আলি নদভির সিরাতচর্চা | শারাফাত শরীফ

আলি-নদভির-সিরাত-চর্চা

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

আবুল হাসান আলি মিয়া নদভি রহিমাহুল্লাহ (মৃ. ১৯৯৯ ঈ.)। তিনি আলি মিয়া নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। প্রায় ছিয়াশি বছর এই আলোবাতাসের পৃথিবীতে ছিলেন। দীর্ঘ জীবনে তিনি অসংখ্য কিতাবাদি পাঠ করেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে, বিভিন্ন ভাষায়। এবং তাঁর অতীত ও বর্তমান অনেক মানুষকে পাঠ করেছেন। এজন্য তাঁর আল্লামা ইকবাল পাঠ সম্পর্কে যদি আমরা জানতে চাই; আমাদের হয়তো তাঁর জীবনের ছোট্ট একটা অংশ জানতে হবে। যার শুরুটা হবে আল্লামা ইকবালের সাথে তাঁর সাক্ষাতের পর হতে। কিম্বা এরও কিছুকাল আগে থেকে। কিন্তু যখন বিষয়টা হবে, তাঁর সিরাত পাঠ; আমাদের তাঁর পুরো ছিয়াশি বছরের জীবনকে জানতে হবে। তাঁর সিরাত পাঠের ব্যাপ্তি পুরো জিন্দেগিকে জড়িয়ে আছে। একটা ঘটনা দিয়ে বিষয়টা আমরা বুঝানোর চেষ্টা করবো।

সিরাত পাঠের সূচনা

তাঁর অটোবায়োগ্রাফি ‘কারওয়ানে জিন্দিগি’তে তিনি একটা গল্প লিখেছেন। গল্পটা তাঁর নিজের। বয়স যখন আট-নয়ের কাছাকাছি হবে। তখনই সিরাত বিষয়ক ছোট-বড় কিছু রিসালা পড়ে ফেলেছেন। সবগুলো উর্দুভাষার ছিল। হঠাৎ একদিন তাঁর মনে শখ জাগল, তিনি সিরাত বিষয়ক জলসা করবেন। মানুষদের ডেকে সিরাতের গল্প শুনাবেন। তখনকার সময়ে এমন জলসা অনেক হতো। অবশ্য এসব জলসা বড়রা করতেন।

শখ পুরণে তিনি তাঁর সমবয়সীদের ঘরে গেলেন; একে একে। এবং তাদের মজলিশে উপস্থিতির দাওয়াত করলেন। তাঁর দুজন বোন ছিল। তাঁদের কেউ একজন তাঁর মাথায় পাগড়ি বেঁধে দিল। তিনি পঠিত কিতাবাদি হতে একটি তুলে পড়া শুরু করলেন। অবস্থা এমন ছিল নবী আলাইহিমুস সালামের দাদা; কোরাইশ নেতা আবদুল মুত্তালিবকে আবদুল মুত্তালিব পড়ছিলেন।

তাঁর পিতা আবদুল হাই রহি. দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। চুপচাপ নিজ পুত্রধনকে দেখছিলেন। পিতার অনুভূতি অনুধাবন করে তিনি লিখেন, ‘তাঁর জন্য ঘটনাটা কত খুশির ছিল। অল্পবয়সী নিজ সন্তানকে ওই মহান ব্যক্তির স্মরণে সময় কাটাতে দেখেছেন। যিনি খায়র ও বারাকাতের অধিকারী।’ (কারওয়ানে জিন্দিগি: খ. ১, পৃ. ৫৭)

সিরাতুন্নাবির পরিবার

তাঁর পরিবার বংশগত দিক থেকে সাইয়্যেদ। নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশের সূত্রতায় নবির সুন্নত ও সিরাত তাঁদের পরিবারের আদর্শ ছিল। তাঁর লিখিত ‘আস সিরাতুন্নাবাবিয়্যা’ গ্রন্থের ভূমিকায় তিনি আমাদের জানান, “সিরাত আমাদের পারিবারিক সংস্কৃতি ও কৃষ্টির অন্যতম ভিত্তি হিসাবে বিবেচিত হতো। বাড়ির প্রতিটি শিশুর জীবনকে সিরাতের রঙে রঞ্জিত করাকে জরুরী বলে মনে করা হতো। পরিবারের শিশুদের সভ্য হিসাবে গড়ে তোলার পেছনে সদা ভ্রাম্যমাণ ক্ষু্দ্র পাঠাগারের অবদান সবচেয়ে বেশি।” ( সিরাতুন নাবাবিয়্যা: পৃ. ০৯, দারুশ শারাক)

তিনি বলেন, “আমাদের ঘরানা উলামা ও লেখকদের ঘরানা ছিল। আমার আব্বা তাঁর সময়কার বড় লেখকদের একজন ছিলেন। বংশীয় প্রভাব অনেক প্রতিক্রিয়াশীল হয়। যা বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে। আর বাচ্চাদের জীবনকেও এই প্রভাব আচ্ছন্ন করে ফেলে। এজন্য কিছুটা বংশীয় প্রভাব আর কিছুটা আব্বাজানের কারণে ঘরের প্রতিটি সদস্যের মাঝে কিতাবাদি পড়ার ঝোঁক তৈরি হয়েছিল। এই ঝোঁক এতটা বেড়ে গিয়েছিল; অনেকটা অসুস্থতার পর্যায়ে বলা যায়। যখনি নতুন কোনো বই চোখে পড়তো না পড়ে সেটা হাতছাড়া করা সম্ভব হতো না।” (কারওয়ান: খ. ১, পৃ. ৫৭ )

তিনি যখন লিখতে শিখেন, তাঁর আম্মা রহি. তাঁকে বলেন, যখনি কিছু লিখতে শুরু করবে; এর আগে বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম লিখবে। এবং এই দুআ, الهم اتني بفضلك أفضل ما توتي عبادك الصالحين   লিখবে। তিনি বলেন, “এই দুআ লেখার অভ্যাস আমার এখনো রয়ে গেছে। ( তাঁর বয়স তখন প্রায় সত্তুর।) আর এখনো দুআর জন্য হাত তুললে এই দুআ আমার মুখে চলে আসে।” (কারওয়ানে জিন্দেগি: খ. ০১, পৃ. ৮৪)

 যোগ্য অভিভাবক

একটা শিশু একখণ্ড নরম-কোমল মাটির খামিরার মতো। অবিভাবক তাকে যেভাবে খুশি ভাঙতে পারে, গড়তে পারে। কিন্তু যোগ্য অভিভাবক সব শিশুর ভাগ্যে থাকে না। আলি মিয়া রহিমাহুল্লাহ ছিলেন ভাগ্যবানদের একজন। পিতার মৃত্যুর তিনি তাঁর বড়ভাই ডা. হাকীম সাইয়্যেদ আবদুল আলি (মৃ. ১৩৮০ হি.) তত্বাবধানে ছিলেন।

এই সম্পর্কে তিনি বলেন, “তখন আমার বয়স ছিল নয় বছর। তিনি (ভাই) বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখতেন, এই বাল্যকালে কী ধরনের কিতাবাদি মুতালাআ ও অধ্যায়ন করা আমার জন্য উপকারি হবে। সুতরাং তিনি আমাকে ‘সিরাতে খাইরুল বাশার’ নামে একটি কিতাব পড়তে দেন। যার লেখক হলেন হিন্দি।

তিনি (ভাই) প্রচুর পরিমাণ সিরাতের কিতাবাদি পড়তেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, জীবনে বড় ধরনের ভূমিকা পালন, আকীদা-বিশ্বাস মজবুত করা, চারিত্রিক উৎকর্ষতা এবং ঈমানের বীজ বপন ও প্রতিপালনের জন্য সিরাতে তাইয়্যিবা অপেক্ষা প্রতিক্রিয়াশীল আর কিছু নেই। কাজেই জীবনের শুরু থেকেই সিরাতের কিতাবাদির সাথে আমার যারপরনাই হৃদ্যতা গড়ে উঠে। এবং সিরাতের কিতাব অধ্যয়ন, সংগ্রহ করার গভীর আগ্রহ জন্মায়।” (আত তরীক ইলাল মদিনা: পৃ. ১১)

আলি মিয়া রহি. এর সিরাত পাঠ অনেক বিস্তৃত ছিল। জীবনের একটা সময় তিনি এমন কাটিয়েছেন; যখন সিরাতই ছিল তাঁর ধ্যানজ্ঞান। তিনি বলেন, “একটা সময় সিরাতের গ্রন্থ আমার দিবানিশির সঙ্গী ছিল। আমার জীবনের যাবতীয় মনযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। সিরাত পাঠে আমি ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করতাম। এবং ঈমান ও ইয়াকীনের অস্তিত্ব অনুভব করতাম। সিরাতে বর্ণিত ঘটনাবলি আমার নবি প্রেমের বাগান সিক্ত করত।” এজন্য  তিনি মনে করেন, “জীবন গড়ার শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভের ক্ষেত্রে কোরআন মাজিদের পরে সিরাতের মর্মস্পর্শী ঘটনাবলির কোনো বিকল্প নাই।” (সিরাতুন নাবাবিয়্যা: পৃ. ১০, দারুশ শারাক)

সিরাতের প্রিয় কিতাব

আলি মিয়া রহি. জীবনে সিরাত বিষয়ক অসংখ্য কিতাবাদি পাঠ করেছেন। যার অধিকাংশ আরবি আর উর্দুভাষায় রচিত। এর মাঝে একটি কিতাব নিয়ে তিনি মনমুগ্ধকর আবেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর রচিত ‘আত তরীক ইলাল মদিনা’ কিতাবে তিনি الكتاب الذي لاأنسى فضله শিরোনামে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। যেই শিরোনামের বাংলা করা যায়, যে কিতাবের অনুগ্রহ ভুলা যায় না।

তিনি আলোচনা শুরু করেন, “আজ আমি আপনাদের এমন এক কিতাবের কথা বলবো; যার অপরিসীম অনুগ্রহ আমার উপর রয়েছে। যার লেখকের জন্য আমি দিল খুলে রহমতের দোয়া করি। যিনি তাঁর কিতাবের মাধ্যমে ঈমানের পর আমাকে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস দিয়েছেন। বরং বলা যায়, এটিও ঈমানেরই অংশ। কিতাবটির নাম, সিরাতু রহমাতিল্লিল আলামিন। যার লেখক হলেন, কাযি মোহাম্মাদ সুলাইমান মনসূরপুরি রহি.।”

এরপর তিনি এই কিতাব ক্রয়ের একটি হৃদয়গ্রাহী গল্প বলেন। যা দশ-এগারো বছর বয়সি আলি মিয়ার অন্তর বিস্তর রেখাপাত করেছিল। যার বিস্তারিত বর্ণনা তিনি আলোচনা করেছেন। ঘটনাটা ছোট্ট করে আমরা জানতে পারি।

একবার তিনি শিবলি বুক ডিপো লক্ষ্মৌর কিতাবের সূচিপত্র দেখছিলেন। তখনি এই কিতাবের নাম তাঁর চোখে পড়ে। আর তিনি বইটার অর্ডার পাঠান। ডাকে বা চিঠিতে। কিন্তু বইয়ের দাম পরিশোধ করার সাধ্য তাঁর ছিল না। তবুও তাঁর অর্ডার করার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, “কিন্তু শিশুরা বাজেটের আইনকানুন, সীমা-পরিসীমা এবং জীবন-জীবিকার সঙ্কীর্ণতার বাধা বুঝে না। সে কেবল তার নিষ্পাপ চাওয়া-পাওয়া, আশা-আকাঙ্খা নিয়ে চলে।”

এদিকে পিয়ন বই নিয়ে উপস্থিত হয়। কিন্তু তাঁর কাছে তো পয়সা নেই। তিনি তাঁর আম্মার নিকট টাকা চান। কিন্তু তাঁর হাতও ফাঁকা বলে তিনি জানান। তিনি মাত্র একজন দশ-এগারোর কিশোর। তাঁর অপারগতা কিন্তু চাহিদার তীব্রতার অনুভূতি তিনি প্রকাশ করেন চমৎকার ভাষায়। তিনি বলেন, “আমি দেখলাম এই মুহূর্তে আমার কোনও সাহায্যকারী নেই। তবে, একজন আছে, শিশুরা যার নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে। আামাদের নেতা উমায়ের বিন আবি ওয়াক্কাস রাযি. যার নিকট সুপারিশ করেছেন। আর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণের অনুমতি দিয়েছিলেন। এ হল চোখের পানি এবং নিষ্পাপ বিলাপের সুপারিশ। যা আল্লাহর নিকট খুবই প্রিয়। সুতরাং আমার আম্মার অন্তর কোমল হয়ে গেল। আর তিনি কোথাও হতে টাকার ব্যবস্থা করে আমাকে দিলেন।” (আত তরীক ইলাল মদিনা: পৃ. ১৩)

সিরাত পাঠ

আমরা যারা সিরাত পাঠ করি, নবি সা.কে বুঝতে চাই, সাহাবায়ে কেরামকে বুঝতে চাই। আমাদের জন্য সে যুগের অধিবাসীদের বুদ্ধিবৃত্তি ও কৃষ্টিকালচার সম্পর্কে অবগত হওয়া আবশ্যক। সেই সাথে আরবের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো জানা; যুদ্ধ ও সামরিক শক্তির ধরণ সম্পর্কে জানা। এবং আরবদের ধ্যান-ধারণা, ভাবধারা, মানসিকতা ও চিন্তাভাবনা সম্পর্কে জানা আবশ্যক। তবেই বোঝা যাবে ইসলামের উন্নতি ও অগ্রগতির পথে কি কি সঙ্কট দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তাই মদিনার পটভূমি, পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতা বোঝা ছাড়া ইসলামের সাফল্য ও বিজয়ের সুগভীর রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব নয়। এইসব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন ছাড়া নবি সা. আর সাহাবায়ে কেরামকে আমরা বুঝতে পারবো না। কিভাবে নবি সা. তাঁদের তালিম ও তরবিয়ত দিয়েছেন; কিভাবে তাঁদেরকে এক নতুন স্বপ্ন দেখিয়েছেন। কিভাবে পরস্পর সংঘাত ও বিদ্রোহমুখর মানুষগুলোকে এক অটুট বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন।

আলি মিয়া রহি. বলেন, “পাঠকের সামনে সিরাতের অনেক ঘটনা আসবে, হাদিসের অনেক বর্ণনা আসবে। যদি তখনকার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে। তার অবস্থা হবে অচেনা সুড়ঙ্গপথ যাত্রার মতো। যার গলিঘুপচি তার জানা নেই।” ( সিরাতুন নাবাবিয়্যা: পৃ. ১৪, দারুশ শারাক)

সিরাতের কিতাবের বৈশিষ্ট্য

আলি মিয়া রাহি. বলেন, “যদি সিরাতের কোনো গ্রন্থ ভক্তি ভালবাসা, ঈমান ও আবেগশূন্য হয় তবে তা হবে জীবন স্পন্দনহীন এক শুস্ক কাষ্ঠ নির্মিত কাঠামো। যাতে জীবনের স্নিগ্ধতা, সিক্ততা, ও উষ্ণতার কোন কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

আবার ভক্তি-ভালবাসা ও আবেগ-উচ্ছ্বাসের আধিক্য যেন সুস্থ বিবেক-বুদ্ধির সকল দাবিকে উপেক্ষা না করে বসে যা বর্তমান যুগে অপরিসীম গুরুত্ব রাখে। আবার সর্বজনগ্রাহ্য যুক্তি ও সঠিক মৌলনীতির পরিপন্থীও যেন না হয়।

তাহলে এটা হবে নিতান্তই ধর্মবিশ্বাস ও অন্ধ অনুকরণের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক গ্রন্থ, যেখানে উজাড় করে ঢেলে দেয়া হয়েছে অন্তরের আবেগ-উচ্ছ্বাস, ভক্তি-ভালবাসা, নিংড়ে দেয়া হয়েছে হৃদয় অর্ঘ্য যা প্রগাঢ় ঈমানের অধিকারী জন্মগত মুসলমান এবং সুগভীর প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের অধিকারী ওলামায়ে কেরাম ছাড়া আর কারও পক্ষে বোঝা ও গ্রহণ করা সম্ভব না।” ( সিরাতুন নাবাবিয়্যা: পৃ. ১০, দারুশ শারাক)

সিরাত লেখা

আলি মিয়া রহি. আরবি ও উর্দূভাষায় অনেক কিতাবাদি লিখেছেন। কিন্তু তখনো পূর্ণ সিরাত নিয়ে কিতাব লেখেননি। অবশ্য এর আগে তিনি সিরাতের সাথে সম্পর্কিত দুইটি কিতাব রচনা করেন।

প্রথমটি হলো, মা যা খাসিরাল আলাম। যার চমৎকার বাংলা অনুবাদ হয়েছে। মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ হাফিজাহুল্লাহ বইয়ের নাম দিয়েছেন, ‘মুসলিম উম্মার পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হল?’

১৩৬৩ হিজরি মুতাবেক ১৯৪৭ ঈসায়ীতে আলি মিয়া রহি. এই কিতাব রচনা করেন। যখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ত্রিশ বছর। কিন্তু কিতাবটি প্রকাশিত হয় ১৪০১ হিজরির দিকে। এবং আরব ও আজমে এই কিতাব সমানভাবে সমাদৃত হয়।

শহীদ সাইয়্যেদ কুতুব রহি. এর মতো ব্যক্তি এই কিতাবের ভূমিকা লিখেন। এবং এক পর্যায়ে বলেন, “এই কিতাবের পাঠক হয়তো আশা করেননি যে, একজন আলেম, যিনি ইসলামের রূহানী ও আধ্যাতিক শক্তিতে পূর্ণ আস্থাবান এবং বিশ্বেনেতৃত্বের আসনে ইসলামের প্রত্যাবর্তনের জোরালো প্রবক্তা। তিনি নেতৃত্বের যোগ্যতা সম্পর্কেও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করবেন এবং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির পাশাপাশি শিল্প, প্রযুক্তি ও সমরশক্তি অর্জনের প্রতিও গুরুত্ব আরোপ করবেন। সেই সঙ্গে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও স্বনির্ভরতা অর্জনেরও আহ্বান জানাবেন। এবং আহ্বান জানাবেন পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের। কিন্তু পরম পরিতোষের বিষয় যে, এসকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর চিন্তা থেকে বাদ পড়েনি।” (মুসলিম উম্মার পতনে বিশ্বের কী ক্ষতি হল? পৃ. ১৯)

 

দ্বিতীয়টি হল, আত ত্বরীক ইলাল মদীনা।

এই কিতাবের ভূমিকা লিখেছেন আলি তানতাবি রহি.। কিতাবটি পাঠের পর তিনি বলেন, “আমার প্রিয় ভাই আবুল হাসান! আমি যখন তার কিতাব ‘আত তরীক ইলাল মদীনা’ পড়লাম, তখন অনুভব করলাম, আমার প্রথম হজ্বের আবেগ-অনুভূতি পুনরায় উজ্জীবিত হচ্ছে।” (আত তরীক ইলাল মদীনা: পৃ. ১০)

১৩৯৬ হিজরির পূর্বে তিনি পূর্ণ সিরাতের কোনো কিতাব লেখেননি। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, “জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে অনেক বিষয়ে লেখা হয়েছে। এবং দশের অধিক কিতাবাদি লেখা হয়েছে; তবুও সিরাতের একটি গ্রন্থ রচনার চিন্তা করিনি। অথচ আমি সিরাতের এমন একটি গ্রন্থের প্রয়োজন অনুভব করতাম; যা লিখিত হবে আধুনিক জ্ঞান-গবেষণার রীতি অবলম্বন করে। আধুনিক ও প্রাচীন মৌলিক গ্রন্থরাজির জ্ঞানভাণ্ডারের সহযোগীতা নিয়ে। যার ভিত্তি হবে সিরাতে মৌলিক প্রাচীন গ্রন্থের উপর। যেখানে কোরআন-হাদিসে বর্ণিত তথ্য চুল পরিমাণ হেরফের হবে না।” ( সিরাতুন নাবাবিয়্যা: পৃ. ১৪, দারুশ শারাক)

কিন্তু প্রয়োজনবোধ থাকা সত্বেও তিনি সিরাতের কিতাব রচনা করেননি। এর একটা কারণ হতে পারে, মানুষের জীবনী লেখা দুঃসাধ্য কর্ম। তিনি বলেন, “আমার জানা ছিল, কোন মনীষীর জীবনি লেখার মতো দুঃসাধ্য কর্ম কোন লেখকের জন্য আর দ্বিতীয়টি নেই। আর নবি সা.এর জীবনি লেখা তো আরো জটিল ও কঠিন।” ( সিরাতুন নাবাবিয়্যা: পৃ. ১৫ দারুশ শারাক)

এরপর তিনি সিরাতুন্নাবি নিয়ে কিতাব লিখেছেন। নাম দিয়েছেন, আস সিরাতুন নাবাবিয়্যা। আর বড় বড় গ্রন্থে ছড়িয়ে থাকা বিক্ষিপ্ত সিরাতের ঘটনাবলীকে অনুসন্ধান করে একত্রিত করেছেন। যেই কাজকে তিনি তাঁর ভাষায় বলেন, “অসংখ্য পিপীলিকার মুখ থেকে চিনির দানা সংগ্রহ করার মতো কঠিন ছিল।” ( সিরাতুন নাবাবিয়্যা: পৃ. ১২, দারুশ শারাক)

কারণ তিনি মনে করেন, “সিরাত স্বীয় শোভা-সৌন্দর্য, উপযুক্ততা, প্রভাব বিস্তারের অপূর্ব ক্ষমতা ও চিত্তাকর্ষক হওয়ার কারণে কোন মহামানবের সুপারিশ, কোন জ্ঞানীর বিদ্যা-বুদ্ধি কিম্বা কোন লেখক-সাহিত্যিকের চমৎকার সাহিত্যকর্ম মনোমুগ্ধকর বর্ণনার মুখাপেক্ষী নয়।” ( সিরাতুন নাবাবিয়্যা: পৃ. ১০, দারুশ শারাক)

এছাড়াও সিরাতুন্নাবি বিষয়ে তাঁর যে সকল ছোটবড় রচনা রয়েছে। কিছু তিনি লিখেছেন। আর কিছু তাঁর বিভিন্ন লেকচারের শ্রুতিলিখন।

সিরাতে মুহাম্মাদ দুআও কে আয়নে মে, আন নাবিয়্যুল খাতিম ওয়াদ দীনুল কামেল, নবীয়ে রহমত, আর রিসালাতুল মুহাম্মাদিয়া ইলাল গুরুবিল হাদির, গারে হেরা সে তুলু হোনে ওয়ালা আফতাব, মুহাম্মাদ সা. কি কামেল পায়রাবি, খাতিমুল আম্বিয়া কি তাশরীফ আওরি দুনিয়া কে লিয়ে রহমত, মানসাবে রিসালাত, মুহসিনে আলাম, মোহাম্মাদ রাসুল্লাহ রাসূলল আজম, নবুওয়াত কা আসল কারনামা, কোরআন মাজিদ মে আব কা তাযকেরা, মোহাম্মাদ সা. কা পয়গাম মওজুদা মুসলমানো কে নাম, অসিয়্যাতে রাসুল, উসওয়াতুন হাসানাতুন

শেষকথা

আমরা বর্তমানে তাঁকে সরাসরি দেখিনি। তাঁর কথা সরাসরি শুনিনি। কিছু শুনেছি উস্তাদ আর মুরুব্বীদের মুখে। আর কিছু পড়েছি কাগজের পাতায়। তিনি তাঁর জীবনী লিখে গিয়েছেন। নিজ হাতে। কারওয়ানে জিন্দিগি নাম দিয়েছেন। আমরা তাঁর জীবনের যাত্রাপথ সম্পর্কে যতদূর জানতে পারি, তিনি উম্মতের ইলমি, আমলি, আখলাখি, ফিকরি ও রূহানি তরবিয়তে নিয়োজিত ছিলেন। এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই কাজ করে গেছেন।

পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া প্রতিটি মানুষের বিশেষ কিছু কাজ থাকে। ব্যক্তির জন্মের পূর্বে যার প্রয়োজন ছিল; মৃত্যুর পূর্বে ওই প্রয়োজনীয়তাকে তিনি পূরণ করেন। যেনো অতিপ্রয়োজনীয় এই সকল কাজ আঞ্জাম দেওয়ার জন্যই আল্লাহ তাকে পাঠিয়েছেন।

তেমনি আলি মিয়ার রহি. এর জন্মের পূর্বে মানবজাতির বিশেষ কিছু শব্দ-বাক্যের প্রয়োজন ছিল, এমন কিছু চিন্তার প্রয়োজন ছিল। যা মানবজাতির  চিন্তার জগতে ঝড় তুলবে। বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সবাইকে ইসলাম সম্পর্কে, মুসলিম সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে শিখাবে। তিনি তা আঞ্জাম দিতে সক্ষম হয়েছেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। এজন্যই বিনম্র শ্রদ্ধাভরে তাঁকে আমরা স্মরণ করি একজন মুফাক্কিরে ইসলাম হিসাবে। রহিমাহুল্লাহ।

Tijarah-Shop

Facebook Comments