আত্মশুদ্ধি

সুন্নাত ও বিদআত-৩ | আল্লামা ইউসুফ লুধিয়ানভী রহ.

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

৭. হয়তো আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, মানুষ কেন দ্বীনে শরিয়তের মাঝে নতুন নতুন বিদআত তৈরি করে? আল্লাহর ভয় কেন তাদেরকে এই নিকৃষ্ট কাজ থেকে বিরত রাখে না?
এই প্রশ্নের উত্তর বোঝার জন্যে কেন মানুষ বিদআত তৈরিতে উদ্বুদ্ধ হয়, এর কিছু কারণ সংক্ষিপ্তভাবে আরজ করা সমীচীন মনে করছি।

১. বিদআত তৈরির প্রথম কারণ হলো ‘অজ্ঞতা’।
প্রত্যেকটি বিদআতের মাঝে বাহ্যিক সৌন্দর্য থাকে। আর মানুষ বাহ্যিক আকার-আকৃতির সৌন্দর্য দেখে তাতে মুগ্ধ হয়ে যায়। এবং নিজ থেকেই মনে মনে একটি ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফেলে, এত সুন্দর একটি কাজে শরিয়ত কেন নিষেধ করবে? ব্যস, বাহ্যিক সৌন্দর্য আর নিজের পছন্দ, এই দুই বস্তুকে ভালো-মন্দের মাপকাঠি বানিয়ে মানুষ বিদআতে লিপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু ঐ কাজের বাস্তবিক যে নিকৃষ্টতা আর ভয়াবহতা, তা আর নজরে পড়ে না।

এর উদাহরণ অনেকটা এমন, কুৎসিত চেহারার এক কুষ্ঠরোগীকে সুন্দর জামা-কাপড় পরিয়ে দেওয়া হলো। ঐ রোগীর আসল অবস্থা যারা জানে না, তারা যখন দূর থেকে তাকে দেখবে, সুন্দর পোশাকের বাহ্যিকতায় তারা মুগ্ধ হয়ে তার দিওয়ানা হয়ে যাবে৷

সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বাহ্যিকতার মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে। নবিজির সুন্নাতের প্রতি তাদের মহব্বত-ভালোবাসা ততটা থাকে না, যতটা কুসংস্কার, কল্পকাহিনি ও বাহ্যিক চাকচিক্যে ভরা বিদআতের প্রতি থাকে।
সাধারণ মানুষের এই আন্তধর্মী দুর্বলতার কথা যাদের জানা আছে, তারা বিদআতকে বাজারজাত করার একটি প্রস্তুতকৃত ফর্মুলা পেয়ে যায়।

২. শয়তানের ধোঁকা ও প্ররোচনা।
মুসলিম মাত্র এই কথা জানে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত দ্বীন ও সুন্নাতের সবচে বড় শত্রু হলো শয়তান। শয়তান এই কথা খুব ভালো করে জানে, বনি আদমের জান্নাতের একমাত্র রাস্তা হলো সুন্নাতের অনুসরণ। অনেক চেষ্টা-তদবিরের পর একজন মানুষকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে সে গুনাহর কাজে লিপ্ত করে। কিন্তু গুনাহের অনুতপ্ততার আছর বান্দার অন্তর থেকে বের করতে পারে না। আর বান্দা যখন এই অনুতপ্ততা নিয়ে আল্লাহর কাছে খাঁটি মনে তাওবা করে, তখন তার সমস্ত চেষ্টা বৃথা হয়ে যায়।

হাদিস শরিফে এসেছে, শয়তান যখন আল্লাহর দরবার থেকে বিতাড়িত হলো, তখনই অভিশপ্ত কসম খেয়ে বলেছে, হায় আল্লাহ! আপনি এই আদমের কারণে আমায় বঞ্চিত করলেন? আমি কসম করছি, আমরণ আমি তার সন্তানদের পথভ্রষ্ট করে যাব। এই কথার জবাবে আল্লাহ তায়ালাও কসম করে বলেছেন, আমার বান্দা যত বড় গুনাহই করুক, যখন সে খাঁটি মনে আমার কাছে গুনাহ মাফের জন্যে তাওবা করবে, আমি তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিবো।

মোটকথা, তাওবা-ইস্তেগফার শয়তানের কোমর ভেঙে দেয়। কোনো মানুষকে দিয়ে সে বড় বড় গুনাহ করিয়েও এই আশঙ্কায় ভুগতে থাকে, হয়তো সে এখনই তাওবা করে সমস্ত গুনাহ থেকে পবিত্র হয়ে যাবে।
তাই শয়তান বিদআতের মতো চিন্তাহীন এক বিপদজনক পথ আবিষ্কার করেছে, যাতে লিপ্ত ব্যক্তির তাওবার অনুভূতি কখনো তৈরি হয় না।

শয়তান সমস্ত শয়তানি কাজের উস্তাদ। মিথ্যাকে সত্য, ভালো কাজকে খারাপ করার এত বেশি অপব্যাখ্যা ও পদ্ধতি তার জানা আছে যে, মির্জা গোলাম কাদিয়ানি ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গ পর্যন্ত শয়তানকে তাদের গুরু মানতে বাধ্য হয়েছে। প্রত্যেক মানুষের মনস্তত্ত্ব তার জানা আছে। প্রত্যেক শ্রেনী, দল, ব্যক্তিকে সে তার নিজস্ব আন্দাজে গোমরাহ করে থাকে। যেমন বর্তমান পৃথিবীতে অপপ্রচার ও প্রোপাগাণ্ডার শক্তি দিয়ে সত্যকে মিথ্যা, অত্যাচারীকে নিরপরাধ ও নিরপরাধকে অত্যাচারী, হক্বকে বাতিল আর বাতিলকে হক্ব বানিয়ে ফেলা হয়। এটা শয়তানের শয়িতানির ছোট একটি নমুনা মাত্র।

আমি এই কথা ভেবে পেরেশান হয়ে যাই, সূর্যের আলো থেকেও সুস্পষ্ট প্রমাণিত বিষয়কে মানুষ কত নির্লজ্জভাবে অস্বীকার করে বসে। আর সে সম্পর্কে সন্দেহের ফাইল খুলে বসে। কিন্তু যে সমস্ত কথা-কাজ দ্বীনের বিপরীত, এমনকি জ্ঞান-বুদ্ধি ও বিবেকেরও পরিপন্থী, একটি ছোট বাচ্চাও যা বুঝতে পারে, এরকম বিষয়গুলোকেও লোকেরা কুরআন-হাদিস খুলে দ্বীন-শরিয়তের অন্তর্ভুক্ত করার কাজে লিপ্ত থাকে। এখন এটাকে শয়তানের ধোঁকা ছাড়া আর কী নাম দেওয়া হবে? কুরআন শরিফে এই বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে বলে দিয়েছে,
زين لهم الشيطان أعمالهم
শয়তান তাদের সামনে তাদের আমলসমূহকে সুশোভিত করে তোলে।

খোলাসা কথা হলো, দ্বীনের বিষয়ে মানুষের মনে সংশয়-সন্দেহ তৈরি করা এবং নতুন নতুন চিন্তাগত,আদর্শগত ও কর্মগত বিভিন্ন বিদআত তৈরি করে মানুষের দৃষ্টিতে তা সুসজ্জিত করে তোলা শয়তানের এমন এক হাতিয়ার, যা দিয়ে সে নিশ্চিন্তমনে মানুষকে গোমরাহ কর‍তে পারে।

‘শয়তানের ধোঁকা’ বিষয়ে অনেক বড়-বড় কিতাব লেখা হয়েছে। ইমাম গাজালি, ইবনুল-কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ ও ইমাম শা’রানি রহ.-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

৩. দুনিয়ার মহব্বত ও জনপ্রিয়তার ধান্ধা।
এটা একটা স্বভাবজাত বিষয় যে, নতুন নতুন বস্তুতে আকর্ষণ থাকে। যেকোনো পুরাতন বিষয়কে একটু নতুন শিরোনামে সামনে আনলে তাতে হুমড়ি খেয়ে পড়তে থাকে।

জনপ্রিয়তারা ধান্ধায় থাকা এই সমস্ত রোগিরা নিজের স্বার্থ উদ্ধারে দ্বীনের নামে বিভিন্ন বিষয়কে নব্য আকৃতিতে সামনে নিয়ে আসে। হাদিস শরিফে বিষয়টি এভাবে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘শেষ জামানায় বহু মিথ্যুক ধোঁকাবাজের আবির্ভাব হবে, যারা তোমাদেরকে দ্বীনের নামে এমন কিছু শোনাবে, যা ইতিপূর্বে না তোমরা শুনেছো, না তোমাদের বাপ-দাদারা শুনেছে! তোমরা তাদের থেকে বেঁচে থাকো, যাতে তারা তোমাদের ফিতনায় নিপাতিত করে পথভ্রষ্ট করতে না পারে।
(আল-হাদিস)

৪. অন্য ধর্মাবলম্বীদের অনুসরণ।
মানুষ্য সভ্যতা ও পরস্পর জীবনাচারের একটি স্বভাবজাত মূলনীতি হলো, যখন তা বিভিন্ন সভ্যতার মানুষদের সাথে মিশতে থাকে, তখন নিজেদের মনের অজান্তেই একে অপরের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যায়। আর যে সম্প্রদায় নিজ সভ্যতা ও তাহজিবের সংরক্ষণে গুরুত্ব দেয় না, তারা নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে। বিশেষ করে পরাজিত সভ্যতা বিজিত সভ্যতার হাতে ধীরে ধীরে বিলিন হয়ে যেতে থাকে।

মুসলমানরা যতদিন বিজিত ছিল ও নিজেদের সভ্যতা ও সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যসমূহের রক্ষণাবেক্ষণে সচেষ্ট ছিল, ততদিন তারা অন্য সভ্যতার উপর প্রভাব বিস্তার করে গিয়েছে। কিন্তু যখন তাদের ইমানি তাপ ঠাণ্ডা হয়ে গেল, দিলের জ্বলন্ত অঙ্গার নিভে যেতে লাগল, মুসলিম সভ্যতা হিসেবে নিজেদের স্বভাব, সভ্যতা ও বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণে অনাগ্রহী হয়ে পড়ল, তখন ধীরে ধীরে অন্য সভ্যতা ও সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পড়ল। হালযামানায় ইংরেজি সভ্যতায় প্রভাবিত হওয়া এই কথার অনেক একটি বাস্তব প্রমাণ।

এই আজনবি সভ্যতা গ্রহণের কখনো ফলাফল এই দাঁড়াতে লাগল, অন্য ধর্মালম্বীদের রুসুম-রেওয়াজ দ্বীনী রূপ ধারণ করতে লাগল। এবং তার বৈধতা প্রমাণের জন্যে দলিল-দস্তাবেজ বের করা শুরু হয়ে গেল।

মুসলম ভূখণ্ডে ভিন্ন-ভিন্ন বিদআত প্রচলনের এটাই হলো আসল রহস্য। উপমহাদেশে যে সমস্ত বিদআতের প্রচলন রয়েছে তা আরব দেশগুলোতে নেই। তদ্রুপ মিশর-শামের বহু বিদআত উপমহাদেশে প্রচলিত হতে পারেনি।

ভারত উপমহাদেশে ইসলাম অনেক দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু আফসোস, এসমস্ত নওমুসলিমদের মাঝে দ্বীনি ইলম ও ইসলামি তারবিয়াত সেভাবে হয়ে উঠেনি। এই জন্যে সনাতন বা হিন্দু ধর্ম ছেড়ে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারা পূর্বের ধর্মের রসম-রেওয়াজ পরিপূর্ণ ছাড়তে পারেনি। বরং হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথে প্রচুর উঠবস করার কারণে যারা উপমহাদেশের বাহির থেকে এখানে এসেছে তারাও হিন্দুদের বিভিন্ন রসম-রেওয়াজে লিপ্ত হয়ে গিয়েছে।

যেমন মুসলিম বিয়ে-শাদিতে যে সমস্ত শরিয়ত বহির্ভূত কর্মকাণ্ড প্রচলিত আছে, তা সব হিন্দু ধর্ম থেকে আমদানিকৃত রোগ-জীবাণু।
মাওলানা উবাইদুল্লাহ মালিরকোটলায়ি ‘তুফাতুল হিন্দ’ নামক কিতাবে এই বিষয়ে চমৎকার আলোচনা করেছেন।

আল্লাহর কাছে পানাহ চাই, আমার উদ্দেশ্য এই নয় যে, হিন্দ উপমহাদেশে মুসলমানদের সকল কাজকর্ম হিন্দুয়ানা। এবং আমি এটাও বুঝাইনি—এতদঞ্চলের সমস্ত মুসলমান তাতে লিপ্ত ছিল। বরং আমার উদ্দেশ্য হলো ঐ সমস্ত রসম ও অভ্যাস, যেগুলোর কোনো দলিল শরিয়তে নেই; শুধু হিন্দু ধর্মীয় জীবনে যার প্রমাণ রয়েছে।

এমন অনেক এলাকা ছিল, যেখানে হিন্দুরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ আর মুসলমানরা ছিল সামান্য সংখ্যক। আর এই সমস্ত মুসলমানদের জন্যে সহজে ইসলামের শিক্ষা ও তরবিয়াত সম্ভবপর ছিল না৷ তাদের নাম পর্যন্ত হিন্দুয়ানী থাকত। তারা মাথায় ঝুটি পর্যন্ত রাখত৷

তো এই সমস্ত মানুষরা বিদআতে লিপ্ত না হয়ে আর কি বা করতে পারতো! এ থেকে অন্য ভূখণ্ডের পরাজিত মুসলমানদের অবস্থা কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যায়। যেহেতু এই সমস্ত রসম-রেওয়াজ তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে, তাই ইসলামের সঠিক শিক্ষা তাদের কাছে নতুন মনে হতে লাগল। অনেক মহিলা এমনকি জ্ঞানহীন মুর্খ পুরুষদেরকে ইসলামের বিভিন্ন মাসআলা বলা হলে, তখন বলতে শোনা যায়, ‘নতুন নতুন মোল্লা হয়ে নতুন নতুন মাসআলা বলে’! অথচ হিন্দুদের সাথে উঠা-বসা আর চলাফেরাতে তারা যে সমস্ত রসম-রেওয়াজ পৈত্রিকসূত্রে পেয়েছে তা একটি স্বতন্ত্র ধর্মের রূপ নিয়েছে। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা, যা থেকে তারা জীবনভর অজ্ঞ ও উদাসীন ছিল, তাই তাদের নিকট নতুন ধর্ম হয়ে গেছে!!

এই ছিল কিছু ‘আসবাব’ যা ইসলামী জীবনে বিদআতের অনুপ্রবেশের মূল কারণ ছিল। আমার আফসোস হলো, এখানে দোষ সাধারণ মানুষ থেকে ঐ সমস্ত আলেমদের বেশি, যারা ইসলামের মধ্যে বিদআতের বিষকে নিঃশেষ করার পরিবর্তে তাতে গা ভাসিয়ে দেওয়াকে নিজেদের হেকমত ভেবে বসেছিল।

মূলঃ আল্লামা ইউসুফ লুধিয়ানভী রহ
অনুবাদঃ আব্দুল্লাহ বিন বশির

আগের পর্বঃ

সুন্নাত ও বিদআতের পরিচয় : কিছু মৌলিক কথা-১

সুন্নাত ও বিদআত : কিছু মৌলিক কথা-২

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: