত ইত্যাদি দিক হতে পবিত্র। কেননা এতে করে আল্লাহ তাআলার নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ হওয়া আবশ্যক হয়ে যায়। তদুপরি এতে আল্লাহর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সাব্যস্ত হয়ে যায়। যেমন আল্লাহর উপর আছে বলতে গেলে তার মাথা আছে বলতে হয়। কেননা উপর বলা হয় মাথার দিককে। এমনিভাবে তার নিচ আছে বলতে গেলে তাঁর পা আছে বলতে হয়। কেননা নিচ বলা হয় পায়ের দিককে। ইত্যাদি। সারকথা তিনি নিরাকার।

৬. আল্লাহ তাআলা সুরত-আকৃতি, দিক ও প্রান্ত থেকে পবিত্র হওয়া সত্তেওও পরকালে দৃষ্টিগোচর হবেন। দুনিয়াতে তার সত্তার দর্শন সম্ভব, তবে সংঘটিত হয় নি। পরকালে দৃষ্টগোচর হওয়ার দলিল এই আয়াত,
وجوه یومءذ ناضرة،الی ربها ناظرة
অর্থাৎ, সেদিন কতক মুখমণ্ডল উজ্জল হবে। তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে। (কিয়ামাহ : ২২-২৩)

৭. আল্লাহর সত্তা কারও সত্তার মধ্যে মিশ্রিত বা দ্রবীভূত হয় না বা প্রবেশ হয় না এবং তাঁর সত্তার মধ্যেও কেউ মিশ্রিত বা দ্রবীভূত হয় না। খ্রিষ্টানদের ধারণায় আল্লাহ তাআলা হজরত ইসা (আ.) এর মধ্যে প্রবেশ (حلول) করেছিলেন। হিন্দুদের বিশ্বাসমতে ভগবান মানুষ, প্রাণী, বৃক্ষ ও পাথর সবকিছুর মধ্যে প্রবেশ (حلول) করেন অর্থাৎ অবতারিত হন। এরূপ বিশ্বাস পোষণকারীদের হুলুলিয়া বলা হয়। এরূপ বিশ্বাস সুস্পষ্ট কুফুরি। মাও. আব্দুল হাই হক্কানি (র.) বলেন যেসব মূর্খ লোকেরা বলে, আল্লাহ তাআলার খাসা অলিরা আল্লাহর সত্তার এমনভাবে লীন হয়ে যান; যেমন বরফ পানির মধ্যে এবং বিন্দু সমুদ্রের মধ্যে লীন হয়ে যায়, এটা সম্পূর্ণ কুফর।

ফেরেশতা সম্বন্ধে ইমান :
দ্বিতীয় মৌলিক যে বিষয়ে ইমান রাখতে হয় তা হল, ফেরেশতা সম্বন্ধে ইমান। ফেরেশতা শব্দের আরবি অর্থ হল মালায়িকা ( ملاءکة)। এ শব্দটি বহুবচন। এর একবচন হল, ملک/ملاک/مالک।
এর আভিধানিক অর্থ হল, বার্তাবাহক।
পরিভাষায় ফেরেশতা বলা হয়, “এমন নুরানি মাখলুক, যারা বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করে থাকেন এবং আল্লাহ তাআলার নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করেন না; বরং সর্বদা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালনে রত থাকেন”।
ফেরেশতা সম্বন্ধে এই বিশ্বাস রাখতে হবে যে,
ফেরেশতারা আল্লাহ তাআলার এক সম্মানিত সৃষ্টি। তারা নুরের সৃষ্টি।
২. তারা পুরুষও নন নারীও নন। তারা কাম, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি থেকে মুক্ত। ফেরেশতাদেরকে নারী বা পুরুষ বলে আখ্যায়িত করা যায় না। কেননা এ ব্যাপারে কুরআন হাদিসে কোন ভাষ্য কিংবা কোন যুক্তি নেই।
৩.তারা বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করতে পারেন। হজরত জিবরাইল (আ.) বিভিন্ন আকৃতিতে নবি (সা.) এর দরবারে আসতেন।
৪. তাদের কোন সন্তানাদি নেই।
৫. তারা সংখ্যায় অনেক। হাদিসে বর্ণিত আছে, সাত আসমানের সর্বত্র এত ফেরেশতা ইবাদতে রত আছেন যে, সামান্য অর্ধহাত জায়গাও খালি নেই। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
وما يعلم جنود ربك الا هو
অর্থাৎ, তিনি (আল্লাহ) ব্যতীত তোমার রবের সৈন্যবাহিনী (ফেরেশতা) সম্বন্ধে কেউ অবগত নয়। (মুদ্দাসসির : ৩১)
৬. আল্লাহ তাআলা তাদেরকে বিপুল শক্তির অধিকারী বানিয়েছেন।
৭. আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সৃষ্টি করে বিভিন্ন কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন। কাউকে আজাবের কাজে, কাউকে রহমতের কাজে, কাউকে আরশ বহনের কাজে নিযুক্ত করেছেন। আবার কাউকে আমলনামা লেখার কাজে নিযুক্ত করেছেন। তাদেরকে “কিরামান কাতিবিন” বলা হয়। এমনিভাবে সৃষ্টির বিভিন্ন কাজে ফেরেশতাদেরকে আল্লাহ তাআলা নিযুক্ত করেছেন।
৮. ফেরেশতারা মাসুম বা নিষ্পাপ। সর্বদা আল্লাহ তাআলার নির্দেশ মোতাবেক কার্য সম্পাদন করে থাকেন। তারা তার ব্যতিক্রম করেন না। তারা আল্লাহ তাআলার অবাধ্যতা করেন না; বরং প্রত্যেকে নিজ দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করেন। এ ব্যাপারে কুরআনে বলা হয়েছে,
لا يسبقونه بلقول وهم بءمره يعملون-
অর্থাৎ, তারা আগে বেড়ে কথা বলে না। তারা তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে থাকে। (আম্বিয়া : ২৭)
ইবলিশ আল্লাহ তাআলার নির্দেশ অমান্য করেছিল- এ থেকে প্রমাণ হয় না যে, ফেরেশতা আল্লাহ তাআলার অবাধ্য হতে পারে। কেননা মুহাক্কিক আলেমদের মতে ইবলিশ ফেরেশতা নয়; বরং সে জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত ছিল।
যেমন এক আয়াতে বলা হয়েছে,
كان من الجن ففسق عن امر ربه
অর্থাৎ, সে ছিল জিনদের অন্তর্ভুক্ত। অতঃপর সে তার রবের অবাধ্য হয়ে যায়।
তদুপরি ইবলিশের সন্তানাদি আছে বলে কুরআনে কারিমে উল্লেখ আছে। এটাও তার ফেরেশতা না হওয়ার দলিল। কেননা ফেরেশতাদের কোন সন্তানাদি হয় না।
উপর্যুক্ত আয়াতেই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
افتتخذونه وذريته اولياء من دوني وهم لكم عدو
অর্থাৎ, তবে কি তোমরা আমার পরিবর্তে তাকে এবং তার বংশধরকে অভিভাবক রূপে গ্রহণ করছ? অথচ তারা তোমাদের শত্রু। (কাহাফ : ৫০)

৩. নবি ও রাসুল সম্বন্ধে ইমান :
তৃতীয় মৌলিক যে বিষয়ের উপর ইমান রাখতে হয় তা হল, নবি রাসুলদের প্রতি ইমান। জিন ও মানুষের হেদায়েতের জন্য আল্লাহ তাআলা যে কিতাব প্রেরণ করেন, সেই কিতাবের বাহক বানিয়ে, সেই কিতাব বুঝানো ও ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য তথা আল্লাহ তাআলার বাণী হুবহু পৌঁছে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলা নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং জিন ও মানব জাতির নিকট তাদেরকে প্রেরণ করেছেন। তাদেরকে বলা হত নবি বা পয়গাম্বর। মুহাক্কিক উলামায়ে কেরামের মতে নবি- যারা বিশেষ বৈশিষ্ট্য প্রাপ্ত হয়েছেন, তাদেরকে বলা হয় রাসুল।যেমন নতুন কিতাব প্রাপ্ত হয়েছেন বা নতুন উম্মতের নিকট প্রেরিত হয়েছেন বা বিশেষভাবে বিরুদ্ধবাদীদের সাথে মোকাবেলা করার নির্দেশ প্রাপ্ত হয়েছেন, তাদেরকে রাসুল বলা হয়। আর যাদের কাছে অহি আসে তাদেরকে নবি বলা হয়। এ হিসেবে নবি ব্যাপক। অর্থাৎ, সব রাসুল নবি, তবে সব নবি রাসুল নন। রাসুল হওয়ার জন্য নতুন কিতাব প্রাপ্ত হওয়া আবশ্যক নয়। কেননা হজরত ইসমাইল (আ.) সর্বসম্মতিক্রমে রাসুল ছিলেন, কিন্তু তার নিকট কোন কিতাব আসে নি। তা ছাড়া এক হাদিস থেকে জানা যায়, রাসুলদের সংখ্যা ৩১৩ জন। আর কিতাব ও সহিফার সংখ্যা সর্বমোট ১০৪। নবি ও পরিভাষাদ্বয়ের মাঝে এই পার্থক্য থাকে সত্তেও সাধারণভাবে নবি, রাসুল, পয়গাম্বর সব শব্দগুলো একই অর্থে ব্যবহ্রিত হয়ে থাকে। বিশুদ্ধ মত অনুযায়ী নবিদের রাসুলদের মর্যাদা অধিক।
সাধারণভাবে সব নবি ও রাসুলদের প্রতি যে ইমান রাখতে হবে তা হল :
১. নবুয়ত ও রেসালাত আল্লাহ তাআলার দান। আল্লাহ তাআলা যাকে চান তাকেই দান করেন। নবুয়ত সাধনা বলে অর্জিতব্য বিষয় নয়।
কুরআনে কারিমে বলা হয়েছে,
الله اعلم حيث يجعل رسالته
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা তাঁর রেসালাতের ভার কার উপর অর্পণ করবেন, তা তিনিই ভালো জানেন। (আনআম : ১২৪)
২. নবি রাসুলদের থেকে কখনও নবুয়ত ও রেসালাতকে কেড়ে নেওয়া হয় না। নবিরা নবুয়ত লাভ করার পর সে পদে চির বহাল থাকেন।
৩. তাঁরা মানুষ, তাঁরা খোদা নন বা তাঁর পুত্র নন বা তাঁর রূপান্তর নন; বরং তাঁরা খোদার প্রতিনিধি ও নায়েব। আল্লাহ তাআলার বাণী অনুসারে জিন ও মানুষ জাতিকে হেদায়েতের জন্য তাঁরা দুনিয়াতে প্রেরিত হন। যারা হজরত ইসা (আ.) কে খোদা বা হজরত ইসা ও উজায়ের (আ.) কে খোদার পুত্র বলেছে, তাদের খণ্ডনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,
لقد كفر الذىن قالوا ان الله ٥و المسيح ابن مريم
অর্থাৎ, যারা বলে মারইয়াম তনয় মাসিহই আল্লাহ, তারা তো কুফুরি করেছে। (মায়িদা : ১৭)
وقالت اليهود عزير ابن الله وقالت النصاري المسيح ابن الله – ذالك قولهم بءفواههم
অর্থাৎ, ইহুদিরা বলে উজায়ের আল্লাহ তাআলার পুত্র এবং খ্রিষ্টানরা বলে মাসিহ আল্লাহ তাআলার পুত্র। এটা তাদের মুখের কথা। (তাওবা : ৩০)
৪. নবি রাসুলদের প্রতি ইমান আনয়ন ব্যতীত আল্লাহ তাআলার প্রতি ইমান আনয়ন গ্রহণযোগ্য হয় না। আল্লাহ তাআলা বলেন,
ان الذين يكفرون بلله ورسله ويريدون ان يفرقوا بين الله ورسله ويقولون نؤمن ببعض ونكفر ببعض. ويريدون ان يتخذوا بين ذالك سبيلا. اولاءك هم الكافرون حقا-
অর্থাৎ, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলদের সাথে কুফুরি করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলদের মাঝে তারতম্য করতে চায় ও বলে, আমরা কতকের প্রতি ইমান রাখি এবং কতকের প্রতি ইমান রাখি না আর এভাবে কোন মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করতে চায়, তারা প্রকৃতপক্ষে কাফের। (নিসা : ১৫০-১৫১)
৫. নবিগণ আল্লাহ তাআলার বাণী পৌঁছে দিয়েছেন। বাণী পৌঁছানোর ক্ষেত্রে তাদের দ্বারা কোন ত্রুটি সংঘটিত হয় নি।
ইরশাদ হয়েছে,
الذين يبلغون رسالات الله ويخشونه ولا يخشون احدا الا الله
অর্থাৎ, তারা আল্লাহ তাআলার বাণী প্রচার করত এবং তাঁকে ভয় করত, আর আল্লাহ তাআলা ব্যতীত অন্য কাউকে ভয় করত না।
(আহজাব : ৩৯)
৬. সর্বপ্রথম নবি হজরত আদম (আ.) এবং সর্বশেষ নবি হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)। নবিদের ধারাবাহিতা হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে আমাদের নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর উপর শেষ হয়েছে। নবিদের সংখ্যা কত, তা সীমাবদ্ধ করে উল্লেখ না করাই শ্রেয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
منهم من قصصنا عليك ومنهم من لم نقصص عليك
অর্থাৎ, তাদের কারও কারও কথা তোমার নিকট বিবৃত করেছি আর কারও কারও কথা তোমার নিকট বিবৃত করিনি।
(মুমিন : ৭৮)
৭. আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের মত অনুযায়ী, নবিরা কবরে জীবিত। শহিদদের জীবনের চেয়েও তাঁদের জীবন অধিক অনুভূতি সম্পন্ন। তাঁদের কাছে উম্মতের আমল ও দরুদ সালাম পৌঁছানো হয়। আমাদের নবি (সা.) কবরে জীবিত আছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন,
الانبياء احياء في قبورهم يصلون
অর্থাৎ, নবিরা কবরে জীবিত, তাঁরা তাঁদের কবরে নামাজ পড়েন।
আল্লামা সামাহুদি (র.) বলেন, নবিদের কবরে জীবিত হওয়া সম্পর্কিত দলিল সমূহ থেকে বুঝা যায়, তাঁরা দুনিয়ার মতই দৈহিক জীবন-যাপন করে থাকেন। তবে সেখানে তাঁদের খাদ্য-খাবারের প্রয়োজন হয় না। নবি (সা) কবরে জীবিত বিধায় তাঁর রওজা মোবারকে সালাম দেওয়া হলে তিনি তা শুনতে পান। অন্য কোন স্থানে থেকে নবি (সা) এর প্রতি দরুদ সালাম পাঠ করা হলে নির্ধারিত ফেরেশতারা তা নবি (সা) এর নিকট পৌঁছে দেন।
৮. হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত যত নবি এসেছেন, সকলেই সত্য ছিলেন। সকলের প্রতিই ইমান রাখতে হবে। কারও প্রতি ইমান আনা হবে আর কারও প্রতি ইমান আনা হবে না, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
لا نفرق بين احد من رسله
অর্থাৎ, আমরা তাঁর রাসুলদের মাঝে (ইমান আনয়নের ক্ষেত্রে) কোন তারতম্য করি না।
(বাকারা : ২৮৫)
রাসুল (সা.) ও সকল নবিকে সত্য বলে স্বীকার করেছেন। ইরশাদ হয়েছে,
بل جاء بلحق وصدق المرسلين
অর্থাৎ, সে হক সহকারে আগমন করেছে এবং প্রেরিত রাসুলদের সত্যায়ন করেছে।
(সাফফাত : ৩৭)
সকল নবি রাসুলের প্রতি ইমান আনা আবশ্যক বলে আল্লাহ তাআলা রাসুলদের প্রতি ইমান আনার বর্ণনার ক্ষেত্রে রুসুল- বহুবচন ব্যবহার করেছেন। ইরশাদ হয়েছে,
كل امن بلله وملاءكته وكتبه ورسله
অর্থাৎ, তারা সকলে ইমান এনেছে আল্লাহ তাআলা, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসুলদের প্রতি।
(বাকারা : ২৮৫)
৯. নবি রাসুলদের দ্বারা তাদের সত্যতা প্রমাণিত করার জন্য অনেক সময় অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটেছে। মুজিযায় বিশ্বাস করাও ইমানের অঙ্গীভূত। যেমন হজরত ইবরাহিম (আ.) এর জন্য আগুন ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, হজরত মুসা (আ.) এর লাঠি সাপ হয়ে যাওয়া, হজরত ইসা (আ.) এর দুআয় মৃতদের জীবিত হওয়া, হজরত মুহাম্মদ (সা.)- এর হাত মুবারকের আঙ্গুল থেকে পানি ফুটে বের হওয়া যার দ্বারা সমস্ত সৈন্যবাহিনী তৃপ্তি সহকারে পান করে নেওয়া ইত্যাদি।

৪. আল্লাহ তাআলার কিতাব সম্বন্ধে ইমান :
চতুর্থ যে মৌলিক বিষয়ে ইমান রাখতে হবে তা হল, আল্লাহ তাআলার কিতাব সমূহের প্রতি ইমান। আল্লাহ তাআলা মানব ও জিন জাতির হেদায়েত এবং দিক নির্দেশনার জন্য নবিদের মাধ্যমে তাঁর বাণীসমূহ পৌঁছে দিয়ে থাকেন। এই বাণী ও আদেশ নিষেধের সমষ্টিকে বলা হয় কিতাব। আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে যত কিতাব পাঠিয়েছেন, তার মধ্যে ছিল অনেকগুলো সহিফা অর্থাৎ পুস্তিকা বা কয়েক পাতার কিতাব। এক বর্ণনামতে সর্বমোট ১০৪ টি কিতাব ও সহিফা প্রেরণ করা হয়। তন্মধ্যে চারটি হল বড় কিতাব, আর ১০০ টি হল সহিফা। যার মধ্যে হজরত শিস (আ.) উপর ৫০ টি, হজরত ইদরিস এর উপর ৩০ টি, হজরত ইবরাহিম (আ.) এর উপর ১০ টি এবং হজরত আদম (আ.) এর উপর ১০ টি সহিফা অবতীর্ণ হয়।

চারটি বড় কিতাব হলো :
(এক) তাওরাত বা তৌরিত : যা হজরত মুসা (আ.) এর উপর অবতীর্ণ হয়।
(দুই) যাবুর : যা হজরত দাউদ (আ.) এর উপর অবতীর্ণ হয়।
(তিন) ইঞ্জিল : যা হজরত ইসা (আ.) এর উপর অবতীর্ণ হয়।
(চার) কুরআন : যা আমাদের নবি হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর উপর অবতীর্ণ হয়েছে।
কুরআনকে আল-কুরআন, আল-কিতাব, ফুরকান এবং আল-ফুরকানও বলা হয়। উল্লেখ্য যে, কুরআন বতীত অন্যান্য কিতাবসমূহ ও সহিফাসমূহকে আমরা সত্য বলে বিশ্বাস করি।

আল্লাহ তাআলার কিতাবসমূহ সম্বন্ধে ইমান রাখার মধ্যে যেসব বিষয় অন্তর্ভুক্ত :
প্রধানত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিশ্বাস করা :
১. এ সমস্ত কিতাব আল্লাহ তাআলার বাণী, মানব রচিত নয়।
২. আল্লাহ তাআলা যেমন অনাদি (قديم) ও চিরন্তন, তাঁর বাণীও তদ্রুপ অনাদি ও চিরন্তন।
৩. আসমানি কিতাব সমূহের মধ্যে কুরআন সর্বশ্রেষ্ঠ।
৪. কুরআন সর্বশেষ কিতাব- এর পর আর কোন কিতাব অবতীর্ণ হবে না।
কিয়ামত পর্যন্ত কুরআনের বিধানই চলবে। কুরআনের মাধ্যমে অন্যান্য কিতাবের বিধান রহিত হয়ে গেছে।
৫. কুরআন হিফাজতের জন্য আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করেছেন। কাজেই কেউ এর পরিবর্তন করতে পারবে না। কুরআনকে অবিকৃত বলে বিশ্বাস করতে হবে।
ইরশাদ হয়েছে,
انا نحن نزلنا الذكر وانا له لحافظون-
অর্থাৎ, আমি এই কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং অবশ্যই আমি এর হিফাজতকারী।
(হিজর : ৯)

৫. আখেরাত সম্বন্ধে ইমান :
পঞ্চম মৌলিক যে বিষয়ে ইমান রাখতে হয় তার মধ্যে একটি হল, আখেরাত সম্বন্ধে ইমান। এই জগতের যেমন একটা শুরু আছে, তেমনি এর একটা শেষও রয়েছে। মৃত্যুর পর পুনরায় সকলে জীবিত হবে। দুনিয়ার কৃত সকল কর্মের জবাবদিহি করতে হবে এবং কর্মের ভিত্তিতে পুরস্কার ও শাস্তি হবে। সকল আসমানি কিতাব পরকালে বিশ্বাসের ব্যাপারে একমত। পরকালে অবিশ্বাস করলে তার ইমান থাকে না।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
قاتلوا الذين لا يؤمنون بلله ولا بليوم الأخر
অর্থাৎ, যারা আল্লাহ তাআলার প্রতি ও পরকালের প্রতি ইমান রাখে না, তাদের সাথে যুদ্ধ কর।
(তাওবা : ২৯)

আখেরাত বা পরকাল সম্বন্ধে বিশ্বাস রাখা
অর্থ – মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে কবর ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয় জান্নাত জাহান্নাম ও তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়- যেগুলো সম্পর্কে ইমান আনার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তার সব কিছুতেই বিশ্বাস করা। অতএব এ পর্যায়ে মোটামুটি ভাবে নিম্নোক্ত বিষয়াবলীতে বিশ্বাস রাখতে হবে।

(এক) কবরের সুওয়াল জওয়াব সত্য :
কবরে প্রত্যেক মানুষের সংক্ষেপে কিছু পরীক্ষা হবে। মুনকার ও নাকির ফেরেশতা কবরবাসীকে প্রশ্ন করবে- তোমার রব কে? তোমার দীন কী? তোমার রাসুল কে? সে নেককার হলে এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে সক্ষম হবে। তখন তাঁর কবরের সাথে এবং জান্নাতের সাথে দরজা খুলে যোগাযোগ স্থাপন করে দেওয়া হবে এবং কিয়ামত পর্যন্ত সে সুখে বসবাস করতে থাকবে। আর নেককার না হলে (অর্থাৎ, কাফের বা মুনাফেক হলে) প্রত্যেক প্রশ্নের উত্তরে সে বলবে,هاه هاه لا ادري হায়! হায়! আমি জানি না! তখন জাহান্নাম ও তার কবরের মাঝে দরজা খুলে দেওয়া হবে। এবং বিভিন্ন রকম শাস্তি তাকে দেওয়া হবে। কবরে মুনকার নাকির নামক ফেরেশতাদ্বয়ের আগমন ও প্রশ্ন করা সম্পর্কে হাদিসে বলা হয়েছে,
اذا قبر الميت اوقال احدكم اتاه ملكان اسودان ازرقان- يقال لأحدهما المنكر والأخر النكير-
অর্থাৎ, যখন মৃত ব্যক্তিকে কবরস্থ করা হবে, তখন তার কাছে কালো রঙয়ের নিল চক্ষুবিশিষ্ট দুজন ফেরেশতা আসবে, যাদের একজনকে মুনকার, অনজনকে বলা হয় নাকির।
অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে এই সুওয়াল জওয়াব মুমিন গাইরে মুমিন নির্বিশেষ সকলের ক্ষেত্রেই হবে। তবে সহিহ মতে আম্বিয়ায়ে কেরাম ও শহিদদেরকে তাঁদের উচ্চ মর্যাদার প্রেক্ষিতে কবরে প্রশ্ন করা হবে না। সহিহ মুসলিম ও নাসায়ি শরিফের হাদিস দ্বারা এটাই প্রমাণিত হয়।

(দুই) কবরের আজাব সত্য :
মূলত কবর শুধু নির্দিষ্ট গর্তকে বলা হয় না। কবর বলতে বুঝায় মৃত্যুর পর থেকে নিয়ে হাশরের ময়দানে পুনর্জীবিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কালীন জগতকে। এ জগতকে কবর জগত, আলমে বরযখ বা বরযখের জগত বলা হয়।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
ومن وراءهم برزخ الى يوم يبعثون-
অর্থাৎ, তাদের পশ্চাতে রয়েছে বরযখ তাদের পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত।
(মুমিনুন : ১০০)
মৃত ব্যক্তিকে কবরস্থ করার পর তার দেহে রূহ প্রত্যাবর্তন করে। অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে রূহের প্রত্যাবর্তন আংশিকভাবে হয়না; বরং দেহ বা দেহের অংশ বিশেষের উপর তার প্রভাব পড়ে। পরিভাষায় যাকে اشراق এবং اسراف বলা হয়। মৃত্যুর পর মানুষের মরদেহ যেখানেই থাকুক না কেন, সে কবরজগতের অধিবাসী হয়ে যায় এবং বদকার হলে তার উপর আজাব চলতে থাকে। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
مما خطيءتهم اغرقوا فأدخلوا نارا-
অর্থাৎ, তাদের পাপাচারের কারণে তাদেরকে নিমজ্জিত করা হয়।
(নুহ : ২৫)
হাদিসে আছে,
تعوذ بلله من عذاب القبر
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলার কাছে কবরের আজাব থেকে আশ্রয় চাও। (মুসলিম)
কবরের এ আজাব হয় মূলত রূহের উপর এবং রূহের সাথে দেহও সে আজাব উপলব্ধি করবে। আর মৌলিক ভাবে আজাব যেহেতু রূহের উপর হবে, তাই কবরের হওয়ার এই দেহ অবশিষ্ট থাকাও অপরিহার্য নয়। জীবিত মুসলমানদের দুআ, দান-খয়রাত ও নামাজ তিলাওয়াত দ্বারা মৃত মুসলমানদের উপকার হয়। তবে কাফেররা কারও দুআ দান-খয়রাত দ্বারা উপকৃত হয় না। এর দ্বারা তাদের শাস্তি লাঘব বা লঘু হয় না।
ইরশাদ হয়েছে,
فلا يخفف عنهم العذاب ولا هم ينصرون-
অর্থাৎ, তাদের থেকে আজাব লঘু করা হবে না। আর না তারা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে।
(বাকারা : ৮৬)

(তিন) পুনরুত্থান ও হাশর ময়দানের অনুষ্ঠান সত্য :
কিয়ামতের সময় শিঙ্গায় ফুক দেওয়ার পর সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে। আর আল্লহ তাআলার হুকুমে এক সময় শিঙ্গায় ফুক দেওয়া হলে আদি অন্তের সব জিন মানব ও যাবতীয় প্রাণী পুনরায় জীবিত হয়ে হাশরের ময়দানে একত্রিত হবে।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
ونفخ في الصور فصعق من في السموات ومن في الأرض الا من شاء الله- ثم نفخ فيه اخرى فإذاهم قيام ينظرون
অর্থাৎ, শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে। ফলে আল্লাহ তাআলা যাদেরকে চান, তারা ছাড়া সকলে বেহুশ হয়ে পড়বে। অতঃপর আবার ফুৎকার দেওয়া হবে, তৎক্ষণাৎ তারা দণ্ডায়মান হয়ে তাকাতে থাকবে।
(জুমার : ৬৮)
যুক্তিগতভাবেও পুনরুত্থান সম্ভব। কারণ পুনরুত্থান হল, পুনর্বার সৃষ্টি। আবার যে খোদা প্রথমবার সৃষ্টি করতে সক্ষম, সে খোদা পুনর্বার সৃষ্টি করতেও সক্ষম।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
وهو الذي يبدأ الخلق ثم يعيده وهو اهون عليه
অর্থাৎ, তিনি ঐ সত্তা, যিনি সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনয়ন করেন। অনন্তর আবার তাকে সৃষ্টি করবেন। পুনর্বার সৃষ্টি করা তার জন্য আরও সহজ।
(রুম : ২৭)

পুনরুত্থান শারীরিক, নাকি শারীরিক-আত্মিক উভয়ভাবে?
এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আলেমদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। মুতাকাল্লিম আলেমদের অধিকাংশের মতে, পুনরুত্থান হবে শারীরিক ভাবে। তাঁদের মতে রূহ বা আত্মাও একটি সুক্ষ্ম দেহ বিশেষ- যা শরীরের সর্বত্র মিশে আছে। যেমন গোলাবের পানি গোলাবের সর্বত্র মিশে থাকে। অতএব রূহ ও দেহ উভয়ের সমভিব্যাহারে পুনরুত্থান হল শারীরিক।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
يأيتها النفس المطمءنة- ارجعي الى ربك راضية مرضية- فأدخلي في عبادي وأدخلي جنتي-
অর্থা, হে প্রশান্ত চিত্ত! তুমি তোমার রবের নিকট ফিরে আস সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে। আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ কর।
(ফাজর : ৩০)

পুনরুত্থান কোন দেহের উপর হবে?
পুনরুত্থান হবে শরীরের মৌলিক অংশের উপর ভিত্তি করে যা জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে। খাদ্য-খাবার দ্বারা যার প্রবৃদ্ধি ঘটে কিংবা রোগ-ব্যাধিতে যার হ্রাস ঘটে তার নয়। অতএব দেহ যেখানেই থাকুক না কেন, তার যে অংশ অবশিষ্ট থাকবে সেটুকু আজাব উপলব্ধি করবে। আর মৌলিক ভাবে আজাব যেহেতু রূহের উপর হবে, তাই কবরের আজাব হওয়ার জন্য এই দেহ অবশিষ্ট থাকা অপরিহার্য নয়। শরীরের মৌলিক অংশের উপর ভিত্তি করে পুনরুত্থান সংঘটিত হওয়ার নির্দেশনা পাওয়া যায় নিম্নোক্ত হাদিস থেকে,
كل ابن ادم يفني الا عجب الذنب منه خلق ومنه يركب-
অর্থাৎ, সকল বনি আদম ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে তার ব্যতিক্রম; তার থেকে তার সৃষ্টি হয়েছে এবং তার থেকেই পুনর্গঠন হবে।
(চার) আল্লাহ তাআলার বিচার ও হিসাব নিকাশ সত্য :

পুনর্জীবিত হওয়ার পর সকলকে আল্লাহ তাআলার বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
ثم لتسألن يومإذ عن النعيم-
অর্থাৎ, অনন্তর সেদিন তোমাদেরকে নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।
(তাকাসুর : ৮)
হাদিসে ইরশাদ হয়েছে,
لا تزول قدما ابن ادم يوم القيامة حتى يسأل عن خمس: عن عمره فيما افناه وعن شبابه فيما ابلاه وعن ماله من اين اكتسبه وفيما انفقه وماذا عمل فيما علم-
অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন পাঁচটা বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হওয়ার (অর্থাৎ হিসাব-নিকাশের) আগে কোন বনি আদমের পা বাড়ানোরও ক্ষমতা থাকবে না। তার জীবন কোথায় ব্যায় করেছিল, তার যৌবন কোথায় ক্ষয় করেছিল, সম্পদ কোথা থেকে আয় করেছিল এবং কোথায় ব্যয় করেছিল, আর যা জেনেছিল তার কতটুকু আমল করেছিল।

(পাঁচ) কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা কতৃক মানুষকে সুওয়াল করা সত্য :
কিয়ামতের আল্লাহ তাআলা মানুষকে সুওয়াল করবেন এটা সত্য।
হাদিসে এসেছে,
الله يدني المؤمن فيضع عليه كنفه ويقره فيقول اتعرف ذنب كذا اتعرف ذنب كذا- فيقول نعم اي رب حتى اذا قرره بذنوبه ورأى في نفسه انه قد هلك قال سترتها عليك في الدنيا وانا اغفرها لك اليوم فيعطى كتاب حسناته-
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা মুমিনকে কাছে আনবেন। অতঃপর তার দিকে ঝুকে তার পাপের স্বীকৃতি নিবেন। তাকে জিজ্ঞাসা করবেন, তুমি অমুক অমুক পাপ চেন কী? সে বলবে, জি হে আমার রব। অবশেষে যখন তার থেকে পাপের স্বীকৃতি নেওয়া হবে এবং সে মনে মনে ভাববে আমার ধ্বংস অনিবার্য। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, আমি দুনিয়ায় তোমার এসব পাপ গোপন করে রেখেছিলাম, আজও আমি তা ক্ষমা করে দিবো। অতঃপর তার নেক আমল তার হাতে দেওয়া হবে।

(ছয়) সওয়াব ও গুনাহের ওজন সত্য :
কিয়ামতের ময়দানে হিসাব-নিকাশের জন্য মিজান বা দাঁড়িপাল্লা (মাপযন্ত্র) স্থাপন করা হবে এবং তার দ্বারা সওয়াব ও গুনাহের ওজন করা হবে ও ভালো-মন্দ এবং সৎ-অসতের পরিমাপ করা হবে।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
ونضع الموازين القسط ليوم القيامة
অর্থাৎ, কিয়ামতের দিন আমি ইনসাফের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবো।
(আম্বিয়া : ৪৭)

(সাত) শাফাআত সত্য :
শাফাআর মশহুর (প্রসিদ্ধ) হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। মুতাজিলার এ ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করে। তাদের ধারণায় পাপীকে ক্ষমা করা আল্লাহ তাআলার পক্ষে সম্ভব নয়। আর আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতে- বান্দার কবিরা আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করতে পারেন যদি সে গুনাহকে হালাল মনে করে করা না হয়। পক্ষান্তরে কোন সগিরা গুনাহের কারণেও আল্লাহ তাআলা শাস্তি দিতে পারেন।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
ان الله لا يغفر ان يشرك به ويغفر ما دون ذالك لمن يشاء
অর্থাৎ, নিশ্চয় আল্লাহর সাথে শরিক করাকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করবেন না। অন্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন।
(নিসা : ১১৬)

পরকালে রাসুল (সা.), আলেম, হাফেজ প্রমুখদেরকে বিভিন্ন পর্যায়ে সুপারিশ করার অনুমতি দেওয়া হবে। রাসুল (সা.) অনেক প্রকারের শাফাআত বা সুপারিশ করবেন।
তন্মধ্যে :
১. হাশরের ময়দানে কষ্ট থেকে মুক্তির জন্য।
হাশরের ময়দানে কষ্টে সমস্ত যখন পেরেশান হয়ে বড় বড় নবিদের কাছে আল্লাহ তাআলার নিকট এই মর্মে সুপারিশ করার আবেদন করবে যেন আল্লাহ তাআলা বিচারকার্য শুরু করে হাশরের ময়দানের কষ্ট থেকে সকলকে মুক্তিদান করেন, তখন সকল নবি অপারগতা প্রকাশ করবেন। কারণ আল্লাহ তাআলা সেদিন অত্যন্ত রাগান্বিত থাকবেন। অবশেষে রাসুল (সা.) সুপারিশ করবেন। এটাকে শাফাআতে কুবরা বা বড় শাফাআত বলা হয়।

এ ছাড়াও রাসুল (সা.) আরও বিভিন্ন ধরনের সুপারিশ করবেন। যেমন :
২. হিসাব ও সুওয়াল সহজ করার জন্য।
৩. কোন কাফেরের আজাব সহজ করার জন্য।
যেমন রাসুল (সা.) এর চাচা আবু তালেবের জন্য এরূপ সুপারিশ হবে।
৪. কোন কোন মুমিনকে জাহান্নাম থেকে বের করার জন্য।
৫. যে সব মুমিন বদ আমল বেশি হওয়ার জাহান্নামের যোগ্য হয়েছে- এরূপ মুমিনদের কতককে না পাঠানো বরং ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য।
৬. কোন কোন মুমিনকে বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য।
৭. আরাফ তথা জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে অবস্থিত প্রাচীরে যারা অবস্থান করবে, তাদের মুক্তির জন্য।
৮. জান্নাতে কতক মুমিনের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য।

(আট) আমল নামার প্রাপ্তি সত্য:
* রাসুল (সা.) এর সুপারিশের পর কিয়ামতের ময়দানে আমলনামা উড়িয়ে দেওয়া হবে। প্রত্যেকের আমলনামা তার হাতে গিয়ে পড়বে।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
وكل انسان الزمناه طاءره في عنقه-ونخرج له يوم القيامة كتابا يلقه منشورا-اقرأ كتابك كفى بنفسك اليوم عليك حسيبا-
অর্থাৎ, আমি প্রত্যেক মানুষের কর্ম তার গ্রীবালগ্ন কিরেছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করবো এক কিতাব, যা সে উন্মুক্ত পাবে।
(বনি ইসরাইল : ১৩)
★ নেককারের আমলনামা তার ডান হাতে গিয়ে পৌঁছুবে, আর বদকারের আমলনামা বাম হাতে গিয়ে পড়বে।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
فأما من اوتي كتابه بيمينه فيقول هاؤم قرؤا كتابيه……..
অর্থাৎ, যাকে তার আমলনামা তার ডান হাতে দেওয়া হবে,সে বলবে, নাও পড়ে দেখ……..
আর যাকে তার আমলনামা বাম হাতে দেওয়া হবে, সে বলবে, হায় আমাকে যদি আমার আমলনামা দেওয়াই না হত!
★ প্রত্যেকে তার জীবনের ভালো-মন্দ ক্ষুদ্র বৃহৎ যা কিছু করেছে, সব তার আমলনামায় লিখিত অবস্থায় পাবে।
ইরশাদ হয়েছে,
ويقولون يولتنا ما لهذا الكتاب يغادر ضغيرة ولا كبيرة الا احصاها-ووجدوا ما عملوا حاضرا-ولا يظلم ربك احدا
অর্থাৎ, তারা বলবে হায় আমাদের দূর্ভোগ! এ কী অদ্ভুত আমলনামা- ছোট-বড় কোন কিছুকে বাদ দেয়না; বরং সবই হিসাব রেখেছে! তারা তাদের যাবতীয় আমল উপস্থিত পাবে। তোমার রব কারও প্রতি জুলুম করেন না।
(কাহাফ : ৪৯)
★ প্রত্যেককে তার আমলনামা পড়তে দেওয়া হবে। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
اقرأ كتابك كفى بنفسك اليوم عليك حسيبا-
অর্থাৎ, তুমি তোমার কিতাব (আমলনামা) পাঠ কর। আজ তোমার হিসাব নেওয়ার জন্য তুমি নিজেই যথেষ্ট।
( বনি ইসরাইল : ১৪)

(নয়) হাউজে কাউসার সত্য :
কবর থেকে উঠার পর কিয়ামতের ময়দানে প্রত্যেকে পিপাসার্ত থাকবে। তাদেরকে পানি পান করানোর জন্য প্রত্যেক নবিকে আল্লাহ তাআলা তাঁদের মর্তবা অনুযায়ী একটি হাউজ দান করবেন। এই হাউজ তাঁরা তাঁদের উম্মতকে পানি পান করাবেন, যার ফলে পিপাসা আর তাদেরকে কষ্ট দিবে না। আমাদের নবি (সা.) কে যে হাউজ দান করা হবে তার নাম হাউজে কাউসার। এ হাউজ অন্যান্য সকল হাউজ থেকে বড় হবে।

হাউজে কাউসার কুরআন হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
انا اعطيناك الكوثر
অর্থাৎ, আমি তোমাকে কাউসার দান করেছি।
(কাউসার : ১)
হাদিসে ইরশাদ হয়েছে,
حوضى مسيرة شهر وزواياه سواء ماءه ابيض من اللبن وريحه اطيب من المسك وكيزانه اكثر من نجوم السماء من يشرب منها فلا يظمأ ابدا-
অর্থাৎ, আমার হাউজ এক মাস সফর করা পরিমাণ বিস্তৃত। তার কোণগুলো সমান। তার পানি দুধের চেয়ে সাদা। তার সুগন্ধি মিশকের চেয়েও উত্তম। তার পেয়ালা আকাশের নক্ষত্রের চেয়ে বেশি সংখ্যক। কেউ একবার তা থেকে পান করলে আর কখনও সে পিপাসার্ত হবে না।
(দশ) পুলসিরাত সত্য :

★ হাশরের ময়দানের চতুর্দিক জাহান্নাম দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকবে। এই জাহান্নামের উপর একটি পুল স্থাপন করা হবে, যা চুলের চেয়ে সরু এবং তরবারির চেয়ে ধারালো হবে। এটাকে বলা হয় পুলসিরাত। সকলকেই এই পুল পার হতে হবে। যে খোদা পাখিকে উড়াতে সক্ষম, তিনি এমন পুলসিরাতের উপর দিয়ে মানুষকে চালাতেও সক্ষম।
★ এই পুলসিরাত হল দুনিয়ার সিরাতে মুস্তাকিমের স্বরূপ। দুনিয়াতে যে যেভাবে সিরাতে মুস্তাকিমের উপর চলেছে, সে সেভাবে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ চোখের পলকে, কেউ দ্রুতগামী ঘোড়ার গতিতে, কেউ দৌড়ে, কেউ হেটে, আবার কেউ হামাগুড়ি দিয়ে পার হবে। মোটকথা, যার যে পরিমাণ নেকি সে সেরকম গতিতে পুলসিরাত পার হবে। আর পাপীদেরকে জাহান্নামের আংটা জাহান্নামের মধ্যে টেনে ফেলে দিবে।
হাদিসে ইরশাদ হয়েছে,
ثم يضرب الجسر على جهنم وتحل الشفاعة ويقولون اللهم سلم سلم- قيل يا رسول الله وما الجسر- قال دحض مزلة فيها خطاطيف وكلاليب…… فيمر المؤمنون كطرف العين وكالبرق وكالريح وكالطير وكاجاويد الخيل والركاب فنام مسلم ومخدوش مرسل ومكدوس في نار جهنم – صحيح مسلم
অর্থাৎ, অনন্তর জাহান্নামের উপর পুল স্থাপন করা হবে। শাফাআত সংঘটিত হবে। লোকেরা বলবে হে আল্লাহ! নিরাপত্তা দাও নিরাপত্তা দাও! রাসুল (সা.) কে জিজ্ঞাসা করা হল পুল কী? তিনি বললেন, পদস্খলন ঘটার এক পিচ্ছিল স্থান। তাতে থাকবে সাঁড়াশি ও আংটা।….তখন মুমিনরা কেউ চোখের পলকে, কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ পাখির মত, কেউ দ্রুতগামী অশ্বের ন্যায় এবং কেউ সাধারণ সওয়ারির গতিতে পুল পার হয়ে যাবে। তখন কেউ অক্ষত অবস্থায় মুক্তি পাবে, আর কেউ জাহান্নামের আগুনে নিক্ষিপ্ত হবে।

★ রাসুল (সা.) এবং এই উম্মত সর্বপ্রথম এই পুল পার হবে। তারপর অন্যান্যরা পার হবে।
হাদিসে ইরশাদ হয়েছে,
فأكون انا وامتي اول من يجيز- صحيح مسلم
অর্থাৎ, তখন আমি এবং আমার উম্মত সর্বপ্রথম পার হবো।
(এগার) আরাফ সত্য :
★ আরাফ বলা হয় জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে অবস্থিত প্রাচীরকে।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
وبينهما حجاب وعلى الأعراف رجال يعرفون كلا بسيماهم-
অর্থাৎ, তাদের উভয়ের (জান্নাতি ও জাহান্নামিদের) মাঝে থাকবে আঁড়। এবং আরাফে কিছু লোক অবস্থান করবে, যারা সকলকে তাদের চিহ্ন দেখে চিনতে পারবে।
(আরাফ : ৪৬)

এটা কোন স্থায়ী জায়গা নয়। যাদের সওয়াব গুনাহ সমান হবে তাদেরকে সাময়িক এখানে অবস্থান করানো হবে। অবশেষে আল্লাহ তাআলার মঞ্জুরি হলে তাদের পাপ ক্ষমা করে তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিবেন।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
ادخلوا الجنة لا خوف عليكم ولا انتم تحزنون-
অর্থাৎ, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর, তোমাদের কোন ভয় নেই, তোমরা দুঃখিতও হবে না।
(আরাফ : ৪৯)

(বার) জান্নাত বা বেহেশত সত্য :
আল্লাহর নেক বান্দাদের জন্য আল্লাহ এমন সব নেয়ামত তৈরী করে রেখেছেন যা কোন চোখ দেখেনি, কোন কান শোনেনি, কারও অন্তরে তার পূর্ণ ধারণাও আসতে পারে না। এই সব মহা নেয়ামতের স্থান হল জান্নাত বা বেহেশত। এর কিছুটা বিবরণ দিয়ে এক হাদিসে কুদসিতে বলা হয়েছ,
الله تعالى اعددت لعبادي الصالحين مالا عين رأت ولا اذن سمعت ولا خطر على قلب بشر واقرؤا ان شءتم فلا تعلم نفس من قرة اعين
অর্থাৎ, আমি আমার বান্দাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি যা কোন চক্ষু দেখেনি, কোন কান শোনেনি, আর না কোন মানুষের হ্রিদয়ে তার কল্পনাও আসতে পারে। তোমরা (এর প্রমাণ স্বরূপ) নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করতে পার (যাতে বলা হয়েছে,) কেউ জানে না তাদের জন্য
নয়নপ্রীতিকর কী লুকায়িত রাখা হয়েছে।
★ জান্নাত কোন কল্পিত বিষয় নয় বরং সৃষ্টরূপে ও অস্তিত্বশীল হিসেবে তা বিদ্যমান আছে এবং অনন্তকাল বিদ্যমান থাকবে। মুমিনরাও অনন্তকাল সেখানে থাকবেন। এমন নয় যে পরবর্তীতে সৃষ্টি করা হবে। দলিল –
১. কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
وسارعوا الى مغفرة من ربكم وجنة عرضها السموات والأرض- اعدت للمتقين
অর্থাৎ, তোমরা ধাবমান হও স্বীয় রবের ক্ষমার দিকে এবং সেই জান্নাতের দিকে যার বিস্তৃতি আসমান ও জমিনের ন্যায়; যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে মুত্তাকিদের জন্য।
(আলে ইমরান : ১৩৩)
২. পূর্বে বর্ণিত যে হাদিসে জান্নাতের নেয়ামতরাজি প্রস্তুত রাখার কথা বলা হয়েছে, তাও জান্নাত সৃষ্টরূপে বিদ্যমান থাকার দলিল।
★ জান্নাতের অবস্থান এখন কোথায় এ ব্যাপারে মতবিরোধ রয়েছে। তব অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে জান্নাত আকাশসমূহের উপর।
যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
ولقد رآه نزلة اخرى- عند سدرة المنتهى- عندها جنة المأوى
অর্থাৎ, আর সে তাকে (জিবরাইলকে) দেখেছিল সিদরাতুল মুনতাহার কাছে; যার নিকট জান্নাতুল মাওয়া অবস্থিত।
(নাজম : ১৩-১৫)
নবি (সা.) জান্নাতুল ফিরদউসের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন,
سقفها عرش الرحمن-
অর্থাৎ, তার ছাদ হল আল্লাহর আরশ।
★ জান্নাতবাসীদের কখনও মৃত্যু হবে না। জান্নাতবাসীরা যা খেতে ইচ্ছা করবেন, তাই পাবেন। তাদের জন্য হুর গিলমান ও খাদেম থাকবে।
(তের) জাহান্নাম বা দোজখ সত্য :

জাহান্নামের সাতটি স্তর বা দরজা থাকবে। একেক স্তরের শাস্তির ধরন একেক রকম হবে। অপরাধ অনুসারে যে যে স্তরের উপযোগী হবে তাকে স্তরে নিক্ষেপ করা হবে। স্তরগুলোর পৃথক পৃথক নাম রয়েছে। যাথা :
১. জাহান্নাম।
২. লাজা।
৩. হুতামা।
৪. সায়ির।
৫. সাকার।
৬. জাহিম।
৭. হাবিয়া।
জাহান্নামের অবস্থান এখন কোথায় এ ব্যাপারে অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে- জমিনের নিচে অবস্থিত। তবে এ ব্যাপারে স্পষ্ট ভাষ্য পাওয়া যায়না বিধায় এর জ্ঞান আল্লাহর উপর ন্যাস্ত করাই শ্রেয়।

৬. তাকদির সম্বন্ধে ইমান :
ষষ্ট মৌলিক যে বিষয়ে ইমান রাখতে হবে তা হল তাকদিরের বিষয়ে ইমান।
তাকদির (تقدير) শব্দটি قدر থেকে গঠিত। এর শাব্দিক অর্থ হল- পরিকল্পনা, নকশা, পরিমাণ, নির্ধারণ করা, ব্যবস্থাপনা করা ইত্যাদি।
পরিভাষায় তাকদিরের সংজ্ঞা হল,
هو تحديد كل مخلوق بحده الذي يوجد من حسن وقبح ونفع وضرر وما يحويه من زمان ومكان وما يترتب عليه من ثواب وعقاب (قواعد الفقه)
অর্থাৎ, সমুদয় সৃ্ষ্টির ভলো-মন্দ, উপকার-ক্ষতি ইত্যাদি সবকিছুর স্থান-কাল এবং এসবের শুভ-অশুভের পরিমাণ ও পরিণাম পূর্ব হতে নির্ধারিত করা।
আল্লাহ তাআলা সবকিছু সৃষ্টি করার পূর্বে সৃষ্টি জগতের একটা নকশাও লিখে রেখেছেন, সবকিছুর পরিকল্পনাও লিখে রেখেছেন। এই নকশা ও পরিকল্পনাকেই তাকদির বলা হয়। এই পরিকল্পনা এবং নকশা অনুসারেই সবকিছু সংঘটিত হয় এবং হবে। ভালো এবং মন্দ ইমান ও কুফর, হেদায়েত ও গোমরাহি, আনুগত্য ও অবাধ্যতা সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ – এই বিশ্বাস রাখা অপরিহার্য।
কুরআনে কারিমে বলা হয়েছে,
قل الله خالق كل شيء وهو الواحد القهار
অর্থাৎ, তুমি বলে দাও, আল্লাহ সব কিছুর সৃষ্টিকর্তা। তিনি একক, মহাপরাক্রমশালী।
(রাদ : ১৬)
এর বিপরীত কেউ যদি ভাল বা “সু”-এর জন্য একজন সৃষ্টিকর্তা আর মন্দ বা “কু”-এর জন্য আরেকজন সৃষ্টিকর্তা মানে তাহলে সেটা কুফর ও শিরক হয়ে যাবে। যেমন অগ্নিপূজারীরা কল্যাণ ও “সু”-এর সৃষ্টিকর্তা আররহমানকে মানে। হিন্দুরা “সু” -এর সৃষ্টিকর্তা লক্ষ্মীদেবী এবং “কু” -এর সৃষ্টিকর্তা শনি দেবতাকে মানে। এটা কুফর ও শিরক।

তাকদির সম্বন্ধে ইমান রাখার অর্থ হল নিম্নোক্ত বিষয়াবলীতে বিশ্বাস রাখা :
১. সবকিছু সৃষ্টি করার পূর্বেই আল্লাহ তাআলা সবকিছু লিখে রেখেছেন।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
ما اصاب من مصيبة في الأرض ولا في انفسكم الا في كتاب من قبل ان نبرأها-ان ذالك على الله يسير-
অর্থাৎ, পৃথিবীতে অথবা ব্যক্তিগত ভাবে তোমাদের উপর যে বিপদ আসে তা সংঘটিত করার পূর্বেই কিতাবে (লাওহে মাহফুজে) লিপিবদ্ধ থাকে।
(হাদিদ : ২২)
২. সবকিছু ঘটার পূর্বেই আল্লাহ তাআলার অনাদি জ্ঞান সে সম্বন্ধে অবহিত এবং তাঁর জানা ও ইচ্ছা অনুসারেই সবকিছু সংঘটিত হয়। তবে কোন পাপ করে তার দায় থেকে অব্যাহতি লাভের জন্য তাকদিরের দোহাই দেওয়া জায়েজ নয়।
কুরআনে ইরশাদ হয়েছে,
وما تسقط من ورقة الا يعلمها ولا حبة في ظلمات الأرض ولا رطب ولا يابس الا في كتاب مبين-
অর্থাৎ, তাঁর অজ্ঞাতসারে একটা পাতাও নড়ে না; মাটির অন্ধকারে কোন শস্যকণা কিংবা কোন রসযুক্ত বা শুস্ক সব কিছু সম্পর্কেই তিনি অবগত, সবই সুস্পষ্ট কিতাবে (লাওহে মাহফুজে) রয়েছে।
(আনআম : ৫৯)

৩. তিনি ভালো ও মন্দ সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা। তবে মন্দ সৃষ্টির জন্য তিনি দোষী নন; বরং যে মাখলুক মন্দ উপার্জন করবে সে দোষী। কেননা মন্দ সৃষ্টি মন্দ নয়; বরং মন্দ উপার্জন হল মন্দ। মন্দ সৃষ্টি এজন্য মন্দ নয় যে, তার মধ্যেও বহু রহস্য বহু পরোক্ষ কল্যাণ নিহিত রয়েছে। তাই ভালো কাজে আল্লাহ তাআলা সন্তুষ্ট এবং মন্দ কাজে তিনি অসন্তুষ্ট।
৪. আল্লাহ তাআলা কলম দ্বারা লাওহে মাহফুজে তাকদিরের সবকিছু লিখে রেখেছেন। তাই লাওহ, কলম ও লাওহে যা কিছু লিখে রাখা হয়েছে সব কিছুতে ইমান রাখা বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত।
৫. মানুষ একদিকে নিজেকে অক্ষম ভেবে নিজেকে দায়িত্বহীন মনে করবে না এই বলে যে, আমার কিছুই করার নেই, তাকদিরে যা আছে, তা-ই তো হবে! আবার তাকদিরকে এড়িয়ে মানুষ খোদার সৃষ্টির কিছু করে ফেলতে সক্ষম- এমনও মনে করবে না। মোটকথা তাকদিরের তদবির বা চেষ্টা-চরিত্রের কোন বিরোধ নেই।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
يا بني لا تدخلوا من باب واحد وادخلوا من ابواب متفرقة – وما اغني عنكم من الله من شيء – ان الحكم الا لله – عليه وعليه فليتوكل المتوكلون-
অর্থাৎ, সে (ইয়াকুব আ.) বলল, হে আমার পুত্র! তোমরা একদরজা দিয়ে প্রবেশ করবে না, ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারি না। বিধান আল্লাহ তাআলারই। আমি তাঁর উপরই নির্ভর করি। এবং যারা নির্ভর করতে চায় তারা তাঁর উপরই নির্ভর করুক।
(ইউসুফ : ৬৭)

৬. মানুষের প্রতি আল্লাহর যত হুকুম ও আদেশ নিষেধ রয়েছে, তার কোনটি মানুষের সাধ্যের বাইরে নয়। কোন অসাধ্য বিষয়ে আল্লাহ হুকুম ও বিধান দেননি।
কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
لا يكلف الله نفسا الا وسعها-
অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা কাউকে তার সাধ্যের বাইরে বিধান দেননা।
(বাকারা : ২৮৬)
৭. আল্লাহ তাআলার উপর কোন কিছু ওয়াজিব নয়। তিনি কাউকে কোন কিছু দিতে বাধ্য নন। তাঁর উপর কারও কোন হুকুম চলেনা। যা কিছু তিনি দান করেন সব তাঁর রহমত ও মেহেরবানি মাত্র। কুরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে,
لا يسأل عما وهم يسألون –
অর্থাৎ, তিনি (আল্লাহ) যা করেন সে বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা যাবে না; বরং তাদেরকে প্রশ্ন করা হবে।
(আম্বিয়া : ২৩)
৮. কোন অপরাধের দায় থেকে বাঁচার জন্য তাকদিরকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো জায়েজ নয়।
৯. তাকদির সম্পর্কে বিতর্ক করা নিষেধ। রাসুল (সা.) তাকদির সম্পর্কে বিতর্ক করতে প্রচণ্ড রাগান্বিত হতেন।
১০. তাকদির সম্পর্কে চূড়ান্ত কথা হল এটা আল্লাহ তাআলার এমন জটিল রহস্যময় বিষয়; যার প্রকৃত স্বরূপ উদঘাটন করা মানব মেধার পক্ষে সম্ভব নয় এবং তা উদঘাটনের চেষ্টা করাও নিষিদ্ধ।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সহিহ আকিদা জেনে তার উপর আজীবন অটল থাকার তাওফিক দান করুন, আমিন!
(“ইসলামী আকীদা ও ভ্রান্ত মতবাদ” অবলম্বনে)

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: