ঈদসংখ্যা ২০২০

খন্দকের যুদ্ধ | সাদিক ফারহান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

সত্যের সন্ধানে বাড়িঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে এক যুবক। পথে এক বাণিজ্যিক কাফেলায় যুক্ত হয়ে ভারাক্রান্ত ভাবুক মনে সে এগিয়ে চলছে অজানার পথে। পারস্যের বালু-মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়া ধনাঢ্য পরিবারের ছেলেটি যে কাফেলার পায়ে পা মিলিয়ে চলছে ধীরস্থির—তারা আরবের বেদুইন। সত্যের তালাশে অধীর হয়ে থাকা যুবকটির হৃদয়ের আর্তি, হয়ত আল্লাহ কবুল করে নিয়েছিলেন। মোটা খদ্দর পরিহিত সাধারণ আরবদের এই সঙ্গযাত্রাই মূলত, তার সত্যের স্বর্গযাত্রা হতে যাচ্ছে।

কিন্তু কাফেলার কিছু বিশ্বাসঘাতকের নজর পড়ে সুদর্শন সুঠাম এই পারস্য যুবকের প্রতি। তারা গন্তব্যে নেমে মদিনার বাজারে তাকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়। সত্যানুসন্ধানী রাজপুত্রের কপালে জোটে নির্মম দাসবৃত্তি। কিন্তু মনিবের বাড়িতে কদম রেখে তার আক্ষেপ কেটে যায়। পাথুরে ভূমির বুক চিরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা খেজুরবাগানে ভরা এ জনপদ তার চিরপরিচিত মনে হয়। এই জনপদের খোঁজেই তো তিনি বের হয়েছিলেন। এ তো তার স্বপ্নে পাওয়া সত্যের সেই পুণ্যময় ধন্যভূমি!

বাবার চোখের শীতলতা হিসেবে বেড়ে ওঠা ছেলেটি শৈশবের সত্যের জন্য আকুল হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ধর্মের বিভিন্ন মান্যজনের দুয়ারে ধর্ণা দিয়ে তিনি নিজের ভেতর সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্ব তৈরি করেন। অগ্নিপূজারী বাবা সেটা অনুভব করতে পেরে ছেলেকে শেকলবন্দি করে ফেলে রাখে। কিন্তু তিনি সেখান থেকে পালিয়ে খ্রিষ্টান গির্জায় আশ্রয় নেন এবং ধর্মযাজকদের নৈতিক স্খলনচিত্র কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেন। সেখানকার একজন সৎ ধর্মগুরুই তাকে সত্যের দিশা দেন, তার চোখে তুলে দেন শেষনবীর সাহচর্যের স্বপ্ন। তারপর থেকে বছরের পর বছর কেটে গেছে যাযাবর হয়ে, নীরব প্রতীক্ষায়।

কিন্তু তার সে প্রতীক্ষা বৃথা যায় নি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আহুত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সভায় তিনি বসে আছেন সালমান ফারসি হয়ে হয়ে। রাসুল ভালোবেসে তাকে সালমান আল খায়র বলে ডাকতেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পূর্বে তার নাম ছিল মাবিহ ইবনে বুজখশান। সালমান ছিলেন নবীজির অন্যতম বন্ধু এবং নিকটতম সাহাবি। ধর্মতত্ত্ব, যুদ্ধ ও রাষ্ট্রবিদ্যায় তিনি অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। রাসুলের সাথে কথা বলতে বসলে দুজনে এ-কথা সে-কথায় সারারাত পার করে দিতেন। আম্মাজান হজরত আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা বলেন : ‘রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেদিন রাতে সালমানের সাথে নিভৃতে আলোচনা করতে বসতেন, আমরা তাঁর স্ত্রীরা ধারণা করতাম, সালমান হয়তো আজ আমাদের রাতের সান্নিধ্যটুকু কেড়ে নেবে।’

ঘটনার অনুঘটক 

মদিনাবাসী ইহুদিদের শাখা গোত্র বনু নাযিরকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দেশান্তর করে দিলে তারা খাইবারে গিয়ে শেকড় গাড়ে। এর কিছুদিন পর ইহুদিদের একটি প্রতিনিধি দল অনিষ্ট চিন্তার বিনিময় ঘটাতে মক্কা মুকাররমায় যায়। এ-দলে উল্লেখযোগ্য যে-সব ইহুদিরা ছিল, তারা হলো : বনু নাযির গোত্রের কিনানা ইবনুর রাবি ইবনু আবিল হুকাইক, সাল্লাম ইবনু মিশকাম, হুয়াই ইবনু আখতাব; এবং বনু ওয়ায়েল গোত্রের হাওযাহ ইবনু কাইস এবং আবু আম্মার। এরাই ছিল আহযাব বা খন্দক যুদ্ধের মূল হোতা। এরা যুদ্ধের জন্য ইহুদিদের মধ্যে দল গঠন করেছে, তাদেরকে আহ্বান করেছে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে সমবেত করেছে। এরপর বনু নাযির এবং বনু ওয়ায়িল গোত্রের লোকদের নিয়ে রওনা করেছে মক্কায়। সেখানে তারা কুরাইশদেরকে রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য উস্কে দেয়। এবং তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে যুদ্ধে অংশ নিলে, নিজেদের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাসও প্রদান করে। মক্কাবাসিরা তাদের এমন আহ্বানে সানন্দে সাড়া দেয়।

মক্কার দিকটা যুদ্ধের পক্ষে সম্মত রেখে ইহুদিদের এই দল গাতফান গোত্রে হাজির হয়। তাদেরকেও মক্কাবাসীর মতো একই কাজের আহ্বান জানায় এবং তারাও, কুরাইশদের মতো এদের ডাকে সাড়া দেয়। এরপর চূড়ান্ত পর্যায়ে আবু সুফিয়ান ইবনু হারবের নেতৃত্বে কুরাইশরা মদিনার দিকে যাত্রা করে। অন্যদিকে ফাযারাহ গোত্রের সর্দার উয়াইনা ইবনু হিসন ইবনু হুযাইফা ইবনু বাদর আল-ফাযারি, বনী মুররা গোত্রের প্রধান হারিস ইবনু আওফ আল-মুররি এবং আশজায়িদের গোত্রপতি মাসউদ ইবনু রাখিলার নেতৃত্বে বনু গাতফানও মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য বের হয়ে যায়। এভাবে আবু সুফিয়ানের অধীনে পঞ্চম হিজরির শাওয়াল মাসে, সাকুল্যে সেবার মদিনার বিরুদ্ধে জড়ো হয় প্রায় দশ হাজার যোদ্ধা।

পরিখা খনন

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এই সংবাদ শুনতে পান, অবিলম্বে তিনি বিচক্ষণ সাহাবা ও যুদ্ধবিষয়ে অভিজ্ঞদের সাথে পরামর্শ করেন। অনেকে অনেকধরণের কথা বললেও, সাহাবি হজরত সালমান আল-ফারসি রাযিয়াল্লাহু আনহু শহরের চারপাশে পরিখা খননের পরামর্শ দেন। তার এ পরামর্শ রাসুল ও উপস্থিত সাহাবাদের মনোঃপুত হয় এবং তারা এটাকে আমলে নেয়। ওদিকে বনু কুরাইজার ইহুদিরাও পূর্বলিখিত চুক্তি মোতাবেক যোদ্ধা ও রসদ সরবরাহ করে কুরাইশদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং নেতৃপর্যায়ের সাহাবারা খননকাজের সার্বিক তদারকি করছিলেন। এ-সময় সালমান আল-ফারসি রাযিয়াল্লাহু আনহুর কাজে এক প্রকাণ্ড পাথর প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। সেটা সরাতে গিয়ে জোরে আঘাত করলে তার লোহার শাবল ভেঙে যায়; কিন্তু পাথরটি আগের মতোই থেকে যায়। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাথরটির কাছে এগিয়ে এসে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে পাথরটিতে আঘাত করেন। এতে পাথরটি ফেটে চোখ-ঝলসানো এক উজ্জ্বল আলো বেরিয়ে আসে। রাসুল বলে ওঠেন : ‘আল্লাহু আকবার, রোম বিজিত হয়েছে; আমি তার লাল প্রাসাদগুলো দেখতে পেয়েছি’। এই বলে তিনি দ্বিতীয়বার আঘাত করলে পাথরটির দ্বিতীয় এক-তৃতীয়াংশ ভেঙে যায়। রাসুল পূনরায় বলে ওঠেন : ‘আল্লাহু আকবার! পারস্য বিজিত হয়ে গেছে; আমি তার সাদা দালানগুলো দেখতে পেয়েছি’। এরপর তিনি তৃতীয় আঘাত হানেন, এতে পাথরটির শেষ এক-তৃতীয়াংশ ভেঙে পড়ে এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : ‘আল্লাহু আকবার! ইয়েমেন বিজিত হয়ে গেছে; আমি সানআ’ শহরের প্রধান ফটক দেখতে পেয়েছি’। আল্লাহ তাঁর বান্দাকে সাহায্য করেছেন এবং তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্য করেছেন। সমস্ত প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালকের তরে!

হজরত বারা ইবনু আজিব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং আমাদের সাথে কাজ করছিলেন। ধুলোয় তাঁর দেহ মোবারক ঢেকে যাচ্ছিল প্রায়, কিন্তু তিনি আমাদেরকে কাজে রেখে বিশ্রামে যেতে চাচ্ছিলেন না।’  পরিখা খননের কাজ একদমই সহজ ছিল না। মদিনায় তখন শীত নেমে এসেছিল, ক্ষুধায় সাহাবাদের চোখমুখ শুকিয়ে যাচ্ছিল। তাদের অধীনে কোন দাস ছিল না, তাই খননের কাজ যত কষ্টেরই হোক, নিজেদেরই করতে হচ্ছিল।

সহ্য করতে না পেরে কোন কোন সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে নিজেদের অবস্থা জানায়। দেখায় যে, তাদের পেটে একেকটি পাথর কীভাবে ক্ষুধার তাড়না কমিয়ে রাখছে। রাসুল নিজের কাপড় খানিক তুলে ধরলে দেখা যায়, প্রাণের নবীর পেটে ক্ষুধার যন্ত্রণা কমাতে দুটি পাথর বাঁধা আছে।

একদিন হজরত জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসুলের কষ্ট দেখে বাড়িতে গিয়ে একটি বকরি জবাই করেন। স্ত্রীকে খাবার প্রস্তুত করতে বলে তিনি রাসুল ও তাঁর কজন বিশিষ্ট সাহাবিদের দাওয়াত করেন। কিন্তু রাসুল সকল সাহাবাদের নিয়ে জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহুর বাড়ির দিকে রওনা করেন। সাহাবি জাবির ও তার স্ত্রী এই চিত্র দেখে ভয়ে চুপসে যান। এত মানুষের খাবার তো তারা প্রস্তুত করেন নি। কিন্তু রাসুল তাকে আশ্বস্ত করেন। এক হাজার সাহাবি পেট ভরে রুটি গোশত খেয়ে চলে যাবার পরও দেখা যায়, উনুনে গোশতভর্তি হাড়ি তখনও টগবগ করছে। রুটির খামিরাও রয়ে গেছে আগের মতো।

আরেকদিন হজরত নুমান ইবনু বাশিরের বোন খন্দকের কাছে তার ভাই ও মামার জন্য কিছু খেজুর নিয়ে আসেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশ দিয়ে যাবার সময় তিনি খেজুরগুলো চেয়ে নিয়ে একটি কাপড় বিছিয়ে তাতে ছড়িয়ে দেন। এরপর খননকাজে ব্যস্ত সাহাবিদের খেতে ডাকেন। তারা পেট ভরে খেজুর খেয়ে চলে যাবার পরও, বিছানো কাপড়ে পড়ে থাকা খেজুরগুলো যেন কেবল বেড়েই যাচ্ছিল।

এদিকে যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাজ শেষ করলেন, ওদিকে তখন কুরাইশরা তাদের সহযোগী কিনানা ও তিহামাবাসীদের নিয়ে মোট দশ হাজার সৈন্য এগিয়ে এসে নাজদের মিত্রদের নিয়ে আসা বনু গাতফানের সাথে মিলিত হয়ে যায়। এরপর একজোট হয়ে তারা অবস্থান নেয় উহুদ পাহাড়ের পাদদেশে। তাদেরকে চোখের দূরত্বে দেখতে পেয়ে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন হাজার সাহাবাদের নিয়ে পরিখার উপকণ্ঠে এসে দাঁড়ান। নিজেদের ও মুশরিকদের মাঝে খননকৃত পরিখা রেখে তিনি মুসলমানদের কাতারবদ্ধ করেন। এবারও তিনি নিজের অবর্তমানে মদিনায় ইবনু উম্মে মাকতুম রাযিয়াল্লাহু আনহুকে প্রতিনিধি নিযুক্ত করে আসেন।

বনু কুরাইজার চুক্তিভঙ্গ

বেশ কয়েকদিন কেটে গেল এভাবেই। মুশরিকরা শহরে প্রবেশের কোন পথ না পেয়ে কোন ধরনের যুদ্ধ কার্যক্রম ছাড়াই মুসলমানদের মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে ছিল।

একপর্যায়ে আল্লাহর শত্রু হুয়াই ইবনু আখতাব কা’ব ইবনু আসাদ আল-কুরাজির কাছে এলো। সে ছিল বনু কুরাইজারগোত্রীয় চুক্তির মুখপাত্র এবং তাদের অন্যতম গোত্রপ্রধান। সে ইতিপূর্বে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু হুয়াই ইবনু আখতাব তাকে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে, নানাভাবে উস্কে—মুসলমানদের সাথে বনু কুরাইজার কৃত চুক্তি ভঙ্গ করতে চেষ্টা করে। হুয়াই জানায়, অন্যান্য গোত্রগুলো মুসলিমরা নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত ফিরে যাবে না বলে অঙ্গীকার করেছে। অতএব, মুহাম্মদের পতন আজকে নিশ্চিত। কাব ইবনে আসাদ প্রথমে তার প্রস্তাবে রাজি হননি; বরং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সততা ও বিশ্বাসের প্রশংসা করতে থাকেন। কিন্তু আক্রমণকারীদের সংখ্যা ও শক্তির কারণে, শেষপর্যন্ত বনু কুরাইজা নিজের মত বদলায় এবং জোটে যোগ দেয়। এর ফলে মুসলিমদের সাথে বনু কুরাইজার চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায়। নিশ্চয়তা হিসেবে হুয়াই অঙ্গীকার করে যে,  কুরাইশ ও গাতাফানরা যদি মুহাম্মাদকে হত্যা না করে ফিরে যায়,  তবে সে স্বয়ং কুরাইজার দুর্গে প্রবেশ করবে; এবং কুরাইজার ভাগ্যে যাই ঘটুক না কেন, সে নিজেও সেই পরিণতি বরণ করে নেবে।

কা’ব এবং হুয়াইয়ের এই গোপন সাক্ষাতের খবর পৌঁছে যায় রাসুলের কাছে। তাদের এরূপ কর্মকাণ্ডের ফলে তিনি মুসলিম বাহিনীতে ভীতি ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারে শঙ্কা বোধ করেন। মদিনা সনদ অনুযায়ী বনু কুরাইজার ইহুদিরা মুসলিমদের মিত্র ছিল, তাই তাদের এলাকার দিকে মুসলিমরা কোনো প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তাছাড়া কুরাইজার অধিকারে ছিল ১,৫০০ তলোয়ার, ২,০০০ বর্শা, ৩০০ বর্ম ও ৫০০ ঢাল। তারা পেছন থেকে বাগড়া দিলে, যুদ্ধের পরিস্থিতি বদলে যাবার সম্ভাবনা ছিল। তাই তিনি খাযরাজপ্রধান সা’দ ইবনু উবাদা,  আওসপ্রধান সা’দ ইবনু মুআজ, আবদুল্লাহ ইবনু রাওয়াহা এবং খাওয়াত ইবনু জুবাইরকে পাঠান এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত হতে। রাসুল তাদেরকে বলে দেন : ‘বনু কুরাইজার কাছে যাও, আমরা যা শুনলাম, তা যদি সত্য হয়—তাহলে ইঙ্গিতে এমনভাবে আমাকে জানাবে, যাতে আমি ব্যাপারটা বুঝে নিতে পারি; জোরেশোরে জানিয়ে মুসলমানদের মধ্যে ফাটল তৈরির দরকার নেই। আর যদি সংবাদটি সত্য না হয়, তাহলে সবার সামনে সেটা ঘোষণা করে দিয়ো’।

তারা বনু কুরাইজার কাছে পৌঁছে দেখেন, তাদের ব্যাপারে অনিষ্টকর যা শুনেছিলেন এবং রাসুল যা তাদেরকে বলেছিলেন, তারা তারচেয়েও ভয়ঙ্কর দুরভিসন্ধিতে লিপ্ত। রাসুলের পাঠানো সাহাবাদের দেখে তারা বলে উঠল : ‘মুহাম্মদের সাথে আমাদের কোন চুক্তি নেই’। এ-কথা শুনে সাদ ইবনু মুআজ রাযিয়াল্লাহু আনহু তাদেরকে গালমন্দ করতে লাগলেন; এতে তারাও পাল্টা গালাগালি শুরু করল। ধীরে ধীরে উভয়পক্ষ উত্তপ্ত হতে থাকলে সাদ ইবনু উবাদা রাযিয়াল্লাহু আনহু সাদ ইবনু মুআজ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন : ‘আপনি গালমন্দ বন্ধ করে দিন, তাদের সাথে আমাদের গালাগালির চেয়েও শক্ত লেনাদেনা বাকি আছে’। এরপর তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ফিরে আসেন, তাদের সাথে আরও কিছু মুসলমান। তারা এসে বলেন : ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ! আদ্বল আর ক্বারা’, অর্থাৎ আদ্বল এবং ক্বারা গোত্র ‘আসহাবুর রাজি’ তথা খুবাইব এবং তার সঙ্গীদের সাথে গাদ্দারি করেছে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেনাদের দিকে ফিরে বলেন : ‘সুসংবাদ গ্রহণ করো হে মুসলমান সেনাদল’। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমে নাজুক হতে থাকে। বাহিনীতে দ্রুত ভীতি ছড়াতে থাকে। মুসলমানরা একইসাথে বহির্শত্রু এবং নিজেদের আন্তঃরাষ্ট্রীয় শত্রুদের টার্গেটে পরিণত হয়ে যায়। সেনাদলে আল্লাহর ফায়সালা নিয়ে নানারকম ধারণা প্রকাশ পেতে থাকে। মুসলমানরা তখন সর্বদিক থেকে আক্রান্ত হয়ে আছে; কিন্তু রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও নেতৃপ্রধান সাহাবায়ে কেরাম আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের রহমত থেকে একটুও নিরাশ নন; কারণ, তাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, আল্লাহ তাদের রক্ষা করবেন!

মুনাফিকদের অবস্থান

এ-যুদ্ধে মুনাফিকরা তাদের বহু গোপন ভেদ প্রকাশ করে দেয়। তাদের কেউ বলে : ‘আমার বাড়ি অরক্ষিত পড়ে আছে, আমার ভয় হচ্ছে, আমাকে যেতে হবে’। কেউ বলে : ‘মুহাম্মদ আমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিল রোম-পারস্যের গুপ্তধন অর্জন করবে, আর আজকে দেখি মুসলমানদের কেউ টয়লেটে যাওয়াও নিরাপদ মনে করছে না’

টুকরো টুকরো সংঘাত

পরিখার পাশে অনড় অবস্থানে রইলেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। ওপাশে মুশরিকরাও শহর ঘেরাও করে পড়ে রইল। মক্কা থেকে আগত কুরাইশ বাহিনী মদিনার নিকটে জুরফ ও জাগাবার মধ্যবর্তী মাজমাউল আসয়াল নামক স্থানে এবং নজদ থেকে আগত গাতাফান ও অন্যান্য বাহিনী উহুদ পর্বতের পূর্বে জানাবে নাকমায় শিবির স্থাপন করে পড়ে আছে।

আরবীয় যুদ্ধকৌশলে পরিখা খনন প্রচলিত ছিল না, তাই মুসলিমদের খননকৃত পরিখার কারণে জোটবাহিনী অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে যায়। পরিখা পার হওয়ার কোনো ব্যবস্থা তাদের কাছে হাজির নেই। তারা অশ্বারোহীদের সহায়তায় বাধা কাটিয়ে উঠার কয়েকটি চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। দীর্ঘ এ-সময়ে মাঝেমধ্যে দুই বাহিনী পরিখার দুই পাশে এসে সমবেত হতো এবং সামান্য কিছু তীর বিনিময় করতো। আক্রমণকারীরা পরিখা পার হওয়ার জন্য দুর্বল কোন স্থানের সন্ধান করে যাচ্ছিল। দিনের পর দিন চলে যায়, তেমন কোন জায়গা তাদের চোখে ধরা দেয় না।

এই অচলাবস্থায় কুরাইশ সেনারা ক্রমে অধৈর্য হয়ে পড়ে। বিশ দিনেরও অধিক, প্রায় এক মাস পেরিয়ে গেছে—অথচ দুপক্ষের মাঝে কিছু তীর ও পাথর নিক্ষেপ ছাড়া যুদ্ধের কিছুই ঘটে নি। তবে কুরাইশদের কিছু অশ্বারোহী, যেমন : বনু আমের গোত্রের আমর ইবনু আবদে-উদ্দ আল-আমেরি, ইকরিমা ইবনু আবি জাহল, হুবাইরা ইবনু আবি ওয়াহব এবং যিরার ইবনুল খাত্তাব; যারা সকলেই কুরাইশের সাহসী অশ্বারোহী হিসেবে প্রসিদ্ধ, এদের একটি দল পরিখার কাছাকাছি এসে বলে : ‘যুদ্ধের এমন কৌশল তো আরবে প্রচলিত না’, এটা কোন বহিরাগত চিন্তা বলে মনে হচ্ছে। এরপর তারা পরিখার একটি সংকীর্ণ পথ খুঁজে পেয়ে সেখানে ঘোড়া তুলে দেয়। এতে তারা পরিখা ও প্রতিপক্ষের মাঝখানে পড়ে যায়। এ দেখে আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলমানদের একটি বাহিনী নিয়ে সেই ছিদ্রপথেই তাদেরকে ধরে ফেলেন, যেখান দিয়ে তারা অতর্কিত ঢুকে পড়েছিল।

এদের মধ্যে আমর ইবনু আবদে-উদ্দ বদর যুদ্ধে মারাত্মক আঘাত পেয়ে উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারে নি, তাই খন্দকের এ যুদ্ধে যে চাচ্ছিলো তার অবস্থান চেনাতে। সে তার ঘোড়াসহ দাঁড়িয়ে সদম্ভে আহ্বান করল : কেউ কি আছো আমার মুখোমুখি হবার সাহস রাখো? আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু তার আহ্বানে বের হয়ে বললেন : হে আমর! শুনেছি তুমি আল্লাহর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছো যে, কোন দুটি স্বভাবের দিকে আহ্বান করা হলে তুমি তার যে-কোন একটি অবশ্যই গ্রহণ করবে? সে বলল : হ্যাঁ। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন : আমি তোমাকে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইসলামের দিকে আহ্বান করছি। আমর বলল : এর কোনটাই আমার দরকার নেই। আলি রাযিয়াল্লাহু বললেন : তাহলে এসো মুখোমুখি হই। আমর বলল : ভাতিজা! আমি চাই না তুমি আমার হাতে নিহতো হও; কারণ, তোমার বাবার সাথে আমার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। আলি রাযিয়াল্লাহু বললেন : কিন্তু আল্লাহর কসম! আমি চাই আপনি আমার হাতে নিহতো হন।

এ-কথা শুনে আমর ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে। ঘোড়া থেকে নেমে সে আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর দিকে এগিয়ে যায়। আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুও নেমে এলে দুজনের মধ্যে কিছুক্ষণ চক্রবিক্রম চলে। এরপর দুজনের মাঝখানে ধূলোর পাহাড় জমে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। যখন সে ধূলো সরে গিয়ে অবস্থা গোচরে আসে, দেখা যায় আলি রাযিয়াল্লাহু আনহু আমরের বুকে বসে তার শির ধড় থেকে আলাদা করে ফেলছেন। এ দৃশ্য দেখে আমরের অন্য সাথীরা তাদের ঘোড়াগুলো নিয়ে পড়ি-মরি করে স্থান ত্যাগ করে পালিয়ে যায়।

রাতের বেলায়ও আক্রমণকারী সৈনিকরা পরিখা অতিক্রমের জন্য কয়েক দফা চেষ্টা চালায়। কিন্তু তাদের সকল চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। মুসলিমরা পরিখার অপর পাশ থেকে তীর নিক্ষেপ করে, পুরোটা সময় তাদেরকে বাধা প্রদান করতে থাকে। পরিখার পুরো দৈর্ঘ্য বরাবর পদাতিকদের মোতায়েন করা যদিও সম্ভব ছিল; কিন্তু সম্মুখ যুদ্ধে মুসলিমদের সুবিধাজনক অবস্থানের কারণে তারা এই পদক্ষেপ নেয়নি। পরিখা খননের সময় তোলা মাটি দিয়ে তৈরি বাধের পেছনের সুরক্ষিত অবস্থান থেকে মুসলিমরা তীর ও পাথর ছুড়ে আক্রমণ করার জন্য সদাপ্রস্তুত হয়ে বসে ছিল। ফলে কোনোপ্রকার আক্রমণ হলে, কুরাইশদের ব্যাপক হতাহতের সম্ভাবনা ছিল।

আক্রমণ

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে হেঁটে আসতে দেখা যায় নুআইম ইবনু মাসউদ ইবনু আমের আল-আশযায়ি রাযিয়াল্লাহু আনহুকে। তিনি এসে রাসুলকে বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ! আমি মুসলমান হয়ে গেছি; কিন্তু আমার গোত্র সে-খবর জানে না। আপনি আদেশ দিলে আমি একটা কিছু চিন্তা করেছি, সেটা বাস্তবায়ন করতে চাই। রাসুল বললেন : ‘আপনি গাতফান গোত্রের একজন পুরুষ; আপনি বেরোলে যদি আমাদের বেরোবার প্রয়োজন না হয়, তাহলে সেটাই আপনার বসে থাকার চেয়ে উত্তম। আপনি যান, যা চান করুন—অনুমতি আছে; কারণ যুদ্ধের অপর নাম, ধোঁকা’।

রাসুলের অনুমতি পেয়ে নুয়াইম এক কার্যকরী কৌশল অবলম্বন করে এগিয়ে যান। তিনি প্রথমে বনু কুরাইজা গোত্রের কাছে গিয়ে তাদেরকে অন্যান্য মিত্রদের দুরভিসন্ধির ব্যপারে সতর্ক করেন। বলেন, যদি অবরোধ ব্যর্থ হয়, তবে বাকি মিত্ররা ইহুদিদেরকে মুহাম্মাদের হাতে তুলে দিতে পিছপা হবে না। আমার অন্তত তাই মনে হচ্ছে। তাই কুরাইজাদের উচিত, মিত্রবাহিনীর কিছু প্রতিনিধিকে সহায়তার বিনিময়স্বরূপ তাদের কাছে জামিন হিসেবে রেখে যাওয়ার দাবি করা। নুয়াইমের এই পরামর্শ কুরাইজাদের মনপুত হয়। তাদের বুকের ভেতরটা নড়ে ওঠে। তাহলে তো তারা বিরাট বিপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে! নুআইমের পরামর্শমতো তবে কুরাইশদেরকে এই প্রস্তাবটা করা যায়; নতুবা কিছুতেই যে তাদের ব্যাপারে নির্ভার হওয়া যাচ্ছে না। কুরাইজাদের এ-ধারণা, মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে তাদের ভীতিকে আরও পাকাপোক্ত করে দিল।

এরপর নুয়াইম ইবনু মাসউদ যান মিত্রবাহিনীর নেতা আবু সুফিয়ানের কাছে। তাকে বলেন, আপনি কি জানেন কুরাইজাগণ মুহাম্মাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে? তারা তো আপনাদের সাথে ধোঁকাবাজি করে মুহাম্মদের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করার পণ করেছে। আমি জানতে পেরেছি, ইহুদি গোত্রগুলো সহায়তার বিনিময়ে মিত্রবাহিনীর সদস্যদের জামিন রাখার আবেদন করবে বলে অভিসন্ধি করেছে। আমি সত্য শুনে থাকলে, তারা অচিরেই আসবে। তবে মনে রাখবেন, প্রকৃতপক্ষে তারা জামিন হিসেবে আপনাদের লোক নিয়ে, তাদেরকে মুহাম্মাদের হাতে তুলে দিতে চায়। তাই আপনাদের মিত্রবাহিনী যেন তাদেরকে একটি লোকও জামিন হিসেবে না দেয়, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন। আর যদি মুহাম্মদের সাথে তাদের চুক্তির ব্যাপারে আপনাদের খটকা থাকে, তাহলে তাদেরকে অতিসত্বর যুদ্ধের জন্য ময়দানে আসতে বলুন, তবেই সবকিছু সাফ হয়ে যাবে। শুভাকাঙ্খী হিসেবে পরামর্শ দিলাম, মানা না-মানা আপনাদের ব্যাপার।

ফলে কুরাইশের গাতফান উপগোত্রের লোকেরা ইকরিমা ইবনে আবু জেহেলসহ একটি প্রতিনিধিদলের মাধ্যমে ইহুদিদের কাছে খবর পাঠায় যে, কুরাইশদের অবস্থান তেমন ভালো মনে হচ্ছে না, ঘোড়া উট একে একে মারা যাচ্ছে। এ-কারণে তারা চাচ্ছে একযোগে মোহাম্মদের ওপর হামলা করবে। ইহুদিগণও যেন তাদের দিক থেকে হামলা করে এবং পূর্ব চুক্তিমতো কুরাইশদের সাথে মুহাম্মদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়। ইহুদিগণ প্রত্যুত্তরে বলল, আজ শনিবার। অতীতে যারা এইদিন সম্পর্কে ধর্মীয় নির্দেশ লঙ্ঘন করেছে, তারাই ভয়ানক শাস্তি পেয়েছে। তাছাড়া কুরাইশগণ যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের কিছু লোক জামিন স্বরূপ আমাদের কাছে না দেবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করব না। দূতদল ইহুদীদের এমন জবাব শুনে এসে আবু সুফিয়ানকে জানালে,  কুরাইশ এবং গাতাফানের সকলে একসাথে বলে ওঠে, আল্লাহর শপথ, নুআইম তবে সত্য কথাই বলেছে। এরপর তারা ইহুদীদের খবর পাঠিয়ে বলল যে, তারা জামিন স্বরূপ কোন লোক তাদের কাছে পাঠাতে পারবে না। একথা শুনে কুরাইজা গোত্রের লোকেরা বললো, তবে তো নুয়াইম সত্য কথাই বলেছে। এরা তো আমাদের সাথে নেই। ঘটনাক্রমে যদি মুহাম্মদ জিতে যায়, তাহলে আমাদের কী হবে? এভাবে নুআইম ইবনু মাসউদের বিচক্ষণতায় উভয় দলের মধ্যে অবিশ্বাস, সকল সৈন্যদের মধ্যে হতাশা এবং জোটভুক্ত গোত্রগুলোর মধ্যে ফাটল দেখা দিলো।

নুআইম ইবনু মাসউদ তাঁর চিন্তায় পুরোপুরি সফল হয়ে আসেন, অথচ তার গোত্র তার ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কিছুই জানতে পারে নি। তিনি কুরাইশদের সম্মিলিত বাহিনী এবং বনু কুরাইজা গোত্রের মধ্যে ফাটল তৈরি করে দেন, তাদের অন্তরে পরস্পরের প্রতি সন্দেহ ও সংশয় ছড়িয়ে দেন। এরপর চূড়ান্ত বিজয়ের বার্তা দিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন রণক্ষেত্রে প্রবল বাতাস ছোটান, যা মুশরিকদের তাঁবুগুলো উড়িয়ে দেয়, তাদের খাবারের ডেগগুলো উল্টে দেয় এবং আল্লাহর অনুগ্রহে যুদ্ধের পুরো চিত্রই পাল্টে দেয়।

বিজয়ের বার্তা

এতক্ষণে সম্মিলিত বাহিনীর প্রধান সেনাপতি আবু সুফিয়ান বুঝতে পারে, এখানে এভাবে বসে থেকে আসলেই কোন লাভ নেই। তাদের  রসদ ফুরিয়ে আসছে। ক্ষুধা ও আঘাতের কারণে ঘোড়া ও উটগুলো মারা পড়ছে একে একে। শীতও খুব তীব্র আকার ধারণ করেছে। অবরোধ দিন দিন কেবলই দীর্ঘ হচ্ছে। তাছাড়া প্রচন্ড বায়ুপ্রবাহের ফলে, সেনাদের শিবির খানাখাদ্য সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে। তাই সে বাহিনীতে মক্কা ফিরে যাবার নির্দেশ ছড়িয়ে দেয়। বলে দেয়, যে যেখান থেকে এসেছে—সে যেন সেদিকে ফিরে যায়।

রাত নেমে আসে ময়দানে। ঘন আঁধারে তলিয়ে গেছে সব। কুরাইশ বাহিনীর নড়াচড়ার আওয়াজ পেয়ে খন্দকের পাশে অতন্দ্র বসে থাকা মুসলিম সেনারা তীর তাক করে। দুয়েকটা তীর গিয়ে পড়ে শত্রুদের অবস্থানস্থলে। কিন্তু ততক্ষণে ময়দান খালি হয়ে গেছে। সকালে সুর্য উঠে এলে দেখা যায়, রাতে ছোঁড়া মুসলমানদের তীরগুলো যেখানে পড়ে আছে, সেখানে শত্রুদের কোন আনাগোনা নেই। ময়দান ফাঁকা হয়ে গেছে। কুরাইশদের বাহিনী ময়দান ছেড়ে গেলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : ‘আজকের পর থেকে যুদ্ধ আমরা করবো, তারা নয়’। অর্থাৎ, আজকের পর কুরাইশরা কখনোই মদিনায় আক্রমণ করার সাহস করবে না।

খন্দকের যুদ্ধ শেষ করে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহিনী নিয়ে এগিয়ে যান বনু কুরাইজার দিকে; চুক্তি ভঙ্গ করে কাফেরদের সঙ্গ দেয়ার অপরাধে সেখানে তিনি ইহুদিদের অবরোধ করে রাখেন। অবরোধের মুখে বনু কুরাইজার নেতা কাব ইবনে আসাদ অবরুদ্ধ ইহুদিরদের একত্র করে তাদের সামনে তিনটি প্রস্তাব রাখেন। এক :  সকলে মিলে ইসলাম গ্রহণ, দুই : সন্তানদের হত্যা করে নিজেরা সর্বাত্মক যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া; তিন : মুসলমানরা যেহেতু নিশ্চিত জানে যে, শনিবার আক্রমণ হবে না; তাই তাদেরকে ধোঁকা দিয়ে সেদিনই আক্রমণ করা। কিন্তু ইহুদিরা কাব ইবনে আসাদের তিনটি প্রস্তাবের কোনোটিই গ্রহণ করেনি। এতে কাব প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, “আদিকাল থেকে আজ পর্যন্ত তোমাদের মধ্যে একটি লোকও জন্মেনি, যে সারা জীবনে একটি রাতের জন্যও স্থির ও অবিচল কোন সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে”।

ইহুদিদের এমন গোঁ ধরা আলস্য দেখে, আত্মসমর্পণ করা ছাড়া কাবের সামনে আর কোনো উপায় ছিল না। সে প্রথমে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রস্তাব দেয়, যাতে তাদের মিত্র আবু লুবাবাকে পরামর্শের জন্য ভেতরে পাঠানো হয়। আবু লুবাবা সেখানে পৌঁছলে কাব জিজ্ঞেস করে, আত্মসমর্পণ করবে কি না! আবু লুবাবা হ্যাঁ-সূচক জবাব দেন। শাস্তি কী হতে পারে প্রশ্ন করলে, আবু লুবাবা হাত দিয়ে কণ্ঠনালির দিকে ইঙ্গিত করে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে বলে জানান।

২৫ দিন অবরোধের পর শেষপর্যন্ত বনু কুরাইজা আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিয়ে বেরিয়ে আসে। মুসলিম সেনারা তাদের দুর্গ ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নেয়। সেখানে পুরুষদের সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে ৯০০। তাদেরকে গ্রেপ্তার করে মুহাম্মদ ইবনে মাসআলামার তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। নারী ও শিশুদেরকে রাখা হয় পৃথকভাবে।

ইসলাম গ্রহণের পূর্ব থেকে বনু আউসের সাথে বনু কুরাইজার পূর্বমিত্রতা ছিল। বনু আউসের অনুরোধে এবং বনু কুরাইজার ইচ্ছানুসারে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আউস গোত্রের সাদ ইবনে মুয়াজকে দোষীদের বিচারকার্যের জন্য নিযুক্ত করেন। খন্দকের যুদ্ধের সময় সাদ বেশ আহতো হয়েছিলেন। এসময় তীরের আঘাতে তার হাতের শিরা কেটে যায়। যুদ্ধাহতো অবস্থায় তাকে বিচারের জন্য রাসুলের সামনে নিয়ে আসা হয়। তিনি তাওরাতের আইন অনুযায়ী গাদ্দারি করার কারণে সমস্ত পুরুষকে হত্যা, নারী ও শিশুদেরকে দাস হিসেবে বন্দী এবং সমস্ত সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মর্মে সিদ্ধান্ত দেন।

সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর ফায়সালা শুনে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে ওঠেন : ‘তুমি তাদের ব্যাপারে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের বিধানমতোই ফায়সালা করেছো’। এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনতিবিলম্বে সাদ রাযিয়াল্লাহু আনহুর দেয়া সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন করেন। বন্দীদেরকে বনু নাজ্জার গোত্রের নারী কাইস বিনতে হারিসার বাড়িতে নিয়ে রাখা হয়। এরপর সিদ্ধান্তমতে মদিনার বাজারে গর্ত খুড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ পুরুষ বন্দীর শিরচ্ছেদ করা হয়। বনু কুরাইজাকে প্ররোচনাদানকারী হুয়াই বিন আখতাবকেও এ-সময় মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।

ইতিপূর্বে বনু কুরাইজাকে দেয়া তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বনু কুরাইজার ভাগ্য বরণের জন্য হুয়াই তাদের সাথেই অবস্থান করছিল। তার পোষাক যাতে কেউ নিতে না পারে সেজন্য তিনি তার বিভিন্ন জায়গায় ছিদ্র করে রেখেছিলেন। তাকে নিয়ে আসার পর তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “আপনার সাথে শত্রুতার জন্য আমি নিজেকে নিন্দা করি না। কিন্তু যে আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করে, আসলেই সে পরাজিত হয়। এরপর লোকেদের দিকে তাকিয়ে সে বলে, “শোন লোকেরা, আল্লাহর ফয়সালায় কোনো অসুবিধা নেই। এটা ভাগ্যের অনিবার্য লিখিত ব্যাপার। এটি এমন হত্যাকাণ্ড, যা বনী ইসরাইলের জন্য স্বয়ং আল্লাহ লিপিবদ্ধ করে দিয়েছেন”। এরপর হুয়াই গর্দান নামিয়ে বসে পড়ে এবং নিমিষেই তার শিরচ্ছেদ করে দেয়া হয়।

পুরুষদের সাথে এক নারীকেও মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। কারণ, অবরোধের সময় এই নারী কাল্লাদ বিন সুয়াইদের উপর যাতা ছুড়ে মেরে তাকে হত্যা করেছিল। অবশিষ্ট বন্দী নারী ও শিশুসহ যুদ্ধলব্ধ সব সম্পদ মুসলিমদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হয়। তবে বনু কুরাইজার কিছু লোক আত্মসমর্পণের পূর্বেই দুর্গ ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করছিল, তাদেরকেও ক্ষমা করা হয়।

আহযাবের এ যুদ্ধ কেবল রণক্ষেত্রের লড়াই বা ময়দানের সংঘাত ছিল না; বরং এ যুদ্ধ ছিল রগে-রেশায়, শিরা-উপশিরায়, এ যুদ্ধ ছিল চিন্তা যাচাইয়ের, চেতনা পরীক্ষার, হৃদয় ও মানসজগত যাচপরতালের—তাই তো এ যুদ্ধে মুনাফিকের দল হেরে গেছে, ব্যর্থ হয়েছে আর সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে সফল হয়ে গেছে ঈমানের বাহিনী।

জোটবাহিনীর অবরোধ ব্যর্থ হওয়ার ফলে নেতা হিসেবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরবে আরও বেশি উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠেন। এদিকে মক্কা এ যুদ্ধে তাদের সর্বশক্তি দিয়ে মদিনা থেকে মুসলিমদেরকে উৎখাত করতে চেয়েছিল, কিন্তু পরাজিত হওয়ার ফলে তারা সিরিয়ায় তাদের বাণিজ্য হারায় এবং সমগ্র আরবে তাদের সম্মান অনেকাংশে নষ্ট হয়ে যায়। বরং হিতে বিপরীত হয়ে এ ঘটনার পর মক্কার লোকেরা ভিন্নভাবে চিন্তা করতে শুরু করে এবং ইসলাম গ্রহণকে নিজেদের জন্য ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করতে থাকে।

তথ্যপঞ্জি :

  • আল কামিল ফিত তারিখ : ইবনুল আসির জাযারি (৬৩০ হি.)
  • আল-ইসতিয়াব : ইবনু আবদিল বার রহ.
  • তারিখুত তাবারি : মুহাম্মাদ ইবনু জারির তাবারি (৩১০ হি.)
  • যাদুল মাআদ : ইবনুল কাইয়িম আল-জাওযিয়্যাহ রহ.
  • সিরাতে ইবনে হিশাম : আবু মুহাম্মদ আবদুল মালিক ইবনু হিশাম রহ.
  • আদ-দুরার ফি ইখতিসারিল মাগাজি ওয়াস-সিয়ার : ইবনু আবদিল বার রহ.
  • রাহমাতুল্লিল আলামিন : সুলাইমান মনসুরপুরি রহ.

Tijarah-Shop

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: