সীরাতের আয়নায় দায়ীদের কর্মপন্থা | আবূ উসামা মুহাম্মাদ জাফর ইকবাল

সীরাতের আয়নার দায়ীদের কর্মপন্থা

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন :

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا. سورة الأحزاب : 21

অর্থাৎ, তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং বেশি বেশি আল্লাহর স্মরণ করে তাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ।

(সূরাতুল আহযাব : ২১)।

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবনে কাসীর রহ.(মৃত : ৭৭৪ হি : ) বলেন :

هذه الآية الكريمة أصل كبير في التأسي برسول الله صلى الله عليه وسلم في أقواله وأفعاله وأحواله ; ولهذا أمر الناس بالتأسي بالنبي صلى الله عليه وسلم يوم الأحزاب ، في صبره ومصابرته ومرابطته ومجاهدته وانتظاره الفرج من ربه ، عز وجل ، صلوات الله وسلامه عليه دائما إلى يوم الدين; ولهذا قال تعالى للذين تقلقوا وتضجروا وتزلزلوا واضطربوا في أمرهم يوم الأحزاب , ( لقد كان لكم في رسول الله أسوة حسنة ) أي , هلا اقتديتم به وتأسيتم بشمائله ؟

অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথা, কাজ এবং সবকিছু অনুসরণের ক্ষেত্রে এ আয়াতটি অনেক গুরুত্ববহ। এজন্যই আল্লাহ তাআলা আহযাবের যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধৈর্য, অটলতা, শত্রুদের বিরুদ্ধে পূর্ণ প্রস্তুতি, কঠোর পরিশ্রম এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্যের প্রতীক্ষা সবক্ষেত্রেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণের আদেশ দিয়েছেন। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক। তাইতো আহযাবের যুদ্ধে যারা ভীত বিহ্বল হয়ে পড়েছিল, যাদের অন্তরে অস্থিরতা ও প্রকম্পন সৃষ্টি হয়েছিল এবং যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণের ব্যাপারে দ্বিধা-সংকোচে নিপতিত হয়েছিল তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ তাআলা বলছেন, “ তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ।” অর্থাৎ, তোমরা কেন তাঁর অনুসরণ করছো না এবং তাঁর সুমহান আদর্শের অনুকরণ করছো না না?!! (তাফসীরে ইবনে কাসীর , সূরাতুল আহযাব, ২১)

এ আয়াত সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করছে যে আমাদের জীবনের ছোট বড় সবক্ষেত্রেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মাঝে রয়েছে সর্বোত্তম আদর্শ। তাই কোন ব্যক্তি নিজেকে ইমানদার হিসেবে দাবি করলে সে মনগড়া কোন কাজ করতে পারে না। বরং তাকে জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ও কর্মপন্থা খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে এবং নিজ কর্মক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।এর মাঝেই একজন মুমিনের জীবনের সফলতা ও কামিয়াবী।

আমাদের আলোচ্য বিষয় : আমাদের আলোচ্য বিষয়  হলো “সীরাতের আয়নায় দায়ীদের কর্মপন্থা”। নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে বিষয়টি কতটা স্পর্শকাতর এবং গুরুত্ববহ। আয়নায় মানুষ নিজের প্রতিবিম্ব দেখতে পায়।তো একজন দায়ী যখন নিজেকে সীরাতের আয়নার সামনে দাঁড় করাবে তখন সে তার দাওয়াতী কর্মপন্থার বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করবে যেমন কাঁচের স্বচ্ছ আয়নার সামনে নিজ প্রতিবিম্ব স্পষ্টভাবে প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু সীরাতে নববীর এমন স্বচ্ছ আয়নার নির্ভুল ও সফল চিত্রায়ন কি চারটে খানি ব্যাপার?! এর জন্য প্রয়োজন সীরাতের উৎসসমূহ তথা কুরআনে কারীম, নির্ভরযোগ্য হাদীস, সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থ সমূহে বিচরণকারী বিদগ্ধ, সুচিন্তার অধিকারী, অন্তর অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন, সীরাতের আলোকে জীবন পরিচালনাকারী মহান ব্যক্তিত্বের।এটা আমার মত  অদক্ষ, অদূরদর্শী কিংবা পাঠক বলতে পারেন অপরিণামদর্শী অতি জযবাতী তরুণের কাজ নয়। তবু মহান আল্লাহর উপর ভরসা করে বড়দের থেকে যা শিখেছি তা হতে দুচার কলম যা মনে আসে লিখে ফেলি।এর মাঝে কোন কল্যাণ ও উপকারিতা থেকে থাকলে তা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আর যা কিছু অকল্যাণ অনুপকারী তা অধম ও শয়তানের পক্ষ থেকে।

সীরাতের উৎসসমূহ : আলোচ্য নিবন্ধে মাঝে মধ্যেই কুরআন থেকে অথবা নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থ সমূহ থেকে রেফারেন্স দেয়া হবে ইনশাআল্লাহ। এক্ষেত্রে কারো মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে, নিবন্ধের নাম দেয়া হলো  “সীরাতের আয়নায় দায়ীদের কর্মপন্থা” অথচ হাওয়ালা দেয়া হলো কুরআন থেকে?! হাদীস থেকে?!! বিষয়টা কেমন যেন হয়ে গেল?!!!

তো তাদের অবগতির লক্ষ্যে বলছি, আমি আগেও ইঙ্গিত দিয়েছি, এখনো বলছি,, সীরাত গ্রন্থ সমূহই সীরাতের একমাত্র উৎস নয়, বরং সীরাতের মৌলিক উৎস চারটি,

১। কুরআনে কারীম।

২। হাদীস গ্রন্থ সমূহ।

৩। সীরাত গ্রন্থ সমূহ।

৪। ইতিহাস গ্রন্থ সমূহ।

এরমধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, নির্ভরযোগ্য, আবেদনপূর্ণ উৎস হলো কুরআনে কারীম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাতের সঠিক নির্ভুল রুপায়ন ও চিত্রায়ন কুরআন যে চমৎকারভাবে ও মর্মস্পর্শী ভঙ্গিমায় উপস্থাপন করেছে তা আর কোথাও পাওয়া যাবে না। আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা (রা)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র কেমন ছিল? জবাবে আম্মাজান বলেছিলেন , كان خلقه القرآن (কুরআনই ছিল তার চরিত্র।)

কুরআনের পরে দ্বিতীয় পর্যায়ে আছে নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থ সমূহের স্থান। কারণ হাদীস যতটা গুরুত্ব ও সতর্কতার সাথে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে সীরাত বা ইতিহাস গ্রন্থ সমূহ সেভাবে সংকলন করা হয়নি। তাছাড়া হাদীস গ্রন্থ সমূহে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিক নির্দেশনা ও আদর্শ বর্ণনার প্রতি অধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে যা সীরাতুন্নবীর মূল রূহ ও প্রতিচ্ছবি। পক্ষান্তরে সীরাত ও ইতিহাস গ্রন্থ সমূহে ঘটনা বর্ণনার প্রতি বেশি জোর দেয়া হয়েছে। মিসরের প্রখ্যাত গবেষক শাইখ মুহাম্মাদ আল গাযালী রহ, যথার্থই বলেছেন  :

قد تظن أنك درست حياة محمد صلى الله عليه وسلم إذا تابعت تأريخه من مولده إلى وفاته إنه خطأ بالغ إنك لن تفقه السيرة حقا إلا أن درست القرآن الكريم و السنة المطهرة و بقدر ما تنال ذلك تكون صلتك بنبي الإسلام .(فقه السيرة : 374).

অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ইতিহাসে নযর বুলিয়েই তুমি আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলছ যে তুমি তাঁর সীরাত অধ্যয়ন করে ফেলেছ(?!!) মনে রাখবে এটা কল্পনা বিলাস বৈ কিছু না! কুরআনে কারীম ও সুন্নাতে মুতাহ্হারার সুগভীর অধ্যয়ন না করে সীরাতের সঠিক উপলব্ধি কোনোভাবেই সম্ভব নয়।এ অধ্যয়ন যত বেশি বিস্তৃত হবে ইসলামের নবীর সাথে তোমার সম্পর্ক ততই গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকবে। (ফিকহুস সীরাহ : ৩৭৪)

 

সীরাতের আয়নার দায়ীদের কর্মপন্থা 

এবার আমরা আমাদের আলোচ্য বিষয় নিয়ে সামান্য আলোকপাত করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। আলোচনার সুবিধার্থে আমরা বিষয়বস্তুকে তিন ভাগে বিন্যস্ত করব :

১। দাওয়াতের বিষয়বস্তু সংক্রান্ত কর্মপন্থা।

২। দাওয়াতের পদ্ধতিমূলক কর্মপন্থা।

৩। দাওয়াতের সুরক্ষামূলক কর্মপন্থা।

 

দাওয়াতের বিষয়বস্তু সংক্রান্ত কর্মপন্থা

দায়ীগণ দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্রে কোন বিষয়ের দাওয়াত দিবেন আর কোন বিষয়ের দাওয়াত দিবেন না এ নিয়েই আমাদের এই আলোচনা।

) খালিস তাওহীদের দাওয়াত  :

সকল নবীর দাওয়াতের মূল এবং মৌলিক বিষয় ছিল খালিস তাওহীদ বা শিরক মুক্ত তাওহীদ। কারণ বেশিরভাগ মানুষই আল্লাহকে মানে তবে পাশাপাশি অন্যদেরকেও অংশীদার সাব্যস্ত করে। আল্লাহ তাআলা বলেন :

و ما يومن أكثرهم بالله الا وهم مشركون.(سورة يوسف : 106)

অর্থাৎ, তাদের অধিকাংশই আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে কিন্তু অংশীদারও সাব্যস্ত করে।(সূরা ইউসুফ : ১০৭)

অপর এক জায়গায় বলেছেন :

و لئن سألتهم من خلق السموات والارض ليقولن الله.(سورة الزمر : 38).

অর্থাৎ : (হে মুহাম্মাদ!) যদি তুমি তাদেরকে প্রশ্ন কর যে আসমান জমিন কে সৃষ্টি করেছে তাহলে তারা অতি অবশ্যই বলবে, আল্লাহ।(সূরা যুমার : ৩৮)

এ থেকে স্পষ্টভাবে বোঝা যায় যে মক্কার মুশরিকরাও আল্লাহর রুবূবিয়্যাতের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করত। তারা স্বীকার করত যে আল্লাহই তাদেরকে এবং আসমান-জমিন সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। তাহলে তাদের শিরক মূলত কি ছিল?! মূলত তাদের শিরক তাওহীদে রুবূবিয়্যাতের ক্ষেত্রে ছিল না বরং তাদের শিরক ছিল তাওহীদে উলূহিয়্যাতের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ তারা আল্লাহকেই একমাত্র রব, রিযিকদাতা, সৃষ্টিকর্তা হিসেবে বিশ্বাস করত কিন্তু একমাত্র আল্লাহর ইবাদত না করে দেবদেবীরও পূজা করত(?!) তাও আবার আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে (?!!) মহান আল্লাহ মক্কার মুশরিকদের বক্তব্য কুরআনে কারীমে এভাবে উল্লেখ করেছেন,

ما نعبدهم الا ليقربونا إلى الله زلفى).

অর্থাৎ, আমরা তো দেবদেবীর পূজা এজন্যই করি যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়। (সূরা যুমার , ৩)

এজন্যই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সকল নবীকে তাওহীদে উলূহিয়্যাতের দাওয়াত দিয়ে প্রেরণ করেছেন।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন :

وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا ففَاعْبُدُونِ

অর্থাৎ, তোমার পূর্বে আমি যত নবী পাঠিয়েছে প্রত্যেককেই এই প্রত্যাদেশসহ পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই সুতরাং একমাত্র আমারই ইবাদত করো। (সূরা আম্বিয়া : ২৪)

সুতরাং কেউ সীরাতের আলোকে দাওয়াত দিতে চাইলে তাকে অবশ্যই তাওহীদে রুবূবিয়্যাতের সাথে সাথে তাওহীদে উলূহিয়্যাতের দাওয়াতও দিতে হবে। বরং তাওহীদে উলূহিয়্যাতই হল দাওয়াতের মূল বিষয়বস্তু আর তাওহীদে রুবূবিয়্যাত হল দাওয়াতের হাতিয়ার বা মাধ্যম। তাওহীদে রুবূবিয়্যাতের মাধ্যমে মানুষের অন্তর দাওয়াত গ্রহণের জন্য উদ্বুদ্ধ হবে এবং আল্লাহর মর্যাদার প্রভাব তাদের হৃদয়ে রেখাপাত করবে। ঠিক এই সুযোগে তাদেরকে তাওহীদে উলূহিয়্যাতের দাওয়াত দিতে হবে। তাহলেই তা নববী দাওয়াতের সঠিক প্রতিনিধিত্ব করবে। নতুবা শুধু রুবূবিয়্যাতের দাওয়াত কখনোই ‘নবীওয়ালা’ দাওয়াতের প্রতিচ্ছবি নয়।

 

) তাগুত বর্জনের দাওয়াত 

এটা মূলত প্রথম প্রকার যথা খালিস তাওহীদেরই অপরিহার্য শর্ত। এটার বিশেষ গুরুত্বের দিক বিবেচনা করে আলাদাভাবে উল্লেখ করা হলো। অনেকে তো তাগুত নামই কখনো শুনেনি। আবার কেউ শুনলেও এব্যাপারে সঠিকভাবে জানে না।কেউ কেউ মনে করে তাগুত মানে শয়তান। আবার অনেকেই ধারণা করেন তাগুত মানে মুর্তি। শয়তান, মুর্তি তাগুত হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু তাগুত মানে শয়তান বা মুর্তি নয় এবং এর মাঝেই তাগুতের অর্থ সীমাবদ্ধ নয়। বরং তাগুত একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ যার অর্থ হলো আল্লাহর বিপরীতে যার ইবাদত করা হয় বা নিঃশর্ত আনুগত্য করা হয় বা এর উপযুক্ত মনে করা হয়।

ইমাম ইবনে জারীর তাবারী রহ, (মৃত : ৩১০ হি : ) বলেন :

والصواب من القول عندي في” الطاغوت “، أنه كل ذي طغيان على الله، فعبد من دونه، إما بقهر منه لمن عبده، وإما بطاعة ممن عبده له، وإنسانا كان ذلك المعبود، أو شيطانا، أو وثنا، أو صنما، أو كائنا ما كان من شيء.

অর্থাৎ, আমার মতে “তাগুত” এর সঠিক ব্যাখ্যা হলো তাগুত হচ্ছে প্রত্যেক আল্লাহ দ্রোহী যাকে আল্লাহর পরিবর্তে ইবাদত করা হয়, তার পক্ষ থেকে চাপ দেয়ার কারণে হোক কিংবা ইবাদতকারী স্বেচ্ছায় তা করুক। এ উপাস্য মানুষ, শয়তান, মুর্তি বা যেই হোক না কেন সে তাগুত। (তাফসীরে তাবারী, সূরা বাকারা, ২৫৬)

এরচেয়েও আরো ব্যাপক ও মর্মপূর্ণ সংজ্ঞা দিয়েছেন ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রহ. (মৃত : ৭৫১ হি : )। তিনি বলেন,

أخبر سبحانه أن من تحاكم أو حاكم إلى غير ما جاء به الرسول فقد حاكم الطاغوت وتحاكم إليه والطاغوت كل ما تجاوز به العبد حده من معبود أو متبوع أو مطاع فطاغوت كل قوم من يتحاكمون إليه غير الله ورسوله أو يعبدونه من دون الله أو يتبعونه على غير بصيرة من الله أو يطيعونه فيما لا يعلمون أنه طاعة لله.

অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি রাসূলের আনিত দীনের বাইরে অন্য কারো কাছে বিচার কামনা করল ও তা মেনে নিল সে মূলত তাগুতের কাছে বিচার প্রার্থনা করল এবং মেনে নিল।তাগুত হচ্ছে যার ব্যাপারে বান্দা তার সীমালঙ্ঘন করে চাই সে হোক কোন উপাস্য  বা অনুসৃত  কিংবা আনুগত্যের অধিকারী। সুতরাং, প্রত্যেক জাতির তাগুত হলো তারা যাদের কাছে তারা আল্লাহর পরিবর্তে বিচার-ফায়সালা প্রার্থনা করে, বা আল্লাহর পরিবর্তে তাদের ইবাদত করে, অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন প্রমাণ ব্যতীত  বিনাবাক্যে তাদের অনুসরণ করে কিংবা আল্লাহর আনুগত্যের অংশ হিসেবে না করে বিনাশর্তে স্বয়ংসম্পূর্ণভাবে তাদের আনুগত্য করে। (ই’লামুল মুআক্কিয়ীন :  ১/৫৪)

এই হলো তাগুতের অতি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

এবার আসি তাগুত বর্জনের দাওয়াত প্রসঙ্গে। এটা শুধু আমাদের নবীর সীরাত নয় বরং সকল নবীর সীরাত এবং দাওয়াতে তাওহীদের অপরিহার্য রোকন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন :

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولاً أَنِ اعْبُدُواْ اللّهَ وَاجْتَنِبُواْ الطَّاغُوتَ.

অর্থাৎ, আমি প্রত্যেক জাতির মাঝে রাসূল প্রেরণ করেছি এই প্রত্যাদেশসহ যে তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর। (সূরা নাহল : ৩৬)

সুতরাং নবীওয়ালা দাওয়াতের মেহনতের দাবি করতে হলে তাগুত বর্জনের দাওয়াতও দিতে হবে।

 

) রিসালাত

খালিস তাওহীদের পরেই আসে রিসালাত এবং খতমে নুবুওয়াতের দাওয়াত।এ দাওয়াত তো স্বয়ং কালিমার অংশ।রিসালাতের সর্বজনীনতার দাওয়াতের আদেশ তো স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলকে বিশেষভাবে প্রদান করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :

قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا.

বলুন, হে লোক সকল! আমি তোমাদের সবার কাছে আল্লাহ রাসূল (হিসেবে আগমন করেছি).[সূরা আ’রাফ : ১৫৮]

এব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :

 بُعِثْتُ إلى النَّاسِ كافَّةً  الأحمرِ و الأسودِ، (مسند أحمد : 2742). 

অর্থাৎ, আমাকে সাদাকালো সকল মানুষের রাসূল হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে।(মুসনাদে আহমাদ : ২৭৪২)

এদিকে খতমে নুবুওয়াতের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার বাণী :

مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا.

অর্থাৎ, মুহাম্মাদ তোমাদের কারো পিতা নন। বরং তিনি আল্লাহর রাসূল ও শেষ নবী।(সূরা আহযাব : ৪০)

আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া বলেছেন :

أنا خاتم النبيين لا نبي بعدي.(المعجم الأوسط : 3/318)

অর্থাৎ : আমিই শেষ নবী। আমার পরে আর কোন নবী নেই।(আল-মু’জামুল আওসাত : ৩/৩১৮)

এ থেকে হিযবুত তাওহীদ, কাদিয়ানীসহ বিভিন্ন যিন্দিকদের বিরুদ্ধে দাওয়াতী কাজের গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়।

 

) আখিরাত

সীরাতে নববীর দাওয়াতের বিষয়বস্তুসমূহের অন্যতম প্রধান বিষয় হলো আখিরাত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সর্বপ্রথম যখন প্রকাশ্যে দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করেন তখন তাওহীদ, রিসালাত আর আখিরাত দিয়েই শুরু করেছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা, বর্ণনা করেন,

– صعِدَ رسولُ اللَّهِ صلَّى اللَّهُ علَيهِ وسلَّمَ ذاتَ يومٍ على الصَّفا فَنادى , يا صَباحاهُ ، فاجتَمعَت إليهِ قُرَيْشٌ ، فقالَ , إنِّي نذيرٌ لَكُم بينَ يدَي عذابٍ شديدٍ ، أرأيتُمْ لو أخبرتُكُم أنَّ العدوَّ مُمسِّيكم أو مصبِّحُكُم أَكُنتُمْ تصدِّقوني ؟ فقالَ أبو لَهَبٍ , ألِهَذا جَمعتَنا ؟ تبًّا لَكَ ، فأنزلَ اللَّهُ تبارك وتعالى , تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ. (جامع الترمذي : 3363).

অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একদিন সাফা পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে উঁচু আওয়াজে আহ্বান করে বললেন : ইয়া সাবাহা (বিপদ সংকেতমুলক শব্দ)! সাথে সাথে কুরাইশগণ তাঁর সামনে একত্রিত হল। এরপর বললেন, আমি তোমাদেরকে কঠিন আযাবের ভীতি প্রদর্শন করছি?! আচ্ছা বলতো, আমি যদি তোমাদেরকে সংবাদ দেই যে শত্রু বাহিনী সকাল বা সন্ধ্যায় তোমাদের উপর হঠাৎ আক্রমণ করে বসবে তবে কি তোমরা আমাকে সত্যায়ন করবে না??!!তখন আবূ লাহাব বলে উঠলো, তুমি ধ্বংস হও! এজন্যই কি তুমি আমাদেরকে একত্রিত করেছ?! (জামিয়ুত্ তিরমিযী : ২৩৬৩)

 

ঙ) আল ওয়ালা ওয়াল বারা

আল ওয়ালা অর্থ হলো সম্পর্ক স্থাপন, মাহাব্বাত, আন্তরিক সম্পর্ক আর আল বারা অর্থ হলো শত্রুতা পোষণ, সম্পর্কচ্ছেদ ইত্যাদি। এক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে আল ওয়ালা ওয়াল বারার ভিত্তি হল  ঈমান ও কুফর। অর্থাৎ মুমিনরাই শুধু ঈমানের কারণে একে অপরের থেকে বন্ধু, অন্তরঙ্গ সাথী, শুধু ঈমানের কারণেই একে অপরের সাহায্যের অধিকারী। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন :

إنما المؤمنون إخوة.(سورة الحجرات : 10.

অর্থাৎ, শুধু মুমিনরাই পরস্পর ভাই ভাই।(সূরা হুজুরাত : ১০)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন :

و إن استنصروكم في الدين فعليكم النصر.(سورة الأنفال : 72).

অর্থাৎ :  আর তারা যদি তোমাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে করে তাহলে তাদেরকে সাহায্য করা তোমাদের উপর আবশ্যকীয় কর্তব্য। (সূরা আনফাল :  ৭২)

অপরদিকে কাফির শুধু কাফির হওয়ার কারণে মুমিনের শত্রু, সে কখনো মুমিনের অন্তরঙ্গ বন্ধু হতে পারে না। আল্লাহ তাআলা বলেন :

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ لاَ تَتَّخِذُواْ بِطَانَةً مِّن دُونِكُمْ لاَ يَأْلُونَكُمْ خَبَالاً وَدُّواْ مَا عَنِتُّمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاء مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الآيَاتِ إِن كُنتُمْ تَعْقِلُونَ(سورة آل عمران : 118).

অর্থাৎ : হে ঈমানদারগণ! নিজেদের ব্যতীত কাফিরদেরকে অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করোনা। ওরা মনেপ্রাণে কামনা করে যেন তোমরা কষ্টে নিপতিত হও। তাদের কথাবার্তায় বিদ্বেষ প্রকাশ পায়। আর তাদের অন্তর যে বিদ্বেষ গোপন করে তাতো আরো ভয়াবহ। (সূরা আলে ইমরান : ১১৮)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :

أنا بريءٌ من كلِّ مسلمٍ يقيمُ بين أظهُرِ المشركينَ

মুসলিম দাবীদার এমন ব্যক্তির সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই যে মুশরিকদের সাথে বসবাস করে। (সুনানে আবু দাউদ : ২৬৪৫)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরাম কর্তৃক মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত, মদীনায় মুহাজির ও আনসারদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপন, মুহাজির ও আনসারদের নিয়ে নিজ গোত্র কুরাইশের বিরুদ্ধে বিভিন্ন যুদ্ধ ইত্যাদি বিষয় আল ওয়ালা ওয়াল বারার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।আর এবিষয়ক আয়াত হাদীসের সংখ্যা এত বেশি যার কিয়োদাংশও এখানে উল্লেখ করা সম্ভব না। এজন্য সীরাতের আলোকে দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করতে হলে আল ওয়ালা ওয়াল বারার দাওয়াতও দিতে হবে। তাহলে বাঙালি জাতীয়তাবাদ, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ, নববর্ষ উদযাপন, হিন্দুদের ধর্মীয় উৎসবে যোগদান, জাতিসংঘের সদস্য হওয়া, মুসলিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনাকারী ন্যাটোসহ অন্যদেরকে যেকোনোভাবে সাহায্য প্রদান ইত্যাদি বিষয় যেগুলো আল ওয়ালা ওয়াল বারার পরিপন্থী সেসব বিষয়কে এড়িয়ে নবীওয়ালা দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করা কি কস্মিনকালেও সম্ভব?! পাঠকের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রইল।

 

) পূর্ণ দীনের দাওয়াত 

আসলে দীনী দাওয়াত পূর্ণাঙ্গতা লাভ করে দীনের ছোট থেকে বড় সকল বিষয়ের দাওয়াত দেয়ার মাধ্যমেই। তবে বিষয়গুলোর গুরুত্বভেদে স্তরবিন্যাস থাকায় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক বিষয়গুলো আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুবা নববী দাওয়াত তো পূর্ণাঙ্গ দীনের দাওয়াত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন :

فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ.

অর্থাৎ, তোমাকে যা আদেশ করা হয় তার সব প্রকাশ্যে ঘোষণা করো এবং মুশরিকদের থেকে বিমুখ হও।(সূরা হিজর : ৯৪)

আল্লাহ তাআলা আরো বলেন :

يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ.

অর্থাৎ : হে রাসূল! আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার উপর যা কিছু তা (মানুষের মাঝে) পূর্ণরূপে পৌঁছে দিন। যদি আপনি এমনটা না করেন (বরং আংশিকভাবে পৌঁছান) তাহলে আপনি রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেননি!!!(সূরা মায়িদা : ৬৭)

এজন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিদায় হজ্বের সময় সাহাবীদেরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ألا فهل بلغت  অর্থাৎ আমি কি পৌঁছে দিয়েছি?! তখন সাহাবীগণ সমস্বরে বলেছিলেন بلى  অবশ্যই। সুতরাং নবীওয়ালা দাওয়াতের দাবি করতে হলে পূর্ণ দীনের দাওয়াত দিতে হবে। আংশিক দাওয়াত দিয়েই আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলা যাবে না।

 

দাওয়াতের পদ্ধতিমূলক কর্মপন্থা

এবার আমরা সীরাতের আলোকে দাওয়াতের পদ্ধতিমূলক কর্মপন্থা নিয়ে অতি সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

) আম দাওয়াত খাস দাওয়াত  

আম দাওয়াত হলো ব্যাপকভাবে দাওয়াত প্রদান যেমন জুমুআর খুতবা, বিভিন্ন মাহফিল, সভা সেমিনারে বয়ান বক্তৃতা প্রদান, লেখালেখি ইত্যাদি যা ব্যাপকভাবে অনেক মানুষকে লক্ষ্য রেখে বাস্তবায়ন করতে হয়।আর খাস দাওয়াত হলো বিশেষভাবে একজন বা কয়েকজনকে টার্গেট করে ধারাবাহিকভাবে দাওয়াত প্রদান।এই দুই ধরণের দাওয়াতই আমরা সীরাতে নববীর মাঝে সমুজ্জল দেখতে পাই।আম দাওয়াতের একটা উদাহরণ তো ইবনে আব্বাস রা, বর্ণিত হাদীসে আমরা আগেই প্রত্যেক্ষ করে এসেছি যেখানে আমরা দেখতে পাই যে তিঁনি সাফা পাহাড়ের চূড়ায় আরোহণ করে কুরাইশদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন। এখানে  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আম দাওয়াতের আরেকটি ছোট্ট চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছি। সফিউল্লাহ মুবারকপূরী রহ, স্বীয় কালজয়ী সীরাতগ্রন্থ ‘আর রাহীকুল মাখতূমে’ বলেন  :

ولاقتراب الموسم كان الناس يأتون إلى مكة رجالا، وعلى كل ضامر يأتين من كل فج عميق، لقضاء فريضة الحج، وليشهدوا منافع لهم، ويذكروا الله في أيام معلومات، فانتهز رسول الله صلى الله عليه وسلم هذه الفرصة، فأتاهم قبيلة قبيلة يعرض عليهم الإسلام، ويدعوهم إليه، كما كان يدعوهم منذ السنة الرابعة من النبوة … 

القبائل التي عرض عليها الإسلام

قال الزهري, وكان ممن يسمى لنا من القبائل الذين أتاهم رسول الله صلى الله عليه وسلم ودعاهم وعرض نفسه عليهم بنو عامر بن صعصعة، ومحارب بن خصفة، وفزارة، وغسان، ومرة، وحنيفة، وسليم، وعبس، وبنو نصر، وبنو البكاء، وكندة، وكلب، والحارث بن كعب، وعذرة، والحضارمة، فلم يستجب منهم أحد «1» .

অর্থাৎ : হজ্জের মৌসুমে নিকটবর্তী হওয়ায় দূরদূরান্ত থেকে লোকজন হজ্জ আদায়ের লক্ষ্যে মক্কায় আগমন করত…রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করলেন না।এক এক করে বিভিন্ন গোত্রের কাছে গিয়ে গিয়ে ইসলাম পেশ করে তাদেরকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিতে লাগলেন।…ইমাম যুহরী রহ, বলেন : “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেসব গোত্রের কাছে গিয়ে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিল বনূ আমির বিন সা’সাআ’, মুহারিব বিন খাসাফা, ফাযারা, গাসসান, মুররা, হানীফা, সুলাইম, আবস, বনূনাসর, বনুল বুকা, কিনদা, কালব, হারিস বিন কা’ব, আযারা এবং হামলায়। কিন্তু কেউই তার দাওয়াত কবুল করেনি। (আর রাহীকুল মাখতূম : ১১৫)

এরকম অসংখ্য ঘটনা আছে যা এই অল্প পরিসরে উল্লেখ করা সম্ভব নয়।

এবার আসি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের খাস দাওয়াতের ছোট্ট একটি চিত্র নিয়ে। সফিউর রহমান মুবারকপূরী রহ, বলেন  :

وكان من الطبيعي أن يعرض الرسول صلى الله عليه وسلم الإسلام أولا على ألصق الناس به وآل بيته، وأصدقائه، فدعاهم إلى الإسلام، ودعا إليه كل من توسم فيه خيرا ممن يعرفهم ويعرفونه، يعرفهم بحب الله والحق والخير، ويعرفونه بتحري الصدق والصلاح، فأجابه من هؤلاء- الذين لم تخالجهم ريبة قط في عظمة الرسول صلى الله عليه وسلم وجلالة نفسه وصدق خبره- جمع عرفوا في التاريخ الإسلامي بالسابقين الأولين، وفي مقدمتهم زوجة النبي صلى الله عليه وسلم أم المؤمنين خديجة بنت خويلد، ومولاه زيد بن حارثة بن شرحبيل الكلبي «١» وابن عمه علي بن أبي طالب- وكان صبيا يعيش في كفالة الرسول- وصديقه الحميم أبو بكر الصديق. أسلم هؤلاء في أول يوم من أيام الدعوة «٢» .       

অর্থাৎ, স্বাভাবিকভাবেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রথমে দাওয়াত দিয়েছিলেন তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ব্যাক্তিদেরকে, তাঁর পরিবার পরিজন ও বন্ধুদেরকে….তো এদের মধ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মহত্ত্বের ব্যাপারে যাদের অন্তরে বিন্দুমাত্র দ্বিধা-সংশয় ছিল না তারা বিনাবাক্যে তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিল…. এঁদের অগ্রভাগে ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সহধর্মিণী ও উম্মুল মুমিনীন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ(রা : )…. তাঁর চাচাতো ভাই আলী ইবনে আবূ তালিব(রা : )…এবং তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু আবূ বকর সিদ্দিক (রা : )…(আর রাহীকুল মাখতূম : ৬৩)

) পর্যায়ক্রমে দাওয়াত 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাত পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই যে তিনি তাঁর নুবুওয়াতী যিন্দেগীর শুরুর দিকে শুধু তাওহীদ, রিসালাত, আখিরাত,  পূণরুত্থান, জান্নাত, জাহান্নাম ইত্যাদি বিষয়ের দাওয়াত দিয়েছেন এবং মানুষের অন্তরে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের মহব্বত ও আনুগত্যের বীজ বপন করেছেন এরপর ধীরে ধীরে বিভিন্ন হুকুম আহকাম জারী করেছেন। এজন্যই আমরা দেখতে পাই যে মাক্কী জীবনে বিধিবিধান খুব কম নাযিল হয়েছে। অপরদিকে মাদানী যিন্দেগীতে একেরপর এক বিধান নাযিল হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ মদ হারাম হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা যেতে পারে।মদ একদম শুরুতেই হারাম করে দেয়া হয়নি বরং তিনটি পর্যায় অতিক্রম করে চতুর্থ পর্যায়ে গিয়ে চুরান্তভাবে হারাম করা হয়েছে।

তো বর্তমানে দায়ীদের কর্তব্য হলো এই পদ্ধতি অবলম্বন করা। তবে লক্ষনীয় বিষয় হলো হালাল-হারাম শরীয়তের মূল বিধিবিধান চুরান্ত হয়ে গেছে, দীন পূর্ণাঙ্গ হয়ে গেছে।এখন আর এসব বিধিবিধানের ক্ষেত্রে কোন পর্যায়ক্রমিতার সুযোগ নেই। বরং দায়ী শুধু মাদয়ূর অবস্থা বিবেচনা করে একেক সময় একেক বিষয়ের দাওয়াত দিবে।

) নরম পন্থায় দাওয়াত

সীরাতে নববীর দাওয়াতের অন্যতম কার্যকরী একটি পদ্ধতি হলো নরম পন্থায় দাওয়াত। কারণ নরম পন্থায় দাওয়াত দিলে মানুষ সহজেই তা গ্রহণ করে। পক্ষান্তরে কঠিন ও রুক্ষভাবে দাওয়াত দিলে তা মানুষ তা সহজে গ্রহণ করতে চায় না। আল্লাহ তাআলা তার রাসূলকে উদ্দেশ্য করে বলেন :

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِّنَ اللّهِ لِنتَ لَهُمْ وَلَوْ كُنتَ فَظًّا غَلِيظَ الْقَلْبِ لاَنفَضُّواْ مِنْ حَوْلِكَ فَاعْفُ عَنْهُمْ

অর্থাৎ, আল্লাহর পক্ষ থেকে দয়ার কারণেই তুমি তাদের প্রতি নরম হয়েছ। যদি তুমি কঠোর ও পাষান হৃদয়ের অধিকারী হতে তাহলে তারা তোমার থেকে দূরে সরে যেত।(সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)

এমনকি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা হযরত মুসা আলাইহিস্ সালামের মত জলীলুল কদর নবীকে ফিরাউনের মত উদ্ধত শয়তানের কাছে তাওহীদের দাওয়াত প্রদানের ক্ষেত্রে নরম পন্থার আদেশ দিয়ে বলেন

فقولا لهما قولا لينا لعله يتذكر أويخشى.( سورة طه : 44)

অর্থাৎ, অতঃপর তাকে নরম কথা বল। হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীত সন্ত্রস্ত হবে।(সূরা ত্বহা : ৪৪)

এ থেকে নরম পন্থায় দাওয়াতের গুরুত্ব সহজেই বুঝে আসে। আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আদেশ দিয়ে বলেন :

ادع إلى سبيل ربك بالحكمة و الموعظة الحسنة و جادلهم بالتي هي أحسن.(سورة النحل : 125)

অর্থাৎ, তোমার রবের পথে আহ্বান করো হিকমাত ও উত্তম উপদেশমালার মাধ্যমে আর তাদের সাথে বিতর্ক করো সর্বোত্তম পন্থায়।(সূরা নাহল : ১২৫)

এক্ষেত্রে এসে একটা বিষয়ে সামান্য ইঙ্গিত না দিলেই নয়।তা হলো অনেকে নরম পন্থার দাওয়াত আর নরম দাওয়াতের মাঝে জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতসারে তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। তাদের বক্তব্য হলো ইসলামের শুধু এমন বিষয়গুলোরই দাওয়াত দিতে হবে যেগুলো তুলনামূলক নরম, যেগুলো মানুষ সহজেই গ্রহণ করে করবে। দলীল হিসেবে তারা উপর্যুক্ত আয়াত সমূহ এবং এজাতীয় আরো আয়াত ও হাদীস দিয়ে দলীল দেয়ার অপচেষ্টা করে থাকেন।এটা সুস্পষ্ট গোমরাহী।নরম দাওয়াত আর নরম পন্থার দাওয়াত কখনোই এক নয়। শুধু নরম দাওয়াত হলো দীনকে টুকরো করে ফেলা। আর নরম পন্থায় দাওয়াত হলো দীনের পূর্ণাঙ্গ দাওয়াত তবে তা হবে উত্তম পন্থায় হিকমাতের সাথে। দুইটা বিষয়ের মাঝে আসমান জমিনের ফারাক। কিন্তু ঐযে কিছু লোক থাকবেই যারা পরিষ্কার পানি ঘোলা করে পান করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। সুতরাং দায়ীদেরকে এবিষয়ে খুব চৌকস ও সতর্ক হতে হবে।

 

) মিডিয়ার সদ্ব্যবহার 

দাওয়াতের ময়দানে মিডিয়া তথা প্রচার মাধ্যমের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।এর গুরুত্ব এখন সবাই বোঝে। তাই এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আর বিস্তারিত আলোচনার কোনো প্রয়োজন বোধ করছিনা।সীরাত নিয়ে সামান্য পড়াশোনা আছে এমন ব্যক্তির কাছেও অজানা নয় যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তৎকালীন সময়ের সর্বোচ্চ মিডিয়া ব্যবহার করেছিলেন। হেরাক্লিয়াস, খসরূ পারভেজসহ বিভিন্ন রাজাবাদশাহর কাছে তার প্রেরিত পত্রগুলো তার সমুজ্জল ও অকাট্য প্রমাণ।

 

) বিভিন্ন ভাষায় দাওয়াত 

দাওয়াতের প্রচার প্রসারে বিভিন্ন ভাষার ব্যবহারও অতিব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমান সময়ে বিশেষ করে ইংরেজি ভাষা এব্যাপারে খুব বেশি প্রভাবশালী ও কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সীরাত থেকে সরাসরি আমরা এর গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারি।যায়েদ বিন সাবিত রা, বলেন,

قال لي رسول الله صلى الله عليه وسلم, أتحسن السريانية؟ أنه يأتيني كتب، قال قلت لا، قال فتعلمها، قال فتعلمتها في سبعةعشريوما.(شرح مشكل الآثار : 2038)

অর্থাৎ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, ‘তুমি কি সুরিয়ানী ভাষা জানো? কারণ আমার কাছে অনেক চিঠিপত্র আসে। আমি বললাম, ‘না’।তিঁনি বললেন, শিখে ফেলো। তখন আমি তা সতের দিনে শিখে ফেললাম। (শরহু মুশকিলিল আসার : ২০৩৮)

 

) যোগ্যদের মাঝে দায়িত্ব বন্টন

দাওয়াত কার্যকরী হওয়ার এটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ সবার মাঝে সব যোগ্যতা থাকেনা।কেউ এক বিষয়ে দক্ষ হয় তো আরেক বিষয়ের প্রাথমিক জ্ঞানও থাকেনা। বর্তমানে দাওয়াতের ক্ষেত্র অনেক বেশি।তাই এটা উপেক্ষা করার কোন সুযোগ নেই।সীরাত থেকেই এবিষয়ের গুরুত্ব আমরা অতি সহজেই উপলব্ধি করতে পারি। ইতোপূর্বে যায়েদ বিন সাবিত রা, এর ঘটনায় দেখলাম যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুরিয়ানী ভাষা শিক্ষার জন্য তাঁর চেয়ে বয়সে ও ইলমে বড় কোনো সাহাবীকে বাছাই করেননি। এমনকিভাবে কুরআন সংকলনের জন্য বিশেষ বিশেষ সাহাবী নির্বাচন, মদীনায় দায়ী হিসেবে মুসআব বিন উমায়েরকে প্রেরণ ইত্যাদি শত  শত ঘটনা আমাদেরকে এই শিক্ষাই দেয়।

 

দাওয়াতের সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ

শুধু এই পদক্ষেপগুলোর ক্ষেত্রে সীরাতে নববীর অনুসরণ না করায় কত দাওয়াতের চারা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেছে! শুধু এই একটি কারণে অনেক মুবারক দাওয়াতী কাফেলা ধ্বংস হয়ে গেছে বা এর কাংখিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেনি কিংবা পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। তাই এবিষয়ে সীরাতের দিক নির্দেশনা সম্পর্কে সামান্য পর্যালোচনার চেষ্টা করব ইনশাল্লাহ।

) মুদাহানাত থেকে বেঁচে থাকা

মুদাহানাত হলো দুনিয়া ঠিক রেখে দীনের ব্যাপারে ছাড় দেয়া।এই ছাড় দেয়ার মানসিকতা দীনী দাওয়াতের ওপর ছুরিকাঘাত সমতুল্য বরং তার চেয়েও শতগুণ মারাত্মক। কারণ দায়ী যদি কাফির, ফাসিক, তাগুত ও দীনের শত্রুদের সাথে কোনোভাবে সামান্য একটু আধটুও ছাড় দেয় তাহলেই দীনী দাওয়াতের জবাই করার চুক্তি স্বাক্ষর ও সম্পাদিত হয়ে যায়। এজন্যই তারা চায় মুমিন দায়ীগণ একটু আধটু হলেও আপোষ করুক, ধীরে ধীরে তাদের আপষহীনতা বরফের মতো বিগলিত হয়ে যাবে। মক্কার মুশরিকরা এই জিনিসটাই চেয়েছিল যে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটু হলেও ছাড় দিক। এজন্য তারা তাঁকে বিভিন্নভাবে লোভ ও ভীতি প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে, তাঁর চাচা আবু তালিবের মাধ্যমেও কাবু করার চেষ্টা করেছে কিন্তু তিনি  আবূ তালিবের সামনে দীপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন,

يا عماه، والله لوْ وضعوا الشمس في يميني، والقمر في يساري على أن أترك هذا الأمر حتى يُظهره الله أو أهلك فيه ما تركتُه.     

অর্থাৎ : চাচা!! আল্লাহর কসম, ওরা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চন্দ্রও এনে রেখে দেয় তবুও আমি এবিষয় ছাড়বো না যতক্ষণ না আল্লাহ তাআলা এই দীনকে বিজয়ী করেন অথবা আমি মারা যাই!

আল্লাহ তাআলাও পবিত্র কুরআনে এবিষয়ে বার বার সতর্ক করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেছেন’

ودوا لو تدهن فيدهنون.(سورة القلم : 9).

তারা কামনা করে যদি তুমি শিথিলতা অবলম্বন করর তবে তারাও শিথিলতা অবলম্বন করবে।(সূরাতুল কলম : ৯)

وَأَنِ احْكُم بَيْنَهُم بِمَآ أَنزَلَ اللّهُ وَلاَ تَتَّبِعْ أَهْوَاءهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَن يَفْتِنُوكَ عَن بَعْضِ مَا أَنزَلَ اللّهُ إِلَيْكَ.(سورة المائدة : 49)

অর্থাৎ, তোমার উপর যা নাযিল করা হয়েছে তুমি তার মাধ্যমেই তাদের মাঝে ফায়সালা করো।আর সতর্ক থাকো যেন তারা তোমাকে আল্লাহর নাযিল করা বিধিবিধানের সামান্য অংশ থেকেও বিচ্যুত করতে না পারে। (সূরা মায়িদা : ৪৯)

এই মুদাহানাতের কুফল দেখার জন্য বেশিদূর যেতে হবেনা। শাপলা চত্বর থেকে শুকরিয়া মাহফিল ও বর্তমান সময়ের বিভিন্ন ঘটনার দিকে তাকালেই অনেক কিছু বুঝে আসবে।

) ছোটখাটো বিষয়ে বাড়াবাড়ি না করা

অনেক দায়ীর এখন মেধা ও শ্রম ব্যয় হচ্ছে ছোটখাটো বিষয়গুলোতে। আমীন আস্তে বলা জোরে বলা, রফয়ে ইয়াদাইন করা না করা ইত্যাদি নিয়ে মারামারি ধরাধরি উম্মাহর মাঝে শুধু বিভাজনই সৃষ্টি করছে। এক্ষেত্রে উচিৎ ছিল যে যেটার উপর আমল করছে তাকে সেটাই করতে দেয়া।এটা দাওয়াতের কোন বিষয়বস্তু হতেই পারেনা! হায় যদি আমরা সীরাত থেকে শিক্ষা নিতাম!!হাতীম মূলত কাবার অংশ ছিল। কিন্তু কুরাইশরা তা আলাদা করে রেখেছিল। আয়েশা সিদ্দিকা (রা) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

لَوْلا أنَّ قَوْمَكِ حَديثُو عَهْدٍ بجاهِلِيَّةٍ، أوْ قالَ, بكُفْرٍ، لأَنْفَقْتُ كَنْزَ الكَعْبَةِ في سَبيلِ اللهِ، ولَجَعَلْتُ بابَها بالأرْضِ، ولأَدْخَلْتُ فيها مِنَ الحِجْرِ.(صحيح مسلم1333).

অর্থাৎ, তোমার গোত্র যদি সদ্য কুফরমুক্ত নও মুসলিম না হত তাহলে আমি কাবার ধনভাণ্ডার আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করতাম, তার দরজা বাহিরে দিতাম এবং তাতে হাতিমকে অন্তর্ভুক্ত করে নিতাম। (সহীহ মুসলিম : ১৩৩৩)

) হিকমত মাসলাহাতের অপব্যবহার না করা

মূলত হিকমতের মাধ্যমে দাওয়াত প্রদান ভালো একটি গুণ। এমনিভাবে মাসলাহাত তথা দীনের বড় স্বার্থের জন্য ছোটখাটো বিষয়ে ছাড় দেয়া নন্দিত কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু হিকমত মাসলাহাতের  দোহাই দিয়ে দীনের বিধান গোপন করা, দীনের ফরজ বিধান ছেড়ে দেয়া ইত্যাদি শুধু নিন্দনীয় না বরং তা দাওয়াতের মূল স্পিরিট নষ্ট করে দেয় এবং সাধারণ মানুষকে ফেলে ধোকায়। বেচারারা মনে করে তাদের প্রাণপ্রিয় দায়ীগণ তাদের কাছে দীনের সঠিক দাবীই উপস্থাপন করছে অথচ তাদের দায়ীগণও জানেন যে এ দাওয়াত পূর্ণাঙ্গ নয় বরং অঙ্গকাটা। মূলত এটাও মুদাহানাতেরই অংশ। তবু এই দুই পরিভাষার অপব্যবহার খুব বেশি হওয়ায় আলাদাভাবে উল্লেখ করা হলো।

) দাওয়াত বিস সাইফ তথা কিতাল ছেড়ে না দেয়া

ইসলামী দাওয়াত রক্ষায় দাওয়াত বিস সাইফ বা জিহাদ-কিতালের অপরিহার্যতা এমন স্বতঃসিদ্ধ বিষয় যা বলাই বাহুল্য। কিন্তু উম্মাহর দায়ীগণ এটাকে এমনভাবে ভুলে গেছেন যেন ইসলামে কিতাল বলে কোন বস্তুই নেই।(নায়ূযু বিল্লাহ) এজন্য ইসলামী দাওয়াত রক্ষায় এই ভুলে যাওয়া মাযলূম ফরিযার গুরুত্ব কত বেশি সে বিষয়ে শুধু কুরআন ও সুন্নাহর অসংখ্য বাণীহমূহ হতে সামান্য কয়েকটি উল্লেখ করছি। আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَوْلاَ دَفْعُ اللّهِ النَّاسَ بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَّفَسَدَتِ الأَرْضُ وَلَكِنَّ اللّهَ ذُو فَضْلٍ عَلَى الْعَالَمِينَ.(سورة البقرة : 251).

অর্থাৎ, আল্লাহ যদি মানুষের কতককে কতকের দ্বারা প্রতিহত না করতেন তাহলে পৃথিবী ফিতনা ফাসাদে ভরে যেত। কিন্তু আল্লাহ পৃথিবীবাসীর উপর অনুগ্রহশীল।(সূরা বাকারা : ২৫১)

و قاتلوهم حتى لا تكون فتنة و يكون الدين كله لله.(سورة الأنفال : 39).

অর্থাৎ, তাদের বিরুদ্ধে ততক্ষণ পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাও যতক্ষণ না সকল ফিতনা দূরীভূত হয় এবং দীন কেবল আল্লাহরই হয়ে যায়।(সূরা আনফাল : ৩৯)

এদিকে বদর যুদ্ধের শুরুলগ্নে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করতে গিয়ে বলেছিলেন,

اللهم إن تهلك هذة العصابة فلن تعبد في الأرض أبدا.  

হে আল্লাহ যদি এই দল ধ্বংস হয়ে যায় তাহলে এই পৃথিবীতে আর কখনোই তোমার ইবাদত করা হবেনা।

আশাকরি দাওয়াত বিস সাইফ বা কিতাল দাওয়াত রক্ষায় কতটা গুরুত্বপূর্ণ তার কিছুটা হলেও হয়তো উপলব্ধি করতে পারছি।

যাইহোক খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে আমাদের আলোচ্য বিষয় ‘সীরাতের আয়নায় দায়ীদের কর্মপন্থা’ সম্পর্কে কিছু ধারণা দেয়া হলো। জানিনা কতটুকু সফল হয়েছি। আল্লাহ কবুল করো আমীন।

و صلى الله على سيدنا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.و آخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين.       

লেখক : তরুণ আলেম 

Tijarah-Shop

Facebook Comments