ঘুম থেকে জাগার পরীক্ষিত আমল | আবদুল্লাহ বিন বশির

ঘুম থেকে জাগার আমল
রাতের গভিরতা যত হয়, মাওলা পাকের কাছে গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়াটা ততই সহজ হয়৷ নির্জনে বান্দার কাকুতিমিনতি আল্লাহ খুব পছন্দ করেন। সমস্যায় জর্জরিত জীবনের যেকোনো প্রয়োজন পুরো যেনো বান্দাহ সে সময় করে নেই, তাই নিজেই বান্দাকে ঢাকতে থাকেন। এত গুরুত্বপূর্ণ সেই সময়গুলো খামখেয়ালি আর অলসতায় আমরা কাটিয়ে দেয়৷ রাতের একটি বড় সময় ফেসবুক,মেসেঞ্জার, ওয়াটসএপ আর ইউটিউবে কাটিয়ে দিতে পারি৷ ফেসবুকে দোয়া চেয়ে পোষ্ট আর ডিপ্রেশনের স্ট্যাটাস দিয়ে কিছু উপদেশ আর আশা জাগানিয়া কমেন্ট জুগিয়ে নিতে পারি৷ অতচ অলসতার চাদরটি একটু সরিয়ে নিয়ে দুরাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহ পাকের দরবারে দুটো হাত তুলতে পারছিনা। আরো দুঃখজনক হলো— বিষয়টি বুঝতেও চাইনা৷ এবং অনেকে বুঝিওনা।
এই হলো কিছু ভাইদের সমস্যা। আরো কিছু নামাজি ভাই আছেন যারা তাহাজ্জুদ পড়তে চান কিন্তু ঘুমের দোষে উঠতে পারেননা। যদি বিষয়টি একটি খেয়াল করি তাহলে দেখা যাবে ঘুম থেকেও বেশি দোষ আমাদের গাফলতির। তাই আজ থেকে এই গাফলতির চাদরকে ‘না’ বলে দিন৷ জীবনের সফলতা, গুনাহ মাফ ও উম্মাহের মজলুমদের জন্যে একটি কান্নাকাটি করি।
– ভাই মনে তো চায় প্রতিদিন তাহাজ্জুদ পড়ি। আল্লাহর দরবারে সেজদাহ দিয়ে মনের প্রতিটি আবেগ খুলে বলি৷ কিন্তু কিছুতেই করেই পারছিনা। রাত্রে দ্রুত ঘুমিয়ে যাই। মোবাইলেও দেখা যায় এলার্ম দেই তারপরও উঠতে পারিনা। অনেকসময় তো…
– ফজরও মিস হয়ে যায়?
– জি।
– এই সমস্যা আপনার একার না। আরো বহু মানুষ এই সমস্যার কথা আমাদের কাছে এসে বলে। আপনারা যদি হিম্মত করেন তাহলে আমি আপনাদের একটি পরিক্ষিত আমলের কথা বলতে পারি।
আপনি ঘুমানোর সময় এই আমলটি করে যে সময় উঠার নিয়ত করে শোবেন, আশা করি সে সময়ই উঠতে পারবেন। বহু বুজুর্গ, আল্লাহর ওলিগণ আমলটি করেছেন এবং উপকৃত হয়েছেন। নিকট ও দূর অতিতের বহু আলেমে দ্বীন আমলটিকে একটি পরিক্ষিত আমল বলেছেন।
– জি, অবশ্যই বলেন, ইনশাআল্লাহ আজ থেকেই আমল শুরু করবো।
– আমলটি অত্যান্ত সহজ। অনেকেই জানেন। যারা জানেননা তারা একটু হিম্মত করে মুখস্থ করে নিলেই হবে। খুব কঠিন নয় একদম। একটু শুধু আমলের জযবা ও হিম্মতের প্রয়োজন।আমলটি হলো— ‘সুরা কাহাফের শেষের দুই আয়াত’। এই দুই আয়াত পড়ে আপনি ঘুমাবেন ইনশাআল্লাহ যখন উঠার নিয়ত করে ঘুমাবেন তখনই দেখবেন আপনার চোখ খুলে গেছে। আমলটি শুধু তারের সাথেই নির্দিষ্ট নয় আপনারা যেকোনো সময় চাইলেই আমলটি করতে পারেন।দুপুরে ঘুমিয়েছেন, চাচ্ছেন এক ঘন্টা পর উঠবেন। আমলটি করুন দেখবেন, ফলাফল পেয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ।
আপনাদের হয়তো বিষয়টি একটি কেমন খটকা-খটকা মনে হচ্ছে৷ আচ্ছা, আমি আপনাদেরকে নিকট ও দূরের কিছু আলেমে দ্বীনের এক দুইটি ঘটনা শুনাই।
১.
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের রা.-র কাছে একব্যক্তি এসে বললো— মনে মনে সর্বদাই ইরাদা থাকে রাতে উঠে তাহাজ্জুদ পড়বো৷ কিন্তু ঘুমের প্রবলতার কারনে পারিনা। তার কথা শুনে ইবনে আব্বাস রা. বললেন— যখন তুমি ঘুমাতে যাবে সুরা কাহাফের শেষ দুই আয়াত পড়ে শোবে।এতে তুমি যখনই ঘুম থেকে উঠার ইচ্ছে করবে আল্লাহ তখনই তোমায় জাগিয়ে দিবেন।
(তাফসিরে ছা’লাবির সূত্রে তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন ৫/৬৬৪, আনওয়ার বুক ডিপু দেওবন্দ)
২.
বিশিষ্ট তাবেয়ি যির ইবনে হুবাইশ রহ. বলেন— যে ব্যক্তি সুরা কাহাফের শেষ দুই আয়াত পড়ে ঘুমাবে, সে যে সময় উঠার নিয়ত করবে সে সময়ে জাগ্রত হয়ে যাবে।
(সুনানে দারেমি বর্ণনা নং ৩৭২৭)
৩.
হযরত আবদাহ রহ. বলেন— আমি এই আমলটি পরিক্ষা করেছি এবং উনি যেভাবে বলেছেন ঠিক সেরকমই পেয়েছি৷
( সুনানে দারেমি বর্ণনা নং ৩৭২৮)
৪.
বিশিষ্ট মুহাদ্দিস হযরত জিকরুল্লাহ খাঁন সাহেব দা.বা. কিছুদিন পূর্বে যাত্রাবাড়ী জামিয়াতুল মাআরিফ মাদরাসার উদ্বোধনী দরসে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বয়ানে বলেন— সুরা কাহাফের শেষ দুই আয়াতের এই আমলটি এতটাই পরিক্ষিত যে, আজ পর্যন্ত কেউ এটা করে ভিন্ন কোনো ফলাফল পায়নি৷ এমনকি তোরা যদি মনে কর তিনটা পঞ্চাশ মিনিট পঞ্চাশ সেকেন্ডে উঠতে চাস, দেখবে কোনো অজানা কারণে ঐ সময় তোর চোখ খুলে গেছে। তখন আশপাশে ঘড়ি থাকলে মিলিয়ে নিবি।
৫.
হেফজাখানায় থাকাকালীন সকালের সবক মুখস্থ সবচে বেশি হতো শেষ রাত্রে৷ ছাত্রদের মধ্যে যারা রাত্রে উঠতো, তাদের অধিকাংশকেই অনেকেই বলতো— ভাই আমাকেও উঠিয়ে দিও। তখন এক ছাত্র এই আমলটির কথা বললো একদিন৷ এরপর থেকে আর কখনোই কেউ কাউকে তেমন একটা জাগিয়ে দিতে বলতোনা। বরং নিজেরাই এই দোয়া পড়ে ঘুমাতো আর উঠে যেতো। এমনকি আমি নিজেও যতবার আমলটি করেছি ঐ সময় ঘুম ভেঙ্গে যেতো এটা খুব ভালো করে টের পেতাম।
.
বি.দ্র.
এটা হাদিসে বর্ণিত কোনো আমল নয়। বুজুর্গদের তাজরিবা। এখানে আমি কিতাব ও বর্তমান সময়ের অন্যতম একজন ইলমী ব্যক্তিত্ব ও বুজুর্গ মানুষ হযরত খাঁন সাহেব হুজুরের হাওয়ালায় কথাগুলো বললাম। এবং নিজেও পরিক্ষা করে উপকৃত হয়েছি৷ আশা করি আমাদের তাহাজ্জুদ বা অন্য যেকোনো সময় ঘুম ভাঙ্গানোর নিয়তে পড়লে উপকৃত হবেন৷
তথ্যসূত্র :
=============
১] সুনানে দারেমি।লেখক: আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ আদদারেমি মৃত্যু ২৫৫হি., দারুল বাশায়ের আল ইসলামিয়া, দ্বিতীয় মুদ্রণ ১৪৩৪হি.
২] মাআরিফুল কুরআন লেখক মুফতি শফি রহ. মৃত্যু ১৩৯৬ হি. আনওয়ার বুক ডিপু দেওবন্দ।
৩] মাওলানা জিকরুল্লাহ খাঁন সাহেবের বয়ান। জামিয়াতুল মাআরিফ যাত্রাবাড়ি ইফতিতাহি দরসে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বয়ান৷
৪] বিভিন্ন মানুষের থেকে শোনা তাদের অভিজ্ঞতা।

Facebook Comments