খালকে কুরআন এবং ইমাম আহমাদ রহ. | মাহমুদ সিদ্দিকী

খালকে-কুরআন

সব যুগেই শাসকরা আলিমদেরকে ভয় পেয়ে এসেছে। শরিয়ত বিরোধী কোনো কথা ও কাজ প্রকাশ বা প্রচার করতে তারা আলিমদের ব্যাপারটাকে মাথায় রেখেছে। কারণ, শরিয়ত বিরোধী কিছু হলে সবার আগে তাদের বিরোধিতা করবেন আলিমগণ—একথা যুগে-যুগে সকল শাসকই জানে। এর নজির এখনো বর্তমান। এজন্য নতুন কোনো ফিতনা তৈরি বা প্রচার-প্রসার ঘটাতে তারা দুইটা পথ গ্রহণ করে। ১. আলিমদেরকে সেই মতের সমর্থক বানাতে চেষ্টা করে। ২. না পারলে তাদেরকে নির্যাতন করে দমিয়ে রাখে। কখনো-সখনো নির্যাতনের মাত্রা এতটাই বেশি হয় যে, সকল আলিম বাধ্য হয়ে নীরব হয়ে যান অথবা ভুল মতটাকেই বাহ্যত মেনে নেন। একসময় সুযোগ পেলে সেটা থেকে প্রত্যাবর্তন করেন।

এই কথা উমাইয়া ও আব্বাসি খেলাফতের ক্ষেত্রে যেমন সত্য, মুসলিমদের এই করুণ সময়েও সমানভাবে সত্য।

এই সত্যতা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের দুইশো বছর পরের ইতিহাস থেকে দেখে আসি।

ইসলাম ও মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে যে-কয়েকটি ভয়াবহ রকমের ফিতনা এসেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো—‘খালকে কুরআন’ অর্থাৎ কুরআন নশ্বর না অবিনশ্বর এই প্রশ্নের ফিতনা। কুরআন হলো আল্লাহ তাআলার কালাম। আর, আল্লাহর কালাম মাখলুক নয়। মোটাদাগে এই হলো আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাআতের আকিদা।

কিন্তু অতি উদারমনা জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার পক্ষপাতী মু’তাযিলা প্রভাবিত খলিফা মামুন কুরআনের নশ্বরতার ফিতনা রাষ্ট্রীয়ভাবে শুরু করেন। খলিফা মামুনের অনেক ভালো কীর্তি আছে সত্য, কিন্তু অতি উদারমনা গবেষণার কারণে তিনি বিভিন্ন ফিরকা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। বিশেষভাবে আকিদার ক্ষেত্রে শিয়া, মু’তাযিলা সহ বিবিধ চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। আল্লামা শিবলি নুমানি লেখেন—“সুন্নি ঐতিহাসিকগণ মামুনের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে লেখেন, আফসোস তিনি শিয়া ছিলেন। শিয়ারা বলে, মামুনের শিয়াপ্রীতি মূলত ছিল ধোঁকা। এর মাধ্যমে আলি রেযাকে বশে এনে বিষ খাইয়ে হত্যা করেছেন…আকিদাগত দিক দিয়ে মামুন মাজুনে মুরাক্কাব ছিলেন। অর্থাৎ, অনেক মতবাদ ও আকিদাই তিনি লালন করতেন”। (১)

এই মত প্রকাশ করলে মামুন তোপের মুখে পড়বেন—জানতেন। এজন্য কিছু আলিমের সমর্থন তার প্রয়োজন। প্রথমেই মামুন লোক পাঠান ইয়াযিদ ইবনে হারুনের (২০৬ হি.) কাছে। ইয়াযিদ ইবনে হারুন সেসময়ের একজন গ্রহণযোগ্য আলিম ও মুহাদ্দিস।
বর্ণনাটা মামুনের বিচারপতি কাযি ইয়াহইয়া ইবনে আকসামের (২৪২ হি.) মুখ থেকে শোনা যাক।

“একবার মামুন আমাদেরকে বললেন, ইয়াযিদ ইবনে হারুনের মতো প্রভাবশালী আলিম যদি না থাকত, তাহলে কুরআন নশ্বর এই কথা আমি প্রকাশ করতাম।
-আমিরুল মুমিনিন, ইয়াযদি কী এমন ব্যক্তি যে, তাকে ভয় করে চলতে হবে? সভাসদদের একজন বলে উঠল।
-আরে, আমার আশঙ্কা হলো—এই মত প্রকাশ করলে সে আমার বিরুদ্ধে বলবে, তখন মানুষজন মতবিরোধে লিপ্ত হয়ে পড়বে। এতে করে ফিতনা তৈরি হবে। আর আমি ফিতনা অপছন্দ করি। মামুন জবাব দিলেন।
-তাহলে এক কাজ করি, ইয়াযিদকে বিষয়টা জানাই আমি। উপস্থিত আরেকজন মত পেশ করল।
-হুম, করতে পারো। খলিফা মত দিলেন।

লোকটি ওয়াসেতের উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে গেল। ইয়াযিদ ইবনে হারুনের কাছে পৌঁছে মসজিদে তাঁর কাছে গিয়ে বসল। সে তার বক্তব্য পেশ করল—আবু খালেদ, আমিরুল মুমিনিন আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। তিনি আপনাকে বলছেন—আমি কুরআন নশ্বর একথা প্রকাশ করতে চাই।
-তুমি আমিরুল মুমিনিনের নামে মিথ্যা বলছ। যে-বিষয়ে সাধারণ মানুষের জ্ঞান নেই সে-বিষয় তিনি তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। আর যদি তুমি সত্য বলে থাকো, তাহলে মজলিসের অপেক্ষা করো। লোকজন জড়ো হলে যা বলার বোলো। ইয়াযিদ জবাব দেন।

পরদিন মানুষজন জড়ো হলে খলিফার দূত দাঁড়িয়ে বলে— আবু খালেদ, আমিরুল মুমিনিন আপনাকে সালাম জানিয়েছেন। তিনি আপনাকে বলছেন—আমি কুরআন নশ্বর একথা প্রকাশ করতে চাই। এই বিষয়ে আপনার মতামত কী?

– তুমি আমিরুল মুমিনিনের নামে মিথ্যা বলছ। যে-বিষয়ে সাধারণ মানুষের জ্ঞান নেই সে-বিষয় আমিরুল মুমিনিন তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারেন না। এমন কথা ইতিপূর্বে কেউ বলেওনি।” (২)

প্রথম পদক্ষেপে মামুন ব্যর্থ। এবার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে যান, এই পদক্ষেপে কাজ হবে না। ভিন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। গ্রহণযোগ্য সকল আলিমকে ডেকে পাঠাতে হবে। তারপর আটকে রেখে নির্যাতন করে হলেও এর সমর্থন আদায় করতে হবে। সেই সময়ের শীর্ষ সাতজন আলিমকে ডেকে পাঠান। এবং নির্যাতনের মুখে তাঁদের কাছ থেকে কুরআনের নশ্বরতার পক্ষে মত আদায় করেন। তারপর একের পর এক আলিমদেরকে ডেকে পাঠান

আবু আলি হাম্বল বলেন, “মিহনার জন্য সর্বপ্রথম খলিফার কাছে নিয়ে যাওয়া হয় সাতজনকে। খলিফার পক্ষ থেকে পুলিশপ্রধানের কাছে পত্র আসে—তাদেরকে যেন খলিফার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং এখানে পরীক্ষার মুখোমুখি না করা হয়। নির্দেশ মোতাবেক পুলিশপ্রধান তাদেরকে পাঠিয়ে দেন। রাক্কায় তারা মামুনের সামনে তার মত স্বীকার করে নেন। সেই সাতজন হলেন—ইয়াহইয়া ইবনে মাইন, আবু খাইসামা যুহাইর ইবনু হারব, আহমাদ ইবনু ইবরাহিম দাওরাকি, ইসমাইল জাওযি, মুহাম্মাদ ইবনে সা’দ, আবু মুসলিম আব্দুর রহমান ইবনে ইউনুস মুস্তামলি এবং ইবনু আবি মাসউদ। বাবুল আম্বারে এক সরাইখানায় তারা মামুনের মুখোমুখি হন। এবং মামুনের মত মেনে নিলে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হয়। (৩)

তারপর আহমাদ ইবনে হাম্বল সহ অন্য আলিমদেরকে ডেকে পাঠান। সেই ঘটনার বিবরণ তাঁর পুত্র সালেহ ইবনে আহমাদের মুখ থেকে শোনা যাক।

“তারপর লোকজনকে পরীক্ষার মুখোমুখি করা হতে থাকে। যারা মতগ্রহণ থেকে বিরত থাকে তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়। চারজন ব্যতীত সকল আলিম মামুনের মত স্বীকার করে নেন। সেই চারজন হলেন—আব্বাজান, মুহাম্মাদ ইবনে নুহ, উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর আল কাওয়ারিরি এবং হাসান ইবনে হাম্মাদ সাজ্জাদাহ। পরবর্তীতে উবাইদুল্লাহ ইবনে উমর এবং হাসান ইবনে হাম্মাদও স্বীকার করে নেন। কারাগারে রয়ে যান কেবল দুইজন, আব্বাজান ও মুহাম্মাদ ইবনে নুহ”।

পরবর্তীতে তারাসুস থেকে খলিফার পত্র আসে এই দুজনকে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে। রওয়ানা হলে খলিফার মৃত্যু সংবাদ আসে। রাক্কা থেকে ফেরার পথে মুহাম্মাদ ইবনে নুহ ইন্তেকাল করেন। (৪)

খলিফা মামুনের মৃত্যুর পর এই ফিতনাকে জঘন্য রূপ প্রদান করেন মামুনের ভাই খলিফা মু’তাসিম বিল্লাহ। মামুন যতটা না নির্যাতনের পথ বেছে নিয়েছিলেন, মু’তাসিম বেছে নিয়েছিলেন তারচেয়ে বহুগুণ বেশি। আহলুস সুন্নাহর ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলকে দলবেঁধে নির্যাতন করেছেন বিদআতি বলে। মু’তাসিমও ভেবেছিলেন, নির্যাতনই একমাত্র পথ তাদেরকে ফিরিয়ে দেওয়ার। কিন্তু শত নির্যাতনের পরও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. বিন্দুমাত্র টলেননি। পাহাড়ের মতো অটল ছিলেন নিজের মতের ওপর।

এটাই যুগে-যুগে হয়েছে। সকল নির্যাতনের মুখে যখন প্রায় সকল আলিম নীরব হতে বাধ্য হয়েছেন, তখন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের মতো কেউ-কেউ শরিয়ত ও ইসলামের পক্ষে পর্বতসম দৃঢ়তা নিয়ে অটল ছিলেন।

আলি ইবনুল মাদিনি। হাদিস জগতের শীর্ষ আলিম। হাদিস চর্চার যখন স্বর্ণযুগ, তখন তাঁর মজলিসে থাকত ছাত্রদের ভিড়। তাঁর সময়ে মুসলিম বিশ্বের শীর্ষ আলিমদের একজন। ইন্তেকাল করেছেন ২৩৪ হিজরিতে। আলি ইবনুল মাদিনিও নির্যাতনের মুখে মামুনের মত মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ওই মুহূর্তে ইমাম আহমাদ ছাড়া এই আকিদার কথা কেউ মুখ ফুটে বলতে পারছিলেন না। কিন্তু ইমাম আহমাদ নির্যাতন সয়েও সত্যটা বলে গেছেন বারবার।

তাঁর এই দৃঢ়তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি ছিল উম্মাহর জন্য তার আঁচ পাওয়া যায় আলি ইবনুল মাদিনির বক্তব্যে—“সন্দেহ নেই, আল্লাহ তাআলা এই দ্বীনকে এমন দুজন ব্যক্তির দ্বারা সম্মানিত করেছেন, যাদের পর্যায়ের তৃতীয় কেউ নেই। আবু বকর সিদ্দিক রাযিয়াল্লাহু আনহুর দ্বারা ইরতেদাদের ফিতনার কালে এবং আহমাদ ইবনে হাম্বলের দ্বারা মিহনার কালে”। (৫)

ইবনুল মাদিনি আরেকদিন বলেন, নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর আহমাদ ইবনে হাম্বলের মতো আর কেউ দ্বীনের এত গুরুভার দায়িত্ব পালন করেননি। মাইমুনি জানতে চান—আবুল হাসান, আবু বকর সিদ্দিক রা.ও নন? ইবনুল মাদিনি উত্তর দেন—আবু বকর সিদ্দিক রা.-এর তো সঙ্গীসাথি ও সহযোগী ছিলেন; কিন্তু ইমাম আহমাদের কোনো সঙ্গীসাথি বা সহযোগী ছিল না। (৬)

আব্দুল গনি মাকদিসির উস্তাদ, ৫৫২ হিজরিতে ইন্তেকাল করা হিলাল ইবনুল আলা আরও চমৎকার কথা বলেছেন—“আল্লাহ তাআলা চারজন ব্যক্তিকে পাঠিয়ে এই উম্মাহর প্রতি অনুগ্রহ করেছেন। তাঁদের একজন হলেন আহমাদ ইবনে হাম্বল। মিহনার সময় হকের ওপর অটল ছিলেন। যদি ইমাম আহমাদ না হতেন, তাহলে সকল মানুষ কাফির হয়ে যেত…” (৭)

অন্য আলিমগণ এক্ষেত্রে মাযুর ছিলেন। রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের সামনে তারা অসহায় ছিলেন। পরবর্তীতে মুতাওয়াক্কিলের সময় যখন এই ফিতনা স্তিমিত হতে থাকে, তখন অনেকেই প্রকাশ্যে রুজু করেন। কিন্তু ইমাম আহমাদ ছিলেন অটল-অবিচল। আল্লাহ তাআলা ইমাম আহমাদের এই কুরবানির ফলাফল আমাদের সামনে রেখেছেন। ইতিহাসে ‘খালকে কুরআনের’ প্রবক্তারা বাতিল হিসেবে প্রমাণিত হয়ে গেছে।

সূত্র :
(১) ইতিহাসের দর্পণে খলিফা আল-মামুন পৃ. ২০৯, দারুল ওয়াফা, ২০১৯
(২) মিহনাতুল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, পৃ. ৩৯, আব্দুল গনি মাকদিসি, দার হিজর, ১৪০৭
(৩) মিহনাতুল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, পৃ. ৪০-৪১, আব্দুল গনি মাকদিসি, দার হিজর, ১৪০৭
(৪) সিরাতুল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, পৃ. ৪৯-৫০, দারুস সালাফ, ১৪১৫ হি.; মিহনাতুল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, পৃ. ৪২-৪৩, আব্দুল গনি মাকদিসি, দার হিজর, ১৪০৭
(৫) মিহনাতুল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, পৃ. ৩১, আব্দুল গনি মাকদিসি, দার হিজর, ১৪০৭
(৬) মিহনাতুল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, পৃ. ৩১, আব্দুল গনি মাকদিসি, দার হিজর, ১৪০৭
(৭) মিহনাতুল ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, পৃ. ৩০, আব্দুল গনি মাকদিসি, দার হিজর, ১৪০৭

Facebook Comments