আত্মশুদ্ধি

দরূদ- সৌভাগ্যের সোপান | আব্দুল্লাহ বিন বশির

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr
একটু ভেবে দেখেছেন—ছোট্টো একটি বাক্য আপনার জীবনে কতটা সৌভাগ্য বয়ে আনতে পারে?
সেটা কি?
তার আগে একটি বিষয় বলুন তো, যদি কখনো শুনতে পান, দুনিয়ার মধ্যে আপনার কোনো একান্ত পছন্দের মানুষ যিনি সম্মান মর্যাদায় এত উঁচু যে যাকে শুধু দূর থেকে ভালোবাসতে পারাটাই আপনার জন্যে গর্বের ও গৌরবের বিষয়। যার ভালোবাসা প্রকাশ্যে বা গোপনে, একান্ত আলোচনায় বা ফেসবুকে বলতে আপনার আনন্দ হয়। সম্ভব না, কিন্তু মনের অজান্তেই জীবনে একটি বার সেই ভালোবাসার মানুষটির সাক্ষাত যদি কখনো পেতেন তাহলে নিজের জীবনকে ধন্য ভাবতেন এতটাই ভালোবাসেন তাকে। যদি কখনো শুনতে পারেন সেই ভালোবাসার মানুষটি আপনাকে নিয়ে আলোচনা করেন। আপনার নাম আপনার পিতার নাম তিনি জানেন৷ তার বৈঠকে বা অফিসে আপনার নামে আলোচনা হয় এবং তিনি তখন আপনার নাম নিয়ে বলেন— তিনি আপনাকে ভালোবাসেন। আপনার অনুভূতি কেমন হবে তখন? খুশির আতিশয্যে হয়তো পাগলও হয়ে যেতে পারেন, তাইনা।

এই বাস্তবতা আমি আপনি সকলেই স্বীকার করি। কারণ দুনিয়ার রীতিনীতি এটাই। এবার উপরের সে ভালোবাসা আর ভালোলাগার কথাটি বলা হলো সেটাকে মিলিয়ে বলুন তো, উপরের যে সম্মানিত ব্যাক্তির কথা বলা হলো, তার থেকেও বেশি সম্মান কি আমার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নয়? একজন মুমিন এর থেকেও কি বেশি ভালোবাসা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বাসবেনা? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভালোবাসা কি এই সকল ভালোবাসার থেকেও উর্ধ্বে নয়?

আপনি যদি চান যে, দুজাহানের সর্দার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আপনার নাম উচ্চারিত হোক৷ আপনার পরিচয় পেশ করা হোক৷ তাহলে শুধু ছোট্ট একটি কাজ করলেই তা হয়ে যাবে। ছোট্ট একটি বাক্য ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বা ‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ’ শুধু আপনি উচ্চারণ করবেন। বাস, মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি সকল ভালোবাসার চেয়ে বেশি ভালোবাসা পাওয়ার যিনি যোগ্য তার দরবারে আপনার নাম পৌঁছে যাবে। বিশ্বাস হয়না? দেখুন হাদিস শরীফে কি বলা হয়েছে।
عن ابن مسعود رضي الله عنه عن النبي قال: إن لله ملائكة سياحين في الأرض يبلغني أمتي السلام،
( رواه النسائي ، كذا في مختصر الترغيب و الترهيب ص ٣٧٤، قال ابن حجر: صححه ابن حبان، دار البشائر الإسلامية ، لتحقيق الشيخ سائد بكداش، )
১. ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— আল্লাহর কিছু ফেরেশতা জমিনে বিচরণ করে আমার উম্মত আমাকে যে সালাম পাঠায় তা আমার নিকট পৌঁছে দেয়।

عن عمار بن ياسر رضي الله عنه قال: قال رسول صلى الله عليه وسلم: إن الله وكل بقبري ملَكا أعطاه أسماع الخلائق ، فلا يصلي عليَّ أحد إلى يوم القيامة إلا أبلغني باسمه واسم أبيه : هذا فلان ابن فلان قد صلى عليك، (رواه البزار في المسند ٢/٢٢٦ كذا في مختصر الترغيب و الترهيب ص ٣٧٣، دار البشائر الإسلامية ، لتحقيق الشيخ سائد بكداش، )
২. আম্মার ইবনে ইয়াসার রা. বলেন— রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন — রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন আল্লাহ তাআলা আমার কবরে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করে দিয়েছেন এবং তাকে দুনিয়ার সবচেয়ে বেশি শক্তি শ্রবণ দান করেছেন।কেয়ামত পর্যন্ত যে কেউ আমার উপর দুরুদ পড়বে, সে আমার কাছে ঐ ব্যক্তির পিতার নামসহ আমার নিকট পৌঁছিয়ে দেয়— অমুকের ছেলে অমুক আপনার উপর দুরুদ পড়েছে।
(মুখতাসারুত তারগিব ওয়াত তারহিব পৃষ্ঠা ৩৩৭)

অন্য আরেকটি হাদিসেও বিষয়টি এভাবে বলা হয়েছে যে,

وعن أبي الدرداء رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : وإن أحدا لن يصلي علي إلا عرضت علي صلاته حتى يفرغ منها،
(رواه ابن ماجه برقم: ١٦٣٧) .
৩. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— আমার উপর যে দুরূদ পড়বে তা আমার কাছে পেশ করা হয়৷
(ইবনে মাজাহ হাদিস নং: ১৬৩৭) (১)

ভেবে দেখু আপনি একবার শুধু বললেন— ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ একবার আপনার নাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে পেশ করা হবে। যদ দশবার পড়েন তাহলে দশবার। আর যদি দিনে একশোবার পড়েন তাহলে একশোবার! বছরে! জীবনে!! যার নাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এতবার উপস্থাপিত হবে তাকে কি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালোবাসবেননা। তাকে কি রওজায়ে আতহারে ডেকে নিবেন না?
আমাদের অনেক উস্তাদ বলতেন— যাদের হজ্জ্ব করার অনেক তামান্না তারা বেশি বেশি দুরুদ পড়বে। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তোমাকে নিয়ে যাবেন৷ তারপর এই হাদিসগুলো বলতেন।

শুধু এতটুকু হলেও তো আমাদের মত গুনাহগার বান্দাদের জন্যে যথেষ্ট ছিলো যে, আমরা খুব বেশি থেকে বেশি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরূদ পড়বো৷ কিন্তু যিনি আল্লাহ তায়ালার এত প্রিয় তার উপর দুরুদ পড়লে এতটুকুই শুধু প্রতিদান আল্লাহ দিবেন না বরং তার প্রিয় হাবিবকে ভালোবাসার সামান্য এতটুকুকে আল্লাহ দশগুন বাড়িয়ে দিবেন। হাদিসের বক্তব্য লক্ষ্য করুন।

عن أبي هريرة رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم قال : (مَنْ صَلَّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ عَشْرًا)
(روى مسلم، والترمذي و أبو داود، وقال الترمذي : حسن صحيح، كذا في القول البديع في الصلاة على الحبيب الشفيع ص ٢٣٦، لتحقيق الشيخ محمد عوامة،)

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দুরূদ পড়বে আল্লাহ তার উপর দশটি রহমত অবতীর্ণ করবেন৷ (সহিহ মুসলিম)

আল্লাহর পেয়ারা হাবিব রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দুরূদ পাঠকারীকে এতটুকু দিবেন? অন্য হাদিস থেকে বুঝা যায় শুধু এতটুকুই নয় আল্লাহ তায়ালা হয়তো আরো বেশি বাড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

عن عبد الله بن عمرو رضي الله عنهما قال من صلى على النبي صلى الله عليه وسلم واحدة، صلى الله عليه و ملائكته بها سبعين صلاة،

(قال ابن حجر في ”مختصر الترغيب والترهيب“ص ٢٧٣: رواه احمد بإ سناد جيد،
و وقال السخاوي في ”القول البديع في الصلاة على الحبيب الشفيع“ص٢٣٧: رواه احمد بإسناد حسن وحكمه الرفع إذ لا مجال للاجتهاد فيه،)

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন— যে ব্যক্তি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর একবার দুরুদ পড়বে আল্লাহ তার উপর সত্তরটি রহমত দিবেন এবনহ ফেরেশতারা তার জন্যে সত্তরবার মাগফিরাতের দোয়া করবে।
(মুসনাদে আহমদ)

কত সৌভাগ্য তাইনা? শুধু একটিবার দুরুদের এত ফজিলত। মুমিন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বতে এভাবে দুরুদ পড়তে থাকবে। বেশি থেকে বেশি পড়বে আর এভাবে সে একজন বেশি পরিমান দুরুদ শরিফ পড়ে এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হবে৷ যার ফলাফল হিসেবে সে হবে আখেরাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রিয় ও নিকটতম ব্যক্তি৷
عن ابن مسعود رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ”ان اولى الناس بي يوم القيامه اكثرهم علي صلاة“.

(قال ابن حجر(قال ابن حجر في ”مختصر الترغيب والترهيب“ص ٢٧٣: رواه الترمذي وحسنه وابن حبان وصححه،)

ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন— কেয়ামতের দিন আমার সবচেয়ে নিকটবর্তি হবে যে আমার উপর বেশি দুরুদ পড়ে।
(সুনানে তিরমিজি, সহিহ ইবনে হিব্বান)

এবার একটি কথা বলি, দুরুদ শরিফসহ এরকম কত ফাজায়েল আর সুন্দর আমলের কথা আমরা ফেসবুকে পড়ি। লাইক দেই, কমেন্ট করি, শেয়ারও করি৷ অন্যকে জানাই৷ কিন্তু ফেসবুক আর অন্যান্য সোস্যাল মিডিয়া রেখে ঐ আমলগুলো কতটুকু করি। বা কোনো একটি আমলের লেখা পড়ে আমার জীবনে নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত করি? বাস্তবায়ন করি? সত্যি বলতে গেলে একদম শূন্য! কিন্তু এমনটা কি হওয়া উচিত? আখেরাতের সফলতা কি শুধু কমেন্ট আর শেয়ারে আসবে? অন্তত এতটুকু করি আসুন, ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ এই বাক্যটিকে নিজের মুখের একটি অভ্যাসে পরিণত করি যে— আমি হাতে কাজ করছি কিন্তু আমার মুখে বা অন্তরে বাক্যটি চলছে। মনের অজান্তেই। এতটুকুও কঠিন নয় কাজটি৷ অনেক অনেক সহজ।শুধু একটু অভ্যাস করে নিতে হবে।এইজন্য যখন মনে উঠবে পড়া শুরু করবেন, কাজ করতে করতে ভুলে যাবেন কিন্তু যখনই মনে উঠবে শুরু করবেন। সাথে সাথে বন্ধুবান্ধব, ঘরের স্ত্রী, ছেলে সন্তান, আত্মীয়-স্বজন সকলের সাথে সুযোগ মত বিষয়টির ফাজায়েল বলে তাদেরকেও আমলে আনার চেষ্টা-ফিকির করুন৷ দেখবেন এভাবে আপনার দৈনন্দিন আমলে পরিনত ইনশাআল্লাহ। আর আল্লাহর কাছে দোয়া করুন আর হিম্মত করুন যাতে সোস্যাল মিডিয়ায় কম থেকে কম সময় ব্যায় করতে পারেন।

আল্লাহ আমাদের আমল করার তাওফিক দান করুক। আমীন৷

টিকা:
১] এই বিষয়ের হাদিসগুলোর তাহকিক জানার জন্যে দেখুন ইমাম সাখাবী রহ. কৃত ‘আল-কাওলুল বাদি’ পৃষ্ঠা ৩২৩ থেকে ৩৪৩। এখানে হায়াতুন নবি বিষয়ে বেশ চমৎকার আলোচনা আছে। আগ্রহীগণ দেখে নিতে পারেন৷

========

তথ্যপূঞ্জি:

১] মুখতাছারুত তারগিব ওয়াত তারহিব, ইবনে হাজার রহ. (মৃত্যু ৮৫২হি.), দারুল বাশায়ের আলইসলামিয়া, প্রথম মুদ্রণ ২০১৬।ড. সায়েদ বাকদাশ তাহকিককৃত নুসখা।

২] আল-ক্বওলুল বাদি ফিস সলাতি আলাল হাবিবিশ শাফি, মুহাম্মাদ আসসাখাবি রহ.(মৃত্যু ৯০২), দারুল ইউসর, তৃতীয় মুদ্রণ ২০১১, শায়খ মুহাম্মদ আওয়ামা তাহকিককৃত নুসখা।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: