একজন নারীর চোখে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সা. | আতিকা মাহমুদ কাসেমি

একজন-নারীর-চোখে

তাবুর মধ্যে সবাই বেঘোর ঘুম। কেবল ঘুম নেই তার চোখে। বারবার মনে পড়ছে মেয়েটার কথা। কত কষ্ট করে বাঁচিয়ে রেখেছিলো এতটা দিন নিজের নাড়ীছেঁড়া ধনকে। কত স্মৃতি জমা হয়েছে প্রতিনিয়ত। অথচ আজ তার স্বামী তাকে ধোঁকা দিয়ে মেয়েকে পাঠিয়ে দিয়েছে সেই মাটির অন্ধকার গহ্বরে। কেমন মানুষ তিনি? গর্তে ফেলার সময় কিংবা এই ফুটফুটে বাচ্চাটার চিৎকারও তার মন গলাতে পারেনি?

বাঁধা মানছে না অশ্রু। আর কত দিন ইয়া মালিক? জন্মের পর থেকে গঞ্জনা সহ্য করে করে যদি বেঁচেও যাও, তারপরও রক্ষা নেই। সময়ে সময়ে নিজের ইজ্জত, সম্মান বাঁচানো নিয়ে শঙ্কা ছাড়াও নাড়ীছেঁড়া ধনকে নিয়ে শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। মেয়েরা কি কখনোই পূর্ণ মর্যাদা পাবে না? কত দিন চলবে অনিশ্চয়তার জিন্দেগী? ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলো জানতেনও না। পরদিন উঠে আবারো প্রাত্যহিক কাজ শুরু করেছিলেন কষ্ট বুকে চেপেই। ভাবতেও পারেননি ঘনিয়ে এসেছে এসব অনাচারের দিন। নারীর যোগ্য সম্মান ফিরিয়ে দিতে কেউ একজন আসছেন…

হ্যাঁ, মায়ের হৃদয়ের এসব আর্তনাদ পৌঁছে গিয়েছিলো মায়ের চেয়ে বহু গুণ বেশী মায়াময় রউফুর রহীমের কাছে। তাই তিনি পৃথিবীতে পাঠালেন মহামানব। শুরু হলো মানবমুক্তির পালা। নতুন করে সুশোভিত হতে আরম্ভ করলো মাটির দুনিয়া। কবি হয়তো এ চিত্রই অঙ্কন করেছেন কথামালায়—

কন্যাকে ভেবে পাপের প্রতীক

জ্যান্ত পুতে ফেলত মাটিতে।

অবুঝ শিশুর চিৎকারে

আকাশ বাতাস কাঁদত,

দয়া হতো না তবু

পাষাণ পিতার হৃদয়ে।

সেই সে ক্ষণে কাদে মরুভূমি

সাইমুম ঝড় তুলে,

ওগো রহমান ধরার হাদীরে

পাঠাও আমার কোলে।

মঞ্জুর করে সেই প্রার্থনা

আরশের অধীশ্বর,

অপার করুণা ঢালিয়া দিলেন

তপ্ত মরুর ‘পর।

তপ্ত মরুর বুকে আল্লাহ রহমতের বারিধারা বর্ষণ করলেন, ফলশ্রুতিতে আগমন হলো রহমাতুল্লিল আলামীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের। অতঃপর তাঁর কাছে মানব মুক্তির সনদ হিসাবে পাঠালেন ইসলাম। অবশেষে ইসলাম এসে মুক্তি দিলো নারী জাতিকে, তাদের সেই কালো ইতিহাস থেকে। পশুর থেকেও অধম থাকা নারীকে নিয়ে বসালো সম্মানের সর্বোচ্চ চূড়ায়।

তাদের পায়ের নিচে স্থান দিলো সহস্র আম্বিয়া, সাহাবী, আলিম, আবিদের জান্নাত। ভোগের বস্তু থেকে হলেন পোশাক, সাথে মাতৃজাতি হিসাবে স্বয়ং মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা পরালেন তাদের সম্মানের মুকুট।

বলছিলাম মানুষ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা। পৃথিবীর বিভিন্ন অনাচার খতম করতে আল্লাহ যাকে পাঠিয়েছিলেন—সেই মহামানব। জন্মের মাধ্যমে বিধবা মাতার চোখ জুড়িয়েছিলেন এবং ধরাপৃষ্ঠে আগমনের সাথে সাথেই শুরু করেছিলেন মাতৃজাতির মুক্তির সূচনা। এভাবে মৃত্যুর শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত পৃথিবীর নির্যাতিত নিষ্পেষিতদের মুক্তির লক্ষ্যে সংগ্রাম করে গেছেন।

সত্যি বলতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন বহুমাত্রিক এবং বৈচিত্র্যময়। বিভিন্নজন বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকেই তার জীবন নিয়ে আলোচনা করতে পারে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন। ঠিক তাই একজন নারী হয়ে আমি কথামালায় চিত্রিত করতে চাই সেই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে, যিনি একজন সুযোগ্য পুত্র, একজন যোগ্য স্বামী, একজন দায়িত্বশীল ভাই এবং একইসাথে একজন স্নেহশীল, কর্তব্যপরায়ণ বাবা।

একজন সুযোগ্য পুত্র

বিয়ের বছর না ঘুরতেই বিধবা হলেন আমিনা। তারপর এই একাকীত্বের মাঝে আশার আলো নিয়ে আগমন করেছিলেন চাঁদপুত্র শিশু মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। বাবা আব্দুল্লাহর বিরহ ব্যথা তাঁকে দেখেই লাঘব হয়েছিলো সকলের। যদিও তেমন কাছে পাননি পুত্রকে। কিন্তু তারপরও বেঁচে ছিলেন পুত্রের হৃদয়ে। বহুবছর পরে, তার ছোট্টছেলে যখন মদিনার নেতা, তখনও তার কবরের সামনে জারজার হয়ে কেঁদেছিল পুত্র, কেঁদেছিল পুত্রের শত সঙ্গী।

এই ভাবী নবীকে লালনপালন করেই গরীব হালিমা হয়েছিলো হালিমা সাদিয়া। এছাড়াও যখন তায়েফ বিজিত হলো সেদিনের ছোট্ট বালকের হাতে, তখনো সমস্ত বন্দীর মধ্যে উপযুক্ত সম্মান পেয়ে বিনামুক্তিপণে সসম্মানে মুক্ত হয়েছিলেন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুধমা। এক দুর্ভিক্ষের সময় তিনি মদিনায় আসলে তার সম্মানে আমার মা আমার মা বলে নিজের চাঁদর পর্যন্ত খুলে বিছিয়ে দিয়েছিলেন দোজাহানের বাদশাহ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

এছাড়া মায়ের মৃত্যুর পর থেকে যার কাছে ছিলেন, সেই উম্মে আইমান রাযিয়াল্লাহু আনহা! কতটুকু আসন গেড়েছিলেন বাবা আব্দুল্লাহর রেখে যাওয়া একসময়ের দাসী? মৃত্যু পর্যন্ত মায়ের ভালোবাসা দিয়েছেন, জান্নাতী নারী বলে সঙ্গীদের উৎসাহ দিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। এতটা সম্মান দিয়েছেন, যার দরুণ পরবর্তী খলিফা পর্যন্ত তাকে দেখতে যেতেন।

আর অল্পকিছুদিন দুগ্ধদান করা মুকাতাব দাসী সুওয়াইবা? শুধু তার জন্মের সংবাদ বহন করায় মুক্তি পেলো দাসী সুওয়াইবা। এরপরও ঠিকই মায়ের মতোই সম্মান পেয়েছেন আজীবন।

এছাড়াও ফুফু, চাচী সহ মাতৃস্থানীয় সকলকে সম্মান করেছেন, ভালোবেসেছেন। যার প্রমাণ আজও আছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়।

বাবা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

তিন পুত্র ও চার কন্যার জনক ছিলেন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সবপুত্রই শৈশবে মারা গেছেন। সবশেষে তিনি শুধু কন্যাসন্তানের বাবা ছিলেন। প্রত্যেক কন্যার প্রতিই ছিলেন সদা স্নেহশীল। কন্যার সেবা-শুশ্রুষার জন্য জামাতাকে যুদ্ধে যোগ দিতে নিষেধ করেছেন। আরেক জামাতাকে শুধু কন্যাকে কাছে পাঠানোর ওয়াদাতে মুক্তি দিয়েছেন। কন্যাদের প্রতি এতটা মমত্বশীল ছিলেন যে, দাওয়াত খেতে গিয়েও ভুলতেন না তার আদরের কন্যার ক্ষুধার যন্ত্রণা। কন্যা ফাতিমার ব্যাপারে বলেছেন, ফাতিমা আমার অংশ। যে ফাতিমাকে কষ্ট দিল সে বরং আমাকেই কষ্ট দিলো। কন্যাদের কষ্টে তাদেরকে সান্ত্বনা দিতেন, পাশে থাকতেন। কন্যা উম্মে কুলসুমের মৃত্যুর পর নিজের গায়ের চাদর খুলে দিয়েছিলেন কাফন হিসাবে, দাফনের পর কবরের পাশে বসে ঝরিয়েছিলেন নীরব অশ্রু।

যখন ছেলে ইব্রাহিম বেঁচে ছিল, তখন তাকে দেখতে নিয়মিত যেতেন দূরবর্তী কর্মকার আবু সাইফের বাড়িতে। পথের দূরত্ব, ধোঁয়ার কষ্ট কিছুই পরোয়া করতেন না।

এতোটা ভালোবাসতেন যে কন্যার মৃত্যুর পর কন্যার কন্যাকে প্রচন্ড ভালোবাসতেন। সবথেকে ভালোবাসি বলে সবার সামনে পরিয়ে দিয়েছিলেন ইয়েমেনী গলার হার। তাকে নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতেন নামাজে।

ভাই হিসাবে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাম

বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন ছিলেন তিনি। কোনো আপন ভাইবোন ছিল না। কিন্তু একজন দুধবোন ছিল, শায়মা নাম্নী। তায়েফের যুদ্ধে শায়মা যখন বন্দী হলো মুসলিমদের হাতে, তখন তিনি বোন বলে শায়মাকে মুক্তি দিয়েছিলেন। সাথে উপহার দিয়েছলেন ভেড়ার পাল। চাচাতো বোন উম্মে হানীকেও ভালোবাসতেন। এছাড়াও শ্বশুরপক্ষীয় বোনসমতুল্যদেরও অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং ভালোবাসতেন।

একজন যোগ্য স্বামী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

স্বামী হিসাবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেবল যোগ্যই ছিলেন না; বরং মানুষকে কখনো আগ্রহ দিয়েছেন, কখনো হুকুম করেছেন যোগ্য স্বামী হতে। তিনি এমন স্বামী ছিলেন, যে স্ত্রীর মৃত্যুর পরে অন্য স্ত্রী থাকতেও সেই স্ত্রীকে মনে রেখেছেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মনে রেখেছেন তার বোন, বান্ধবীকে। কন্ঠস্বর শুনে উদগ্রীব হয়ে দুআ করেছেন, আল্লাহ! এ যেন হালা হয়!!

শত ব্যস্ততায়ও স্ত্রীকে সময় দিয়েছেন, তাঁদের হৃদয়ের ভাষা বুঝেছেন, তাঁদের কষ্টে পাশে থেকেছেন। স্ত্রীর ছোট্ট ছোট্টো আবদার পূরণে কখনো পিছপা হননি। দাওয়াত, সফর কোথাও ভুলতেন না প্রিয়তমা স্ত্রীদের। এমন সমাজে থাকতেন, যেখানে নারীত্বের ছিলনা বিন্দুমাত্র মূল্য, সেখানে তিনি স্ত্রীদের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মানসিক চাহিদাও পূরণ করতেন। এমনভাবে তাদের আমোদিত করতেন, যা হয়তো একালের মানুষও কল্পনা করতে পারবে না। স্ত্রীর ঠোট লাগানো হাড্ডি চাঁবাতেন, স্ত্রীর ঠোট লাগানো জায়গাতে স্পর্শ করেই পানি পান করতেন। ভুলতেন না স্ত্রীর পরিবারকেও। তিনি স্বামী হিসাবে এতোটা যোগ্য ছিলেন যে, আজও লক্ষ নারী স্বামী হিসাবে মুহাম্মাদী আখলাকওয়ালা কাউকে চায়। এরপর আর কিইবা বলার থাকে তার যোগ্যতা সম্পর্কে?

সমাজের অন্য নারীদের প্রতি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম

তিনি সাধারণ একজন মানুষ ছিলেন না, ছিলেন সমাজের নেতাও। তাই তার স্নেহও সমানভাবে পেতেন সমাজের অন্য নারীরা। বুদ্ধি, পরামর্শ, সাহায্য সবভাবে থেকেছেন নারীদের পাশে। কারো আপনজন শহীদ হলে তার বাড়িতে গিয়ে তাকে সান্ত্বনা জানাতেও ভুলতেন না। সাধারণ নারীদের আবেদন কবুল করতেন। তাদের জন্য দুআ করতেন। সমাজের বিভিন্ন নারীরা তার কাছে আসতেন, তিনি তাদের অভিযোগ শুনতেন, পরামর্শ দিতেন। তাদের মনে রাখতেন।

তিনি ছিলেন এমন একজন মহামানব, যিনি নিজে নারীদের সম্মান করে গেছেন এবং তার উম্মতকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন নারীত্বের মূল্য আদায় করতে। যে মা বাবার মুত্যুর পর মিরাস হিসেবে বন্টিত হতো, সে মায়ের সম্মানে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেলেন অমোঘ বাণী, “পুরুষের উপর সবচেয়ে বেশী হকদার মা, মা এবং মা”। (ইবনে মাজাহ, হাদিস নং-৩৬৫৮) আর অবহেলিত মাংসপিণ্ড জ্ঞান করা স্ত্রীজাতি কী পেলো? নারী মুক্তির এই মহানদূত উম্মতকে সতর্ক করে দিলেন এই বলে, “তোমাদের মধ্যে সে-ই শ্রেষ্ঠ, যে তার স্ত্রীর নিকট উত্তম”। (তিরমিজি, হাদিস নং-৩৮৯৫) অর্থাৎ পুরুষের শ্রেষ্ঠত্বের সার্টিফিকেট নারীর হাতে দিয়ে গেলেন।

কত মনীষীই তো গত হলো, কত সভ্যতাই তো গত হলো, আর কে দিয়েছে এমন বাণী?

বোন, আর কন্যারূপী মেয়েদের সম্মান নিশ্চিত করতে বলেছেন, “যে ব্যক্তি সাবালক হওয়া পর্যন্ত দুটি কন্যার ভারবহন করবে সে আমার সাথে কিয়ামাতের দিন হাতের দুই আঙ্গুলের ন্যায় পাশাপাশি উত্থিত হবো”। (মুসলিম, হাদিস নং-২৬৩১)

তার রেখে যাওয়া সভ্যতার আদর্শে উজ্জীবীত হয়ে এক পশ্চিমা নারী বলেছিলো, “এই যদি হয় মুসলিমদের কাছে নারীর সম্মান তাহলে আমাকে একমাস সেখানে থাকার পর যদি আমাকে মরতেও হয় তাহলেও আমি খুশী থাকবো। (আলী তানতাভী রহ.)

তারপরও যদি কেউ বলে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীর পরিপূর্ণ মূল্যায়ন করেনি, তাহলে আমি তাকে স্রেফ অন্ধ বৈ কিছু বলতে রাজি নই। আদতে পেঁচা কখনোই আলোর রেখা দেখতে পায় না।

আমি বরং পুরো দুনিয়ার মুসলিমাহদের পক্ষ থেকে দীপ্ত কন্ঠে ঘোষণা করতে চাই, “আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত সম্মানে খুশি। আমরা জানি তিনিই কেবল আমাদের আসল মুক্তির লক্ষ্যে সংগ্রাম করেছেন। আর বাকি দুনিয়া হয় ভুলে গেছে নতুবা আবর্জনা, পাপের প্রতীক বলে বঞ্চিত করেছে। নতুবা অধুনা সভ্য (!) মানুষদের ন্যায় আমাদের অধিকার হরণ করেছে”।

Tijarah-Shop

Facebook Comments