ঈদসংখ্যা ২০২০

রাহমাতুল্লিল আলামিন | সুমাইয়া মারজান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr

বনু হানিফা গোত্র। ইয়ামামা অঞ্চলের একটি শাখা। গোত্রের লোকজন মুসলমানদের দুচোখে সহ্য করতে পারে না। ওরা মুসলমানদের বড় শত্রু। ওত পেতে বসে থাকে কী করে মুসলমানদের ক্ষতি করা যায়। মুসলমানদের হত্যা করতো সুযোগ পেলেই।

এই গোত্রের প্রধান লোকটা ছিল খুবই নিষ্ঠুর প্রকৃতির। মায়াদয়া বলতে কিছু তার হৃদয়ে ছিল না। নাম সুমামা ইবনে উছাল।

তার অত্যাচারে মুসলমানগণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিলেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৬ষ্ঠ হিজরিতে নাজদ অভিমুখে একদল অশ্বারোহী সৈন্য প্রেরণ করেন। তারা ছুমামাকে বন্দি করেন। তাকে নিয়ে আসলেন মদিনায়। মসজিদে নববির খুঁটির সাথে তাকে বেঁধে রাখা হলো। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবিদেরকে বললেন, তার সাথে তোমরা ভালো ব্যবহার করবে।

সুমামা ছিল ভোজনরসিক।
এক বৈঠকে খেতে পারতো দশজনের খাবার। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা জানতেন। ঘরে এসে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহাকে বললেন, আজকে একজন ভোজনবিলাসী মেহমান পেয়েছি। ঘরে যা খাবার আছে সব তার জন্য একত্রিত করে রাখো।
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বন্দি মেহমানের জন্য সব খাবার পাঠিয়ে দিলেন।
সুমামাও চেটেপুটে সব খেয়ে নিলো।

সুমামার দিন বেশ ভালোই কাটছে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আতিথেয়তায়। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তুমি কী চাও?
জবাবে বলে, হে মুহাম্মদ! আমি কল্যাণের আশা করি। তুমি যদি আমাকে হত্যা করো তাহলে একজন খুনিকে হত্যা করবে। আর যদি আমার প্রতি অনুগ্রহ করো, তো আমাকে তুমি কৃতজ্ঞ হিসেবেই পাবে। আর যদি তুমি ধনসম্পদের অভিলাষী হও, তাও চাইতে পারো। যা চাও তাই দিবো।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু শুনলেন। কিছু বললেন না। তাকে আগের অবস্থাতেই রেখে দিলেন। পরদিন আবার এসে আগের মতোই প্রশ্ন করলেন। সুমামা আগের মতোই জবাব দিলো। তৃতীয় দিন এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আবার একই প্রশ্ন করলেন। সুমামাও সেই আগের জবাব দিলেন। এবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার বাঁধন খুলে দিলেন। ঘোষণা করলেন তুমি মুক্ত।

মুক্তি পেয়ে সুমামা বাড়ির পথ ধরলো। ধীরে ধীরে হাঁটছে। মনে মনে কিছুটা শঙ্কিত। এই বুঝি আবার তারা আসছে। আবার বন্দি করে নিবে। বারবার পিছন ফিরে দেখলো। নাহ। কেউ আসছে না। সে এখন মুক্ত। শঙ্কাহীন। এসব ভাবতে ভাবতে তার মনটা কেমন যেন আনমনা হয়ে উঠল। জীবন্ত জলছাপ হয়ে কতগুলো দৃশ্য ভাসতে লাগলো তার মনের পর্দায়। মনে পড়ল—কতভাবে সে মুসলমানদের উপর অত্যাচার করেছে। মুসলমানদের হত্যা করেছে। তারপর বন্দি হলো। আর মুসলমানরা তার সাথে কত ভালো ব্যবহার করল। মুহাম্মদ কত উদার! চোখে ভাসলো মুহাম্মদের চেহারা। এত মায়া লাগছে কেন তার জন্য। বুকের ভেতরটা কেমন কেমন করছে। কী যে হলো!

আপনাআপনি মসজিদে নববির পাশেই একটি খেজুর বাগানে গেলো। কূপ থেকে পানি তুলে গোসল করল। মসজিদে প্রবেশ করতে করতে ঘোষণা করলো; আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ। মসজিদের সবাই অবাক। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঠোঁটে সেই মুচকি হাসির স্নিগ্ধ ঝিলিক! সুমামা গিয়ে দাঁড়ালো নবীয়ে রহমতের সামনে। অকপটে বলতে লাগলো তার মনের কথা। হে মুহাম্মদ! আজকের আগে পৃথিবীর বুকে আপনার চেহারা থেকে আর কারো চেহারা আমার কাছে এত ঘৃণিত ছিল না। আর এখন! আপনার চেহারার চেয়ে প্রিয় চেহারা পৃথিবীর বুকে আর একটিও নেই। কসম খোদার আপনার ধর্ম আমার কাছে ছিল সবচে ঘৃণিত ধর্ম। আর এখন! আপনার ধর্মই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হয়ে গেছে।

আপনার অশ্বারোহীরা আমাকে এমন সময় ধরে এনেছে যখন আমি ওমরার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলাম। এখন আপনি আমাকে কী করতে নির্দেশ দেন?
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সুসংবাদ দেন। বলেন আজ থেকে তুমি নবজাতকের মতো পবিত্র। তোমার অতীতের সব গোনাহ মাফ হয়ে গেছে। তুমি ওমরা করে আসো। নবীজির মহানুভবতায় অত্যাচারী নিষ্ঠুর সুমামা হয়ে গেলো রাযিয়াল্লাহু আনহু। সুমামা রাযিয়াল্লাহু আনহু।

দিন কয়েক পরের ঘটনা। সুমামা রাযিয়াল্লাহু আনহু ওমরার জন্য মক্কায় এসেছেন। কাবা চত্বরে গেলেন। চিৎকার করে বলতে লাগলেন, আল্লাহু আকবার। আল্লাহু আহাদুন। আল্লাহ মহান। আল্লাহ এক। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, তুমি কী ধর্মত্যাগী হয়ে গেছো? সুমামা দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিলেন। না। আগে বে-দীন ছিলাম। এখন দীনে প্রবেশ করেছি।

মক্কার কাফিররা এটা সহ্য করতে পারলো না। তাদের শরীর জ্বলে উঠলো। সদলবলে ছুটে আসলো খোলা তরবারি হাতে। খুব করে অপমান করলো সুমামা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে। গালমন্দও করলো খুব।
সুমামা রাযিয়াল্লাহু আনহু কিছু বললেন না। মনে মনে ক্ষেপে গেলেন। বাড়িতে ফিরে মক্কাবাসীকে জব্দ করার পথ খুঁজতে লাগলেন। পেয়েও গেলেন।
ইয়ামামা থেকে মক্কাবাসীরা খাবার আমদানি করতো। আর তিনি তো সেই গোত্রেরই নেতা। তিনি ঘোষণা করলেন, আমি ইসলাম গ্রহণ করার কারণে যেহেতু আমাকে অপমানিত হতে হলো তাহলে তোমরাও শুনে রাখো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদেশ ছাড়া আর একটা শস্যদানাও ইয়ামামা থেকে মক্কা যাবে না।

দিন যায়, সপ্তাহ যায়। ইয়ামামা থেকে একটা কণাও আসে না মক্কায়। মক্কাবাসীরা পড়লো বিপাকে। সুমামার সাথে আপোসও করা যায় না।
দিনে দিনে অবস্থা চরমে উঠলো। মক্কাবাসীর না খেয়ে মরার দশা।
কাফির সর্দারেরা পরামর্শ করতে বসলো। অনেক আলাপ-আলোচনা হলো। কোন সুরাহার পথ বের হয়ে আসলো না। সুমামার সাথে আপোসেরও কোন পথ নেই। এবার কী হবে!

এরমধ্যে একজন বললো, মুহাম্মদের হৃদয় তো কোমল। তার তো মানুষের দুঃখ -দুর্দশা সহ্য হয় না। তাকে বলে দেখো কিছু একটা ব্যবস্থা হবে। আরেকজন বলে সুমামা তো মুসলমান হয়েছে। হয়তো মুহাম্মদের কথা শুনে আমাদেরকে খাদ্য দিতে পারে।
ওদের মন সায় দেয় না। যাকে এত কষ্ট দিলাম, যার উপর এত অত্যাচার করলাম আজকে তার কাছে গিয়ে নত হবো! এছাড়া উপায়ও নেই। মান ধরে বসে থাকলে উপোসে মরতে হবে। শেষতক লজ্জার মাথা খেয়ে সবাই নবীজির কাছে গেলো।

অনুনয় বিনয় করে বললো, হে মুহাম্মদ! আমরা অনেক বড় বিপদে আছি। সুমামা আমাদের খাবার বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা তোমার আত্মীয়স্বজন। তুমি কি চাও আমরা না খেয়ে মরি?
মক্কাবাসীরা ছিল মুসলমানদের জীবনের শত্রু। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তারা কত নির্যাতন করেছে। তার হিসাব রাখার সাধ্য কারোর নেই। হত্যার ষড়যন্ত্র করেছে। তার সাহাবিদেরকে দিয়েছে অমানবিক কষ্ট। তাকে করেছে দেশছাড়া। তবু তার কোমল প্রাণ তাদের দুঃখের কথা শুনে কেঁদে উঠলো। এরা না খেয়ে থাকবে! তিনি তা ভাবতেই পারছিলেন না। তিনি সুমামা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে জানিয়ে দিলেন, খাদ্যশস্য আল্লাহর দান। তার উপর রয়েছে সবার জন্মগত অধিকার। একদিকে লোকে উপোসে মরবে। অন্যদিকে খাদ্যের স্তুপ জমবে তা হয় না। তুমি বিধিনিষেধ তুলে নাও। আর ধৈর্য ধারণ করো। মক্কায় খাদ্য সরবরাহ করো।

সুমামা রাযিয়াল্লাহু আনহু আর কী করবেন! রাসুলের নির্দেশ তো আর অমান্য করা যায়। তিনি সঙ্গে সঙ্গেই খাদ্যশস্য সরবরাহের ব্যবস্থা করলেন। মক্কাবাসী দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পেয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। এতকিছুর পরও কাফিরদের মুসলমানদের বিরুদ্ধাচরণ করা,শত্রুতা দেখানো কমলো না। তারা সব ভুলে আগের মতোই রইলো।
নবীজি সব বুঝতেন, জানতেন। কিন্তু কিছু বলতেন না। কেউ কষ্ট পাবে এটা তার সহ্য হতো না। হোক না সে প্রাণের শত্রু। তাইতো তিনি প্রতিশোধের সুযোগ পেয়েও তা ব্যবহার করলেন না। অথচ! সুমামা রাযিয়াল্লাহু আনহু তিনি না বললে কিছুতেই মক্কাবাসীদের খাবার দিতেন না। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে কাফিরদের কষ্ট দূর করে দিলেন। কারণ, তিনি যে দয়ার আধার। রাহমাতুল্লিল আলামীন।

তথ্যসূত্র : মুসলিম শরীফ।

Tijarah-Shop

Facebook Comments

Write A Comment

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Pin It
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: