আত্মশুদ্ধি

নববর্ষের ইসলামাইজেশন : শরয়ি দৃষ্টিকোণ | মাহমুদ সিদ্দিকী

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই সময়ের সবচেয়ে বড় ফিতনা হলো—ইসলামকে আকল দিয়ে বুঝতে চাওয়া। বুদ্ধিবৃত্তিক ইসলামের জপ করতে-করতে আকলকে বানিয়ে ফেলে ইসলাম ও শরিয়ত বোঝার মূল মানদণ্ড। কিছু বই এবং এবং কিছু আর্টিকেলে শরিয়তের কিছু মূলনীতি ভাসা-ভাসা পড়েই আকল খাটিয়ে শুরু হয় উসুলের ভুল ও বিকৃত প্রয়োগ। সেখানে কোনো দলিলের প্রয়োজন হয় না। প্রয়োজন শুধু আকলের। অথচ, ইসলাম আকলের নাম নয়। শুধু আকল দিয়ে ইসলামকে বোঝা সম্ভবও নয়। ইসলাম বোঝার মানদণ্ড হলো—কুরআন-হাদিসের আলোকে সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং সালাফে সালেহিনের বুঝ।

সাহাবায়ে কেরামের আমল ও সালাফে সালেহিনের বুঝ বাদ দিয়ে ‘বুদ্ধিবৃত্তিকতা’ ও ‘সেলফ ইজতিহাদে’র জঘন্যতম সমস্যা হলো—সবকিছুকে ‘ইসলামাইজেশন’ করতে চাওয়া। এই চাওয়ার সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো—এতে শরিয়তের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায় নিজের ‘চাওয়া’; শুদ্ধ বাংলায় যাকে বলে প্রবৃত্তি, আর আরবিতে বলে ‘শাহওয়াত’। সকল কিছু হালালের জায়গা হলো জান্নাত; “ওয়া ফিহা মা তাশতাহিহিল আংফুস…”। [যুখরুফ-৭১]

 

নববর্ষ পালনের বিধান কী? ইসলামে কি নববর্ষ পালনের কোনো আদেশ বা নিষেধ আছে? সালাফে সালেহিন পালন করতেন কি না?

 

নববর্ষ পালন করার কোনো বিধান ইসলামি শরিয়তে নেই। আরবের বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী গোষ্ঠীর মাঝে বিভিন্ন রকমের উৎসব প্রচলিত ছিল। মদিনায় গিয়ে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেখেন—মদিনাবাসীরা কিছু উৎসব পালন করে। আহলে কিতাব সকল ধর্মের জন্য আল্লাহ তাআলা নির্দিষ্ট শরিয়ত ও কর্মপদ্ধতি বলে দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন—

لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا ۚ

“আমি তোমাদের প্রত্যেককে একটি করে শরিয়ত ও কর্মপদ্ধতি দিয়েছি।” [মায়েদা-৪৮]

 

এর প্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা মুসলিমদের জন্য দুইটি ঈদ প্রদান করেন। আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাদিস শুনুন। “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় এসে দেখলেন, দুটি বিশেষ দিন তারা আনন্দ-উৎসব করে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন—এই দিন দুটি আসলে কী? তারা উত্তর দেন—জাহিলিয়াতে আমরা এই দুটি দিনে আনন্দ-উৎসব করতাম। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—আল্লাহ তাআলা এই দুটি দিনের পরিবর্তে তোমাদেরকে এরচেয়ে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন; ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা।” [সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং-১১৩৪; সুনানুন নাসায়ি, হাদিস নং-১৫৫৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং-১২০০৬]

 

ইসলামি শরিয়তে এই দুই দিবসের বাইরে আলাদা আনন্দ-উৎসবের জন্য কোনো দিবস নেই। এবং এই দুই উৎসবের দিবসেও উৎসবের প্রকৃতি কেমন হবে—সেটা আল্লাহ তাআলা নবিজির মাধ্যমে শিখিয়ে দিয়েছেন। এর বাইরে অন্য কোনো উৎসব নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পালন করেননি, সাহাবায়ে কেরাম পালন করেননি এবং সালাফে সালেহিনের কেউও পালন করেননি। না নববর্ষ কেউ পালন করেছেন, আর না জন্মদিন পালন করেছেন। যদি এগুলো ইসলামের বিধান হতো, তাহলে খাইরুল কুরুনে অবশ্যই তা পালিত হতো।

 

এখন আমাদেরকে জানতে হবে, নববর্ষ পালনের ধারা কোত্থেকে এসেছে?

 

সেকালের পারস্য, বর্তমানের ইরানে নববর্ষ পালন হতো ঘটা করে। এবং সেটা সেই জাহিলিয়াতের যুগ থেকেই। আরবিতে একে বলা হয়—‘নাইরুয’; মূল ফার্সিতে ‘নওরোয’। অর্থাৎ—নববর্ষ। পারস্যের পাশাপাশি মিশরের লোকেরাও এই দিবস পালন করত। হাফেয যাহাবি রহ. লেখেন—”নওরোয হলো কিবতি বর্ষের প্রথম দিন। এই দিন মিশরীয়রা বাড়াবাড়ি রকমের আমল করে। সবাই উৎসবের জন্য সমবেত হয়। এই দিবসটিকে তারা ঈদ বা উৎসবের দিন হিসেবে গ্রহণ করে। বসন্তের প্রথম দিনকে বলা হয় নওরোয।” [তাশাব্বুহুল খাসিস বিআহলিল খামিস ফি রদ্দিত-তাশাব্বুহি বিল মুশরিকিন, পৃ. ৪৯, যাহাবি]

 

পারস্যের লোকেরা ছিল অগ্নিপূজক। মিশরের কিবতিরা ছিল ফেরাউনের গোত্রের। তাহলে দেখা যাচ্ছে—নববর্ষ পালনকারী দুটি জাতিই মূলত মুশরিক। মুশরিকদের থেকেই এই উৎসবের উৎপত্তি।

 

এখন আমাদেরকে জানতে হবে—মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বনের বিষয়ে ইসলাম কী বলে?

 

কোনোভাবেই যেন অন্য কোনো ধর্মের জাতির সাথে মুসলিমদের সাদৃশ্য তৈরি না হয়, তাই নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের আলাদা উৎসবের প্রকৃতি বলে দিয়েছেন। এটুকুই নয়, বরং তাদের সাদৃশ্য থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে বলেছেন। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবসময় সতর্ক করেছেন—জাহান্নামিদের শিআর বা নিদর্শন যেন কোনো মুসলিমের মাঝে না আসে। হোক সেটা খাওয়া-পরা, আনন্দ-উৎসব, শোক-বেদনা কিংবা আমল ও চিন্তায়।

 

শক্তভাষায় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধর্মীদের সাদৃশ্যের ভয়াবহতা বর্ণনা করেছেন। বিষয়টির গুরুতরতা বুঝতে নিচের হাদিসটি পড়ুন।

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ “.

“আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে কোনো দলের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে ওই দলের অন্তর্ভুক্ত।” [সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং-৪০৩১]

 

বুঝতে পারছেন বিষয়টির ভয়াবহতা? শুধু তাই নয়, অন্য হাদিসে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও স্পষ্ট করে বলেছেন—

خَالِفُوا الْمُشْرِكِينَ، وَفِّرُوا اللِّحَى، وَأَحْفُوا الشَّوَارِبَ “

“তোমরা মুশরিকদের সাথে বৈসাদৃশ্য অবলম্বন করো। দাড়ি না কেটে রেখে দাও এবং গোঁফ খাটো করো।” [সহিহ বুখারি, হাদিস নং-৫৮৯২]

মুশরিকদের উৎসবে অংশগ্রহণ তো দূরের কথা, বাহ্যিক বেশভূষায়ও যেন কোনো মিল না থাকে—এই বিষয়েও নবিজি নির্দেশ দিয়েছেন।

 

মুশরিকরা তো বটেই, ইহুদি-নাসারাদের সাথেও বৈসাদৃশ্য অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। স্পষ্টভাষায় বলেছেন—

خَالِفُوا الْيَهُودَ

“ইহুদিদের সাথে তোমরা বৈসাদৃশ্য অবলম্বন করো।” [সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং-৬৫২]

 

আরও শক্তভাষায় নবিজি বলেন—

لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا، لَا تَشَبَّهُوا بِالْيَهُودِ، وَلَا بِالنَّصَارَى

“যে অন্যদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়। তোমরা ইহুদি এবং নাসারাদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন কোরো না।” [সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং-২৬৯৫]

 

এগুলো সরাসরি নির্দেশসূচক হাদিস। এখানে ইনিয়েবিনিয়ে মনের মতো গড়িয়ে নিয়ে ব্যাখ্যা করার সুযোগ নেই। যেখানে সাদৃশ্য অবলম্বন করতেই নিষেধ করা হচ্ছে, সেখানে মুশরিকদের উৎসবে উপস্থিতির ব্যাপারে শরিয়তের নির্দেশ কী হবে ভাবুন!

 

রহমানের বান্দাদের গুণাবলি আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَالَّذِينَ لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ

“যারা ‘যুরে’ উপস্থিত হয় না।” [সুরা ফুরকান-৭২]

হাফেয যাহাবি রহ. বলেন, “বিখ্যাত তাবেয়ি মুফাসসির ইমাম মুজাহিদ রহ. সহ একদল সালাফ থেকে বর্ণিত—এই আয়াতে ‘যুর’ শব্দের অর্থ হলো মুশরিকদের উৎসব।” [তাশাব্বুহুল খাসিস বিআহলিল খামিস ফি রদ্দিত-তাশাব্বুহি বিল মুশরিকিন, পৃ. ২৬, যাহাবি] অর্থাৎ, রহমানের বান্দারা মুশরিকদের উৎসবে অংশগ্রহণ তো দূরের কথা, উপস্থিতও হয় না।

 

খোদ উপস্থিত হবার ব্যাপারেও হাদিসে নিষেধাজ্ঞা আছে। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন—”যে অন্যদের দল ভারী করে, তার হাশর তাদের সাথেই হবে”। [মুসনাদু আবি ইয়ালা, তাশাব্বুহুল খাসিস, পৃ. ৩৩]

 

এবার সাহাবা ও সালাফদের কিছু উক্তি দেখা যাক।

হুজাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—”যে কোনো দলের সাদৃশ্য অবলম্বন করে, সে ওই দলের অন্তর্ভুক্ত। পোশাক-পরিচ্ছদে সাদৃশ্য হতে-হতে একসময় চরিত্রেও না আবার সাদৃশ্য চলে আসে।”

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন—”পোশাক-আশাক যেন বিধর্মীদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ না হয়। এতে একসময় অন্তরও ওদের অন্তরের মতো হয়ে যাবে।”  [তাশাব্বুহুল খাসিস বিআহলিল খামিস ফি রদ্দিত-তাশাব্বুহি বিল মুশরিকিন, পৃ. ৪৯, যাহাবি]

 

বাহ্যিক বেশভূষার সাদৃশ্যের ভয়াবহতা যদি হয় এই, তাহলে তাদের উৎসব উদযাপন কতটা ভয়াবহ? শুনুন আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর মুখ থেকে। ইবনে উমর বলেন, “যারা মুশরিকদের দেশে অবস্থান করে তাদের নববর্ষ এবং ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণ করে, তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করে; অবশেষে এভাবেই মারা যায়, কেয়ামতের দিন এদেরকে মুশরিকদের সাথে হাশর করা হবে।”  [আল-হিকামুল জাদিরাতু বিল ইযাআহ, পৃ. ৫১, ইবনে রজব হাম্বলি]

 

ইবনে রজব হাম্বলি রহ. (৭৯৫ হি.) লেখেন—”নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুশরিক ও আহলে কিতাবদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন থেকে নিষেধ করেছেন। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন। কারণ—কাফেররা এই সময় সূর্যের পূজা করে। ওই সময় নামাজের সিজদা বাহ্যত মুশরিকদের সিজদার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যাবে।” [আল-হিকামুল জাদিরাতু বিল ইযাআহ, পৃ. ৫০, ইবনে রজব হাম্বলি]

 

হাফেয যাহাবি রহ. লেখেন—”মুশরিক ও বিধর্মীদের সাথে সাদৃশ্য অবলম্বন করে জন্মদিন পালন, খামিস এবং নববর্ষ পালন—এগুলো বর্বর বিদআত। যদি কোনো মুসলিম একে ধর্মীয় কাজ মনে করে, তাহলে সেই মূর্খকে ধমকে শিখিয়ে দিতে হবে। আর যদি মুশরিকদের প্রতি ভালোবাসা ও তাদের উৎসব উদযাপনের জন্য পালন করে, তাহলে অবশ্যই নিন্দনীয়। আর যদি অভ্যাসবশত এবং পরিবার ও শিশুদেরকে আনন্দ দেওয়ার জন্য করে, তাহলেও নিন্দনীয়। আমলের বিচার হয় নিয়ত অনুযায়ী। এজন্য অজ্ঞ ব্যক্তিকে বিষয়টির গুরুতরতা নম্রভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে।” [আত-তামাসসুক বিস-সুনান, পৃ. ৫৩, যাহাবি, মাকতাবাতুল উমারাইন আল-ইলমিয়্যাহ]

 

তাহলে দেখা যাচ্ছে—নববর্ষ পালনের ধারা এসেছে মুশরিকদের থেকে। আর মুশরিকদের সাথে যেকোনো ধরনের সাদৃশ্য অবলম্বন থেকে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। মুশরিকদের কোনো উৎসবে উপস্থিত হতে কুরআন সরাসরি নিষেধ করেছে। হাদিসে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি ও হাফেয যাহাবি রহ.-এর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—নববর্ষ পালন করা ইসলামে নিষিদ্ধ।

 

তারপরও কিছু মানুষ এইসব উৎসবে যায়। সে যুগেও যেত, এ যুগেও যায়। খোদ যাহাবি বলছেন—”মিশরে কিবতিদের সেই উৎসবে কিছু মুসলমানও তাদের সাথে তাল মিলিয়ে পালন করত।” [তাশাব্বুহুল খাসিস বিআহলিল খামিস ফি রদ্দিত-তাশাব্বুহি বিল মুশরিকিন, পৃ. ৪৯, যাহাবি]

 

এখানে আরও উক্তি টানা যেত। দীর্ঘায়নের ভয়ে সংক্ষিপ্ত করলাম।

 

এবার দেখা যাক আমাদের দেশের নববর্ষের অবস্থা। বাংলাদেশে মোট দুই ধরনের নববর্ষ পালিত হয়। থার্টি-ফাস্ট নাইট এবং পহেলা বৈশাখ। থার্টি-ফার্স্ট নাইট যে পশ্চিমের অন্ধ অনুকরণ—এ নিয়ে বিস্তারিত লেখার প্রয়োজন নেই। থার্টি-ফাস্ট পালন না-জায়েয হবার বিষয়টিও সবাই খুব ভালোভাবে বোঝেন।

 

এখন আমাদের আলোচ্য বিষয় হলো পহেলা বৈশাখ এবং নববর্ষকে ইসলামিকরণ।

 

পহেলা বৈশাখের ইতিহাস

পহেলা বৈশাখের ইতিহাস সম্পর্কে দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। এক. দ্বীন-ই-ইলাহির প্রবর্তনকারী মুঘল সম্রাট আকবর এই ধারা চালু করেছেন। বাংলা সনের মূল নাম ছিল তারিখ-ই-ইলাহি। দুই. পহেলা বৈশাখ উৎসবটি ঐতিহ্যগত হিন্দু নববর্ষ উৎসবের সাথে সম্পর্কিত। যার প্রবর্তনকারী হিসেবে রাজা শশাঙ্ককে মনে করা হয়। আবার কিছু লোকের মতে, রাজা বিক্রমাদিত্য এর প্রবর্তনকারী। যে-ই করুক, প্রবর্তনকারী সবাই মুশরিক—এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওযা যায়। পহেলা বৈশাখের মূল প্রকৃতি ও ‘মাহাত্ম্য’ বুঝতে হলে আপনাকে পশ্চিমবঙ্গ ও কোলকাতায় উদযাপনের বিবরণ দেখতে হবে। উইকিপিডিয়ার নিবন্ধ থেকে সরাসরি উদ্ধৃত করছি।

“সারা চৈত্র মাস জুড়েই চলতে থাকে বর্ষবরণের প্রস্তুতি। চৈত্র মাসের শেষ দিন অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তি বা মহাবিষুব সংক্রান্তির দিন পালিত হয় গাজন উৎসব উপলক্ষ্যে চড়ক পূজা অর্থাৎ শিবের উপাসনা। এইদিনেই সূর্য মীন রাশি ত্যাগ করে মেষ রাশিতে প্রবেশ করে। এদিন গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে আয়োজিত হয় চড়ক মেলা। এই মেলায় অংশগ্রহণকারী সন্ন্যাসী বা ভক্তগণ বিভিন্ন শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন করে আরাধ্য দেবতার সন্তোষ প্রদানের চেষ্টা এবং সাধারণ মানুষের মনোরঞ্জন করে থাকেন।

এছাড়া, বহু পরিবারে বর্ষশেষের দিন টক এবং তিতা ব্যঞ্জন ভক্ষণ করে সম্পর্কের সকল তিক্ততা ও অম্লতা বর্জন করার প্রতীকী প্রথা একবিংশ শতাব্দীতেও বিদ্যমান। পরের দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ প্রতিটি পরিবারে স্নান সেরে বয়ঃজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করার রীতি বহুলপ্রচলিত। বাড়িতে বাড়িতে এবং সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে চলে মিষ্টান্ন ভোজন। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকাংশই এদিন থেকে তাদের ব্যবসায়িক হিসেবের নতুন খাতার উদ্বোধন করে, যার পোশাকি নাম হালখাতা। এই উপলক্ষ্যে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিতে মঙ্গলদাত্রী লক্ষ্মী ও সিদ্ধিদাতা গণেশের আরাধনা করা হয়। নতুন খাতায় মঙ্গলচিহ্ন স্বস্তিক আঁকা হয়ে থাকে।”

এগুলো হলো পহেলা বৈশাখের মৌলিক প্রথা। অর্থাৎ, পহেলা বৈশাখের গোড়া মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য। যার সাথে জড়িয়ে আছে তাদের দেব-দেবিদের পূজা-অর্চনা। সুতরাং, এটি যে মুশরিকদের উৎসব হিসেবে পরিত্যাজ্য হবে একজন মুসলিমের জন্য—এতে কোনো দ্বিধা কিংবা সন্দেহের অবকাশ নেই। একটু আগে আমরা দলিল সহ আলোচনা করে এসেছি—ইসলামে নববর্ষ পালনের কোনো বিধান নেই। নববর্ষ পালনের মূল ধারা এসেছে পারস্যের অগ্নিপূজক এবং মিশরের মুশরিক কিবতি জাতি থেকে। কুরআন-হাদিসের আলোকে, সাহাবা ও সালাফের বক্তব্য অনুযায়ী স্পষ্টভাবে আমরা দেখেছি—মুশরিক ও বিধর্মীদের উদ্ভাবিত নববর্ষ-উৎসব এবং ধর্মীয় উৎসবে মুসলিমরা অংশগ্রহণ করতে পারবে না। সুতরাং পহেলা বৈশাখেও অংশগ্রহণ করতে পারবে না।

এখন প্রশ্ন হলো—নববর্ষকে ইসলামিকরণের কোনো সুযোগ আছে কি না? কেউ যদি মুশরিকদের সংস্কৃতি পালন না করে অন্যভাবে উদযাপন করে, তাহলে সুযোগ আছে কি না? কারণ, এতে তো মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্য হচ্ছে না?

 

এই প্রশ্নের উত্তর স্বয়ং ইমাম যাহাবি রহ.-এর ভাষায় দিচ্ছি।

“কেউ যদি বলে, এর দ্বারা মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্য করা তো আমাদের উদ্দেশ্য নয়; তাহলে তাকে বলুন—মুশরিকদের সাথে উৎসব ও পার্বণে মিলে যাওয়া এবং খোদ অংশগ্রহণ করাটাই হারাম। এর দলিল হলো, সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত—রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় নামাজ পড়তে নিষেধ করেছেন। নবিজি বলেছেন, সূর্য শয়তানের দুই শিংয়ের মাঝখান দিয়ে উদিত হয়। কাফেররা তখন সূর্যের পূজা করে। এখন এই সময় যিনি নামাজ পড়ছেন, তিনি তো পূজার উদ্দেশ্যে সিজদা দিচ্ছেন না। যদি পূজার উদ্দেশ্যে সিজদা দেন, তাহলে তো কাফেরই হয়ে যাবেন। কিন্তু তবুও নিষিদ্ধ। কারণ, খোদ মুশরিকদের সাথে মিলে যাওয়া এবং তাদের সাথে অংশগ্রহণটাই হারাম।” [তাশাব্বুহুল খাসিস বিআহলিল খামিস ফি রদ্দিত-তাশাব্বুহি বিল-মুশিরিকিন, পৃ. ৩০, যাহাবি]

অর্থাৎ, আপনি কী উদ্দেশ্যে, কোন পদ্ধতিতে নববর্ষ উদযাপন করছেন—সেটা মুখ্য নয়। বরং মুখ্য হলো—আপনার পদ্ধতিতে, আপনার মতো করে এই নববর্ষ উদযাপন মুশরিকদের নববর্ষ পালনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হয়ে যাচ্ছে। এই খোদ সাদৃশ্যটাই হারাম। তাদের শিরকি কর্মকাণ্ড সহ পালন করলে তো ঈমানই থাকবে না।

ইসলামাইজেশনের লক্ষ্যে এইসব উদযাপনের আরও নানাবিধ ক্ষতিকর দিক আছে। পরের পৃষ্ঠাতেই ইমাম যাহাবি সেই ফিরিস্তি দিয়েছেন। যাহাবি লেখেন—“এইসব সাদৃশ্যতার আরও নানা ক্ষতিকর দিক আছে। এতে করে মুসলিম সন্তানেরা এই ধরনের কুফরি উৎসবগুলোর ভালোবাসা বুকে নিয়ে বড় হবে। কারণ, এইসব উৎসবে তারা বিনোদন, পোশাক-আশাক, খাবার-দাবার এবং বিশালকায় রুটি দেখে অভ্যস্ত হবে।” [তাশাব্বুহুল খাসিস বিআহলিল খামিস ফি রদ্দিত-তাশাব্বুহি বিল-মুশিরিকিন, পৃ. ৩১, যাহাবি]

তাহলে খোলাসা যা দাঁড়াচ্ছে তা হলো—সাধারণভাবে নববর্ষ পালন করা তো যাবেই না; বরং ‘ইসলামাইজেশনে’র সুরতেও নববর্ষ পালন স্পষ্ট হারাম। এই সিদ্ধান্ত আমার নয়; আয়াত ও হাদিসের আলোকে ইমাম যাহাবির।

 

নববর্ষকে ইসলামিকরণের পক্ষে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর পূর্বপুরুষের সাথে হযরত আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি ঘটনাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। মূল ঘটনাটি আসলে কী?

মূল ঘটনাটি দেখা যাক। ইমাম আ’যম আবু হানিফা রহ.-এর নাতী ইসমাইল ইবনে হাম্মাদ বলেন—তাঁর দাদা নু’মান ইবনে সাবিত ইবনে নু’মান ইবনে মারযুবান ছিল পারস্যের স্বাধীন মানুষ। আল্লাহর কসম, আমাদের বংশে কখনো দাসত্বের দাগ লাগেনি। আমার দাদা (আবু হানিফা) জন্মগ্রহণ করেন ৮০ হিজরিতে। আমার দাদার বাবা সাবিত যখন ছোট, তখন একবার আলি ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে যান। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু তাঁর জন্য এবং তাঁর বংশধরদের জন্য বরকতের দোয়া করে দেন। আল্লাহর কাছে আমাদের আশা—আমাদের বংশের ক্ষেত্রে আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর দোয়া কবুল করে নিয়েছেন।

قال : والنعمان بن المرزبان أبو ثابت هو الذي أهدى إلى علي بن أبي طالب رضي الله عنه الفالوذج في يوم النيروز، فقال : نوروزنا كل يوم. وقيل : كان ذلك في المهرجان، فقال : مهرجونا كل يوم.

ইসমাইল বলেন, সাবিতের বাবা নুমান ইবনুল মারযুবান হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি পারস্যের নববর্ষের দিন আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ফালুদা হাদিয়া দিয়েছিলেন। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন বলেন—“নাওরুযুনা কুল্লা ইয়াউমিন; অর্থাৎ—মুসলমানদের প্রতিটি দিনই তো নববর্ষ!”[আখবারু আবি হানিফা ওয়া আসহাবুহু, পৃ. ১৬, হুসাইন ইবনে আলি আস-সাইমারি, আলামুল কুতুব, ১৪০৫ হি.]

হাফেয যাহাবি রহ. সিয়ারু আ’লামিন নুবালায় ইমাম আবু হানিফার জীবনীতে এই ঘটনাটি এনেছেন। সেখানে আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর বক্তব্য ছিল—

فقال : نوروزنا كل يوم.

—“নাওরুযুনা কুল্লা ইয়াউমিন; অর্থাৎ—মুসলমানদের প্রতিটি দিনই তো নববর্ষ!” [সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ৬/৩৯৫, যাহাবি, মুয়াসসাসাতুর রিসালা]

ইবনে হাজার হাইতামি রহ.ও (৯৭৩ হি.) এই ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। এবং সেখানে আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর বক্তব্য ছিল—

فقال : نوروزنا كل يوم.

—“নাওরুযুনা কুল্লা ইয়াউমিন; অর্থাৎ—মুসলমানদের প্রতিটি দিনই তো নববর্ষ!” [আল-খাইরাতুল হিসান ফি মানাকিবিল ইমামিল আ’যম আবি হানিফাতান নু’মান, পৃ. ২২, ইবনে হাজার হাইতামি, মাতবাআতুস সাআদাহ]

এই ঘটনার আরেকটি বর্ণনা আছে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সিরিন রহ. থেকে। ইবনে সিরিন বলেন—“একবার নববর্ষের দিন আলি ইবনে আবি তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাছে হাদিয়া নিয়ে আসা হয়। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞাসা করেন, এটা কী? হাদিয়াদাতা উত্তর দেয়, আমিরুল মুমিনিন, আজ নববর্ষ। চতুর্থ খলিফা উত্তরে বলেন—তোমরা তোমাদের প্রতিটি দিনকে নববর্ষ বানিয়ে আমল করো।”

এর ব্যাখ্যা কী? হাফেয যাহাবি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। “বাইহাকি রহ. বলেন—এর অর্থ হলো, স্বাভাবিক দিনের পরিবর্তে নববর্ষ হিসেবে আলাদা দিবস উল্লেখ করাটাকে আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু অপছন্দ করেছেন।” [তাশাব্বুহুল খাসিস বিআহলিল খামিস ফি রদ্দিত-তাশাব্বুহি বিল-মুশিরিকিন, পৃ. ৪৯, যাহাবি]

 

তাহলে দেখা যাচ্ছে, এই ঘটনা নববর্ষকে ইসলামিকরণের পক্ষে তো নয়ই; বরং এর বিপরীতে। সুতরাং সারকথা হলো, সাধারণভাবে নববর্ষ পালন করা তো যাবেই না; বরং ‘ইসলামাইজেশনে’র সুরতেও নববর্ষ পালন স্পষ্ট হারাম।

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: