আত্মশুদ্ধি

মৃত্যুশয্যার এক হৃদয়গ্রাহী উপাখ্যান | হামিদ সরফরাজ

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

জুনাইদ জামশেদ। পাকিস্তানের পপ-তারকাদের অন্যতম। জীবনের একটি বড় অংশ যাঁর বিপথে কেটেছে। পরে তার উপর আল্লাহর সুদৃষ্টি পড়েছে। ফলে তাবলীগ জামাতের উছিলায় হিদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছেন। অন্ধকার দূরীভূত হয়েছে তাঁর জীবন থেকে; আল্লাহর অনুগ্রহে আলোর ফোয়ারা কুলকুল করে বইতে শুরু করল তাঁর ছন্নছাড়া জীবনে। ফিরে পেয়েছেন সরল পথের দিশা; একমাত্র মুক্তির পথ সিরাতুল মুসতাকিম। চিত্রাল থেকে ইসলামাবাদে যাওয়ার পথে বিমান দুর্ঘটনায় ইন্তেকাল করেন তিনি। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদৌসের উচ্চ মকাম দান করুন।

দ্বীনের পথে ফিরার পর জাস্টিস আল্লামা তকি উসমানী হাফিজাহুল্লাহর তত্ত্বাবধানে থেকে নিজের আল্লাহ প্রদত্ত প্রতিভা মোহনীয় সুরকে ইসলামের কাজে ব্যবহার করেছেন। বহু ইসলামিক সংগীত গেয়েছেন। পাকিস্তানে ইসলামিক সিঙ্গারদের শীর্ষে জুনাইদ জামশেদের নাম। উলামায়ে কেরামের অধীনে থেকে ইসলাম সম্পর্কিত গবেষণা শুরু করেছিলেন। একপর্যায়ে তাবলীগের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন। দৈনন্দিন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বিভিন্ন জায়গায় নসীহামূলক পোগ্রাম করতেন। এমনিই এক পোগ্রামে নিজের মমতাময়ী মায়ের মৃত্যুর মর্মস্পর্শী ঘটনা শিক্ষা গ্রহণের জন্য উপস্থিত মানুষের সামনে হৃদয়গ্রাহী বয়ানে তিনি ব্যক্ত করেন।

তিনি বলেন, দুনিয়ার সকল মুসলিম নারী যেন আমার মায়ের মতো মৃত্যু পায়–আমি এ কামনা করি। এমন মৃত্যুর অধিকারী মায়ের সন্তান হিসেবে আমি গর্ববোধ ও আল্লাহর নিকট শুকরিয়া জ্ঞাপন করি। তো আমার মমতাময়ী মা অন্য দশটি মায়ের মতো সাংসারিক কাজ করতে করতে জীবনের সাথে যুদ্ধ করে জীবন সায়াহ্নে উপনীত। জীবনযুদ্ধের বয়োবৃদ্ধ এক বীরাঙ্গনা তখন। বয়সের ভারে নুব্জ্য। শয্যাশায়ী প্রায়।

একদিনের ঘটনা। মায়ের অবস্থা খারাপের দিকে অবনতি হতে লাগল। আমি তখন আল্লাহর রাস্তায়, দ্বীনের কাজে ব্যস্ত ছিলাম। ভাইয়া ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তড়িঘড়ি আমাকে ফোন দিল। বলল, ভাইয়া! আম্মার অবস্থা ভালো না। আপনি তাড়াতাড়ি চলে আসুন। আমি আম্মাকে ফোন দিলাম। সালাম শেষে জিজ্ঞেস করলাম আসবো কি না।

আম্মা দৃঢ়চিত্তে গম্ভীর স্বরে বললেন, “না বাবা, তুমি এসো না। আল্লাহর রাস্তায় থাকো। আমার কিচ্ছু হবে না। তুমি ফিরে দেখবে আমি জীবিত ও সম্পূর্ণ সুস্থ আছি। যদি মরেও যাই তাহলে আল্লাহর কাছে এ বলে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারব যে, হে আল্লাহ! মৃত্যুর সময় আমার এক ছেলে তোমার রাস্তায় দ্বীনের কাজে নিয়োজিত ছিল”। আল্লাহু আকবর! আম্মার এমন দৃঢ় বিশ্বাস ও ইমান জাগানিয়া কথা শুনে আমার মন তখন প্রশান্তিতে ভরে গিয়েছিল।

চল্লিশ দিন পর বাড়ি ফিরে দেখি আম্মা জীবিত ও সুস্থ আছেন। আলহামদুলিল্লাহ। অনেকদিন পর আসার কারণে মায়ের প্রতি সাধারণের চেয়ে আলাদা একটা টান অনুভব করলাম। বাড়িতে থেকে আম্মার বিভিন্ন সুবিধা অসুবিধা খেয়াল করছিলাম। কিছুদিন পর মারকাজ থেকে ফোন আসল, গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পোগ্রাম আছে। আপনার কোনো অসুবিধা না থাকলে আসলে ভালো হয়। আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম, যাবো কি না। আম্মা একবাক্যে বললেন, কেন নয়? অবশ্যই যাবে বেটা। দ্বীনের কাজে পিছিয়ে পড়তে নেই। আমি আচ্ছা বলে পোগ্রামে চলে আসলাম।

একদিন ফজরের নামাজের পর আমার বয়ান ছিল। বোনকে বলে রেখেছিলাম, কোনো কিছু হলে আমাকে যেন তৎক্ষনাৎ জানানো হয়। খোদার ফায়সালা। ঐদিন আমার মোবাইল কোনো কারণে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ব্যাটারির চার্জ শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল হয়তো। আমার মোবাইল বন্ধ পেয়ে বোন মারকাজের আমীর সাহেবের কাছে কল করেছে। আমি যখন বয়ান শেষ করে এশরাক পড়ার জন্য জায়নামাজে দাঁড়াচ্ছিলাম, পিছন থেকে একজন বললেন, ভাই সাব! আল্লাহ আপনাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত করুক। আপনার আম্মা আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়েছেন।

আমি নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করলাম। দুই চোখ বেয়ে আমার অজান্তে নিরবে অশ্রুধারা প্রবাহিত হলো। দুনিয়ার যেকোনো সন্তানের জন্য মায়ের মৃত্যু সংবাদের ধাক্কা সামলানো কঠিন। আমার মনে হয় না মায়ের মৃত্যুর সংবাদে কোনো পাষাণের হৃদয়ও গলে না। যতবড় পাষাণ হৃদয়ের হোক না কেন, মায়ের মৃত্যু সংবাদে সে দুমড়ে মুচড়ে পড়বে এবং এটাই স্বাভাবিক। আমিও সামলাতে পারিনি। বাচ্চা ছেলের মতো কিছুক্ষণ পর ডুকরে কেঁদে উঠেছিলাম সেদিন। কেঁদেছিল উপস্থিত জনতাও।

পরে বোনকে কল দিয়ে ভাঙা দিলে নিরস স্বরে জিজ্ঞেস করলাম। কখন কীভাবে হয়েছে। বোন বলল, ফজরের আগে সুবহে সাদিকের সময় আম্মাজান মৃত্যু বরণ করেন। রাত দুইটার দিকে একটু অস্থিরতা বোধ করলে ভাবিজীকে (মানে আমার সহধর্মিণীকে) ডাকলেন। বললেন, বউমা! তোমাকে আমি নিজের মেয়ের মতই দেখেছি আজীবন। তাই তোমার কোনো কিছু অসংগতি মনে হলে নিজের মেয়ের মনে করে শালীন ভাষায় শুধরে দিয়েছি। আমার অজান্তে তোমাকে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকলে আমাকে দয়া করে ক্ষমা করে দিও। আমার সহধর্মিণী বলল, এ কি বলছেন আম্মাজান! আমার মনে ঘুনাক্ষরেও এধরণের চিন্তা আসেনি। আল্লাহ আপনাকে সুস্থ করে তুলুন। আপনি দুর্বল। রাত অনেক হয়েছে, ঘুমিয়ে পড়ুন।

তিনি নাকচ করলেন। আমার বোনকে ডেকে বললেন, আমার বোধহয় যাবার সময় হয়ে এসেছে। তুমি ইয়াসিন সুরা তিলাওয়াত করো। আমার বোন সুরা ইয়াসিন শেষ করলে বলে উঠেন, সুরা আর-রহমান তিলাওয়াত করো। বোন তাই করতে লাগল। এক পর্যায়ে বললেন, “আরে দেখো দেখো, কেতনি হুব সুরত আওরাত হে। ওয়াহ হাঁমে লেনে আয়া হে—আরে দেখো দেখো, কী সুন্দর কতগুলো মেয়ে এসেছে। ওরা আমাকে নেওয়ার জন্য এসেছে”। বোন বলল, আম্মা এখানে তো ভাবিজী ছাড়া কেউ নেই। আপনি কাকে দেখছেন? তখন আম্মা বললেন, আরে ওদিকে দেখো, ওর পিছনে আরো অনেক মেয়ে দেখছি!

বোন বুঝতে পারল আম্মাজানের যাওয়ার সময় একেবারে ঘনিয়ে এসেছে। তাই বলল, আম্মাজান আপনি দয়া করে কালিমা পড়ুন। তখন আম্মা বললেন, আগে তোমার আব্বুকে ডাকো। আব্বু আসলেন। আম্মা বললেন, আপনাকে সারাজীবন সম্মান ও শ্রদ্ধার আসনে রাখার চেষ্টা করেছি আমি। এতে কখনও এতটুকু ইচ্ছে করে ত্রুটি করিনি আমার জানামতে। যদি অজ্ঞাতসারে কোনো ভুলচুক হয়ে থাকে মাফ করে দিয়েন–বলার পর গরগর করে কালিমা পড়ে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। সুবহানাল্লাহ! আম্মাজানের এমন মৃত্যুর স্মরণ আমার অন্তরে প্রশান্তি বয়ে আনে। এমন মৃত্যুর জন্য সেজদায় লুটে পড়ে প্রভুর দরবারে আরজি করি প্রতিনিয়ত। আল্লাহ প্রত্যেক নর-নারীকে এমন মৃত্যুর সৌভাগ্য দান করুন। আমীন।

(জুনাইদ জামশেদের এক ভিডিও ক্লিপ অবলম্বনে।)

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: