আব্দুল্লাহ আল মামুন

আর-রিহলাতু ইলাল ইলম | আব্দুল্লাহ আল মামুন

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr
[আল্লাহ তা’লা মুহাদ্দিসদের রিহলার কারনে উম্মতের আসন্ন বালা মুসিবত দূর করেছেন। -ইব্রাহীম ইবনু আদহাম]
………………….……………………………………………
.
যুগে যুগে উলামায়ে উম্মত (রহিমাহুমুল্লাহ মান মাতু ওয়া হাফিজাহুমুল্লাহ মান বাক্বু) এই দ্বীনের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসতেছেন। এবং অক্লান্ত পরিশ্রম মেহনত ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে দ্বীনের বিশুদ্ধ ইলম সংরক্ষণ ও সংকলন করে আসতেছেন।
এই দ্বীনের ইলমকে রক্ষাকারী উলামাগন (হাফিজাহুমুল্লাহ) কে আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট রাখবেন।
রাছূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া ছাল্লাম থেকে বর্ণিত :
يَحْمِلُ هَذَا الْعِلْمَ مِنْ كُلِّ خَلَفٍ عُدُولُهُ، يَنْفُونَ عَنْهُ تَحْرِيفَ الْغَالِينَ، وَانْتِحَالَ الْمُبْطِلِينَ، وَتَأْوِيلَ الْجَاهِلِينَ “
অর্থ:”দ্বীনের এই ইলম প্রত্যেক পরবর্তীদের নিষ্ঠাবানরা বহন করবে,তারা সীমালঙ্ঘনকারীদের তাহরীফ( বিকৃতি) থেকে ,বাতিলপন্থীদের জালিয়াতি থেকে এবং মুর্খদের ভূল তাবীল তথা অপব্যাখ্যা থেকে দ্বীনের এই ইলমকে রক্ষা করবে।”
.
[আল বিদউ’ ওয়ান নাহইউ আ’নহা, ইবনু ওয়াদ্দাহ ১/২৫-২৬; মুসনাদে বাযযার ১৬/২৪৭;শরহু মুশকিলিল আছার,ত্বহাবি ১০/১৭ হা:৩৮৮৪;আশ শরীয়াহ,আজুরী-১,২;মুসনাদুশ শামীয়্যীন,ত্ববারাণী ১/৩৪৪ হা:৫৯৯;আল ইবানাতুল কুবরা, ইবনু বাত্ত্বাহ ১/৯৮ হা:৩৩;আল ফাওয়ায়েদ,তামাম ইবনু মুহাম্মাদ ১/৩৫০ হা:৮৯৯;সুনানুল কুবরা,বাইহাক্বী ১০/৩৫৩-৩৫৪ হা:২০৯১১-১২;মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১/১৪০ হা:৬০১]
.
তাহক্বীক:
উপরোল্লিখিত হাদিসটি বিভিন্ন রাবী থেকে বিভিন্ন তুরুক্বে বর্ণিত হয়েছে।
তবে হাদিসটির সবগুলো সনদই সমালোচিত।তা সত্ত্বেও একাধিক সূত্রে বর্ণিত হওয়ায় এবং কোন কোন সনদের রাবী যঈফে ইয়াসির হওয়ায় এটি একটি ছলেহ ও হাসান সনদ।
এছাড়াও এর মূল মতনের পক্ষে বুখারী মুসলিম একাধিক সহিহ হাদিস মুতাবে’ হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে।
.
.
দ্বীনের এই ইলম হাসিল করা যেমন তেমন বিষয়না। এর যেমন বিশেষ ফাজায়েল রয়েছে তেমনিভাবে উক্ত ফজিলত হাসিল করতে হলে প্রয়োজন অদম্য উচ্ছাস, আগ্রহ ও মেহনত। খুব সহজে এই দুর্লভ ইলম যা ইলমে ওয়াহী ইলমে রব্বানী ও ইলমে নবনী তা হাসিল হয়না।
.
.
ইমাম ইয়াহইয়া ইবনু আবী কাছীর রহঃ বলেন-
ميراث العلم خير من الذهب،
والنفس الصالحة خير من اللؤلؤ،
ولا يستطاع العلم براحة الجسد.
“মিরাস(উত্তরাধিকার) সূত্রে ইলম পাওয়া স্বর্ণ (সম্পত্তি) পাওয়া হতে অধিক উত্তম।ও নেককার নফস(অন্তর) মনি মুক্তা থেকে অধিক উত্তম।
এবং ইলম শরীরের আরাম আয়েশের মাধ্যমে হাসিল করা সম্ভব হয়না।”
[তারীখু বাগদাদ ১১/৩৭৫; তাদরীবুর রাবী,সূয়ুত্বী- শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামাহর তাহক্বীক ২/৩১৩]
আল্লাহ আমাদের উপকারী ইলম দান করুক( আমীন)
.
এই অমূল্য রত্ন সমতুল্য ইলম হাসিল করতে গিয়ে আমাদের সালাফুস সালেহীন ও আকাবীরিনে উম্মাহ নিরলসভাবে বহুমুখী তৎপরতা অবলম্বন করেছেন তার মাঝে অন্যতম হচ্ছে ‘রিহলাহ’ তথা ইলম অভিমূখে যাত্রা ও সফর। অনেকেই এই যাত্রা ও সফরে ইলম হাসিল করতে গিয়ে বিয়ে পর্যন্ত করতে সুযোগ পাননি, কেউবা মীরাস থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তি এই মহতী কাজেই ব্যয় করে নিজে উজার হয়ে উম্মতকে মালামাল করেছেন। (অর্থাৎ, ইলম দ্বারা ধনী বানিয়ে গিয়েছেন)
সালাফদের থেকে এমন প্রমান নেই যে, বড় আলেম হয়েছে অথচ ইলমের জন্য সফর করেন নি। এমনকি মহান রব্বুল আলামীনও তার কতিপয় প্রিয়তম নবীদের দ্বারা ইলমের জন্য সফর করিয়েছেন। আর কুরআনে এর তাৎপর্য বুঝাতে গিয়ে ইলমী সফরের হুকুমও দিয়েছেন।
ইমাম ইব্রাহীম ইবনু আদহাম রহঃ বলেন-
إن اللهَ تعالى يرفع البلاء عن هذه الأمَّة برحلة أصحاب الحديث؛
‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তা’আলা মুহাদ্দিসদের রিহলাহর (তথা হাদীস অন্বেষণের যাত্রার) ওয়াসিলায় এই উম্মতের বিভিন্ন বালা-মুসিবত দূর করে দিয়েছেন।
[আর রিহলাতু ফী ত্বলাবিল হাদীস, বাগদাদী পৃঃ৮৯ রক্বমঃ১৫; শারাফু আসহাবিল হাদীস; মুক্বাদ্দামাতু ইবনিস সলাহঃ২৩৪; তাদরীবুর রাবী ২/১২০]
.
.
নিচে আমরা আর রিহলাতু ইলাল ইলমের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।
.
১) আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা বলেন-
قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ بَدَأَ الْخَلْقَ ۚ
‘বলুন! তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমন করো এবং সৃষ্টির সূচনা পর্যবেক্ষণ করো।
[সূরা আনকাবূতঃ২০]
.
ইমাম কুরতুবী তার তাফসীরে বলেন-
قوله تعالى : قل سيروا في الأرض أي قل لهم يا محمد سيروا في الأرض فانظروا كيف بدأ الخلق على كثرتهم وتفاوت هيئاتهم واختلاف ألسنتهم وألوانهم وطبائعهم ، وانظروا إلى مساكن القرون الماضية وديارهم وآثارهم كيف أهلكهم ; لتعلموا بذلك كمال قدرة الله
‘অর্থাৎ হে নবী মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বলে দিন তারা যাতে ভ্রমন করে এই পর্যবেক্ষণ করে যে, কিভাবে বিভিন্ন প্রজাতির,গঠানাকৃতির,বৈচিত্র্যময় ভাষা-বর্ণ ও স্বভাবের সৃষ্টি সূচনা হয়, এবং তারা যেন এই ভ্রমণ থেকে শিক্ষা গ্রহন করে যে, কিভাবে আমি পূর্বে গত হওয়া বহু জাতি-গোষ্ঠীর ঘর-বাড়ি ও সভ্যতা-সংস্কৃতি ধ্বংস করেছি। যেন তারা আল্লাহ ক্ষমতার পূর্ণতা উপলব্ধি করতে পারে।’
[তাফসীরে কুরত্ববী ১৩/৩১০]
এই কথা থেকে বুঝা যাচ্ছে, রিহলাতু ইলাল ইলমের অন্যতম একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে- মহান রবের যাত(সত্ত্বা) ও সিফাতের (গুনাবলীর) পূর্ণ মা’রেফাত (পরিচয়) হাসিল করা।
.
২) আল্লাহ আরো বলেন-
قُلْ سِيرُواْ فِى ٱلْأَرْضِ فَٱنظُرُواْ كَيْفَ كَانَ عَٰقِبَةُ ٱلَّذِينَ مِن قَبْلُ
হে নবী বলুন! তোমরা যমীনে ভ্রমণ করো এবং দেখ, তোমাদের পূর্বের জাতিদের কি পরিনতি হয়েছিল।
[সূরা রুমঃ৪২]
আর সূরা নামলেরঃ৬৯ নং আয়াতে ‘মুজরিম’ তথা অপরাধীদের পরিনতি দেখার জন্যে বলা হয়েছে।
৩) মহান আল্লাহ আরো বলেন-
فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ
প্রত্যেক দল থেকে কেন একটি বিশেষ দল বের হয়না যারা দ্বীনের গভীর জ্ঞান (তথা ফিক্বহ) শিক্ষা অর্জন করবে, যেন তাদের সম্প্রদায়কে ভীতি প্রদর্শন করতে পারে যখন তাদের কাছে তারা ফিরে আসবে যাতে করে তারা (আল্লাহর হক্বের ব্যাপারে) সতর্ক থাকে।
[সূরা তাওবাহঃ১২২]
.
ইমাম খত্বীব আল বাগদাদী রহঃ এ আয়াত প্রসঙ্গে বলেন-
فهذا في كل مَن رحل في طلب العلم والفقه، ورجع به إلى من وراءه فعلمه إياه
‘মূলত এটি প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির উদ্দেশ্যে বলা হয়ে হে যে ইলম ও ফিক্বহ অর্জনের জন্য রিহলাহ তথা সফর করে, অতঃপর তারা যাদের রেখে গিয়েছিলেন তাদেরকে ফিরে এসে ইলম শিক্ষা দিতে পারে।’
[আর রিহলাতু ফী ত্বলাবিল হাদীস, বাগদাদী পৃঃ৮৯ রক্বমঃ১০]
.
আল্লাহ তা’লা নবী মূসা আলাইহিস সালামকে দিয়েও ইলমের জন্যে রিহলাহ তথা সফর করিয়েছেন এবং পাথেয় হিসেবে মাছ ভেজে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
৪) ইমাম বুখারী রহঃ তার ‘সহীহ’ তে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন যার শিরোনাম হচ্ছে-
باب ما ذكر في ذهاب موسى في البحر إلى الخضر عليهما السلام
অধ্যায়ঃ খিযির আলাইহিস সালামের সাক্ষাতে মূসা আলাইহিস সালামের সমুদ্র অভিমূখে যাত্রা।
[সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইলম ১/২৬]
৫) ইমাম ইবনু হাজার আসক্বালানী রহঃ বলেন-
“هذا الباب معقود للترغيب في احتمال المشقة في طلب العلم؛ لأن من يغتبط به تحتمل المشقة فيه”
‘ইমাম বুখারী রহঃ এই অধ্যায় রচনা করেছেন ইলম অন্বেষণে আসন্ন কষ্ট-ক্লেশ সাদরে গ্রহন করার উৎসাহ প্রদানে। কেননা যে ইলমের ব্যাপারে ঈর্ষা করে (অর্থাৎ ইলম হাসিল করতে আগ্রহী হয়) তাকে তা অর্জনে কষ্ট-ক্লেশ অতিক্রম করায় প্রস্তুত থাকতে হবে।
[ফাতহুল বারী ১/১৬৮]
.
৬) এই অধ্যায়ে তিনি একটি হাদীস বর্ণনা করেন আর তা হচ্ছে-
বনী ইসরায়েলের এক ব্যক্তি মূসা আলাইহিস সালামের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলঃ আপনার চেয়েও কি বেশি ইলমের অধিকারী কেউ আছেন ( এ যামানায়)? মূসা আলাইহিস সালাম বললেন- না কেউ নেই। অতঃ পর আল্লাহ তার নিকট ওয়াহী প্রেরণ করে এই সংবাদ দিলেন যে, হে মূসা আমার বান্দা খিযির আছে যিনি তোমার চেয়েও বেশি জানেন। এটি শুনে মূসা আলাইহিস সালাম তার নিকট পৌছার পথ জানতে চাইলেন। অতঃপর আল্লাহ তার জন্যে ‘মাছ’ কে নিদর্শন হিসেবে নির্ধারণ করলেন এবং মূসা আলাইহিস সালাম কে বলা হলঃ এই মাছ যেখানে হারিয়ে যাবে সেখানেই ফিরে যাবে তবেই তার দেখা পাবে।
عن ابن عباس رضي الله عنهما أنه تمارى هو والحُرُّ بن قيس بن حِصْنٍ الفزاري في صاحب موسى فقال ابن عباس: هو خَضِر، فمرَّ بهما أبيّ بن كعب فدعاه ابن عباس فقال: إني تماريت أنا وصاحبي هذا في صاحب موسى الذي سأل موسى السبيلَ إلى لقيِّه هل سمعت النبي صلى الله عليه وسلم يذكر شأنه؟ قال: نعم سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: ((بينما موسى في ملأ من بني إسرائيل جاءه رجل فقال: هل تعلم أحداً أعلم منك؟ قال موسى: لا، فأوحى الله إلى موسى: بلى عبدُنا خَضِر، فسأل موسى السبيل إليه، فجعل الله له الحوتَ آية وقيل له: إذا فقدت الحوت فارجع فإنك ستلقاه)).
[সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইলম ১/২৬-২৭ হাঃ৭৮]
.
মূসা আলাইহিস সালামের যাত্রায় মাছ বহন করার অনেক গুলো হিকমাহর মাঝে অন্যতম একটি হিকমাহ ইবনু হাজার আসক্বালানী রহঃ বর্ণনা করেন যে,
ركوب البحر في طلب العلم، بل في طلب الاستكثار من العلم، ومشروعية حمل الزاد في السفر؛ لأنه أخذ معه الحوت، ولزوم التواضع في كل حال، وخضوع الكبير لمن يتعلم منه، ولهذا حرص موسى على الالتقاء بالخضر -عليهما السلام-
‘মূসা আলাইহিস সালাম ইলম অন্বেষণে সমুদ্রযানে আরোহন করেন বরং বলতে গেলে অধিক ইলম অর্জনের অন্বেষণে বের হয়েছিলেন। এবং ইলমী সফরে পায়েয় অবলম্বন শরীয়ত সম্মত , কেননা তিনি আলাইহিস সালাম মাছ পাথেয় হিসেবে নিয়েছিলেন। এবং ইলম হাসিলে বিনয় ও বিনম্রতা অত্যন্ত জরুরী, এবং বড় হয়ে ছোটদের কাছ থেকে ইলম নেওয়া মানসিকতা থাকতে হবে। এজন্যেই মূসা আলাইহিস সালাম (সব দিক দিয়ে খিযির আলাইহিস সালাম থেকে বড় হওয়া সত্ত্বেও) খিযির আলাইহিস সালাম থেকে ইলম হাসিলের জন্য সাক্ষাত করেছেন।
[ফাতহুল বারী ১/১৬৯]
৭) ইলমী রিহলাহর অক্লান্ত পরিশ্রমে আগ্রহী নবী মূসার হিম্মত ও উদ্যমকে আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লা এভাবে উপস্থাপন করেন-
وَإِذْ قَالَ مُوسَىٰ لِفَتَىٰهُ لَآ أَبْرَحُ حَتَّىٰٓ أَبْلُغَ مَجْمَعَ ٱلْبَحْرَيْنِ أَوْ أَمْضِىَ حُقُبًا
অর্থঃ যখন মূসা তাঁর (সফর সঙ্গী) যুবককে বললেনঃ দুই সমুদ্রের সঙ্গমস্থলে না পৌছা পর্যন্ত আমি (ইলমী সফর) চালিয়েই যাব, নতুবা(এভাবেই) আমি যুগ যুগ ধরে চলতে থাকব!!
[সূরা আল কাহফ: ৬০]
৮) যখন মূসা আলাইহিস সালাম খিযির আলাইহিস সালাম কে পেয়ে গেলেন তখন বললেন-
﴿ هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَى أَن تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْداً ﴾
‘আমি কি এই শর্তে আপনার অনুসরণ করতে পারি যাতে, (আল্লাহর পক্ষ থেকে) আপনাকে সঠিক পথের যেই শিক্ষা প্রদান করা হয়েছে তা আপনি আমাকে শেখাবেন?’
[সূরা কাহফঃ৬৬]
.
নিজ উস্তাযের সাথে বিনয় দেখানো ও তার অনুমতি নিয়ে তার কাছ থেকে ইলম শিক্ষা করা এটিও ইলমের অন্যতম একটি আদব বা শিষ্টাচার। চাই উস্তায যত ছোটই হোকনা কেন। কেননা মূসা আলাইহিস সালামের সম্মান ও মর্যাদা সার্বিক দিক থেকে খিযির আলাইহিস সালাম থেকে বেশি এর পরেও তিনি তার কাছ থেকে ইলম নিতে আগ্রহী ও বিনয়ের সাথে তার কাছে অনুমতি প্রার্থনা করেছেন।
.
৯) ইলমের জন্য যাত্রার ফজীলতে আল্লাহর রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ‘হাসান’ সনদে বর্ণিত রয়েছে-
مَن سلَكَ طريقًا يلتَمِسُ فيهِ علمًا ، سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طريقًا إلى الجنَّةِ ، وإنَّ الملائِكَةَ لتَضعُ أجنحتَها لطالِبِ العلمِ رضًا بما يصنعُ وإنَّ العالم ليستغفِرُ لَهُ مَن في السَّمواتِ ومن في الأرضِ ، حتَّى الحيتانِ في الماءِ ،
‘ইলম হাসিলের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি কোন পথ অবলম্বন করেন, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাতের পথ সুগম করে দেন। এবং ফেরেশতারা উক্ত তালেবে ইলমের যাত্রা পথে তাদের এই মহতী কাজের খুশিতে (অন্য বর্ণনায় সম্মানে) নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেন, আর এই প্রকৃতি আলেমদের জন্য আসমান ও যমীনের সবকিছু এমনকি পানির মাছ পর্যন্তও ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকে।’
[সুনানে আবু দাউদঃ৩৬৪১; সুনানে তিরমিযীঃ২৬৮২; মুসনাদে আহমাদঃ২১৭১৫; সুনানে ইবনে মাজাহঃ২২৩- হাদীসটি বিভিন্ন শব্দে বিভিন্ন সনদে হাসান সূত্রে বর্ণিত হয়েছে]
.
১০) মাত্র একটি হাদীস ত্বলবের জন্যে সালাফদের অভিযাত্রাঃ
আব্দুল্লাহ ইবনু উনাইস রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু থেকে বর্ণিত একটি হাদীস সরাসরি তার কাছ থেকে শ্রবণ করার উদ্দেশ্যে সাহাবী জাবের ইবনু আব্দিল্লাহ রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু শামের পানে ১ মাস পথ অতিক্রম করেন এবং সফরের বাহন হিসেবে উট ক্রয় সহ পাথেয় যোগার করেন এই ভয়ে যে, উক্ত হাদীস শ্রবণের পূর্বে দু’জনের কোন একজন হয়ত জীবিত নাও থাকতে অয়ারেন!!
فعن جابر بن عبدالله – رضي الله عنـه – قال بلغنـي حـديث عن رسول الله –صلى الله عليه وسلم- لم أسمعه، فابتعت بعيرًا فشدّدت عليه رحلي، وسرت شهرًا حتى قدمت الشام، فأتيت عبدالله بن أنيس، فقلت للبوّاب: قل له: جابر على الباب، فقال: ابن عبد الله؟ فقلت: نعـم، فـرجـع فأخبره، فقام يطأطئ ثوبه حتى لقيني فأعتنقني واعتنقته، فقلت: حديث بلغني عنك سمعته من رسول الله –صلى الله عليه وسلم- في القصاص لم أسمعه، فخشيت أن تموت أو أموت قبل أن أسمعه، فقال: سمعت رسول الله –صلى الله عليه وسلم- يقول …. الحديث
[আর রিহলাতু ফী ত্বলাবিল হাদীসঃ১০৯-১১১; আদাবুল মুফরাদ,বুখারী; তা’লীকে বুখারী ১/১৪০ হাদীসঃ৭৪; মুসনাদে আহমাদ, মুসনাদে আবূ ইয়ালা; মুসনাদে শামিয়ীন, তবারানী;মুক্বাদ্দামায়ে ইবনুস সালাহ – সনদ সালেহ]
.
১১)ইমাম আহমাদ ১০টি হাদীস শ্রবনের উদ্দেশ্যে বাগদাদের দারুস সালাম থেকে ইয়ামানের ছনআ’ পর্যন্ত পথ অতিক্রম করেন।
ورحل الإمام أحمد شهرين كاملين من بغداد دار السلام إلى صنعاء اليمن ليأخذ عشرة أحاديث
[আল মিসকু ওয়াল আম্বার ফী খুত্বাবিল মিম্বার,ড.আয়েদ্ব আল ক্বারনীঃ৪৩১]
১২) হজরত সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব রহঃ বলেন-
والله الذي لا إله إلا هو إني كنت أرحل الأيام الطوال لحديث واحد!!
আল্লাহর কসম যিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই, আমি একটি হাদীস শ্রবণের জন্যে দীর্ঘদিনের পথ অতিক্রম করেছি।
[আল মিসকু ওয়াল আম্বার ফী খুত্বাবিল মিম্বার,ড.আয়েদ্ব আল ক্বারনীঃ৪৩১]
.
১৩) ইমাম মালেকের সূত্রে সাঈদ ইবনুল মুসাইয়্যাব রহঃ থেকে বর্ণিত,
إني كنت لأرحل الأيام والليالي في طلب الحديث الواحد
আমি একটি হাদীস অন্বেষণে রাত-দিন রিহলাহ করেছি।
[ফাতহুল বারী ১/১৫৯]
১৪) বর্ণিত আছে যে, হাসান বসরী রহঃ কা’ব ইবনু আজূরাহের নিকট একটি মাস’আলা জানার জন্য বসরা থেকে কূফা পর্যন্ত সূদুর পথ পাড়ি দিয়েছেন।
وعن الحسن أنه رحل من البصرة إلى الكوفة لمقابلة كعب بن عجرة – رضي الله عنه – ليسأله عن مسألة
[আর রিহলাতু ফী ত্বলাবিল হাদীস, পৃঃ১৪৩]
.
১৫) শ্রুত হাদীস সরাসরি সাহাবীদের থেকে শ্রবণের জন্যে সালাফদের অভিযাত্রাঃ
ইমাম শুবা ইবনুল হাজ্জাজ রহঃ একটি হাদীসের মূল সূত্রে কার থেকে উক্ত হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে তা জানার জন্যে এবং যিনি বর্ণনা করেছেন তার থেকে সম্ভবপর পন্থায় সরাসরি শ্রবণ করে সুনিশ্চিত হওয়ার জন্যে কূফা থেকে মক্কা, আবার মক্কা থেকে মদীনা এরপর আবার মদীনা থেকে বসরায় রিহলাহ (গমন) করেন।
[আর রিহলাতু ফী ত্বলাবিল হাদীসঃ১৪৭-১৫৩]
.
১৬) প্রখ্যাত তাবেয়ী আবুল আ’লিয়া রহঃ বলেন-
كنا نسمع الرواية عن أصحاب رسول الله ﷺ بالبصرة فلم نرض حتى ركبنا إلى المدينة فسمعناها من أفواههم
‘আমরা(তাবেয়ীরা) বসরায় সাহাবাদের থেকে বর্ণিত হাদীস শুনতাম কিন্তু তাতেই তুষ্ট থাকতাম না যতক্ষণ না মদীনায় গিয়ে শুনার জন্যে বাহনে আরোহন করতাম অতঃপর তাদের মুখ থেকে সরাসরি হাদীস শুনে নিতাম।’
[আল জামে’ লি আখলাক্বির রাউই ২/২২৬]
.
১৭)খত্বীব আল বাগদাদী ইমাম উবাইদুল্লাহ ইবনু আদী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন-
بلغني حديث عند على فخفت ان مات أن لا أجده عند غيره فرحلت حتى قدمت عليه العراق
‘আমার নিকট আলী রাদিঃ থেকে বর্ণিত একটি হাদীস পৌছল, আমি আশংকা করলাম যে, তিনি মৃত্যু বরণ করলে এই হাদিস অন্য কারো কাছে পাব না সুতরাং আমি রিহলাহ করলা। এমনকি ইরাক্বে আসলাম।
[ফাতহুল বারী ১/১৫৯]
১৮) ইমাম আহমাদ রহঃ বলেন- আমি ইলম ও সুন্নাহ ত্বলবের উদ্দেশ্যে সীমান্তে,সমুদ্রতীরে, পূর্বে-পশ্চিমে, জাযায়ের,মক্কা, মদীনা, হিজায, ইয়ামান, ইরাকের সকল এলাকা, হাওরান, পারস্য, খুরাসান, পাহাড়, বিভিন্ন কোণায় কোণায় গিয়েছি।
سافرت فِي طلب العلم والسنة إلى الثغور والشامات والسواحل والمغرب والجزائر ومكة والمدينة والحجاز واليمن والعراقين جميعًا وأرض حوران وفارس وخراسان والجبال والأطراف،
[ত্ববাকাতে হানাবিলাহ ১/৪৭; আদাবুশ শরঈ’য়াহ ২/৪৮]
.
১৯) ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রহঃ দুনিয়ার কোণায় কোণায় চক্কর লাগিয়ে ইলম হাসিল করার পর সর্বস্ব হয়ে বলেন-
“لو كانت عندي خمسون درهماً كنت قد خرجت إلى الري إلى جرير بن عبد الحميد فخرج بعض أصحابنا ولم يمكني الخروج لأنه لم يكن عندي شيء”
ইশ! যদি আমার কাছে ৫০ দিরহাম থাকত তবে আমি ‘রায়’-এ জারীর ইবনু আব্দিল হুমাইদ এর নিকট যেতাম, আমার কিছু সাথীরাও গিয়েছেন কিন্তু যাত্রাপথের খরচ বহন করার মত আমার কিছু না থাকায় তা আমার জন্যে সম্ভব হয়ে উঠেনি।
[আল জামে লি আখলাক্বির রাউই ২/২৩৫]
.
২০) ইমাম মিস’আর ইবনু কিদাম রহঃ বলেন-
طلبت مع أبي حنيفة الحديث، فغلبنا وأخذنا في الزهد، فبرع علينا، وطلبنا معه الفقه فجاء منه ما ترون .
‘আমি (অন্য বর্ণনায় আমরা) আবূ হানীফার সাথে ইলমে হাদীস অন্বেষণের প্রতিযোগিতায় বের হলাম, অতঃপর আবূ হানীফা রহঃ আমাদের চেয়ে বেশি অন্বেষণ করে ফেললেন, আমরা ‘যুহদ’ হাসিলের জন্যে বের হলাম এতেও তিনি আমাদের আগে বেড়ে গেলেন। এরপর আমরা তার সাথে ফিক্বহের জ্ঞান অন্বেষণে বের হলাম, এর ফলাফল কি তার ব্যাপারে ব্যাপারে আর কি বলব! তোমরা তো নিজ চোখেই দেখছ (অর্থাৎ তিনি ফক্বীহকুল শিরোমণি হয়ে গিয়েছেন!)।’
[মানাক্বেবে আবূ হানীফা,যাহাবীঃ৪৩; আখবারু আবী হানীফাহ, সইমারী; জামেউল মাসানীদ ওয়াস সুনান (মুকাদ্দিমা)- ৪২]
.
২১) এক ব্যাক্তি ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল রহঃ কে জিজ্ঞেস করলেন-
رجل يطلب العلم؛ يلزم رجلاً عنده علم كثير أو يرحل؟ قال: “يرحل يكتب عن علماء الأمصار، فيشام الناس ويتعلم منهم”.
‘এক ব্যাক্তি ইলম অন্বেষণ করতে চায়, তিনি কি ইলম অর্জনে (নিজ এলাকায়) যার কাছে বেশি জ্ঞান জমা আছে তার খেদমতে থাকবে নাকি ইলম অর্জনে রিহলাহ করবে??
উত্তরে তিনি রহঃ বলেন-
তিনি ইলমের জন্যে রিহলাহ করবে এবং বিভিন্ন দেশের আলেমদের কাছ থেকে আহরিত ইলম লিখে রাখবে।এরপর মানুষদের তা থেকে শিক্ষা দান করবেন।
[ফাতহুল বারী ১/১৫৯]
.
২২) তাকে একবার বলা হলঃ তালেবে ইলম কি হাদীসে আ’লী সনদের জন্যে রিহলাহ করবে? জবাবে তিনি বললেন- অবশ্যই, আল্লাহর কসম তিনি এর জন্যে কঠোর প্রচেষ্টা করবে। নিশ্চয়ই আলক্বমা ইবনে কাইস আন নাখঈ, আসওয়াদ ইবনু ইয়াযীদ আন নাখঈ উভয়ে কূফায় অবস্থিত ইরাক্বের অধিবাসী ছিলেন, তাদের নিকট উমর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু থেকে বর্ণিত এক হাদিস পৌছলে তারা তাতে তুষ্ট হননি যতক্ষণ না উভয়ে হজর উমর রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহুর নিক মদীনায় গিয়ে সরাসরি হাদীস না শুনেছেন!
أيرحل الرجل في طلب العلو؟ فقال: “بلى والله شديداً، لقد كان علقمة بن قيس النخعي، والأسود بن يزيد النخعي،- وهما من أهل الكوفة بالعراق – يبلغهما الحديث عن عمر، فلا يقنعهما حتى يخرجا إليه – إلى المدينة المنورة – فيسمعانه منه”.
[ফাতহুল বারী ১/১৫৯;মুক্বাদ্দামায়ে ইবনুল সালাহঃ২৩৫]
.
২৩) ইমাম ইয়াহইয়াহ ইবনু মাঈন থেকে বর্ণিত যে, যে ব্যক্তি কেবল নিজ শহরেই ইলমে হাদীস অর্জন করে লিখে রাখে কিন্তু ইলমের জন্যে রিহলাহ ইখতিয়ার করেনা তার মাঝে কোন কল্যাণ নেই।
أربعة لا يؤنس منهم رشد: حارس الدرب، ومنادي القاضي، وابن المحدث، ورجل يكتب في بلده ولا يرحل في طلب الحديث.
[মুক্বাদ্দামায়ে ইবনুল সালাহঃ২৩৪]
২৪) এই জন্যেই ইমাম ইবনুস সালাহ রহঃ নিজ দেশ থেকে দেশের সুপ্রসিদ্ধ ও মর্যাদাশীল আলেমদের থেকে ইলম অর্জন করার পর ভিন্ন দেশে ইলম অর্জনের জন্যে সফর ও রিহলাহ করার জন্যে তালেবে ইলমদের ইলমের আদাব হিসেবে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।
وإذا أخذ فيه فليشمر عن ساق جهده واجتهاده، ويبدأ بالسماع من أسند شيوخ مصره، ومن الأولى فالأولى من حيث العلم أو الشهرة أو الشرف، أو غير ذلك.
وإذا فرغ من سماع العوالي والمهمات التي ببلده فليرحل إلى غيره.
[মুক্বাদ্দামায়ে ইবনুল সালাহঃ২৩৪]
.
আল্লাহ তা’আলা আমাদের উপকারী ইলম অরদান করুন এবং রিহলাতু ইলাল ইলম নসীব করুন। (আমীন)

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: