আত্মশুদ্ধি

সুবাস জড়ানো অলিন্দে-৩ | আহমাদ সাব্বির

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

২১,
রাসুলের অনুসারী, সাহাবায়ে কেরাম ছিলেন খোদাভীতির উৎকৃষ্ট আদর্শ৷ পরবর্তীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে খোদাকে তদ্রুপ ভয় করবার জন্যে যেরূপে ভয় করতেন তারা৷ আর এই বিরলপ্রজ তাকওয়া তারা অর্জন করেছিলেন জগতের শ্রেষ্ঠ মানব মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সংস্পর্শে; পৃথিবী যার চে’ ‘সত্যবাদী’ পায়নি কো আর৷

২২,
এটা কোন অসাড় দাবী নয়— রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র সংস্পর্শে তৈরি হয়েছিল সাহাবাদের যে দল তারচে’ অধিক খোদাভীরু আর কাউকে দেখবে না পৃথিবী৷

২৩,
এই নশ্বর পৃথিবীর কোন মূল্য ছিল না তাদের চোখে৷ তাদের হৃদয়ে সদা জাগরূক থাকতো— মরেই তো যেতে হবে একদিন৷ গিয়ে দাঁড়াতে হবে মহান প্রভুর সমুখে৷ এই জীবন কিছুই নয়৷ মৃত্যুর পর যে জীবন সেটাই অনন্ত৷ কী হবে এই নশ্বর জীবনের মোহে পড়ে সেই অনন্ত জীবন ভুলে থেকে! কী হবে মহান প্রভুর সম্মুখস্থ দাঁড়াবার কথা ভুলে প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে জীবন অতিবাহিত করে!

২৪,
এই যে ভয়— যা সন্ত্রস্ত করে রাখতো সর্বদা নবিজীর সাহাবাদের সেই ভয়-কাতরতা তাদের হৃদয়ে বাসা বেঁধেছিল রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরই পবিত্র সান্নিধ্যে৷ সামান্য ক’টা দিন তারা পেয়েছিলেন তাঁকে৷ সেই সামান্য দিনের সংস্পর্শেই এমন তাকওয়া তারা হৃদয়ে ধারণ করে নেন যা পরবর্তী সকলের জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত৷

২৫,
কেবল বই পত্তরের পৃষ্ঠা উল্টে কিংবা সভা-সেমিনারে চিত্তাকার্ষক বক্তব্য শুনে এই তাকওয়া অর্জিত হয় না৷ তাকওয়ার নির্যাস দিয়ে হৃদয়কে ভেজাতে হলে তাওহীদের কালিমা ও তার দাবী জীবনে চিত্রায়ণ করে এমন খোদাভীরুর সংস্পর্শে যেতে হয়৷ তার সান্নিধ্যে কিছুকাল থেকে গভীরভাবে দেখতে হয় তার জীবনাচার৷ রোনাজারী শিখতে হয় তার শেষ রাতের ফরিয়াদ থেকে৷ ইবাদাতের একাগ্রতা শিখতে হয় তার ইবাদাতের আন্তরিকতা দেখে৷ কেমন তার হেঁটে চলা, কেমন তার কথা বলা, কেমন তার হাসি, কেমন তার কান্না— সবকিছু অনবরত দেখে যেতে হয় পাশে থেকে; গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে৷ তাকওয়া অর্জনের পন্থা এটাই৷ এভাবেই যুগে যুগে তাকওয়ার স্থানান্তর ঘটেছে হৃদয় থেকে হৃদয়ে৷

২৬,
প্রায়শঃই একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় আমাকে— বর্তমান সময়ে এমন ‘সত্যবাদী’ কোথায়? কোথায় সে জন যে পূর্ণতা দানে সচেষ্ট রবের সাথে কৃত তাবৎ অঙ্গিকারের? কালিমার দাবী পূরণ করছে এমন পাই না তো খুঁজে কাউকে! কোথায় সে জুনায়েদ বাগদাদী যার এক দৃষ্টিপাতে জীবনের মোড় বদলে যায়! কোথায় সেই শিবলী যার ক্ষণিকের সান্নিধ্যে অতিশয় গোনাহগারও রূপান্তরিত হয়ে যায় পরশ পাথরে! এখন তো সর্বত্র ভেজালের ছড়াছড়ি৷ এর মধ্যে কোথায় পাব আমি সেই পবিত্র-হৃদয় ‘সত্যবাদী’কে যার সংস্পর্শ আমার জীবন আমূল বদলে দেবে!

২৭,
আমার শ্রদ্ধেয় পিতা তার জীবদ্দশায় অসংখ্যবার প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়েছেন৷ এবং বোধ করি— সব যুগেই প্রশ্নটি উচ্চারিত হয়েছে, গোচরে কিংবা অগোচরে৷ আমার শ্রদ্ধেয় আব্বাজান বলতেন— মানুষ খুবই আজিব এক প্রাণি৷ সে নিজে গোণাহের অতলান্তিক সমুদ্রে আছে ডুবে; তার একটি মুহূর্ত অতিক্রান্ত হয় না গোনাহের সঙ্গ ছাড়া; পাপাচার যার কাছে নিত্যকার খানা-খাদ্য গ্রহণের মতো স্বাভাবিক সেও সান্নিধ্য গ্রহণের জন্য ‘সত্যবাদী’ খোঁজে জুনায়েদ বাগদাদীর মতো৷ সেও আত্ম-সংশোধনের জন্য ‘মুরশিদ’ কল্পনা করে বায়েজীদ বোস্তামি কোনো৷ অথচ তার কর্তব্য ছিল— তার স্তরের কোন মুরশিদ খুঁজে নেয়া৷ যেমন রূহ ফেরেশতাও তো সেই স্তরেরই হওয়া চাই!

২৮,
খাদ্যের বেলায় তো আমরা এ কথা বলে বসে থাকি না৷ সর্বত্র ভেজালের ছড়াছড়ি— তাই বলে তো আমরা শুদ্ধতার অনুসন্ধানে নিবৃত্ত হই না৷ দূর দূরান্তে লোক পাঠিয়ে খাঁটি গাওয়া ঘি আনিয়ে রসনাকে তৃপ্ত করি৷ কোথায় ‘পিওর’ মধু পাওয়া যাবে তার সন্ধানে তাবৎ মাধ্যম ব্যয়িত করি৷ শত মাইল পেরিয়ে, শত বাঁধা মাড়িয়ে গোয়ালার দুয়ারে গিয়ে হাজির হই এক পেয়ালা বিশুদ্ধ দুধে চুমুক দিতে৷ এই ভেজালের জামানায়ও শুদ্ধতা খুঁজে নিতে আমরা সাধ্যাতীত পরিশ্রম স্বীকার করে নিই৷ সবই করি পাকস্থলির সুস্থতার জন্যে; শরীরের ‘সংশোধনে’র জন্যে৷ তবে আত্মার সংশোধনে কেন নয়! কেন আত্মার শুদ্ধি করণের জন্য ‘নির্ভেজাল মুরশিদ’ আমি খুঁজে নেব না৷ কেন একজন ‘সত্যবাদী’র অন্বেষায় আমি মাড়াবো না শতেক মাইল পথ!

২৯,
সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করে যদি নাইবা পাওয়া যায় তেমন কোনো সত্যবাদী যার হাতে হাত রেখে ‘দুনিয়া’ ভুলে যাওয়া যায়৷ যার সান্নিধ্যে কিছুকাল অতিক্রান্ত করলে ‘আখেরাত’ চিন্তায় ব্যাকুল হয়ে ওঠে হৃদয়, তবে, মসজিদের মুয়াজ্জিনকে বেছে নিতে হবে৷ তার সান্নিধ্যেই অতিবাহিত হোক জীবনের কিছু সময়৷ সে দৈনিক পাঁচবার আল্লাহর নাম সুউচ্চ কণ্ঠে উচ্চারণ করে, সে মানুষকে আহ্বান করে চির কল্যাণের দিকে, মহান সফলতার দিকে তার সান্নিধ্য ব্যর্থ হবার নয়৷ আত্মার সংশোধন তার সংস্পর্শেও হতে পারে৷

৩০,
তবে, সান্নিধ্য গ্রহণের জন্য কোনো মহৎ-প্রাণ ‘সত্যবাদী’র সন্ধান মিলবে না— এমন হবার নয়৷ যার সংস্পর্শ গোনাহের সমুদ্রে আকণ্ঠ নিমজ্জিত ব্যক্তির নসীব বদলে দিতে পারে; জীবনের বাঁক ঘুরিয়ে দিতে পারে যার নরোম কোমল স্পর্শ— এমন ‘মানুষ’ পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত থাকবে৷ আমাদের একটু উদ্যোগী হয়ে খুঁজে নিতে হবে, এই যা! আত্মার সংশোধনের জন্য এতটুকু পরিশ্রম তো করতেই হয়! এবং সে পরিশ্রমটুকু আমাদের করতেই হবে৷

চলবে…(ইনশাল্লাহ)

সুবাস জড়ানো অলিন্দে ১ম পর্ব

সুবাস জড়ানো অলিন্দে ২য় পর্ব

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: