ইতিহাস

সাম্রাজ্যের মুকুট | ওবায়েদ আহমাদ

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

ঘটনার শুরু :

১৯১৩ সনের ২৩ ই জানুয়ারী। তুর্কী মন্ত্রিসভার এক জরুরী বৈঠক আহবান করা হয়েছে দলমাবাচ প্রাসাদে। একে একে তুর্কী মন্ত্রীগণ অনুষ্ঠানস্থলে এসে সমবেত হয়েছেন। আজকের অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক বর্ষীয়ান তুর্কী রাজনীতিবিদ কামাল পাশা। শুরুতেই ইউরোপিয়ান শাসকবর্গের প্রশংসায় কাসিদা পাঠ করা হলো। সেমিনারের সভাপত্বিত করার জন্য গাজী মাহমুদ শওকতকে অনুরোধ জানানো হলো। হঠাত গিলিপলি থেকে আঞ্জুমানে এত্তেহাদ ওয়া তারাক্কীর তরফ থেকে সকাল সাতটায় একটি তারাবার্তা এলো, খবরদার! ঐ চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করলে পরিণতি ভালো হবে না!

সকাল ১১ টা। কামাল পাশা তারাবার্তার হুমকি উপেক্ষা করে ‘‘চুক্তিপত্র স্বাক্ষর অনুষ্ঠান” চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এসময় সেনাকমান্ডার তালাত পাশা প্রধানমন্ত্রীর সাথে একান্ত সাক্ষাতে মিলিত হলেন এবং চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর না করার অনুরোধ করলেন। কামাল পাশা অনুরোধ উপেক্ষা করলেন। তালাত পাশা ফিরে যাওয়ার সময় বলে গেলেন, এই গোয়ার্তুমির জন্য আপনাকে চরম মূল্য দিতে হবে।

মধ্যদুপুর। ৮০ জন প্রাশাসনিক তুর্কী নেতৃবৃন্দ দলমাবাচ প্রাসাদে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার জন্য সমবেত হলেন। হঠাত করেই প্রাসাদের পিছন থেকে গোলাগুলির আওয়াজ শোনা গেলো। মন্ত্রিপরিষদের সদস্য লতিফ বেগ ও সেনা কমান্ডার নাযেম পাশা নিহত হলেন। তুর্কী মন্ত্রণায়ের সদর দফতর দলমাবাচ প্রাসাদে প্রচন্ড হট্টগোল শুরু হলো। পিস্তল হাতে আনওয়ার বেগ মূল অধিবেশনস্থলে ঢুকে পড়লেন। কড়া গলায় উপস্থিতদের উদ্দেশ্য করে বললেন, খবরদার, তোমরা কেউ যদি গুলি চালাও, তোমাদের খুলি উড়িয়ে দেয়া হবে। তোমাদের সামনে দুটো রাস্তা আছে। হয় তোমরা আমাদের সাথে যুদ্ধ করবে নতুবা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিবে। কামাল পাশা ও মন্ত্রীপরিষদের অন্যান্য সদস্যগণ উপায়ন্তর না দেখে মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিলেন। তাদেরকে নজরবন্দী করে রাখা হলো।

আনওয়ার বেগ মাহমুদ পাশাকে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণ করে উসমানীয় সাম্রাজ্যের বাদশাহ ৫ম মুহাম্মাদের দরবারে হাযির হয়ে নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠন করলেন। প্রধানমন্ত্রী হলেন শওকত পাশা, পররাষ্টমন্ত্রী তালাত পাশা, যুদ্ধমন্ত্রী ইয্যত পাশা এবং কন্সটান্টিনের গভর্নর আনওয়ার পাশা।

ইউরোপ থেকে উড়ে আসা সেই চুক্তিপত্রটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করা হলো। কী লেখা ছিলো সেই চুক্তিপত্রে!! এটাকে কেন্দ্র করে এত উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হলো কেনো? চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করলে এমন কিই বা হতো? চুক্তিপত্রের ভাষা বুঝতে আমরা একটু পেছন দিকে ফিরে যাই।

নয়া সাম্রাজ্যের উত্থান :

সেলজুক সাম্রাজ্যের তরফ থেকে ১২৯৯ সনে আনাতোলিয়া নামে ছোট্ট এক রাজ্যের গর্ভনর নিযুক্ত হন উসমান। নগরের পর নগর জয় করতে থাকেন নবনিযুক্ত বীরদর্পী এই গর্ভনর। সেই থেকে শুরু। ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয় অঞ্চল। একে একে খিলাফতের আসনে সমাসীন হন ৩৭ জন সুলতান। উসমান পরবর্তী সুলতান উরখান উত্তর পশ্চিম আনাতোলিয়ার বুরসা অঞ্চল দখল করে সেখানে রাজধানী স্থানাস্তর করেন এবং ভেনিসিয়াদের কাছ থেকে সেলেনিকা ছিনিয়ে নেন। ৪র্থ উসমানী সুলতান ১ম মুরাদের সময় ছোট্ট রাজ্যটি পরিণত হয় বিশাল রাজ্যে।

আনাতোলিয়া (এশিয়া মাইনর) এর শক্তিশালী রাজ্য কারামানি বেয়লিক এবং ইউরোপে সার্ব, আলবেনীয়, বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়া, এড্রিনোপল ও হাঙ্গেরী সহ বলকানের বেশ কিছু অঞ্চল অর্ন্তভূক্ত হয়। ফলে বিস্তৃত রাজ্যটি পরিচালনায় আনাতোলিয়া (এশিয়া মাইনর) ও রুমেলিয়া (ইউরোপ অংশ) দুটি প্রদেশে সালতানাতকে ভাগ করা হয়। সম্রাট কনস্টানটিন উচ্চমূল্যের কর প্রদান করতে বাধ্য হন। ৫ম উসমানী সুলতান ১ম বায়োজীদ ইউরোপের মূর্তমান আতঙ্ক হিসেবে দেখা দিলেন। বজ্রপাতের মতো কাঁপিয়ে দিলেন গোটা ইউরোপকে। কসোভাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে সার্বিয়ান শক্তির কোমর ভেঙ্গে দিলেন। নিকোপলিস যুদ্ধ থামিয়ে দিলো খ্রিষ্টানদের সম্মিলিত ক্রুসেড শক্তিকে। দখল করে নিলেন বুলগেরিয়ার গোটা সাম্রাজ্য।

এই ফাঁকে বুলগেরিয়ার পার্শ্ববর্তী গ্রীস অঞ্চলও নিজের দখলে নিয়ে নেন প্রতাপশালী এই সুলতান। বায়োজিদের কঠোর অবরোধে হাঁপিয়ে উঠেন বাইজেনটাইন সম্রাট। ইতিহাসে তাই তিনি ইলদারাম (বজ্র) উপাধিতে ভূষিত হন।

তবে এ সময় আঙ্কারার যুদ্ধে তৈমুর লঙ্গের সাথে পরাজিত হয়ে কন্সটান্টিনোপল দখল করতে সুলতান ব্যর্থ হন। বায়েজিদের পুত্রগণের সিংহাসন নিয়ে গৃহবিবাদ শুরু হয়। বলিষ্ঠহাতে গৃহবিবাদ দমন করে কনিষ্ঠ পুত্র ৫ম উসমানী সুলতান ১ম মুহাম্মাদ খিলাফতের আসনে সমাসীন হন। গৃহবিবাদের ফলে হাতছাড়া হয়ে যায় সেলেনিকা, কসোভা ও মেসিডোনিয়া অঞ্চল। পরবর্তী ৬ষ্ঠ উসমানী সুলতান ২য় মুরাদের সময় হাতছাড়া হয়ে যাওয়া এলাকাগুলো পুনরুদ্ধার হয় এবং ঐতিহাসিক ভারনা ও ২য় কসোভা যুদ্ধে ক্রুসেড শক্তিকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করার মধ্য দিয়ে বলকান অঞ্চলের উপর সুলতান একক আধিপত্য বিস্তারে সক্ষম হন।

তারপর তিনি কন্সটান্টিনোপল অবরোধ করেন। অবরোধ চলাকালীন খ্রিষ্টানদের উসকানিতে সুলতানের ছোটোভাই মোস্তফা বিদ্রোহী হয়ে বুরসা অবরোধ করেন। ফলে বাধ্য হয়ে সুলতান অবরোধ প্রত্যাহার করে বুরসা পুনরুদ্ধার করেন এবং মুস্তফাকে মৃত্যুদন্ড দেন। ৭ম উসমানী সুলতান হিসেবে সালতানাতের মুকুট পরিধান করেন কনোস্টানটিনোপোল বিজেতা ২য় মুহাম্মাদ আল-ফাতেহ। ইউরোপ ও এশিয়া মহাদেশের মধ্যে স্থলযোগাযোগের জন্য কনস্টানটিনোপল দখল করা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হয়ে দেখা দেয়। সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ ১৪৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই এপ্রিল কনস্টানটিনোপল অবরোধ করেন এবং ২৯ ই মে টানা দেড়মাসের কঠোর অবরোধের পর দূর্ভেদ্য দুর্গটির পতন হয়। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষতাবণীর বিরল শিরোনামে সম্মানিত হন। তখন থেকেই এটার নামকরণ করা হয় ইস্তামবুল বা ইসলাম বুল (ইসলামের শহর) এবং রাজধানী এড্রিনোপল থেকে ইস্তামবুলে স্থানাস্তর করা হয়।

এ অঞ্চলটি জয় লাভ করার মধ্য দিয়ে এশিয়া ও ইউরোপেরে সাথে স্থলযোগাযোগ সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইউরোশিয়ায় সালতানাতের প্রভাব টিকিয়ে রাখার জন্য এ অঞ্চলটিকে রাজধানী বানানো অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার হয়ে দেখা দিয়েছিলো। উসমানের উত্তরাধিকারগণ নিরলস বিজয়াভিযান ধরে রাখতে সক্ষম হন। পরবর্তী সুলতান ২য় বায়োজীদের পুত্র সেলিম ৯ম সুলতান হিসেবে খিলাফতের আসনে সমাসীন হন এবং খলীফা উপাধি ধারণ করেন। তার শাসনামলে মিশরে তুর্কীদের শাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং তিনি লোহিত সাগরে নৌবাহিনী মোতায়েন করেন।

১০ম সুলতান ১ম সুলাইমান ইউরোপ অংশে বেলগ্রেড জয় করেন এবং হাঙ্গেরীদের পরাজিত করে হাঙ্গেরী রাজ্যের দক্ষিণ ও মধ্যভাগ দখল করে নেন। মোহাচের যুদ্ধে জয়লাভের পর হাঙ্গেরীর পশ্চিম অংশ ও ইউরোপের অধিকাংশ অঞ্চলের উপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। দুইবার ভিয়েনা অবরোধে ব্যর্থ হলেও ট্রান্সিলভানিয়া, ওয়ালিচিয়া ও মলডোভিনিয়া এলাকাগুলো দখলে সক্ষম হন এবং পারস্যের কাছ থেকে বাগদাদ ছিনিয়ে নেন। ফলে  ইরাকের ট্রাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস (দজলা ও ফোরাত) নদী ও পারস্য উপসাগরে নৌ-ট্রান্সপোর্টে উসমানীয়গণ নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।

১০ম সুলতান সুলাইমানের ইন্তেকালের মধ্যদিয়ে তুর্কীদের অগ্রযাত্রার ইতিহাস থেমে যায়। ইটালি, ফ্রান্স, রাশিয়া, যক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট ও জার্মান সহ বেশকিছু দেশ বাদে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপ পুরো ৩ মহাদেশজুড়ে এ সালতানের বিজয় অভিযান অব্যাহত ছিলো। সুর্দীঘ ৬২৫ বছর ধরে প্রতিষ্ঠিত এই বিশাল সালতানাত ইতিহাসে “উসমানী সাম্রাজ্য” হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

পাল্টা ধাওয়া :

সুলতান সুলাইমানের পরবর্তী সুলতানগণ বিজয়ের অগ্রযাত্রাকে ধরে রাখতে পারেননি। এসময় সুলতানদের সাথে বারোপন্থি শিয়া মতবাদধারী পারস্যের সাভাবীদের সাথে তুর্কীদের সংঘর্ষ শুরু হয়। ফলে অনেক প্রদেশ উসমানীয়দের হাতছাড়া হয়ে যায়। স্বার্থপরতা, দুর্নীতি, অসাধুতা ও কর্মদক্ষতার অভাবে কমজোর হতে থাকে উসমানী প্রশাসন। এ সময়গুলোতে তিন-চারজন সুলতান প্রতিরক্ষামূলক দেশ পরিচালনা করলেও ১৭০০ সালের পর থেকে ইউরোপিয়ানদের তরফ থেকে পাল্টা আক্রমণ শুরু হয় এবং তারা উসমানীয়দের উপর সামরিক প্রভাব বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়।

১৭১৭ সালে যুবরাজ ইউজেনের নেতৃত্বে অষ্ট্রিয়ান সেনাবাহিনী বেলগ্রেড দখল করে এবং তুর্কীরা সার্বিয়া, আলবেনিয়া অস্ট্রিয়াদের হাতে ছেড়ে দিয়ে বেলগ্রেড চুক্তি সম্পন্ন করে। মূলত তখন থেকেই একের পর এক ইউরোপিয়ান শাসকরা উসমানী সালতানাতের উপর হামলে পড়ে। ১৭৬৪ সনে ইউক্রেন রাশিয়ার মদদে উসমানী শাসনাধীন বাল্টায় প্রবেশ করে গণহত্যা চালায়। এদিকে ১৮০৪-১৮১৫ পর্যন্ত দীর্ঘ ১১ বছর ধরে চলা ফরাসি বিপ্লবের ফলে উসমানীয় সাম্রাজ্যাধীন গোটা বলকান অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বলকান অঞ্চল বলতে উসমানিদের ইউরোপীয় অংশ, যেখানে আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া, গ্রীস, সার্ভিয়া, রোমানিয়া সহ বেশ কিছু অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত এবং তারা স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার দাবি করে। বেশ কিছু অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠাও করে ফেলে।

এ সময় গ্রীস ফ্রান্স ও রাশিয়ার মদদে নিজেদের স্বাধীনতা দাবি করে এবং তুর্কী প্রশাসক কর্তৃক ধীকৃত হয়। ফলে তারা সাকের দ্বীপ সংলগ্ন সকল তুর্কী রণতরী ডুবিয়ে দেয়। প্রায় ৩ হাজার তুর্কীসেনা শাহাদাত বরণ করে। গ্রীসদের সহায়তায় একদিকে রাশিয়া এবং অন্যদিকে ফ্রান্স উসমানী সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করে। এতে তুর্কী সরকার বিপাকে পড়েন এবং বার্ষিক ৫লাখ স্বর্ণমুদ্রা ট্যাক্স দেয়ার শর্তে গ্রীস অধিবাসীদের স্বায়ত্তশাসন মেনে নেন। হঠাত মিশরে তুর্কী গর্ভনর মুহাম্মাদ আলী পাশা বিদ্রোহ করেন এবং রাশিয়ার মদদে তুর্কি ফৌজকে প্রতিহত করেন। ফলে মিশর, শাম, হালব সহ বেশ কিছু অঞ্চলে স্বায়ত্তশায়ন প্রতিষ্ঠা পায়। এসময় তুর্কী সালাতানাতের অভ্যন্তরীন উন্নতির দিকে তুর্কী সরকার মনোযোগী হন।

১৮৩৯ থেকে ১৮৭৬ পর্যন্ত এই সংস্কারধারা অব্যাহত ছিলো। ৩০তম উসমানীয় সুলতান ২য় মাহমুদ ও ৩১ তম সুলতান ২য় আব্দুল হামিদের মনে এই সংস্কার ধারণার জন্ম নেয়। বর্ষীয়ান নেতা মিদহাত পাশা এই সংস্কার আন্দোলন বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে একটি সংবিধান প্রনয়ণ করেন। তানযীম নামের এই সংস্কার আন্দোলনটি পাশ্চাত্য প্রভাবিত প্রজাতন্ত্রের মতবাদ থেকে সৃষ্ট হয়। ফলে খিলাফত ও প্রজাতন্ত্র একইভাবে চলতে থাকে।

এই সংস্কার আন্দোলনের রূপকার ছিলেন তরুণ আর্মি লেফটন্যান্ট মুস্তফা রশিদ পাশা। উসমানী সাম্রাজ্যের আধুনিকায়ন ও জাতীয়তাবাদের উত্থান ঠেকাতে মূলত এই সংস্কার আন্দোলনের সূচনা হয়। ১৮৩৯ সালে রোজ চেম্বার ঘোষনা করার মধ্য দিয়ে এই সংস্কার আন্দোলন বাস্তবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে এবং এর মাধ্যমে ইসলামী আইনকে সরিয়ে সার্বজনীন এক আইনের প্রবর্তন, দাসপ্রথা বিলুপ্তি, ডাকঘর প্রতিষ্ঠা, টেলিগ্রাফ, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও স্টক-এক্সেচেঞ্জের প্রচলন, জাতীয় পরিচয় পত্রের প্রবর্তন, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় পতাকার উত্তোলন সহ বহুমুখী সামাজিক উন্নয়নমূলক সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়। ১৮৭৬ সনে ইস্তাম্বুলের দলমাবাচ প্রসাদে সর্বপ্রথম দুইকক্ষ বিশিষ্ট (সিনেট ও চেম্বার অব ডেপুটি) পার্লামেন্ট প্রতিষ্ঠিত হয়। ৩৪তম উসমানী সুলতান ২য় আব্দুল হামিদ এই তানযীমকে বাতিল ঘোষণা করে পুনরায় একক খিলাফত ব্যবস্থা কায়েম করেন এবং আন্দোলনের বর্ষীয়ান নেতা মিদহাত পাশাকে হত্যা করেন।

ফলে সংস্কার আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ ক্ষুব্ধ হন। মিদাহাত পাশাকে হত্যার ফলে অভ্যন্তরীণ অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। সংস্কারপন্থীরা আর্মেনিয়া, বুলগেরিয়া সহ অন্যান্য অমুসলিম দেশগুলোর সমন্বয়ে প্যারিসে এক ঐক্যফ্রন্ট গড়ে তোলে। ১৯০৭ সনে ইয়াহুদী, আলবানী, আরমেনী ও বুলগেরীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে তুর্কী সংস্কারপন্থীদের এক আর্ন্তজাতিক সেমিনারের আয়োজন করে এবং নিম্নোক্ত বিষয়গুলোতে সকলে ঐক্যমত পোষণ করে-

১- সুলতানকে দেশান্তর করা হবে।

২- উসমানী সালতানাতের সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখতে হবে।

৩- মিদহাত পাশার সংবিধানকে পুনঃস্থাপন করতে হবে।

আর উক্ত ঐক্যফ্রন্টের নাম রাখা হয় আঞ্জুমানে এত্তেহাদ ওয়া তারাক্কী বা তরুণ তুর্কী বিপ্লব। ১৯০৮ সনে তরুণ তুর্কী বিপ্লব সংগঠনের গণআন্দোলনের মুখে ২য় আব্দুল হামিদ আত্মসমর্পণ করেন এবং তাকে দেশান্তর করা হয়। ফলে ২য় বারের মত মিদহাত পাশার সংবিধান দেশে চালু করা হয় এবং এটাকে আধুনিক তুরস্ক নির্মাণের সূচনা বলে মনে করা হয়। মূলত এই সংবিধান প্রণয়নের মধ্য দিয়ে উসমানী সাম্রাজ্যকে সেকুলার সাম্রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিলো। এ সময় রাশিয়ার কাছে শোচনীয়ভাবে পর্যদুস্থ হয় উসামানী সরকার।

বলকান লীগ তুর্কীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং এ যুদ্ধেও উসমানী সরকার শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। ফলে পূর্বে থ্রেস ও এড্রিনোপল ছাড়া ইউরোপের অবশিষ্ট অঞ্চলগুলো উসমানীয়দের হাতছাড়া হয়ে যায়। এসময় লন্ডন থেকে উড়ে আসে একটি চিঠি। চিঠিতে ইউরোপ অঞ্চল থেকে উসমানীয় কর্তৃত্ব সরিয়ে নেয়ার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানানো হয় এবং চুক্তিপত্র পাঠিয়ে তাতে মন্ত্রীদের স্বাক্ষর দিতে বলা হয়।

ঘটনার শেষ :

ততদিনে শুরু হয়ে গেলো ১ম বিশ্বযুদ্ধ। একদিকে কেন্দ্রিয় শক্তি (জার্মান-বুলগেরিয়া) আর অন্যদিকে মিত্রশক্তি (যক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট-ইতালি-ফ্রান্স-জাপান-রাশিয়া)। তুর্কিরা কেন্দ্রিয় শক্তির পক্ষ হয়ে লড়াই করলেন আর মিত্রশক্তির পক্ষ নিলো আরব জনগোষ্ঠি। এ সময় মক্কার শরীফ হুসাইন বিন আলী  ব্রিটিশ হাইকমিশনার হ্যানরি ম্যাকমোহনের সাথে এক গোপন চুক্তি সম্পন্ন করেন। চুক্তিটিতে উসমানী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরবদের মাঝে জাতীয়বাদের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ ছিলো। বিনিময়ে ব্রিটিশরা আরবদের স্বায়ত্তশাসনে সম্মতি দিবে।

১৯১৪ থেকে ১৯১৮ পর্যন্ত প্রায় চারবছরকাল যুদ্ধ চলার পর পরিস্থিতি যখন স্বাভাবিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হলো উসমানী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহ। আরববিদ্রোহের সুযোগে খিলাফত ব্যবস্থাকে চিরতরে মিটিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়ে মিত্রশক্তির দেশগুলো একটি চুক্তি সম্পন্ন করলো। চুক্তিতে আরবদের জাতীয়তাবাদের অকুণ্ঠ সমর্থন দিলেও আড়ালে তারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নিজেদের আধিপত্য কায়েমের লক্ষ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো একটি গোপন মিটিং করলো এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর শাসন নিজেদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা করে নিলো। আর সেই আধিপত্যকে জোরদার করতে ইসরাঈল রাষ্টকে স্থায়ী আবাসন ভূমি প্রদানের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে খঞ্জর বসিয়ে দিলো মিত্রশক্তির দেশগুলো। উসমানী সাম্রাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রায় ৪৯টি দেশে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করার অনুমোদন দিয়ে ব্রিটিশরা আরবদের মাথায় পরিয়ে দিলো সাম্রাজ্যের মুকুট।

তথ্যসূত্র : মুফতী যাইনূল আবিদীন সাজ্জাদ মিরাঠী রচিত খিলাফতে উসমানিয়া অবলম্বনে

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: