সুবর্নগ্রামের পথ ধরে | ইমরান রাইহান

subarno gram
মোগড়াপাড়া বাসস্টান্ড থেকে দরগাহবাড়ির রিকশায় উঠে মনে হলো ফিরে গেছি ৭০০ বছর আগের সুলতানী আমলে। আমি হেঁটে যাচ্ছি প্রাচীন বানার নদীর তীর ধরে। নদীতে ভাসছে সওদাগরের বজরা। ঘাটে অপেক্ষা করছে সারি সারি জাহাজ। এসব জাহাজে করে মসলিন পাঠানো হবে দূরের রাজ্যে। একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ইটালির নাগরিক ভারথেমা দেখছেন সে দৃশ্য।(১)
রোদের প্রখরতায় ভ্রু কুঁচকে গেল। চোখের পাতা নড়ে উঠতেই দেখলাম হারিয়ে গেছে সুলতানী আমলের দৃশ্য। রাস্তার পাশে বয়ে গেছে মৃতপ্রায় খাল। চওড়া খালটির বেশিরভাগই শুকিয়ে গেছে। সামান্য অংশে অল্প পানিতে ভাসছে কচুরিপনা। উজ্জ্বল রোদ গায়ে মেখে খালটি চলে গেছে দূরে, ব্রক্ষ্মপুত্রের দিকে। দুবছর আগে বর্ষাকালে যখন এদিকে এসেছিলাম তখন খালে ছিল ভরা যৌবন। বেশকিছু নৌকা চলতে দেখেছিলাম তখন।
দরগাহবাড়ির সামনে এসে রিকশা থেকে নেমে গেলাম। ছোট একটা বাজার পার হয়ে এগিয়ে গেলাম জালালুদ্দিন ফতেহ শাহর মসজিদের দিকে। বরাবরের মত জায়গাটা অদ্ভুত রকমের শান্ত ও নির্জন। এখানে একটা পুকুর আর খোলা জায়গা পাশাপাশি অবস্থান করছে। বড় দুয়েকটি গাছের নিচে সিমেন্টে বাঁধানো বসার জায়গা। শিশুরা খেলাধুলা করছে এসব চত্বরে বসে। ডানদিকে ক্ষয়ে যাওয়া দেয়াল নিয়ে নহবতখানা দাঁড়িয়ে আছে কাল পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে। বর্গাকৃতির ঘরটির চারপাশে রয়েছে পুরু দেয়াল। দেয়ালের বেশকিছু অংশ ক্ষয়ে গেছে, তবে এখনো এর দৃঢ়তা টের পাওয়া যায়। সুলতানী আমলে এই নহবতখানা থেকে মুসাফিরদের সন্ধান দেয়া হত সরাইখানার। যে পথিক আসতো দূর থেকে, সেই লখনৌতি কিংবা গৌড় থেকে দীর্ঘ সফরের ক্লান্তি যার চেহারাকে করে তুলতো মলিন, সে এখানে এসে সন্ধান পেত কোথায় আছে সরাইখানা। কোথায় জিরিয়ে নেয়া যায় একটি রাত।
মনটা উদাস হয়ে গেল। সামনে থেকে হারিয়ে গেল শিশুদের কোলাহল। মসজিদের পেছনে থাকা সুউচ্চ দালানগুলোও অদৃশ্য হয়ে গেল আচমকা। নহবতখানার ক্ষয়ে যাওয়া দেয়াল মেরামত হয়ে গেল চোখের সামনে। এখন সে দেয়ালে ভাসছে কারুকাজ। অদ্ভুত হলদে রঙ মেখেছে গায়ে। নহবতখানার সামনে ঝুলছে মখমলের পর্দা। ভেতরে শুনতে পাচ্ছি মানুষের কন্ঠ। আমি বসে আছি ঘোড়ার পিঠে। মনে কিছুটা দ্বিধা। দীর্ঘ সফরের ফলে শরির ক্লান্ত। আমার এখন বিশ্রামের জন্য কোনো সরাইখানা দরকার। আর তার সন্ধান দিতে পারে এই নহবতখানাই।
শিশুদের কোলাহলের শব্দে আমার ঘোর কেটে গেল। দেখি দাঁড়িয়ে আছি প্রাচীন সেই নহবতখানার সামনে। অদৃশ্য হয়েছে মখমলের পর্দা। ভগ্নদেয়ালগুলো যেন করুণ চেহারা নিয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। নহবতখানার পাশেই ইবরাহিম দানিশমান্দের কবর। ইবরাহিম দানিশমন্দ ছিলেন কাদেরিয়া তরিকার সুফি। তিনি এসেছিলেন পারস্য থেকে। সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের পুত্র সুলতান গিয়াসুদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৫৩৩-১৫৪০) শাসনামলে অথবা এর কিছুকাল পূর্বে তিনি বাংলায় আসেন। সুলতান মাহমুদ শাহের জ্যেষ্ঠ কন্যার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয় এবং তাঁকে দক্ষিণ শ্রীহট্টের অন্তর্গত তরফের শাসনকর্তা নিয়োগ করা হয়। ইবরাহিম দানিশমন্দকে মালিক-উল-উমারা (আমীরদের প্রধান) খেতাবে ভূষিত করা হয়। সুলতান তাঁকে সোনারগাঁয়ে লা-খারাজ (রাজস্বমুক্ত) ভূমি বন্দোবস্ত দান করেন। ফলে সামাজিকভাবে তিনি প্রভাব প্রতিপত্তি অর্জন করেন। বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত থেকে জানা যায়, সাইয়্যিদ দানিশমন্দ হোসেনশাহী বংশের পতনের (১৫৪০) পরও এবং সম্ভবত ষোড়শ শতকের ষাটের দশক পর্যন্ত তরফে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। এরপর তিনি সোনারগাঁয়ে এসে মোগরাপাড়ায় বর্তমান দরগাহবাড়ি স্থলে তাঁর খানকা প্রতিষ্ঠা করেন। সে সময় এ স্থান সাদিপুর বা নগর সাদিপুর নামে পরিচিত ছিল।
সাইয়্যিদ ইবরাহিম ইসলামী ধর্মতত্ত্ব এবং এর সকল শাখায় বিশেষত তাসাউফ বিষয়ে অসাধারণ পান্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। ধর্মতত্ত্ব, ইসলামী আইনবিধান, তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানে এবং একজন বহুমুখী বিদগ্ধ লেখক হিসেবে তিনি তাঁর প্রজ্ঞার জন্য ‘দানিশমন্দ নামে অভিহিত হন। তিনি ‘কুতবুল আশেকীন খেতাবেও ভূষিত হন। কাদেরিয়া তরিকার যেসকল সুফি দরবেশ বাংলায় সর্বপ্রথম এই সুফি তরিকার প্রচারকার্যে নিয়োজিত ছিলেন, ইবরাহিম দানিশমন্দ সম্ভবত ছিলেন তাদের অন্যতম। দরগাহবাড়িতে তাঁর প্রতিষ্ঠিত খানকা থেকে তিনি সুফি তরিকার প্রচার এবং ইসলামী বিষয় শিক্ষাদানের এক মহতী ঐতিহ্যের সূচনা করেন। পরবর্তী কয়েক শতাব্দীব্যাপী সেই ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক ছিলেন তাঁর বংশধর ও আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারীরা।(২)
ইবরাহিম দানিশমন্দের কবরটি কুটির আকৃতির চৌচালা গম্বুজাকার ছাদবিশিষ্ট একটি চতুর্ভুজাকৃতির ইমারত। বাইরে আরো কিছু প্রাচীন কবর আছে যাদের কোনো নাম পরিচয় দেয়া নেই। ইবরাহিম দানিশমন্দের কবরের পাশেই একটি প্রাচীন মসজিদ। সুলতান জালালুদ্দিন ফতেহ শাহর আমলে নির্মিত হয়েছে এই মসজিদ। মসজিদ ও ইবরাহিম দানিশমন্দের কবরের দেয়াল একেবারে লেগে আছে পাশাপাশি। মসজিদের কিছু অংশ সংস্কার করে আধুনিক স্থাপত্যরীতি নিয়ে আসা হয়েছে। সামনে রয়েছে প্রশস্ত পাকা চত্বর। শুক্রবারে লোকজন এখানে জুমার নামাজ আদায় করে।
মসজিদের পূর্ব পাশে একটি গোরস্থান। প্রাচীন কিছু কবরের সাথে এখানেই রয়েছে শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার কবর। সবুজ রঙ্গের পাকা কবরের উপর চড়ানো হয়েছে রঙ্গিন কাপড়। এসবই পরের লোকদের কারসাজি। শায়খের সাথে এসবের কোনো সম্পর্ক নেই। মাঈনুদ্দিন তাওহিদ ও আমি কবরস্থানে প্রবেশ করি। শুকনো পাতারা ঝরে পড়ে আছে কবরস্থানে। পায়ের নিচে দুয়েকটা পাতা পড়তেই মচমচ শব্দ হলো। গাছের ছায়া পুরো কবরস্থানকে করে রেখেছে শীতল। এখানে কোনো শব্দ নেই, জীবনের চিহ্ন নেই। তবে একটু দুরেই শিশুরা খেলছে, তাদের কোলাহল কানে আসছে। জীবন ও মৃত্যুর এই পাশাপাশি সহাবস্থানই জীবনের স্বাভাবিক রীতি।
শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার কবরের পাশে দাড়িয়েসুরা পাঠ করতে করতে মনে করে নেই শায়খ সম্পর্কে কী কী পড়েছি।
খ্রিস্টিয় ত্রয়োদশ শতাব্দি। তাতার ঝড়ে পর্যুদস্ত মুসলিম বিশ্ব। ঘুরী ও গজনীদের যুগের সমাপ্তি হয়েছে অনেক আগেই। তাতারদের হাতে পতন ঘটেছে খাওয়ারেজম সাম্রাজ্যের। ভারতবর্ষের সীমানায় বারবার আছড়ে পড়ছে তাতার ঝড়। দক্ষ হাতে সে ঝড় সামাল দিচ্ছেন দিল্লির মামলুক সুলতানরা। ক্ষয়িষ্ণু প্রায় আব্বাসি সাম্রাজ্যকে টেনে নিচ্ছেন যাহির ও মুস্তানসিরের মত নেককার খলিফারা। ওদিকে আইয়ুবী সুলতানরা সামলাচ্ছেন সিরিয়া ও মিসর। ক্রুসেডারদের আক্রমণ থেকে মুসলিম বিশ্বের পশ্চিম সীমান্ত রক্ষার কাজে ব্যস্ত তারা। আন্দালুসের মুসলমানরা হারিয়েছে নিজেদের ভূমির বড় অংশ। গ্রানাডা ও সেভিলকে সম্বল করে কোনো মতে টিকে আছে তারা।
সে সময় তাতার ঝড়ে বিপর্যস্ত বোখারা শহরে জন্মগ্রহণ করেন শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা। সাল তারিখ ইতিহাসে সংরক্ষিত নেই, অনুমান করাও কষ্ট। বড়জোর এটুকু বলা যায় ১২৪৫ সালের আগে জন্মেছেন তিনি। সেকালের নিয়মানুসারে খোরাসানের বিভিন্ন শহর ঘুরে ঘুরে ইলম অর্জন করেন তিনি। সময়টা ছিল অস্থির। তাতারদের আক্রমনে দুই দশক আগে নিহত হয়েছিলেন এসব এলাকার শীর্ষ আলেমদের বেশিরভাগ। মাদরাসা ও মকতবের বেশিরভাগ ধবংস করে ফেলেছে তাতাররা। মার্ভ আর সমরকন্দের বিখ্যাত পাঠাগারগুলোও হয়েছে লুন্ঠিত। শহরে নেই নিরাপত্তা, আছে শুধু শংকা ও ত্রাস। এই অস্থিরতার মধ্যেই শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা ঘুরে বেড়ালেন এক শহর থেকে অন্য শহরে। তাতার হামলার ফলে এসব শহরে জনসংখ্যা নেমে এসেছিল এক পঞ্চমাংশে। শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা খুঁজে খুঁজে বের করলেন জীবিত আলেমদের। বসলেন তাদের দরসে। যেভাবে পারলেন কুড়িয়ে নিলেন ইলমের মনিমুক্তো। মেধা ও পরিশ্রমের ফলে অল্পদিনেই তিনি আরোহন করলেন ইলমের শীর্ষে। দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়লো তার সুনাম। হাদিস ও ফিকহের পাশাপাশি রসায়ন শাস্ত্রেও ছিল তার পারদর্শিতা। একইসাথে তিনি জানতেন জাদুকরদের ভেলকিবাজির রহস্য। বিভিন্ন এলাকায় ইলম অর্জন শেষে ১২৬০ সালে দিল্লী এলেন শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা।
এর দুবছর আগে ১২৫৮ সালে তাতারদের হাতে পতন ঘটেছে আব্বাসি খিলাফাহর। লুন্ঠিত হয়েছে সভ্যতার রাজধানী বাগদাদ। নিহত হয়েছেন শেষ আব্বাসি খলিফা মুস্তাসিম। শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা যে বছর দিল্লী এলেন সে বছরও চলছে তাতার-মুসলিম দ্বন্দ্ব। ১২৬০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিনের আইন জালুত প্রান্তরে সুলতান সাইফুদ্দিন কুতুযের নেতৃত্বে মামলুক সেনারা মুখোমুখি হয় তাতার বাহিনীর। থেমে যায় অপরাজেয় বলে পরিচিত তাতারদের বিজয়রথ।
শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা যখন দিল্লী এলেন সে সময় ভারতবর্ষ শাসন করছেন সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ। তিনি ছিলেন খুব নেককার শাসক। তার জন্য শাসক হওয়ার চেয়ে সুফি দরবেশ হওয়াই বেশি মানানসই ছিল। শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা দিল্লি এসে দরস চালু করলেন। বিভিন্ন এলাকায় দরস দিতে থাকেন। ইলমের সন্ধানে তার কাছে ছুটে আসতে থাকে তালিবুল ইলমরা। দিনে দিনে বাড়তে থাকে তার সুনাম ও সুখ্যাতি। ১২৬৬ সালে সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ ইন্তেকাল করলে মসনদে বসেন সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবন। মসনদে বসার পর থেকে গিয়াসুদ্দিন বলবন লক্ষ্য করছিলেন শায়খ শরফুদ্দিনের জনপ্রিয়তা। তার প্রতি মানুষের আবেগ ও ভালোবাসা। শায়খের সমসাময়িক একজন জীবনিকার শাহ শোয়েবের বর্ননামতে, জ্ঞানীরা ধর্ম ও বিজ্ঞান সকল ক্ষেত্রেই তার পরামর্শ নিতেন। সাধারণ লোক থেকে শুরু করে আমির, উজির সবাই ছিলেন তার প্রতি অনুরক্ত। (৩)
শাসকের জন্য সবচেয়ে ভয়ের জায়গা হলো বিরোধিপক্ষের উত্থান। এই ভয়টিই পাচ্ছিলেন গিয়াসুদ্দিন বলবন। তবে তিনি কঠোর না হয়ে কাজ উদ্ধার করলেন কৌশলে। শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামাকে আদেশ দিলেন সোনারগাঁ গিয়ে দ্বীনের কাজ করতে। মানুষের মাঝে ইসলাম প্রচার করতে। শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা বুঝলেন সবই, কিন্তু তিনি কোনো উচ্চবাচ্য করলেন না। তিনি আদেশ মেনে নিয়ে দিল্লী ত্যাগ করে সোনারগাঁর পথ ধরেন। সময়টা সম্ভবত ১২৭৫ খ্রিস্টাব্দ।
সোনারগাঁ যাওয়ার পথে কিছুদিন বিহারের মানের শহরে অবস্থান করলেন শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা। এখানে তার সাথে দেখা করতে এলেন অনেকে। ধীর পায়ে দুরুদুরু বুকে এসেছিল এক কিশোরও। এই কিশোরের নাম শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরি। ইতিমধ্যে সে মাসাদিয়া ও মিফতাহুল লুগাত বইগুলো মুখস্থ করে সুনাম কুড়িয়েছে। এই কিশোরের জন্ম একটি ইলমি খান্দানে। তার পিতা ইয়াওইয়া মানেরিও বিহারের বিখ্যাত আলেম। তিনি পড়াশোনা করেছেন বাঙলার মহিসুনে (বর্তমানে নওগাঁ জেলার মহিসন্তোষ) অবস্থিত তকিউদ্দিন ইবনুল আরাবির মাদরাসায়। বাংলা থেকে ফিরে গিয়ে নিজের এলাকায় করছেন ইলমের খিদমত।
বালক শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরি বসলো শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার মজলিসে। তার মনে হলো ইলমের যে পিপাসা জেগেছে মনে তা মেটাতে পারেন শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা। কিন্তু শায়খ তো যাচ্ছেন বাংলায়, বিহারে তাকে পাওয়ার সুযোগ নেই। সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করলেন না শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরি। পরিবারকে জানিয়ে দিলেন শায়খের সাথে তিনিও যাবেন সোনারগাঁ। ইলমের দৌলত অর্জন করে ফিরে আসবেন বিহারে। পিতা হাসিমুখে দিলেন অনুমতি। শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামাও আপত্তি করলেন না, ইতিমধ্যে এই কিশোরের আদব আখলাক ও মেধা আকৃষ্ট করেছে তাকে।
গুরু-শিষ্য রওনা হলেন সোনারগাঁর দিকে। বিহার থেকে যাত্রা শুরু করে ভাগলপুর ও খলগাও দুপাশে রেখে তারা এগিয়ে চললেন তেলিয়াগড়ের রাস্তা ধরে। দক্ষিণে ৮০ মাইল বিস্তৃত রাজমহল পর্বতমালাকে পেছনে রেখে তারা প্রবেশ করেন বাঙলার সীমান্তে। দীর্ঘ সফর শেষে ১২৭৭ সালে সোনারগাঁ পৌছেন গুরু-শিষ্য। সে বছর দামেশকে ইন্তেকাল করলেন মামলুক সুলতান রুকনুদ্দিন বাইবার্স।
শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা সোনারগাঁ এসে একটি মাদরাসা ও খানকাহ নির্মাণ করেন। পরিবারের সদস্যদের বসবাসের জন্য নির্মাণ করেন ঘরবাড়ি। নানা দিক থেকে ছাত্ররা আসতে থাকে তার কাছে। অল্পদিনেই প্রচুর ছাত্রের সমাগম হয় এই মাদরাসায়। ১৩০০ খ্রিস্টাব্দে এখানেই ইন্তেকাল করেন শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা। মাদরাসা থেকে একটু দূরে জালালুদ্দিন ফতেহশাহর মসজিদের পাশে দাফন করা হয় তাকে।
শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার কবরের সামনে দাঁড়িয়ে মনে পড়ে যাওয়া ইতিহাসের স্মৃতিগুলো বেদনা জাগালো মনে। এখন যেখানে পাকা ঘরবাড়ি ও সরু রাস্তার আধিপত্য, এক সময় সেখানে ক্বলাল্লাহ ও ক্বলার রসুলের গুঞ্জনে মুখরিত থাকতো পরিবেশ। কল্পনার চোখে আমি দেখতে পাই, তইলাসান পরিহিত শিক্ষকরা হেঁটে যাচ্ছেন মাদরাসার দিকে। তাদের দেখে পথ থেকে সরে জায়গা করে দিচ্ছে ছাত্ররা। তাদের চেহারায় ভক্তি ও সম্ভ্রম।
শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার কবর জিয়ারত শেষে আমরা উনার মাদরাসার দিকে এগুতে থাকি। বড় বড় দালানকোঠার আড়ালে মাদরাসার একতলা ভবন হারিয়ে গেছে। চারপাশটা এত বেশি গিঞ্জি হয়ে উঠেছে প্রায়ই প্রাচীন এই স্থাপনা খুঁজে বের করতে কষ্ট হয়। কয়েকটি সরু গলি পার হয়ে আমরা যখন আবু তাওয়ামার মাদরাসার ভবনের সামনে এসে দাঁড়াই, তখন মাটিতে খেলা করছে আলোছায়া।
আবু তাওয়ামার মাদরাসার মূল ভবনটির দুই তৃতীয়াংশই ধ্বসে গেছে। এখনো মাটিতে উঠে থাকা ইটের অংশ দেখলে পুরো আকৃতি অনুমান করা যায়। বর্তমানে যে কাঠামোটি দাঁড়িয়ে আছে তা মাদরাসার মূল ভবনের এক তৃতিয়াংশ মাত্র। ভবনের উপরে একটি ভগ্নপ্রায় ছাদ যা পাকিস্তান আমলে মেরামত করা হয়েছে। এটিও বর্তমানে যে কোনো সময় ধবসে পড়ার অপেক্ষায় আছে। ভবনের তিন দিকের দেয়ালে রয়েছে কুলঙ্গি, সম্ভবত এগুলোতে বইপত্র রাখা হত তখন। প্রশস্ত ইটের দেয়াল ইমারতকে মজবুত করেছে, যা এখনো ভালোভাবেই টিকে আছে।
মাদরাসার ভবনের নিচে রয়েছে ভুগর্ভস্থ একটি কক্ষ। সিড়ি দিয়ে নামা যায় এখানে। এই কক্ষে বসে শায়খ শরফুদদ্দিন আবু তাওয়ামা ও তার শিষ্যরা জিকির-মোরাকাবা করতেন। কালের বিবর্তনে দীর্ঘ সময় পার হয়েছে কিন্তু এখনো এই কক্ষ বেশ ভালোভাবে টিকে আছে। আমরা সিড়ি বেয়ে নিচে নামি। মনে কিছুটা ভয় নিয়ে কক্ষের ভেতরে প্রবেশ করি। ৭ বছর আগে আমার এক বন্ধু শরফুদ্দিন সহ এখানে এসেছিলাম। তখন তাকে মজা করে বলেছি, তুমি এক শরফুদ্দিন এসেছ আরেক শরফুদ্দিনের মাদরাসায়।
শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার এই মাদরাসা ভবন আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। তবে এটি মেরামতে নেই কোনো উদ্যোগ। সে সময়ের ইতিহাস চর্চা নিয়েও আছে অনীহা।
আবু তাওয়ামার এই মাদরাসা ভবন কি তিনি নিজে নির্মাণ করেছিলেন নাকি কেউ তাকে নির্মাণ করে দিয়েছিল তা জানা যায় না। তবে একদিন এই কক্ষে বসেই ইলমচর্চা করতেন শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরি ও তার বন্ধুরা। পড়াশোনায় তিনি এতবেশি নিমগ্ন থাকতেন, তার বাড়ি থেকে যেসব পত্র আসতো সেসব কখনো খুলে দেখতেন না। সব পত্র তিনি এক পাশে রেখে দিতেন। তার আশংকা ছিল এসব পত্র পাঠের ফলে তার মনে অস্থিরতা তৈরী হবে, যা তার শিক্ষাজীবনের জন্য ক্ষতিকর। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি এসব পত্র খুলে খুলে পড়া শুরু করেন। তখন একটি পত্রে ফেলেন তার পিতার মৃত্যুসংবাদ জানানো হয়েছে তাকে।
শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া দীর্ঘ সময় কান্না করলেন। সময় মত পত্র না খোলায় তার পিতার মৃত্যুর সংবাদ তার জানা হয়নি। শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা জানতেন তার ছাত্রের ইলম পিপাসার কথা। তাই তাকে তিনি দিতেন বাড়তি সুবিধা। মাদরাসার নিয়ম ছিল সকল ছাত্র-শিক্ষক একসাথে বসে খানা খাবে। কিন্তু এই নিয়ম মানতেন না শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরি। তার মতে, একসাথে খেতে বসলে নানা কথা হবে, গল্পগুজব হবে, সময় নষ্ট হবে। ফলে তিনি খাবার খেতেন একা। তার এই কাজে কখনো বাধা দেননি শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা।
ছাত্রকে এতটাই পছন্দ করতেন শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা, এক পর্যায়ে নিজের মেয়েকেই তিনি তার কাছে বিবাহ দেন। ১২৯৩ সালে পড়ালেখা শেষে উস্তাদের কাছ থেকে বিদায় নেন শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরি। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি রওনা হন বিহারের পথে।
শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা তার এই মাদরাসায় ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি জাগতিক শিক্ষাও দিতেন। এই মাদরাসার ছাত্রদের শেখানো হত বিজ্ঞানের নানা শাখা। সে সময় শিক্ষার ক্ষেত্রে এই ধারা খুব স্বাভাবিক ছিল। স্বয়ং সুলতান জালালুদ্দিন ফতেহশাহ চিকিৎসাবিজ্ঞানে খুবই দক্ষ ছিলেন। চতুর্দশ শতকের বিশিষ্ট আমির শাহাবুদ্দিন তো চিকিৎসা শাস্ত্রে এতটাই দক্ষ হয়ে উঠেছিলেন তাকে চিকিৎসকদের গৌরব আখ্যা দেয়া হয়। সুলতানী আমলে এই অঞ্চলে রচিত কোনো ইতিহাসগ্রন্থ আমাদের সামনে না থাকায় হারিয়ে গেছে অনেক তথ্য। এখন নানা সুত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যকে জোড়া দিয়ে একটি চিত্র দাঁড় করানোর চেষ্টা করা ছাড়া উপায় নেই।
সুলতানী আমলে মাদরাসার শিক্ষকরা সুলতানদের পক্ষ থেকে পেতেন নির্দিষ্ট ভাতা। এই ভাতাকে বলা হতো মদদ-ই-মাআশ। মাদরাসার জন্য থাকতো ওয়াকফ কৃত জমির ব্যবস্থা। তকিউদ্দিন ইবনুল আরাবির মাদরাসার জন্য ওয়াকফ ছিল প্রায় ২৭০০ একর জমি। ফলে মাদরাসাগুলোর কোনো অভাব ছিল না। ছাত্র শিক্ষকরা নিজেদের নিশ্চিন্তে ব্যস্ত রাখতে পারতেন ইলমচর্চার কাজে।
গাছের ছায়ারা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। সুনশান নীরবতা নেমে এসেছে শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার মাদরাসার সামনে। মাদরাসা ভবন পেছনে রেখে আমরা হাঁটতে থাকি। আমাদের সঙ্গী হয় বিষণ্ণতা।
টীকা
১। ভারথেমা ছিলেন ইটালির বোলোনা শহরের অধিবাসী। তিনি ১৫০৩ থেকে ১৫০৮ সালের মধ্যে এশিয়ার বিভিন্ন এলাকা সফর করেন। সে সময় তিনি বাংলাদেশেও আসেন। ১৫১০ সালে তার ভ্রমনকাহিনী প্রকাশিত হয়। বিস্তারিত জানতে দেখুন, বাঙলার প্রাচীন রাজধানী সোনারগাঁর ইতিহাস, পৃ-৫৪- শেখ মাসুম কামাল। জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা।
২। বাংলাপিডিয়া।
৩। মানাকিবুল আসফিয়া, পৃ-২৬৪ – শাহ শোয়েব। (উর্দু সংস্করণ)। ফার্সি ভাষায় রচিত এই গ্রন্থটি মূলত ফেরদৌসি সিলসিলার সুফিদের জীবনি নিয়ে লেখা। এই গ্রন্থে শরফুদ্দিন ইয়াহইয়া মানেরির জীবনি আলোচনাকালে লেখক শায়খ শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামার জীবনিও আলোচনা করেছেন। শেখ শোয়েব ৮২৪ হিজরীতে ইন্তেকাল করেন।
(চলবে, ইনশাআল্লাহ)

Facebook Comments