ফিতনার উপলব্ধিঃ প্রথম পর্ব । আবদুল্লাহ বিন বশির

ফিতনার উপলব্ধি

এক.

সময়টা ১৯২৬ সাল। সকালের মিহি হাওয়ায় বাড়ির আঙ্গিনায় বসে আসেন শাহ সাহেব কাশ্মীরী রহ.। তন্ময় হয়ে কি যেনো ভাবছেন। জীবনের এই সন্ধিক্ষণে কি এক পেরেশানি যেনো ভিতরটা তার কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে৷ বেশকিছুদিন যাবৎই শাহ সাহেবকে এমন দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ করে কিসের যেনো এক ভাবনায় হারিয়ে যান৷তখন উপরের অবয়ব থেকেই বুঝা যায় ভিতরের এক জ্বালায় তিনি পুড়ে যাচ্ছেন৷
জীবনের পুরোটা সময় কাটিয়ে দিয়েছেন হাদিসে নববীর খেদমতে। ‘ওয়াবিহি হাদ্দাসানা’ ও ‘ক্বলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’-র পঠন-পাঠনে নিজেকে উজার করে দিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন হাজারো যোগ্য ওয়ারেছে নবি আলেমে দ্বীন। তীক্ষ্ণ মেধা আর গভীর থেকে গভীর ইলমি জটিলতার সমধান দিয়ে শুধু উপমহাদেশেই নয় খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে পুরো জগত জুড়ে।
দুঃখময় সে ভাবনাগুলোর মাঝে হঠাৎ-ই এক আনন্দের ঝিলিক খেলে গেলো শাহ সাহেবের চেহারায়৷ যে ‘ক্বলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’-এ জীবন উৎসর্গ করেছেন কিছুদিন বাদে তার রওজায়ের আতহারের যিয়ারতে যাবেন। হাজার মাইল দূরে বসে হিন্দের এক ছোট্ট গ্রাম দেওবন্দে বসে ভালোবাসার সর্বোচ্চ প্রকাশ করে যার জন্য দরুদ ও সালাম পাঠাতেন, কদিন বাদেই তার রওজার সামনে দাঁড়িয়ে তা পড়বেন— ভাবতেই আনন্দের এক শিহরণ খেলো গেলো পুরো দেহ সত্ত্বায়৷ কিন্তু হাঠাৎ… হঠাৎ আবার নূয়ে পড়লেন সে দুঃখময় ভাবনায়৷ বিষয়টি মনে পড়তেই ভিতরটা যেনো ফেটে চৌচির হয়ে যেতে চায়।
আনওয়ার শাহ! তেইশ বছর শত কষ্ট আর অত্যাচারের পাহাড় সহ্য করে দ্বীনকে তোমাদের কাছে আমনত রেখে এসেছি, আর আজ আমার খতমে নবুওয়াতের চাদর টান দিয়ে সে দ্বীনকে তোমার দেশের এক লোক গোড়া থেকে উৎখাত করে দিতে চাচ্ছে তাদের রুখতে তুমি কি করেছো? কোন মুখে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছো?
যে প্রেমাষ্পদের বানী পড়ে আর পড়িয়ে জীবনের শেষলগ্নে পৌঁছালাম, যার রওজায় কিছুদিন বাদে সালাম পৌঁছাতে পারবো এই ভাবনায় খুশির দোলায় হারিয়ে যাই সেই তিনি যদি আমায় এই কথাগুলো জিজ্ঞাসা করে বসেন তখন কি উত্তর দিবো আমি? আছে কি কোনো উত্তর আমার? চোখের কোনায় উত্তপ্ত কিছু ফোটা পানির উপলব্ধি করলেন শাহ সাহেব কাশ্মিরী রহ.।

==========

দুই.

ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের কাদিয়ান গ্রামের বসবাস করে মির্যা বংশ৷ ইংরেজদের সাথে সু-সম্পর্ক ও ইংরেজদের তত্ত্বাবধানে সরকারি বিভিন্ন পদে চাকরি করে বলে এই বংশের একটি আলাদা পরিচয় আছে সকলের মাঝে। মির্যা গোলাম মর্তুজা বৃটিশ সরকারের একজন অনুগত আমলা৷ কিছুদিন পূর্বেই রিটায়ার্ড করেছেন৷ এককালিন সরকারি টাকা উত্তোলনের জন্যে ছেলে মির্যা গোলাম আহমেদকে পাঠিয়েছেন৷ কিন্তু পিতার টাকা বন্ধুদের পিছনে খরচ করে ভয়ে কলকাতা পালিয়ে যায় ছেলে গোলাম আহমেদ৷ ইংরেজদের নিমোখারামির বংশীয় পরিচয় থাকাতে কিভাবে যেনো শিয়ালকোটে মুখতিয়ারির চাকুরি জুটিয়ে নেয়। ১৮৬৪-৬৮ পর্যন্ত সেখানেই থাকে৷ এরপর গ্রামে ফিরে এসে একেরপর এক অদ্ভুত দাবি করতে থাকে মির্যা বংশের এই গোলাম আহমেদ।

মুসলিম উম্মাহের গৌরবময় বিধান জিহাদকে শেষ করার এক ঘৃণ্য মতলবকে বাস্তবায়িত করতে ১৯০১ সালের পর নবুওয়াত দাবি করে বসে মির্জা গোলাম আহমেদ ৷ দাবির কিছুদিমের মাথায় নিজ মালিক ইংরেজদের ইচ্ছাপুরনার্থে জিহাদের বিধানকে রহিত করার ঘোষণা করে৷ এরপর একান্ত সহচর হাকিম নুরুদ্দিনের ‘শয়িতানি’ মগজকে কাজে লাগিয়ে সৃষ্টি করে এক ধোঁকাপূর্ণ ধর্মের৷ যাতে দ্বীন সম্পর্কে বে-খবর শতশত মানুষ ইসলাম মনে করে কুফরে লিপ্ত হয়ে চিরস্থায়ী জাহান্নামের পথে পা বাড়িয়ে দেয়৷

বৃটিশদের সে শয়তানি কু-মতলব অর্জন না হলেও এই ফিতনাহ মুসলিম উম্মাহের জন্যে এমন এক ভয়াবহ ফিতনার রূপ লাভ করলো যা মির্যার মৃত্যুর পর থেকে নিয়ে আজঅব্দি মুসলিম উম্মাহকে ভোগাচ্ছে।

=========

তিন.

দারুল উলুম দেওবন্দ। উপমহাদেশে ইসলামকে বাঁচিয়ে রাখার মানসে উলামায়ে দ্বীনের এমন এক সৃষ্টি যা কাফেরদের শত কু-চক্রিকে ম্লান করে দিয়েছে৷

একটি প্রতিষ্ঠান দ্বীনের সঠিক চেতনা, ইলমে দ্বীনের খেদমত এবং বাতিলের সমস্ত শক্তিকে উপেক্ষা করে দ্বীনকে বিজয় করার জন্যে অল্প সময়ে এমন সব ব্যক্তিকে উপহার দিয়েছে যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল৷

এটাই সে অন্যতম কারণ উপমহাদেশে মুসলমানদের সবচেয়ে বড় আস্থার জায়গা দখল করে থাকার। দ্বীন থেকে দুনিয়া— জীবনের যেকোনো সমস্যার সমাধানের জন্যে মুসলিমরা ছুটে আসে দারুল উলুম প্রাঙ্গণে।

কিছুদিন থেকে নিয়মিত বিরত দিয়ে দারুল উলুমে খবর আসতে থাকে মির্যা গোলাম কাদিয়ানী নামক একলোকের নবুওয়াতের পক্ষে কিছু মানুষ কুরআন- হাদিসের দলিল দিয়ে যাচ্ছে!

পেরেশান হলো দারুল উলুমের উস্তাদগণ। সময় এখন শ্বেত সন্তাস ইংরেজদের বিরুদ্ধে সব কিছু উজাড় করে দিয়ে জানপ্রাণ লাগিয়ে লড়াই করার৷ এমন সময় এসকল ফিতনা নিয়ে মেধা ও শ্রম ব্যায় করা হলে তো সাদা ভাল্লুক ইংরেজগুলো উপকৃত হতে থাকবে৷ কিন্তু তারপরও তো কিছু করতে হবে ‘নবুওয়াতের দাবি’ তাও আবার কুরআন হাদিস থেকে, এটা তো কোনো সাধারণ কিছু নয়৷ ইমান- কুফরের সম্পর্ক!

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হলেন দারুল উলুমের ইলমী নক্ষত্র চলমান লাইব্রেরি শাইখুল হাদিস আনওয়ার কাশ্মীরী। পেরেশান হয়ে গেলেন তিনি। দ্রুত খোঁজ-খবর নেওয়া শুরু করলেন। ঘাটাঘাটি করলেন ওদের বইসমূহ।প্রখর মেধার এই মানুষটি গভির থেকে বুঝতে চাইলেন নব্য এই ফিতনার ভয়াবহতা ও গভিরতা৷ আৎকে উঠলেন তিনি। হতভম্ব হয়ে গেলেন৷ বুঝে ফেললেন— ভয়ংকর এই ফিতনাহটি মুসলিম উম্মাহকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করবে৷ কালবিলম্ব করলেননা। বিষয়টির সঠিক উপলব্ধি করে সকলের মাঝে ঘোষণা করলেন— ‘আহলে ইলমের মধ্য থেকে একদল এমন হতে হবে যারা কাদিয়ানিদের সমস্ত শয়তানি প্রপাগান্ডার জবাব দিবে৷ এবং সে সমস্ত ইলমে আলোচনাগুলো নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করে মানুষের কাছে একদম সহজ ভাষায় উপস্থাপন করবে যেগুলো আমাদের আর কাদিয়ানীদের মাঝে মৌলিক পার্থক্য৷

ক্রমশ…

Facebook Comments