আহমদ উসমান

আন্দালুসিয়ার গল্প | আহমাদ উসমান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr
স্পেন বিজয়।
২৮ রমজান, ৯২ হিজরি।

উমাইয়া খেলাফতের তখন স্বর্ণসময়। রাজধানী দামেশকের মসনদে উমাইয়া বংশের অন্যতম শাসক খলিফা আল-ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিক সমাসীন। খলিফা আল-ওয়ালিদের নিয়োগে উত্তর আফ্রিকার গভর্নর ছিলেন মুসলিম সেনাপতি মুসা বিন নুসাইর। মূসা বিন নুসাইর ছিলেন ইতিহাসের সাহসী এক মুসলিম বীর। যার ঘোড়া ছুটে বেড়িয়েছে সমগ্র উত্তর আফ্রিকা। তার নেতৃত্বেই মরক্কো পর্যন্ত আফ্রিকার বিশাল অঞ্চল দিগ্বিজয়ী মুসলিম বাহিনী দখল করেছে। আর মরক্কোর ওপাড়েই রয়েছে স্পেন।স্পেনই ছিল এসময় ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিতে মুসলিমদের জন্য উপযুক্ত এক ভূমি। কেননা স্পেনে তখন ছিলনা মানুষের কোন স্বাধীনতা, অধিকার ও মর্যাদা। খ্রীষ্টান শাসকরা প্রজাদের ওপর এহেন কোনো অত্যাচার নেই, যা প্রয়োগ করত না। ইহুদিসহ ভিন ধর্মাবলম্বীরা তো নির্যাতিত ছিলই, খোদ খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীরাও ছিল চরম নিষ্পেষণের শিকার। ভিতরগত জুলুম-নিপীড়ন ও অরাজকতার কারণে আন্দালুস বিজয় করা তখন ছিল সময়ের দাবি। আর মুসা বিন নুসায়েররও পরবর্তী আকাঙ্খা ছিল আন্দালুস বিজয়। যে আকাঙ্খা তার অসম বীরত্বেরই প্রতিক বহন করে।

এসময়ই সিউটার গভর্নর কাউন্ট জুলিয়ানের আমন্ত্রণ স্পেন যাত্রার পথ আরো সহজ করে দেয়। সিউটা ছিল মরক্কোর শেষ সীমায় অবস্থিত। ভূমধ্যসাগরের তীরের এই অঞ্চল শাসিত হতো স্পেন সাম্রাজ্যের অধিনে। মুসলিমদের বার কয়েক স্পেন যাত্রা প্রতিহত করা হয়েছিল এই শহর থেকেই। তৎকালীন স্পেনের প্রথা অনুসারে গভর্নর কাউন্ট জুলিয়ান তার মেয়ে ফ্লোরিন্ডাকে রাজকীয় চাল-চলন ও রীতিনীতি শিক্ষা করার জন্য রাজা রডারিকের রাজ দরবারে পাঠায়। পরমা সুন্দরী ফ্লোরিন্ডা রাজা রডারিক কর্তৃক ধর্ষিতা ও লাঞ্চিতা হয়। এই ঘটনার জের ধরেই জুলিয়ান ক্ষুব্ধ হয়ে উত্তর আফ্রিকার মুসলিম গভর্নর মূসা বিন নুসাইরকে স্পেন দখলের জন্য বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানায়।

এবার খলিফার কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে মুসা বিন নুসায়ের তারিফ বিন মালিকের নেতৃত্বে ক্ষুদ্র একদল মুসলিম সৈন্যকে স্পেনে প্রেরণ করেন। তারা সিমান্ত এলাকায় বেশকিছু সফল অভিযান পরিচালনা করে দ্রুত ফিরে আসে। স্পেনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করাই মূলত এ অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল। তারপর মুসা বিন নুসায়ের মূল অভিযানের জন্য একটি বাহিনী প্রস্তুত করলেন। যাদের নেতৃত্বের ভার তিনি তুলে দিয়েছিলেন তারিক বিন যিয়াদের উপর। তারির বিন যিয়াদ ছিলেন মুসা বিন নুসায়েরের গোলাম। তার বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে মুসা তাকে মুক্ত করে দেন। একপর্যায়ে মুসা বিন নুসায়েরের আস্থাভাজন সেনাপতিতে পরিণত হন।

যাইহোক ৭১১ খ্রিস্টাব্দের রমাদানের প্রথম দিকেই মরক্কো থেকে জাহাজে জিব্রাল্টার প্রণালি পার হন এবং জাবালে তারিকের পাদদেশে নোঙর করেন তারিক। সেখান থেকে তিনি স্পেনের মূল ভূখণ্ডের দিকে অগ্রসর হন। রণকৌশলের অংশ হিসেবে প্রথমে আশেপাশের এলাকাগুলো তিনি বিজয় করে ফেলেন। জাবালুত তারিকের নিকটবর্তী ছিল ‘জাযিরাতুল খাযরা বা সবুজ দ্বীপ’ এলাকাটি।

একটা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মুসলিমরা শহরটি দখল করে নেয়। পরাজিত সেনাপতি টুডমির সম্রাট রডারিকের কাছে বার্তা পাঠায়। রডারিক মোটেও বিচলিত হলেননা। আরেকটি বাহিনী প্রেরণ করলেন। তারাও শোচনীয়ভাবে পরাস্ত হলো মুসলিমদের হাতে। প্রাণে বেঁচে ফেরা কিছু সৈন্যদের মাধ্যমে রডারিক জানতে পারলো পরাজয়ের তিক্ত সংবাদ। এবার রডারিক নিজেই যুদ্ধযাত্রার ঘোষণা দিলেন। যুদ্ধপ্রস্তুতি নিয়ে খ্রিস্টান বাহিনী রাজধানী টলেড থেকে যাত্রা শুরু করলো।

অবশেষে ৯২ হিজরীর ২৮ রমাদানে সিদনিয়া শহরের নিকট ওয়াদি লাক্কার প্রান্তরে রাজা রডারিকের বাহিনীর বাহিনীর সম্মুখে এসে উপস্থিত হয় মুসলিমরা। যুদ্ধের প্রাক্কালে সেনাপতি তারিক বিন জিয়াদ রণোদীপ্ত ভাষণ দেন। যার শুরু হয়েছিল এভাবে, ‘হে আমার সহযোদ্ধারা! কোথায় পালাবে? তোমাদের পেছনে অথৈ জলরাশি আর সামনে শত্রুদল। ধৈর্যসহ সত্যের লড়াই করা ছাড়া তোমাদের আর কোনো পথ খোলা নেই।’

সেনাপতির ভাষণ মুসলিম বাহিনীকে দারুণভাবে উদ্দীপ্ত করে। এই যুদ্ধে মাত্র ১২ হাজারের মুসলিম বাহিনীর বিপরীতে লক্ষাধিক বাহিনীর নেতৃত্ব দেন রডারিক। একদিকে বার হাজার অন্যদিকে এক লক্ষ সৈন্যের বিশাল খ্রিস্টান বাহিনী। খ্রিস্টানদের চোখে-মুখে যেন দম্ভ ও অহমিকা ঠিকরে পড়ছিল।

কিন্তু কোনকিছুই মুসলিমদের সাহসিকতায় চির ধরাতে পারেনি। তারাও দ্যুতিময় বীরত্বের প্রহর গুনতে লাগলো। তারা ছিল ইমানের বলে বলিয়ান। তারা তো শুধু আল্লাহর উপর ভরসা করে তরবারি চালায়, তাদেরকে পৃথিবীর কোন শক্তি দুর্বল করে দিতে পারে? যারা বাহ্যিক উপায় উপকরণের উপর শুধু আল্লাহর নুসরতকেই প্রাধান্য দেয় তারা কি করে বিশাল সেনাবাহিনী দেখে পিছিয়ে পড়তে পারে?

আল্লাহু একবার ধ্বনি দিয়ে মাত্র বার হাজার সৈন্যের ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী অসম যুদ্ধে অবতীর্ণ হলো। টানা আটদিন এক রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর মুসলিমদের নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ সমাপ্ত হলো। পাহাড়সম অটলতা ও নির্ভেজাল ইমানের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের বিনিময়ে আল্লাহ মুসলিম বাহিনীকে গৌরবান্বিত এক বিজয় উপহার দিলেন। ওয়াদি লাক্কার প্রান্তরে তারিক বিন যিয়াদের নেতৃত্বে মুসলিমরা বীরত্বের এমন এক মহাকাব্য রচনা করলো যা মাশরিক থেকে মাগরিব, আন্দালুস ভূমিতে এর পূর্বে কেউ প্রত্যক্ষ করেনি। রাজা রডারিক পালিয়ে যেয়ে নদীতে ডুবে মারা যায়।

ওয়াদি লাক্কা যুদ্ধের বিজয় মুসলিম বাহিনীকে অপূর্ব মনোবল ও আত্নবিশ্বাস যোগায়। সৈন্য বাহিনীকে পুনরায় সুসজ্জিত করে অনধিকৃত অঞ্চলগুলো দখলের জন্য সেনাপতি তারিক বিন যিয়াদ অভিযান শুরু করেন। একে একে মালাগা, সেভিল, ইসিজ, মুরসিয়া ও কর্ডোভা বিজয় করে রাজধানী টলেডো পর্যন্ত বিজয় যাত্রা অব্যাহত থাকে। অত্যাচারী গথ রাজশক্তির পতন হয়ে রাজধানী টলেডোর প্রাসাদ শিখরে উড্ডিন হয় ইসলামী নিশান।

১৩ শতক পূর্বে রমাদানের এমন দিনে রচিত হয় ইতিহাসের এক নতুন গৌরবোজ্জ্বল সোনালী অধ্যায়। ইসলামের সফেদ উড্ডীন পতাকা সেদিন শোভা পায় পৃথিবীর পশ্চিম আকাশে। ইসলামি সালতানাতের সবুজ মানচিত্রে যোগ হয় ভূভাগের বিশাল এক খন্ড ভূমি। সাথে সাথে আন্দালুসের বুকে সূচিত হলো মহাবিজয়ের এক পূন্যযাত্রা। আগামী আটশো বছর গড়ে উঠবে যে কালজয়ী গর্বিত সভ্যতা, এই বিজয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হয় সেই মুবারক সফর।

বালাতুশ শুহাদার যুদ্ধ : খ্রিস্টানদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

যদি মুসলিম তরুণদের বালাতুশ শুহাদা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়, তাহলে দেখা যাবে অধিকাংশের চোখ কপালে উঠে গেছে। দুঃখজনক হলেও সত্যি মুসলিমরা বালাতুশ শুহাদার চেতনা ভুলে গিয়েছে, ভুলে গিয়েছে তারা তাদের বীর আব্দুর রহমান বিন আব্দুল্লাহ আল-গাফিকির পথ। কিন্তু খ্রিস্টানরা মোটেও তাদের বীরদের ভুলে যায়নি। ভুলে যায়নি চার্লস মার্টেলদের পথ। মুসলিমরা বালাতুশ শুহাদার ইতিহাস না জানলেও খ্রিস্টান সন্ত্রাসীরা তা ঠিকই জানে।

৯২ হিজরিতে ওয়াদি লাক্কার যুদ্ধে মুসলিমরা রডারিকের লক্ষাধিক বাহিনীর বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব বিজয় লাভ করে। এই যুদ্ধের কয়েক বছরের মাথায় সমগ্র আইবেরীয় উপদ্বীপ মুসলিমরা দখল করে নেয়। স্পেনের আকাশে শোভা পায় মুসলিমদের সফেদ উড্ডীন পতাকা। স্পেন দখলের পর মুসা বিন নুসায়েরের অভিপ্রায় ছিল ফ্রান্স পার করে রোম মাড়িয়ে পশ্চিম দিক দিয়ে কনস্টান্টিনোপল দখল করার মাধ্যমে রাসূলের (ﷺ) ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপ দেয়া।

কিন্তু ফ্রান্স অভিযানের যাত্রাপথেই খলিফার পক্ষ হতে নিষেধাজ্ঞা আসে। কারণ ইতিমধ্যেই উমাইয়াদের রাজ্য সীমা এতোই বিস্তৃত হয়েছিল যে, তা আরো বৃদ্ধি পেলে পুরো সাম্রাজ্য সঠিকভাবে শাসন করা সম্ভবপর হবে না। মুসা বিন নুসায়ের ও তারিক বিন যিয়াদের স্পেন ত্যাগের পর ইউরোপ পানে মুসলিমদের বিজয়রথ তখনকার মতো থমকে দাড়ায়।

দীর্ঘদিন বড় কোন অভিযান পরিচালিত হয়নি আর। শত্রুরাও পূর্ণোদ্দমে হামলা করার জন্য নিজেদের গুছিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো। এর মধ্যে স্পেনের মসনদে যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বের অভাব দেখা দিল। ফলস্বরূপ চতুর্দিকে বিশৃঙ্খলা, বিবাদ ও হানাহানি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ছড়িয়ে পড়ে। এই নাজুক সময় স্পেনের শাসনকার্যে নিযুক্ত হলেন ইসলামি ইতিহাসের অমিততেজা বীর আব্দুর রহমান বিন আব্দুল্লাহ আল গাফিকি।

আব্দুর রহমান আল-গাফিকি ১১২ হিজরিতে উমাইয়া খলিফা কর্তৃক স্পেনের গভর্নরের দায়িত্ব পান। বর্তমান ইয়ামানের লুহাইহা শহরের গাফিক গোত্রে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। এই গোত্রটি মিশর, মাগরিব বিজয়ে অনেক ভূমিকা রেখেছিল। আল-গাফিকি একজন অকুতোভয় সেনানায়ক হওয়ার পাশাপাশি ছিলেন একজন তাবেয়ি আলেম। জ্ঞানে, নেতৃত্বে ও সাহসিকতায় তার যৌবন মৌবন ছিল সুশোভিত। ৯৩ হিজরিতে মুসা বিন নুসায়েরের সাথে প্রথম তিনি স্পেনে প্রবেশ করেন।

গাফিকি ব্যক্তি, শাসক ও সেনাপতি সবদিক দিয়ে যোগ্য ছিলেন। মনের দিক দিয়েও তিনি ছিলেন উদার ও ন্যায়বিচারক। যেসব অসৎ কাজী কর্মরত ছিলো তাদের তিনি হটিয়ে দেন। বংশ-গোত্র বা ধর্মের কারণে যেন কোন অবিচার না হয় তা তিনি নজর রাখতেন।

স্পেনের দায়িত্বে আসার পর প্রথমে তিনি অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও গোত্রীয় বিদ্রোহ স্বহস্তে নির্মূল করলেন। তিনি পুরো স্পেনকে সংঘবদ্ধ করে বাহিনী নিয়ে ফ্রান্সের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। মুসা বিন নুসায়েরের মতো আল-গাফিকিও ছিলেন ফ্রান্স বিজয়ের অভিলাষী। তারও স্বপ্ন ছিল পশ্চিম পানে বিজয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করা।

১১৪ হিজরি সালে মুসলিম বাহিনী পিরেনিজ পর্বতমালা ডিঙিয়ে লোয়ার নদী অভিমুখে উত্তর দিকে এগিয়ে যায়। একে একে মুসলিমরা লোয়ার নদীর তীরবর্তী ফ্রান্সের বৃহৎ শহরগুলো দখল করে নেয়। গাফিকি আর্লস শহর পুণর্দখল করলেন কর প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে। রোন নদীর তীরে যুদ্ধ হল। এরপরে বর্দু শহর জয় করলেন তিনি।

একুইটেনের ডিউক অডো নদী পার হতে বাধা দিলে ডিউক অডোর সাথে গাফিকির তুমুল সংঘর্ষ বেধে যায়। এটি বোরদাউক্সের যুদ্ধ নামে ইতিহাসে পরিচিত। শোচনীয়ভাবে পরাজীত হন অডো। এভাবেই সমগ্র দক্ষিণ ফ্রান্স মুসলিমদের অধিকারে চলে আসে। ফ্রান্সের আকাশে উড্ডীন হয় তাওহীদি কেতন।

বরদাউক্সের যুদ্ধ থেকে কোন মতে পালিয়ে অডো বাদবাকি ডিউকদের নিয়ে ফ্রাঙ্কিশ সম্রাট চার্লসের দরবারে আশ্রয় নেন। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর ফ্রান্সই পশ্চিম ইউরোপে সত্যিকার শক্তি হিসাবে আত্মপ্রকাশ করছিল। অডোর থেকে খবর পেয়ে চার্লস গাফিকির বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিতে বিলম্ব করলো না। কারণ এটা ছিল খ্রিস্টান বিশ্বের অস্তিত্বের প্রশ্ন। পুরো ইউরোপ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করলো চার্লস। প্রস্তুতি সম্পন্ন করে খ্রিস্টানরা টুরস অভিমূখে অগ্রসর হয়।

এদিকে গাফিকির গোয়েন্দারা ফ্রাঙ্ক সেনাবাহিনী সম্পর্কে ভুল তথ্য প্রদান করে। ফলে মুসলমানরা নিশ্চিন্ত মনে বিপুল উৎসাহে লোয়ার নদী পার হতে চেষ্টা করছিল। তখনই চার্লসের পাহাড়সম বিশাল বাহিনী সামনে এসে হাজির। গাফিকি দ্রুত নদী তীর থেকে তার শিবিরে ফিরে এসে টুরস ও পয়টিয়ারসের মাঝে নতুন শিবির স্থান করলেন। স্থানটা মুসলিমদের জন্য সবদিক দিয়েই প্রতিকূল ছিল।

গাফিকি তার সৈন্যদের অবস্থা দেখে আরো চিন্তিত হলেন। তারা অভিযানে যে মালমাত্তা পেয়েছে, তা তাদের জন্য বোঝা হয়ে পড়েছে। গোত্রপ্রীতিতে তারা একে অন্যের উপর হয়ে পড়েছে ঈর্ষা কাতর। হালে ইসলাম গ্রহণ করলেও জাহেলি গোত্রীয়প্রীতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেনি।

চার্লসের সৈন্যরা ছিল কিছু ঘোড়সওয়ার কিছু পদাতিক। এদের শরীরে নেকড়ের পোশাক, ঘাড় পর্যন্ত জট। কালো চুল লম্বা হয়ে ঝুলছে। চার্লস লয়ার নদী পার হয়ে নদীকে পিছনে রেখে অবস্থান নিল।

অবশেষে ২ রমাদান, ১১৪ হিজরিতে পঞ্চাশ হাজার মুসলিম সৈন্য ও খ্রিষ্টানদের বিশাল চার লাখ সৈন্য দক্ষিন ফ্রান্সের টুরসের ময়দানে উপস্থিত হয়। রমাদানের প্রারম্ভেই উভয় বাহিনীর মধ্যে তুমুল রক্তক্ষয়ী এক লড়াই শুরু হয়ে যায়। চালর্স মার্টেলের বাহিনীর সাথে মুসলিম বাহিনীর প্রথম টানা এক সপ্তাহ সংঘর্ষ হয়। এতে দু’পক্ষই সমানভাবে এগিয়ে থাকে।

নবম দিনে তুমুল যুদ্ধ হলো। রাত্রির অন্ধকার নেমে এল। দু’পক্ষ পৃথক হয়ে গেল। পরদিন আবার যুদ্ধ শুরু হল। বিজয় ক্রমশ মুসলমানদের হাতের মুঠোতে আসছিল, গুরুত্বপূর্ণ এক বিজয়ের সম্মুখীন তখন একটা গুজব ছড়িয়ে পড়লো যে মুসলমানদের শিবির মালমাত্তা বিপদের মুখে। এতে দুর্বলচিত্তের একদল সৈন্য বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে, বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মুসলিম সৈন্যরা।

গাফিকি সেনাদের ভিতর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সব চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। কোনদিকে না তাকিয়ে গাফিকি একদল সৈনিক নিয়ে শত্রু বাহিনীর বূহ্য ভেদ করে বীরদর্পে যুদ্ধ করতে থাকেন। একপর্যায়ে হঠাৎ একটা বল্লম এসে আল-গাফিকির শরীরে বিদ্ধ হয়। ঘোড়া থেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তৎক্ষণাৎ শাহাদাৎ বরণ করেন তিনি। ইতিহাসে দেখা যায়, হাতেগোনা মুসলিম সেনাপতি যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হয়েছেন সেই হাতেগোনা শুহাদাদের মধ্যে আল-গাফিকি ছিলেন অন্যতম।

মুসলিম নেতার শহীদ হওয়াতে সেনাদলের মনোবল ভেঙ্গে যায়। এই সুযোগে বিশৃঙ্খল মুসলিম বাহিনীতে শত্রুরা বইয়ে দেয় রক্ত বন্যা। যুদ্ধের সকল নিয়মকানুন ভঙ্গ করে খ্রিষ্টানরা আহত মুসলিম সৈন্যদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। পরাজিত হয় মুসলিম বাহিনী। মরতে মরতে বেঁচে ফিরে খ্রিস্টান জগত। পরবর্তীতে ইতিহাসের অনেক মুসলিম সেনানায়ক ইউরোপ বিজয়ের ইচ্ছা করলেও কারো ভাগ্যেই সে গৌরব জুটেনি।

ইসলামি ইতিহাসে এই যুদ্ধ ‘বালাতুশ শুহাদা’ নামে পরিচিত। ‘শুহাদা’ শব্দটি ‘শহিদ’ শব্দের বহুবচন। এ যুদ্ধে মুসলমানদের এত লাশ পড়েছিল যে, এগুলোকে একত্রিত করলে একটি প্রাসাদ হয়ে যেত। তাই একে বালাতুশ শুহাদার যুদ্ধ বলা হয়। এই যুদ্ধে খ্রিস্টানরা পরাজিত হলে গোটা ইউরোপের ইতিহাসই পালটে যেত। ইউরোপের ইতিহাস রচিত হতো ভিন্ন আঙ্গিতে। আর বলাবাহুল্য ব্যাটল অব টুরস ছিল খ্রিস্টানদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

টুরসের যুদ্ধ সম্পর্কে ইউরোপীয় ঐতিহাসিক গিবন ও লেনপুল মন্তব্য করেন- “যদি মুসলিমরা ফরাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়লাভ করতো তাহলে প্যারিস ও লন্ডনে যেখানে গীর্জা রয়েছে সেখানে মসজিদ থাকত এবং অক্সফোর্ড ও অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনে বাইবেলের স্থলে কুরআন তিলাওয়াত শোনা যেত।”

সাকরু কুরাইশ:

মুসলিমদের স্পেন বিজয় শুধু ইউরোপ নয়, বিশ্বের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল অধ্যায়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামজিক ও ধর্মীয় জীবনে আনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এই বিপ্লব সমগ্র ইউরোপে সৃষ্টি করে অভিনব জাগরণ। যুগ যুগান্তরের ধর্মযাজক ও অভিজাত শ্রেণীর অন্যায় ও অত্যাচারের দীর্ঘ কাহিনীর পরিসমাপ্তি ঘটে। সত্য ও ন্যায়ের ছকে গড়ে উঠে নতুন সমাজ। শোষন বঞ্চনা ও জুলুমের অবসান হয়ে জনগণ পায় নিরাপত্তার নিশ্চয়তা আর স্ব-ধর্ম পালনের অধিকার। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও জনগণ নতুন জীবনের পথ আবিস্কার করে।

৭৫০ সালে যাবের যুদ্ধে আব্বাসীয়দের হাতে উমাইয়া রাজবংশের পতনের পরপরই স্পেনে গোলযোগ, বিবাদ, বিশৃঙ্খলা ও গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। অবশেষে আব্বাসীয়দের হত্যাযজ্ঞ থেকে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া উমাইয়া রাজবংশের যুবরাজ আব্দুর রহমান ইবনে মুয়ায়িয়া আল-উমাবী প্রায় পাঁচ বছরকাল নিতান্ত অসহায় অবিস্থায় ফিলিস্তিন, মিশর, উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন স্থানে আত্নগোপন করে সিউটায় গমন করেন। জীবনের এই প্রতিকুল সময়েও আব্দুর রহমান সিউটায় অবস্থানকালে স্পেনে একটি নতুন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করেন। এই স্বপ্ন তাকে চেপে বসেছে পিতামহ মাসলামার ইলহামি ভবিষ্যদ্বানী থেকে। ছোটকালে তাকে তিনি বলেছিলেন, তুমি বড় হয়ে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দেশ শাসন করবে। এ থেকেই জীবনে বড় হবার অদম্য উৎসাহ তাকে ছুটে বেড়াচ্ছিলো মানজিলের দিকে।

অবশেষে ১৩৮ হিজরী মোতাবেক ৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দে আব্দুর রহমান পুরো স্পেন বিজয় করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম করেন। সূচনা হয় হিস্পানীয় উমাইয়া সাম্রাজ্যের। আন্দালুসিয়ার ইতিহাসে আব্দুর রহমান আদ-দাখিল এক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। তিনি সমস্ত বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা দমন করে শতধা বিভক্ত স্পেনকে এক সূতোয় সংঘবদ্ধ করে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। তিনি মৃতপ্রায় আন্দালুসকে জীবন্ত করে তুলেন। সকল জুলুম দুরিভূত করে প্রতিষ্ঠা করেন ন্যায়বিচার। আন্দালুসে তাঁর দূরদর্শী ও চৌকশ পদক্ষেপে মুগ্ধ হয়ে খলিফা আবূ জাফর আল-মানসূর তাঁকে “সাকরু কুরাইশ” কুরাইশদের বাজপাখি উপাধিতে ভূষিত করেন। আদ দাখিল তাঁর শাসনের অধিকাংশ সময় বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত ছিলন। কখনো ইয়ামানী আরব কর্তৃক, কখনো বার্বার কর্তৃক, কখনো খ্রীষ্টান সম্প্রদায় কর্তৃক বিদ্রোহ দমনে থাকতে হতো সর্বদা ব্যতিব্যস্ত।

১৬১ হিজরি মোতাবেক ৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ঘটনা। তাঁর শাসনামলে সাম্রাজ্য সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয় এই বছর। এ বছর ফ্রান্স রাজা সেনাপতি শারলম্যান এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে আন্দালুস দখলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। তাকে প্ররোচিত করেছিল বার্সেলোনার প্রশাসক সুলাইমান ইবনে ইয়াকজান আল-কালবির নেতৃত্বে কিছু মুসলিম এবং অভিজাৎ খ্রীষ্টান সম্প্রদায়। সে যখন বার্সালোনা ও বেভারিয়া পদানত করে সারাগোসার দিকে অগ্রসর হয় তখন ওখানে আরবদের প্রবল প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়। প্রতিরোধ যুদ্ধ চলাকালে সে যে হিংস্রতার আশ্রয় নিয়েছিল তা বুঝার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, একদিনের ভেতরে সে সারাগোসার সাড়ে চার হাজার আরবকে হত্যা করেছিল।

কিন্তু শত বর্বরতার পরও সে আরবদের দমাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। শার্লেমান যখন তার বাহিনী নিয়ে পিরেনিজ পর্বতমালার গিরিপথ পাড়ি দিচ্ছিল তখন আদ দাখিল কর্তৃক জেনারেল হুসাইন বিন ইয়াহইয়া আন নাসিরি এগিয়ে আসলে প্রচণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে শার্লেমনবাহিনী মুসলিম বাহিনীর তরবারীর নিচে কচুকাটা পড়ে। তার বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য নিহত হয়। ময়দানের চতুর্দিকে খ্রিস্টান সৈন্যদের লাশের স্তুপ হয়ে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে সম্রাট শার্লেমন পালিয়ে নিজ জীবন রক্ষা করে। মৃত্যু শয্যায়ও শার্লেমন ওই পরাজয়ের ভয়াবহতা ভুলতে পারেনি। এরপর সে যতদিন বেঁচে ছিল স্পেনের দিকে চোখ তুলে তাকাবারও সাহস করতে পারেনি।

শাসক আবদুর রহমান আদ দাখিল ছিলেন বিদ্যানুরাগী ও জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রচারক। তিনি স্পেন জুড়ে তৈরি করেছিলেন অসংখ্য বিদ্যা নিকেতন। সেখানে গড়ে উঠেছিল শত শত সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। স্পেনীয়রা হয়ে উঠেছিল ইউরোপের জ্ঞান বিজ্ঞানের শিক্ষক। স্পেনে ইসলামী সভ্যতা, সংস্কৃতির উৎকর্ষতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে সীমাহীন উন্নতির যে ইতিহাস আমরা শুনে থাকি তা এই মহান নেতার হাত ধরেই হয়েছে। এ ব্যপারে ঐতিহাসিক ইবন খালদুন বলেন, নবম হতে একদশ শতাব্দি পর্যন্ত আন্দালুসিয়া যে বিশ্ব সভ্যতা ও সাংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হয়েছিল তার মূলে ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় প্রথম আব্দুর রহমানের পৃষ্পোষকতা। (তারিখে ইবনে খালদুন ৪/১২৫)

দীর্ঘ ৩৩ বছর আন্দালুস দক্ষতার সাথে রাজত্ব করার পর ৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান আব্দুর রহমান আদ-দাখিল (রাহিমাহুল্লাহ) মৃত্যুবরণ করেন। আদ-দাখিলের মৃত্যুর পর তার উত্তরসূরি যথাক্রমে প্রথম হিশাম (৭৮৮-৯৬) প্রথম হাকাম (৭৯৬-৮২২) দ্বিতীয় আব্দুর রহমান (৮২২-৫২) প্রথম মুহাম্মাদ (৮৫২-৮৫) দক্ষতার সাথে স্পেন শাসন করে যান। হিস্পানীয় মুসলিম সাম্রাজ্যকে রক্ষা করেন বহিঃশক্তির আক্রমণ থেকে।

আন-নাসির: স্পেনের স্বর্নযুগের বাহক।

বিশ্ব ও ইসলামের ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায় রচিত হয়েছিল মুসলিম স্পেনকে ঘিরে। মুসলিম স্পেন ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবজ্জ্বল সোনালী অধ্যায়ে প্রবেশ করে ১০ম শতকের শুরুর দিকে। মুসলমানরা তখন শতধা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। দলাদলি-হানাহানিতে লিপ্ত । তাদের পতন ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। শাসকদের অনিয়ম ও স্ববিরোধী নীতির ফলে স্পেনে অভ্যন্তরের অবস্থা তখন গোলযোগ, বিশৃঙ্খলা আর গৃহযুদ্ধে ও বহিঃশত্রুর আক্রমনে দেশের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে। দুর্বলরা জুলুমের শীকার হয় আর সর্বসাধারণের ছিলনা জানমালের কোন নিরাপত্তা।

জাতির এমন নাযুক পরিস্থিতিতে ক্ষমতা নিজ হাতে তুলে নিলেন আবদুর রাহমান আন-নাসির লী- দ্বীনিল্লাহ ( ৯১২-৯৬১ ঈসায়ী)। বদলে গেল দৃশ্যপট, উল্টে গেল আন্দালুসের গতিপথ। বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, প্রতিজ্ঞা, যুদ্ধের ময়দানে অসীম সাহসীকতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, অপূর্ব তেজস্বিতা ও নিরলস পরিশ্রম এবং অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর দুর্লভ ন্যায়পরায়নতা দ্বারা সমস্ত দুর্যোগ, জুলুম-অবিচার দূর করেন। তাকে ঐতিহাসিকরা স্পেনের ত্রানকর্তা বলে থাকেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় অসাধারণ দক্ষতা ও প্রতিভার কারণে রাজ্যের সকল শ্রেণীর লোক তার দিকে সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেন। তার সময়ে স্পেনে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনে, শিক্ষা, সাংস্কৃতি, কৃষি, শিল্প-বানিজ্য এবং স্থাপত্যশিল্পে এক নতুন আলোড়োন সৃষ্টি করে।

এই সময়ে শিক্ষা ও সাংস্কৃতির ক্ষেত্রে এক নবযুগের সূচনা হয়। আন-নাসির ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের উদার পৃষ্ঠপোষক। রাজ্যের সর্বত্র বিদ্যালয় ও পাঠাগার স্থাপন করেন। কুরতুবায় ছিলো সর্ববৃহৎ গ্রন্থাগার। এতে ছিলো ছয় লক্ষাধিক বই। রাজধানী কুরতুবায় নির্মিত হয় তৎকালের বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান কুরতুবা বিশ্ববিদ্যালয়। আব্বাসীয় সাম্রাজ্য, মিশর ও স্পেন ছাড়াও ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া হতে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান সাধনার জন্য এখানে ছুটে আসতো। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী আইনশাস্ত্র ব্যতীত গণিত, উদ্ভিদ শিক্ষা, ফলিত বিজ্ঞান, ইতিহাস ও দর্শনসহ জ্ঞানের সকল শাখায় শ্রেষ্ঠ পন্ডিতগণ দ্বারা চর্চা হতো। পুরো ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প চর্চা হয়ে কুরতুবা কেন্দ্রিক। এখানে বিভিন্ন শাস্ত্রের অভিজ্ঞ পন্ডীতদের অপূর্ব সমাবেশ ঘটায় কুরতুবাকে বলা হতো ‘পণ্ডিতপ্রসু’। আন-নাসির কর্ডোভা মসজিদকে সম্প্রসারিত করেছিলেন। সেটা পরিণত হয়েছিল সেকালের সর্ববৃহৎ মসজিদে।

এই মসজিদ স্পেনের মুসলমানদের দীর্ঘ সাতশ’ বছরের ইতিহাসের স্বাক্ষী৷ মসজিদটি শরয়ী আইন ও সালিসের কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহার করা হতো৷ এই মসজিদের বারন্দায় আল্লামা কুরতুবীর তাফসীর চলতো, ইয়াহইয়া বিন ইয়াহইয়া উন্দুলুসীর দরস হতো, ইবনে হাযাম যাহেরীর ফিকহী প্রবন্ধ পাঠ করা হতো এবং বাকি ইবনে মাখলাদের মতো ব্যক্তিত্ব এখানে বসেই ‘কালাল্লাহ’ এবং ‘কালার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন৷ কিন্তু ১২৩৬ সালে ক্যাসলের রাজা তৃতীয় ফার্ডিনান্দ ও রাণী ইসাবেলা মুসলমানদের নির্বিচারে হত্যা করে কর্ডোভা দখল করে নেয় আর মসজিদটিকে রোমান ক্যাথলিক গির্জায় রুপান্তরিত করে৷ আজো সেখানে ক্রুশ টানিয়ে রাখা হয়েছে৷ নামাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষেধ। এমনকি কেউ যেন রুকুও না করতে পারে, সেজন্য বিভিন্ন স্থানে সিকিরিউটি লোক রাখা হয়েছে৷ একজন সত্যিকার ও চিন্তাশীল মুসলমান মসজিদে কর্ডোভায় দাড়িয়ে না কেঁদে থাকতে পারে না৷

এছাড়াও আন-নাসিরের আমলে বিশ্বে প্রথম বারের মতো রাতের বেলা, রাস্তাগুলোতে আলোকায়নের ব্যবস্থা করা হয়। অথচ তারও সাতশো বছর পর লন্ডনের রাস্তায় আলোর বাতি জ্বলেনি। তার আমলে, ইউরোপে প্রথমবারের মতো উন্মুক্ত হাসপাতাল, উন্মুক্ত পাঠাগার, বিনামূল্যে চিকিৎসা, বিনমূল্যে শিক্ষার প্রথা চালু করা হয়। শুধু কুরতুবায় ছিল পঞ্চাশের উপর চিকিৎসাকেন্দ্র।

স্পেন পতন:

মুসলিমরা মুহাম্মাদে আরাবী (সাঃ)- এর আদর্শ বুকে নিয়ে এশিয়া আফ্রিকা পেরিয়ে ছুটে গিয়েছিল অন্ধকার ইউরোপে। জাবাল তারিক প্রণালী হতে পীরেনিজ পর্বতমালা অতিক্রম করে ফ্রান্স হয়ে সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে গিয়েছিল রেনেসার সাড়া জাগানো সওগাত। ভূমধ্যসাগরের উভয় সৈকতে শোভা পেলো মুসলিম সভ্যতার সফেদ উড্ডিন পতাকা। ইউরোপ রমনী নগরী কুরতুবা স্বগর্বে ঘোষনা দিল জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প, সভ্যতা তাহযীব তামাদ্দুন নিয়ে বিশ্বে সেই সেরা। তখনো প্যারিস কিংবা লন্ডনের রাজপথে জ্বলেনি আলোর বাতি। কিন্তু জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পে এতো উন্নতি সমৃদ্ধিশীল এই জাতির শেষ পরিণতি কেন এতো হৃদয়বিদারক হলো? কোন জিনিষ তাকে তিলে তিলে বিশ্ব সভ্যতা থেকে মুছে দিলো? কেন শুধু রয়ে গেল ইতিহাসের পাতায়!

মুসলিম আন্দালুসিয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে পতন হয় ১৪৯২ সালে। কিন্তু তারও বহু আগে তাদের পতন যাত্রা শুরু হয়েছিল। আন্দালুসে ‘ইমারাহ’ নামে শাসন শুরু করেছিলেন আবদুর রাহমান আদ-দাখিল, ৭৭৫ সাল। নানা চারাই উৎরাই পেরিয়ে আন্দালুসের স্বর্ণযুগের শেষ প্রতিনিধি আল-মানসুরের মৃত্যুর মাধ্যমে সেটা শেষ হয় ১০৩১ সালে। তারপর মুলুকুত তাওয়াইয়া নামে বহু সংখ্যক ছোট ছোট রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ১, ২ টা নয় ২২ টা খন্ড খন্ড রাজ্যে বিভক্ত হয়, এর ভিন্ন ভিন্ন নেতা ছিল। এরচেয়েও হৃদয় বিদারক হচ্ছে, কখনো তারা অপর পক্ষকে পরাজিত করতে খ্রিস্টান রাজাদের অর্থ সম্পদ দিয়ে কিংবা মুসলিম ভূমি ছেড়ে দিয়ে তাদের কাছ থেকে সাহায্য নিতো।

মুসলিমরা শত্রু-মিত্র পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। নিজেদের মধ্যে বিবাদের কোনো শেষ ছিল না। দীনি কেন্দ্রগুলো হয়ে উঠেছিল সমাজবিচ্ছিন্ন একেক দ্বীপ। ওলামারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে বিবাদ ও বিতর্কে চারদিক প্রকম্পিত করছিলেন, কিন্তু জাতীয় অস্তিত্বের বিরুদ্ধে কুণ্ডুলি পাঁকানো ষড়যন্ত্র সম্পর্কে ছিলেন বেখবর। সভ্যতার উৎকর্ষতা স্পেনের মুসলিমদের জিহাদী চেতনায় দীর্ঘদিন ঘরে বসিয়ে ও বেহুদা খেল-তামাশায় মরচে ধরে গিয়েছিল। অপরদিকে ইউরোপে নতুন চেতনাবোধ এবং মুসলিম-বিরোধী সংহতি আরো ধারালো হচ্ছিল। ফ্রান্স, লিয়ন ও ক্যাস্টাইলে শক্তিশালী শাসকের উত্থান ঘটে। তারা নিজেদের দূরত্ব কমিয়ে আন্দালুসিয়ার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয় । বিভক্ত ভেড়ার পালকে নেকড়ের শিকার করা সহজ। তেমনি খ্রিস্টানরা ঝাপিয়ে পড়ে বিভক্ত ভেড়ার পালের ন্যায় আন্দালুসের মুসলিমদের উপর। ভূমধ্যসাগরের একদিকে চলছে পবিত্র ভূমি দখলের লড়াই, অন্যদিকে চলছে আল-আন্দালুস থেকে মুসলিম শাসন উচ্ছেদ করার চেষ্টা।

১০৭৬ সালের দিকে স্পেনের টোলেডো শহর দখল করে নেয় ষষ্ঠ আলফোন্সো, একসময়ের ভিজিগথ রাজধানী ছিল এই শহর। পরবর্তী ১৫০ বছর আইবেরীয় উপদ্বীপের মানচিত্র একইরকম থাকে। অবশেষে ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে তৃতীয় ফার্নান্দো কর্ডোবা আর সেভিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করে নেন, অন্যদিকে আরাগনের প্রথম জায়ুম দখল করে নেন ভ্যালেন্সিয়া শহর।

যে আলফানসোকে অদুরদর্শী আমিরেরা নিজেদের গোত্রীয় লড়াইয়ে সাহায্যের জন্য কর দিয়ে আসছিল, যখন দেখতে পেল সেই পোষা সাপ দংশন শুরু করলো, পুরো স্পেন পতনের মুখে এবং বুঝতে পারলো নিজেদের রক্ষা করতে অক্ষম, তখন মাগরিব থেকে ইউসুফ বিন তাশফিনকে ডেকে আনে। মূলত ইউসুফ বিন তাশফিন স্পেনের সবকিছুই লক্ষ্য করছিলেন, স্পেনের মানুষের নিচু মানসিকতা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন কিন্তু তিনি কওমের বিপদের সময় বসে থাকার লোক ছিলেন না। তিনি সবকিছু ছেড়ে সাগর পাড়ি দিয়ে ছুটে আসেন স্পেনে। জাল্লাকার ময়দানে তার বাহিনী সম্রাট আলফানসোকে পরাজিত করে তখনাকার মতো আন্দালুসকে রক্ষা করে। তিনি চলে যাবার পর তায়েফি শাসকরা পূর্বের ন্যায় গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়। মুসলিমরা ব্যস্ত হয়ে যায় যার যার কাজে। অথচ ওইসময় ইউসুফ বিন তাশফিন না আসলে ১৪৯২ সাল পর্যন্ত ইসলামি স্পেনের ইতিহাস দীর্ঘ হতো না। শেষ পর্যন্ত তাদের সীমাহীন উদাসীনতার দরুন আল-আন্দালুসের শেষ রক্ষা আর হয়নি।

১৪৯২ সালের ২ জানুয়ারি। গ্রানাডা, স্পেনে মুসলিমদের হাতে থাকা সর্বশেষ শহর, কিন্তু দুর্ভাগা আবু আব্দুল্লাহর নিজ জাতি ও পিতা-চাচার সাথে গাদ্দারির ফলে শেষ রক্ষা পায়নি নিভু নিভু করতে থাকা গ্রানাডা। আব আব্দুল্লাহকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। নির্বাসনে যাত্রাকালে তিনি এক পাহাড়ের চূড়া হতে গ্রানাডার দৃশ্য দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন। তার মা তখন তাকে তিরস্কার করে বলেন, ‘যে শহর তুমি পুরুষের মত রক্ষা করতে পারোনি, তার জন্য নারীর মত কেঁদোনা।’

খ্রিস্টান সৈন্যরা সেদিন আলহামরা প্রাসাদ দখল করে এবং এর উপরে সম্মিলিত খ্রিস্টান শক্তির বিজয় পতাকা উড়িয়ে দেয়। এর মাধ্যমে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটিয়ে খ্রিস্টান শাসন প্রতিষ্ঠার বার্তা প্রদান করা হয়। সূর্যাস্ত হয় আন্দালুসিয়ার সাতশো বছরের ইসলামী শাসনের। সন্ধ্যা নামে আন্দালুসে। এই সন্ধ্যা ছিল মুসলিম উম্মাহর উপর সবচে ঘনকালো সন্ধ্যা। এ সন্ধ্যার পর হতাশার যে রাত এসেছিল, আজ অবধি এসেও সেখানে সূর্যোদয় হয়নি। জাতির ঘাড়ে চেপে বসে লাঞ্ছনার, লজ্জার, অসহায়ত্বের সিন্দাবাদীয় ভূত। বিতাড়িত হয়েছে মুসলিমরা আন্দালুস থেকে। আন্দালুসকে অপেক্ষার হাতে ছেড়ে পাড়ি জমায় মরক্কো, আলজেরিয়া। স্পেনের মাটির মায়ায় থেকে যাওয়াদের জন্য অপেক্ষা করছিল নিদারুন কষ্ট ও দুর্ভোগের দিন।

এমনই ছিল মুসলিম আন্দালুসিয়ার শেষ পরিণতি। এই চিত্র সাতশো বছর সগৌরবে ইউরোপে ইসলামি শাসনের শেষ পরিণতির। স্পেনে এখন নেই কোন হানাফি কিংবা মালেকি মাজহাবের অনুসারী, নেই দরবারে নিশ্চিন্তে বসে থাকা কোন পীর, অথবা দ্বীনের মৌলিক বিষয় ত্যাগ করে ফুরুই ইখতিলাফ নিয়ে বাহাস করার মতো নেই কোন আলেম। বহু জাতি আসবে, উত্থান-পতন ঘটবে কিন্তু স্পেনের এই দুর্ভাগা জাতির ভাগ্য যেন অন্যকোন জাতির না হয়। আমাদের সামনে উদাহরণ রয়েছে বাগদাদের করুণ কান্না, রয়েছে গ্রানাডার নির্মম পরিণতি, এরপরেও যদি নিজেদের মুক্তির জন্য পথ নির্ধারণ করতে না পারি তাহলে এরচেয়ে দূর্ভাগা জাতি আর কে?

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: